ব্যবসায়ীরা বলছেন সংকট নেই, বাজারে মিলছে না এলপিজি 

দেশে এলপিজির সংকট নেই বলে আমদানিকারক ও অপারেটররা বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদকে আশ্বস্ত করার পরও রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় এলপিজি সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না। কোথাও কোথাও পাওয়া গেলেও নির্ধারিত দামের তুলনায় প্রায় ১ হাজার টাকা বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। বিভিন্ন এলাকায় ১২ কেজির সিলিন্ডার প্রায় ২ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

এ নিয়ে ভোক্তাদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। শনিবার (৩ অক্টোবর) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে অনেকেই এলপিজি না পাওয়া এবং বেশি দামে কিনতে বাধ্য হওয়ার কথা জানিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। রান্নার জন্য প্রয়োজনীয় গ্যাস কিনতে এক দোকান থেকে আরেক দোকানে ঘুরতে হচ্ছে বলেও অভিযোগ করছেন কেউ কেউ।

গ্রাহকদের ভোগান্তি

ফেসবুকে হাসনাত অভি নামে একজন লিখেছেন, ‘সিলিন্ডার বনাম ইউরেনিয়াম। ১২ কেজির দাম ২৫০০ টাকা।’ ডা. হামিদুর রহমান আজাদ নামে একজন লিখেছেন, ‘‘সরকার বলছে দেশে এলপিজির সংকট নেই। তাহলে ১৫৮৫ টাকার ১২ কেজির সিলিন্ডার ২১০০–২৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে কেন? আবার বেশি দাম দিয়েও অনেক জায়গায় মানুষ গ্যাস পাচ্ছে না কেন? সরকারকে এখন সরাসরি জবাব দিতে হবে— গ্যাস কোথায়? কার কাছে মজুত আছে? কোন পর্যায়ে সরবরাহ আটকে আছে? সংকট না থাকলে বাজারে এই ঘাটতি ও অস্বাভাবিক দাম কেন? কারা অতিরিক্ত দাম নিচ্ছে, আর কারা সরবরাহ আটকে রাখছে—তা তদন্ত করে জনগণের সামনে প্রকাশ করতে হবে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বা পরিবহন ব্যয় বাড়লে তার তথ্য-উপাত্ত দিন। কিন্তু সরকারি দামে পণ্য পাওয়া নিশ্চিত করতে না পেরে শুধু ‘সংকট নেই’ বললে জনগণ সেই বক্তব্য বিশ্বাস করবে কীভাবে? এলপিজি বিলাসপণ্য নয়,এটি মানুষের নিত্যপ্রয়োজন। তাই মজুতদারি, কৃত্রিম সংকট ও অতিরিক্ত মূল্য আদায়ের অভিযোগ তদন্ত করুন, দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিন এবং নির্ধারিত দামে গ্যাস পাওয়া নিশ্চিত করুন। প্রশ্ন খুব পরিষ্কার—গ্যাস যদি থাকে, তাহলে জনগণ তা পাচ্ছে না কেন?’’

এদিকে রামপুরা, বনশ্রী, শান্তিনগর, মালিবাগ, কাঠালবাগানসহ বেশ কিছু এলাকায় খোঁজ নিয়ে গ্রাহকদের কাছ থেকে একই অভিযোগ পাওয়া যায়।

রামপুরা থেকে সাথী আক্তার জানান, এলপিজি সিলিন্ডার পাচ্ছি তবে দাম আকাশ ছোঁয়া। দোকানদারের এক কথা— ‘এই দামে নিলে নেন, না নিলে না নেন।’ আমরা তো বাধ্য। তাই বেশি দামেই কিনতে হচ্ছে।’’ একই কথা বলেন শাহজাহানপুরের বাসিন্দা রুপনা আক্তার। তিনি বলেন, ‘‘নতুন বাড়িতে উঠেছি। গ্যাসের লাইন নেই। প্রথম থেকেই এলপিজি ব্যবহার করি। প্রতিমাসে যে হারে দাম বেড়েই চলেছে, সংসারের খরচের সাথে তা পোষাতে কষ্ট হচ্ছে। এখন বিকল্প চিন্তা করি। যদিও বিদ্যুতের চুলায় রান্না করলে একইভাবে বিদ্যুতের বিলও বেশি আসবে— তাই বিকল্প ভাবারও জায়গা নেই মধ্যবিত্তের।’’

প্রসঙ্গত, সর্বশেষ গত ২ সেপ্টেম্বর সেপ্টেম্বর মাসের জন্য এলপিজির দাম ঘোষণা করে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। তখন ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ১৩ টাকা কমিয়ে ১ হাজার ৫৮৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়। ওই দিন  সন্ধ্যা ৬টা থেকে নতুন দাম  কার্যকর হয়। অর্থাৎ বিইআরসির নির্ধারিত দামের তুলনায় ২ হাজার ৫০০ টাকায় একটি সিলিন্ডার কিনলে ভোক্তাকে এখন প্রায় ৯১৫ টাকা বেশি দিতে হচ্ছে।

গত সপ্তাহে ‘সংকট নেই’ বলেছিলেন অপারেটররা

এলপিজির বাজার পরিস্থিতি নিয়ে গত ২৮ সেপ্টেম্বর জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ আয়োজিত মতবিনিময় সভায় আমদানিকারক ও এলপিজি অপারেটরদের সঙ্গে বৈঠক করেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। ওই সভায় অপারেটররা দেশে এলপিজির কোনও সংকট নেই বলে মন্ত্রীকে আশ্বস্ত করেছিলেন।

এর দুই দিন পর ৩০ সেপ্টেম্বর জেলা প্রশাসকদের সঙ্গে অনলাইন সভায় মন্ত্রী দেশের কোথাও কৃত্রিম সংকট তৈরি করে এলপিজি বেশি দামে বিক্রি করা হচ্ছে কিনা, তা খতিয়ে দেখতে নির্দেশ দেন। বিইআরসির নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি নেওয়া হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানান তিনি।

এরপর ১ অক্টোবর লোয়াবও জানায়, দেশে এলপিজির সরবরাহ পর্যাপ্ত ও সন্তোষজনক। সংগঠনটির তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে ১ দশমিক ৫৮ লাখ টন এবং সেপ্টেম্বরে ১ দশমিক ৫৬ লাখ টন এলপিজি আমদানি হয়েছে। পর্যাপ্ত সরবরাহের পরও বেশি দামে বিক্রি বা নিয়মবহির্ভাবে মজুত করা হলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানায় লোয়াব।

ব্যবসায়ীদের দাবি, বেড়েছে জাহাজের প্রিমিয়াম

তবে এলপিজি ব্যবসায়ীদের বক্তব্য, আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজি পরিবহনে জাহাজ ভাড়া ও ট্রেডারের প্রিমিয়াম অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। এ কারণে বাড়তি ব্যয়ে নতুন কার্গো আমদানিতে চাপ তৈরি হয়েছে।

খাত—‘সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, বিইআরসির সেপ্টেম্বরের মূল্য নির্ধারণে জাহাজ ভাড়া ও ট্রেডারের প্রিমিয়াম টনপ্রতি ১৬০ ডলার ধরা হয়েছিল। কিন্তু বাজারে এই খরচ বেড়ে ২৫০ থেকে ৩০০ ডলারে পৌঁছেছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ বলছেন, বাড়তি প্রিমিয়াম দিয়ে কার্গো সংগ্রহ করলেও বিইআরসির নির্ধারিত দামে সেই বাড়তি ব্যয় সমন্বয়ের সুযোগ নেই। এ কারণে আমদানিতে অনাগ্রহ তৈরি হচ্ছে এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ পড়ছে।

তবে বেসরকারি অপারেটর টিএমএসএস-এলপিজি’র এজিএম আনিসুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘আমরা যে চুক্তি করেছি, সেই চালান আসার কথা ছিল আজ-কালকের মধ্যে। কিন্তু সেটা এখন পিছিয়ে ১০/১২ তারিখে গিয়ে ঠেকেছে। তাও একেবারে নিশ্চিত না। ফলে আমাদের কোম্পানিকে বাধ্য হয়ে রেশনিং করতে হচ্ছে।’’ তিনি বলেন, যে প্রিমিয়ামের ভিত্তিতে বিইআরসি দাম নিধারণ করেছিল। এখন সে প্রিমিয়াম আর নেই। বাড়তি প্রিমিয়াম দিয়ে ব্যবসায়ীরা আর কত লোকসান দিয়ে এলপি গ্যাস আনবে। সংকট নেই এটা একেবারে বলা যাবে না। তবে বাজারের এখন যে গুজব— গ্যাস একেবারে নেই, এটা ঠিক না।’’ অতিরিক্ত দামের প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘‘আমরা ডিলারদের দেওয়ার পর খুচরা ব্যবসায়ীরা সব কোম্পানির সিলিন্ডারই বিক্রি করে। সেখানে কত দামে বিক্রি হচ্ছে, সেটা মনিটর করা আমাদের পক্ষে সম্ভব না। সরকারকেই সে দায়িত্ব নিতে হবে।’’

চাহিদা অনুযায়ী পাচ্ছেন না খুচরা বিক্রেতারা

খুচরা বিক্রেতাদের দাবি, চাহিদা অনুযায়ী ডিলার বা পরিবেশকদের কাছ থেকে সিলিন্ডার পাচ্ছেন না তারা।

কাঠালবাগান বাজারের একজন খুচরা বিক্রেতা জানান, আগে ৫০০ সিলিন্ডারের চাহিদা পাঠালে সবটাই পাওয়া যেতো। এখন  অর্ধেকের মতো দেওয়া হচ্ছে। আগে চাহিদা পাঠানোর পর দ্রুত সরবরাহ পাওয়া গেলেও এখন কয়েক দিন অপেক্ষা করতে হচ্ছে। রাজধানীর পশ্চিম ধানমন্ডির একজন এলপিজি ডিলার জানিয়েছেন, সরবরাহ কমে যাওয়ায় চাহিদা অনুযায়ী সিলিন্ডার রাখা যাচ্ছে না। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ার কারণে এলপিজি পাওয়া যাচ্ছে না বলে তাদের জানানো হচ্ছে।

জানা যায়, শনিবারও এলপিজি সরবরাহ ও বাজার পরিস্থিতি নিয়ে মালিক ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে। এদিকে বাজারে ‍গুজব আছে— সবমিলিয়ে এই সপ্তাহের মধ্যেই এলপিজির দাম বাড়াবে বিইআরসি। প্রতিমাসে যে দাম ঘোষণা করে সেখান থেকেই এই ঘোষণা আসতে পারে। দাম বাড়ানোর পর গ্রাহকদের ধারণা বাজারে আর কোনও সংকট থাকবে না। ফলে অনেকেই একে কৃত্রিম সংকট হিসেবেও দেখছেন।