লোডশেডিংয়ে আর কত ভুগতে হবে?

গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও কমছে না বিদ্যুতের ভোগান্তি। বরং বুধবারের (২৬ আগস্ট) তুলনায় বৃহস্পতিবার বিকালে বিদ্যুতের ঘাটতি দাঁড়িয়েছে দ্বিগুণেরও বেশি। ফলে রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় দফায় দফায় লোডশেডিংয়ে নাকাল হচ্ছেন মানুষ।

এদিকে পিডিবি জানায়, যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে মাতারবাড়ি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট (৬০০ মেগাওয়াট) বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সরবরাহ কমেছে। সে কারণে লোডশেডিং করতে হচ্ছে। প্রকৌশলীরা বিদ্যুৎকেন্দ্রটি সারিয়ে তোলার জন্য কাজ করছেন। তবে তারা এক সপ্তাহের সময় চাইলেও ৫ দিনের মধ্যে চালু করা যাবে বলে আশা করছেন পিডিবি কর্মকর্তারা।

বিদ্যুৎ খাত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্যাস সংকটের কারণে সাম্প্রতিক সময়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হলেও বর্তমানে এলএনজি সরবরাহ পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। এক্সিলারেট এনার্জির এলএনজি টার্মিনালও আবার চালু হয়েছে। অর্থাৎ বর্তমানে দেশের দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল থেকেই গ্যাস সরবরাহ হচ্ছে। কিন্তু বিদ্যুতের ঘাটতি বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন সক্ষমতা, বিদ্যুতের চাহিদা এবং সরবরাহ ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ (পিজিসিবি) সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) বিকাল ৪টার দিকে বিদ্যুতের চাহিদার তুলনায় সরবরাহ ঘাটতি ছিল প্রায় ৩ হাজার ৮১ মেগাওয়াট। আগের দিন বুধবার একই সময়ে ঘাটতি ছিল প্রায় ১ হাজার ৫৩৯ মেগাওয়াট। একদিনের ব্যবধানে ঘাটতি বেড়েছে প্রায় ১ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট।

সরকারি হিসাবের বাইরে বিভিন্ন এলাকায় আরও লোডশেডিং হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় কোথাও কোথাও ২৪ ঘণ্টায় কয়েক দফায় বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। এতে গরমের মধ্যে বাসাবাড়ির স্বাভাবিক কাজকর্ম ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি দুর্ভোগে পড়ছেন শিশু ও বয়স্করা।

চরম ভোগান্তি

রামপুরার উলনের বাসিন্দা সোহাগ সরকার বলেন, সারা দিন গরমের মধ্যে কয়েক দফা বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। বাসায় বাচ্চা আর বয়স্ক মানুষ আছে, তাদের নিয়ে খুব কষ্ট হচ্ছে। কখন বিদ্যুৎ যাবে, কখন আসবে, কোনও ঠিক নেই। আগে আওয়ামী লীগের আমলে লোডশেডিংয়ের শিডিউল করে দেওয়া হয়েছিল। তাতে অন্তত আমরা জানতাম কখন বিদ্যুৎ যাবে। এখন সেটাও করছে না সরকার।

মিরপুরের রেখা রাণী বলেন, সন্ধ্যা থেকে কয়েক দফায় বিদ্যুৎ গেছে। রাতে ঘুমানোর সময়ও বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। গরমে ঘুমানো যাচ্ছে না। কয়েক দিন ধরে এই সমস্যা আরও বেড়েছে। বিশেষ করে মধ্যরাতে বিদ্যুৎ চলে যাওয়াটা বেশ ভোগান্তির।

শাহজাহানপুরের বাসিন্দা রতন কুমার বলেন, বিদ্যুৎ না থাকায় বাসার স্বাভাবিক কাজকর্মই করা যাচ্ছে না। ফ্রিজ, ফ্যান, পানির পাম্প কিছুই ঠিকমতো চালানো যাচ্ছে না। দিনের পর দিন এভাবে চলা খুবই দুর্ভোগের। একদিকে গ্যাস নাই, অন্যদিকে বিদ্যুৎ নাই।

দুই এলএনজি টার্মিনাল চালু, তবু বিদ্যুতে বড় ঘাটতি

গ্যাস সংকটের কারণে গত কয়েক দিন বিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছিল। এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ কমে যায়। এর প্রভাব পড়ে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদনে। তবে বর্তমানে টার্মিনালটি আবার চালু হওয়ায় দুই টার্মিনাল থেকেই এলএনজি সরবরাহ হচ্ছে।

পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার বিকাল ৪টার হিসাবে দেশে মোট গ্যাস সরবরাহ হয়েছে ২ হাজার ৩৫৪ মিলিয়ন ঘনফুট। এর মধ্যে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে এসেছে ১ হাজার ৬১৮ মিলিয়ন ঘনফুট এবং আমদানি করা এলএনজি থেকে সরবরাহ হয়েছে ৭৩৬ মিলিয়ন ঘনফুট।

অর্থাৎ এলএনজি সরবরাহ আগের সংকটকালীন সময়ের তুলনায় বেড়েছে। দুই এলএনজি টার্মিনাল চালু থাকলেও বিদ্যুতের ঘাটতি বৃহস্পতিবার কেন এতটা বেড়েছে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

পিডিবির নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, ‘‘গ্যাস সরবরাহ বাড়লেই সঙ্গে সঙ্গে সব বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদনে যেতে পারে না। কেন্দ্রগুলোর কারিগরি সক্ষমতা, রক্ষণাবেক্ষণ, জ্বালানি সরবরাহ ঘাটতির কারণেও বিদ্যুৎ ঘাটতি হয়। একই সময়ে বিদ্যুতের চাহিদা কতটা বেড়েছে, তার ওপরও উৎপাদন নির্ভর করে। ফলে গ্যাস পরিস্থিতির উন্নতি হলেও বিদ্যুতের চাহিদা বেশি থাকায় কমানো যাচ্ছে না লোডশেডিং।’ 

পিডিবির ২৬ আগস্টের হিসেবে, গ্যাস সংকটে ৪ হাজার ৫৯৩ মেগাওয়াট ঘাটতি হয়েছে। এদিকে রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতের কারণে বন্ধ আছে আরও ১ হাজার ৭৭৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন। এছাড়া বড়পুকুরিয়া কেন্দ্রের ২ নম্বর ইউনিট দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ। ১ নম্বর ইউনিটও সম্প্রতি যান্ত্রিক ত্রুটিতে একাধিকবার বন্ধ হয়েছে। বর্তমানে ৩ নম্বর ইউনিট চালু রয়েছে। এছাড়া বাঘাবাড়ি ১০০ মেগাওয়াট এবং সিরাজগঞ্জ ২১০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধ রয়েছে।

পিডিবির তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার হিসাবে দেশে মোট ১৫ হাজার ৫৫২ দশমিক ৫৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ ছিল। এর মধ্যে গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্র থেকে ৪ হাজার ৭০২ মেগাওয়াট, কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র থেকে ৪ হাজার ৯৭০ মেগাওয়াট, ফার্নেস অয়েল (এইচএফও) থেকে ৩ হাজার ১৮৪ দশমিক ১২ মেগাওয়াট, বিদ্যুৎ আমদানি থেকে ২ হাজার ৩০৪ দশমিক ৪৫ মেগাওয়াট, জলবিদ্যুৎ থেকে ২২০ মেগাওয়াট, ডিজেলচালিত (এইচএসডি) কেন্দ্র থেকে ১৫০ মেগাওয়াট এবং বায়ুবিদ্যুৎ থেকে ২২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হয়।