গ্যাস সরবরাহ বাড়লেও বিদ্যুৎ পরিস্থিতির অবনতি, বেড়েছে লোডশেডিং

শিল্প কারখানা ও বাসাবাড়িতে গ্যাস সরবরাহ বাড়লেও বিদ্যুৎ পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি; বরং গতকালের তুলনায় আজ বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) লোডশেডিং বেড়েছে। গ্যাস সরবরাহ বাড়ায় শিল্প খাত ও সিএনজি স্টেশনের পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। তবে আবাসিকে গ্যাস সরবরাহের পরিস্থিতি এখনও আগের মতোই আছে।

পেট্রোবাংলার সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বুধবার বিকাল ৪টায় জাতীয় গ্রিডে মোট গ্যাস সরবরাহ ছিল ২ হাজার ৬১০ মিলিয়ন ঘনফুট। এর মধ্যে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে পাওয়া গেছে ১ হাজার ৬১৭ মিলিয়ন ঘনফুট এবং আমদানি করা এলএনজি থেকে ৯৯৩ মিলিয়ন ঘনফুট পাওয়া গেছে।

এর আগের দিন মঙ্গলবার বিকাল ৪টায় মোট গ্যাস সরবরাহ ছিল ২ হাজার ৬০৬ মিলিয়ন ঘনফুট। রাতে অর্থাৎ এক দিনের ব্যবধানে মোট সরবরাহ বেড়েছে ৪ মিলিয়ন ঘনফুট। বুধবারের সরবরাহে দেশীয় গ্যাস ও এলএনজির পরিমাণ সামান্য পরিবর্তিত হয়েছে।

গ্যাস বাড়ায় শিল্পে কিছুটা স্বস্তি, আবাসিকে সংকট

গ্যাস সরবরাহ বাড়লেও রাজধানীর বিভিন্ন আবাসিক এলাকায় সংকট পুরোপুরি কাটেনি। কোথাও দিনের বেলা গ্যাসের চাপ কিছুটা বাড়লেও অনেক এলাকায় এখনও চুলা জ্বলছে না। ফলে রান্নাবান্নায় ভোগান্তি অব্যাহত রয়েছে। শান্তিনগরের বাসিন্দা নাসরিন আক্তার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আমাদের এখানে পুরোপুরি গ্যাস বন্ধ হয়নি কখনও। তবে দুপুরের দিকে গ্যাসের চাপ গত কয়েকদিন ধরেই খুব কম ছিল। আজ খুব ভালোভাবে গ্যাস পাচ্ছি।

এদিকে, পশ্চিম ধানমন্ডির বাসিন্দার শওকত আক্তার বলেন, আগেও গ্যাস ছিল না। পেপারে পড়লাম গ্যাস সরবরাহ বেড়েছে, কিন্তু আমাদের গ্যাস আসেনি। আগের মতোই বিদ্যুতের চুলায় রান্না করছি। 

এদিকে, রাজধানীর ভুতের গলির বাসিন্দা রুনা আক্তার বলেন, আগে সকালে গ্যাস পেতাম না। এখন গ্যাস আসছে। চুলা জ্বলছে, কিন্তু চাপ কম থাকায় রান্না করতে অনেক সময় লাগছে।

এদিকে গাজিপুর, নারায়নগঞ্জ ও চট্টগ্রামে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গ্যাস সরবরাহ বাড়ায় শিল্প খাতে এর প্রভাব পড়েছে। তবে সরবরাহ বৃদ্ধির পরিমাণ এবং বিভিন্ন খাতে গ্যাস বিতরণের কারণে আবাসিক গ্রাহকদের পরিস্থিতিতে এখনও বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যায়নি।

সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতেও গ্যাসের চাপ ও সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে ভোগান্তি কমেছে বলে জানান  সিএনজি ফিলিং স্টেশন মালিক সমিতির মহাসচিব ফারহান নুর। তিনি বলেন, আমাদের অবস্থা আগের তুলনায় একটু ভালো বলা যায়। এমন অনেক স্টেশন ছিল যাতে গ্যাসই ছিল না, সেখানে আজ গ্যাস আসছে। তারা বিক্রি করছে। তবে গ্যাসের চাপ এখনও অনেক কম। ফলে ভোগান্তি একেবারে নেই তা বলা যাচ্ছে না।  

পেট্রোবাংলার হিসাবে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে গ্যাসের চাহিদা ২ হাজার ৫২৪ মিলিয়ন ঘনফুট, এর মধ্যে গতকাল সরবরাহ করা হয়েছে ৮৮৪ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস, আজ সেটি বাড়িয়ে ৯৩১ মিলিয়ন ঘনফুটে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। বিদ্যুৎকেন্দ্র, সার কারখানাসহ সব মিলিয়ে আজ সরবরাহ করা হয়েছে ২ হাজার ৫০৮ মিলিয়ন গ্যাস, যা গতকাল ছিল ২ হাজার ৩৬৯ মিলিয়ন ঘনফুট।

তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির পরিচালক (অপারেশন) সাইদুল হাসান বলেন, তিতাসের অধীন এলাকায় চাহিদা ১ হাজার ৯০০ থেকে ২ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। আমরা এখন সরবরাহ পাচ্ছি ১৪১১ মিলিয়ন ঘনফুটের মতো। এর মধ্যে বিদ্যুতে দেওয়া হচ্ছে ২২২ মিলিয়ন ঘনফুট, সারে ৭০ এবং বাদবাকিটা শিল্প, সিএনজি, আবাসিকসহ অন্য ক্ষেত্রে দেওয়া হচ্ছে। এখানে বলে রাখা ভালো শিল্পে গ্যাস যাচ্ছে সবচেয়ে বেশি। তিনি বলেন, আগের তুলনায় সরবরাহ বাড়লেও লো প্রেসার এখনও আছে। সরবরাহ আর না বাড়লে এই প্রেসার বাড়ানো সম্ভব না। 

বিদ্যুৎ পরিস্থিতির অবনতি, বেড়েছে লোডশেডিং

গ্যাস সরবরাহ বাড়লেও বিদ্যুৎ উৎপাদনের ইতিবাচক প্রভাব দেখা যাচ্ছে না। বরং গতকালের তুলনায় বুধবার বিদ্যুতের ঘাটতি ও লোডশেডিং বেড়েছে। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে গ্রাহকদের ভোগান্তি অব্যাহত রয়েছে।

বিদ্যুৎ পরিস্থিতির সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বুধবার ১৬ সেপ্টেম্বর ৫টার হিসাবে চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ৩০৩ মেগাওয়াট, সরবরাহ করা হয়েছে ১৪ হাজার ২৭১ মেগাওয়াট, বিপরীতে লোডশেডিং হয়েছে ২  হাজার ৩২ মেগাওয়াট। এর আগের দিন অর্থাৎ মঙ্গলবার একই সময়ে লোডশেডিং ছিল ১ হাজার ৩১৯ মেগাওয়াট। সেই হিসাবে প্রায় ৭১৩ মেগাওয়াট লোডশেডিং বেড়েছে।

প্রসঙ্গত, গত সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মঙ্গলবার রাত থেকে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতি আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়ার আশা প্রকাশ করেন। মঙ্গলবার সকাল থেকে এলএনজি সরবরাহ কিছুটা বাড়তে শুরু করে; যা এখনও অব্যাহত আছে।

এদিকে, কেন বিদ্যুৎ পরিস্থিতির এই অবনতি জানতে চাইলে পিডিবির সদস্য (উৎপাদন) জহুরুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, গ্যাস সরবরাহ কিছুটা বেড়েছে। আজ সন্ধ্যায় গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে আমরা ৫ হাজার ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাচ্ছি। তবে কয়লাচালিত সব কেন্দ্র পূর্ণ ক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না। রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটা ইউনিট বন্ধ, সেটি উৎপাদনে আসতে পারে ১৭-১৮ সেপ্টেম্বরের দিকে। অন্যদিকে আজ সকালে মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট বন্ধ হয়ে গেছে। এ কারণে বিদ্যুৎ ঘাটতি তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি মেরামত ও সংরক্ষণের কাজ চলায় একাধিক কেন্দ্র বন্ধ আছে।