সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনার ক্ষতি করলে সর্বোচ্চ ৫ বছরের কারাদণ্ড, অধ্যাদেশ জারি

সর্বোচ্চ ৫ মেগাওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন, পরিচালনা ও অনুমোদনের জন্য নতুন অধ্যাদেশ জারি করেছে সরকার। এতে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, বাসাবাড়ি, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, চা-বাগান, সেচপাম্প, কোল্ড স্টোরেজ ও বৈদ্যুতিক যানবাহনের চার্জিং স্টেশনে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের সুযোগ রাখা হয়েছে। তবে বৃহৎ ভূমিভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প এই অধ্যাদেশের আওতার বাইরে থাকবে। অধ্যাদেশে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনা কার্যক্রমে বাধা কিংবা স্থাপনার ক্ষতিসাধনের জন্য সাজার মেয়াদও উল্লেখ করা হয়েছে।

গত ১৯ অক্টোবর ‘বিশেষ সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন অধ্যাদেশ, ২০২৬’ জারি করা হয়। রাষ্ট্রপতি কর্তৃক জারি করা এ অধ্যাদেশে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে বিনিয়োগ, সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান নির্বাচন, বিদ্যুৎ বিল সমন্বয়, সরকারি ক্রয় ও প্রকল্প বাস্তবায়নে বিভিন্ন বিশেষ বিধান যুক্ত করা হয়েছে।

অধ্যাদেশ অনুযায়ী, সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে অপারেশনাল এক্সপেনডিচার (ওপেক্স) মডেলকে। এ মডেলে সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান নিজস্ব বিনিয়োগে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ করবে। উৎপাদিত বিদ্যুতের অংশ বা মূল্য চুক্তির শর্ত অনুযায়ী সমন্বয় করা হবে। অন্যদিকে নিজস্ব তহবিল বা নিয়মিত আয় রয়েছে, এমন প্রতিষ্ঠান চাইলে ক্যাপিটাল এক্সপেনডিচার (ক্যাপেক্স) মডেলে নিজস্ব অর্থায়নে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন ও এর মালিকানা ধরে রাখতে পারবে।

অধ্যাদেশে বলা হয়েছে, উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ জেলাভিত্তিক নির্দিষ্টসংখ্যক যোগ্য সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের তালিকা প্রস্তুত ও সংরক্ষণ করবে। তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্য থেকে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে গ্রাহক সেবাদানকারী নির্বাচন করবেন। তবে গ্রাহক চাইলে তালিকার বাইরে উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে নির্ধারিত প্রতিষ্ঠানকে দিয়েও সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করতে পারবেন।

প্রকল্প বাস্তবায়নে গ্রাহক, সেবাদানকারী ও উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় চুক্তির বিধান রাখা হয়েছে। চুক্তিতে যন্ত্রপাতির গুণগত মান, নিরাপত্তা, স্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণ, বিদ্যুতের বণ্টন, গ্রাহকের প্রাপ্য বিদ্যুতের অংশ, মূল্য নির্ধারণ এবং বিল পরিশোধের শর্ত অন্তর্ভুক্ত থাকবে। পাশাপাশি মেয়াদোত্তীর্ণ যন্ত্রপাতি ও ই-বর্জ্যের নিরাপদ ব্যবস্থাপনা এবং ব্যবহারের অনুপযোগী যন্ত্রাংশ ফেরত নেওয়ার ব্যবস্থাও চুক্তিতে রাখতে হবে।

সরকারি ক্রয়ের ক্ষেত্রেও বিশেষ সুবিধা রাখা হয়েছে। ক্যাপেক্স মডেলে সীমিত দরপত্র পদ্ধতিতে পণ্য ও সংশ্লিষ্ট সেবা কেনার আর্থিক সীমা অনূর্ধ্ব ৫ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ অধ্যাদেশের আওতায় সংশ্লিষ্ট ক্রয় প্রক্রিয়ায় ইলেকট্রনিক গভর্নমেন্ট প্রকিউরমেন্ট (ই-জিপি) ব্যবহার বাধ্যতামূলক হবে না। এ ছাড়া চুক্তির অনুমোদন ও মেয়াদ নির্ধারণে বিশেষ বিধান রাখা হয়েছে।

অধ্যাদেশে নেট-মিটারিংয়ের মাধ্যমে সৌরবিদ্যুৎ থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ নিজস্ব চাহিদা পূরণে ব্যবহারের পাশাপাশি উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের সুযোগ রাখা হয়েছে। গ্রিডে সরবরাহ করা বিদ্যুতের পরিমাণ নির্ধারিত বিলিং মেয়াদে বিদ্যুৎ বিলের সঙ্গে সমন্বয় করা হবে। সমন্বয়ের পরও উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ থাকলে প্রযোজ্য বিধান ও সরকার নির্ধারিত ট্যারিফ অনুযায়ী তার মূল্য পাওয়ার বিধান রয়েছে। নেট-মিটারিং সম্প্রসারণে প্রণোদনামূলক কার্যক্রম গ্রহণের সুযোগও রাখা হয়েছে।

সৌরবিদ্যুৎ কার্যক্রমের নীতিগত দিকনির্দেশনার জন্য প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে জাতীয় পলিসি কাউন্সিল গঠনের বিধান রাখা হয়েছে। এতে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয়, আইন মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী, বিভিন্ন বিভাগের সচিব এবং সরকারি সংস্থার প্রতিনিধিরা থাকবেন। কাউন্সিল নবায়নযোগ্য জ্বালানির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়, নেট-মিটারিং, প্রণোদনা ও বিনিয়োগ মডেল বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যালোচনা করবে।

এ ছাড়া জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে কারিগরি ও সমন্বয় কমিটি গঠনের বিধান রাখা হয়েছে। এসব কমিটি প্রকল্প বাস্তবায়নে সহায়তা ও তদারকি, বিরোধ নিষ্পত্তি, প্রয়োজনীয় দলিল সংরক্ষণ এবং গ্রাহকদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার কাজ করবে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার তথ্য সংরক্ষণ এবং স্থাপনাগুলো সচল রয়েছে কি না, তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে।

অধ্যাদেশে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা বা এর যন্ত্রাংশ চুরি, চোরাই যন্ত্রাংশ কেনাবেচা, স্থাপনার ক্ষতিসাধন, অবৈধ সংযোগ এবং স্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজে বাধা দেওয়ার জন্য শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। যন্ত্রাংশ চুরি বা চোরাই যন্ত্রাংশ কেনাবেচার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদণ্ড বা ৫০ হাজার টাকা জরিমানা কিংবা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনার ক্ষতিসাধনের জন্য সর্বোচ্চ ৫ বছরের কারাদণ্ড বা ৫ লাখ টাকা জরিমানা কিংবা উভয় দণ্ড দেওয়া যাবে। অবৈধ সংযোগ এবং স্থাপন কার্যক্রমে বাধা দেওয়ার ক্ষেত্রেও সর্বোচ্চ ৩ বছরের কারাদণ্ড বা ৫ লাখ টাকা জরিমানা কিংবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।

অধ্যাদেশটি অবিলম্বে কার্যকর করার কথা বলা হয়েছে। এর বাস্তবায়ন ও প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যার জন্য সরকার বিধি, প্রজ্ঞাপন, আদেশ ও নির্দেশিকা জারি করতে পারবে।