বিশ্ববাজারে খাদ্য ও জ্বালানির দাম বাড়ার শঙ্কা, চাপে পড়তে পারে বাংলাদেশ

বিশ্ববাজারে খাদ্য ও জ্বালানির দাম উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। চলতি বছরের শেষ দুই মাসে এই দাম আরও বাড়তে পারে এবং আগামী বছরজুড়েই এই চাপ অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে। এতে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতির দেশগুলোতে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়তে পারে। বিশ্বব্যাংকের ২৮ অক্টোবর প্রকাশিত কমোডিটি মার্কেটস আউটলুক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালে বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম গড়ে ২৩ শতাংশ বাড়তে পারে।

এর পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে জ্বালানির দাম ৩২ শতাংশ বেড়ে যাওয়া, শস্য পরিবহনে বিঘ্ন এবং শক্তিশালী এল নিনোর প্রভাবে সৃষ্ট আবহাওয়াগত ঝুঁকির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালে খাদ্যপণ্যের দাম প্রায় ১০ শতাংশ বাড়তে পারে। ২০২৭ সালে বাড়তে পারে আরও ৭ শতাংশ। দুই বছরে সব মিলিয়ে খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ার হার দাঁড়াতে পারে প্রায় ১৮ শতাংশে।

বিশ্বব্যাংকের আশঙ্কা, এসব সংকট একসঙ্গে দেখা দিলে ঝুঁকিপূর্ণ অর্থনীতির দেশগুলোতে মূল্যস্ফীতি ও খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা আরও বাড়বে। তবে বাংলাদেশে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বা অভ্যন্তরীণ বাজারে পণ্যের দাম কতটা বাড়তে পারে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো পূর্বাভাস দেয়নি সংস্থাটি।

বাংলাদেশে এর প্রভাব কতটা পড়বে, তা নির্ভর করবে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম, আমদানি ব্যয়, বিনিময় হার এবং বাড়তি ব্যয়ের কতটা ভোক্তাদের ওপর চাপানো হচ্ছে, তার ওপর।

দক্ষিণ এশিয়ায় খাদ্য মূল্যস্ফীতি

২০২৬ সালের তৃতীয় প্রান্তিকে দক্ষিণ এশিয়ায় খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ৮ শতাংশে। ২০১০ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে এ অঞ্চলে খাদ্য মূল্যস্ফীতির গড় হার ছিল ৫ দশমিক ৬ শতাংশ। অর্থাৎ বর্তমান হার দীর্ঘমেয়াদি গড়কেও ছাড়িয়ে গেছে। বিশ্বব্যাংক বলছে, শস্য ও ভোজ্যতেলের দাম বাড়ার পূর্বাভাস এ অঞ্চলে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়াতে পারে। চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) এক বছর আগের তুলনায় চালের দাম ২৪ শতাংশ বেশি ছিল। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এল নিনো-সংশ্লিষ্ট আবহাওয়াগত উদ্বেগের কারণে চালের বাজারে এই চাপ তৈরি হয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে চালের দাম ১০ শতাংশ এবং ২০২৭ সালে আরও ১২ শতাংশ বাড়তে পারে। গত এক দশকের মধ্যে এবারই প্রথম বিশ্বে চালের উৎপাদন কমার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এদিকে ২০২৬ সালে গমের দাম ২৮ শতাংশ এবং ২০২৭ সালে আরও ১৪ শতাংশ বাড়তে পারে। চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে শস্যের দাম বেড়েছে ৯ শতাংশ। এক বছর আগের তুলনায় দাম ২৫ শতাংশ বেশি। একই সময়ে গমের দাম বেড়েছে ১৩ শতাংশ। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় গমের দাম এখন ৪০ শতাংশ বেশি। অক্টোবরে বিশ্ববাজারে খাদ্যপণ্যের সামগ্রিক মূল্যসূচক এক বছর আগের তুলনায় ১২ শতাংশ বেশি ছিল।

জ্বালানি, সার ও ধাতুর বাজারে চাপ

২০২৬ সালে জ্বালানির দাম ৩২ শতাংশ বাড়তে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। এতে টানা তিন বছর দাম কমার প্রবণতার অবসান ঘটবে। এ বছর প্রতি ব্যারেল ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের গড় দাম ৯১ ডলারে পৌঁছাতে পারে। ২০২৫ সালে এই দাম ছিল ৬৯ ডলার। অবশ্য ২০২৭ সালের এক পর্যায়ে তা কমে ৭৯ ডলারে নামতে পারে বলেও পূর্বাভাসে উল্লেখ করা হয়েছে।

২০২৬ সালে বিশ্বে তেলের সরবরাহ ৫ দশমিক ২ শতাংশ কমার আশঙ্কা রয়েছে। ২০২০ সালের করোনা মহামারির সময়টুকু বাদ দিলে চার দশকের বেশি সময়ের মধ্যে সরবরাহ কমার এটিই হবে সবচেয়ে বড় ঘটনা।

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে সরবরাহ সীমিত থাকায় অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে এশিয়ার তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) দাম সংঘাত শুরুর আগের তুলনায় প্রায় তিন গুণে পৌঁছেছিল।

এদিকে চলতি বছরের শুরুতে ইউরিয়ার দাম বেড়েছে। শেষের দিকে তা ১৪ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে বলেও ধারণা করা হচ্ছে। তবে ২০২৭ সালে তা ১২ শতাংশ কমার পূর্বাভাস রয়েছে।

জ্বালানি ও সারের দাম বাড়লে কৃষি উৎপাদন এবং পণ্য পরিবহনের খরচও বেড়ে যায়। আমদানি করা জ্বালানি ও কৃষি উপকরণের ওপর নির্ভরশীল বাংলাদেশের জন্য এ কারণে বিশ্ববাজারের এই পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ।

অন্যদিকে ২০২৬ সালে ধাতুর দাম নতুন রেকর্ড গড়তে পারে। এ বছর সামগ্রিকভাবে ধাতুর দাম ২৫ শতাংশ বাড়ার পূর্বাভাস দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। অ্যালুমিনিয়াম, তামা ও টিনের দাম ইতোমধ্যে রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে।

নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বৈদ্যুতিক গাড়ি ও তথ্যকেন্দ্রে বিনিয়োগ বাড়ায় এসব ধাতুর চাহিদা বেড়েছে। পাশাপাশি চলতি বছরের সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্নও দাম বাড়ার পেছনে ভূমিকা রেখেছে। সবমিলিয়ে ২০২৭ সালে ধাতুর দাম ৩ শতাংশ কমতে পারে।

এদিকে নিরাপদ বিনিয়োগের মাধ্যম হিসেবে মূল্যবান ধাতুর চাহিদা বাড়ছে। ভূরাজনৈতিক ও নীতিগত অনিশ্চয়তার কারণে ২০২৬ সালে এসব ধাতুর দাম ৪০ শতাংশ বাড়তে পারে। ২০২৭ সালে দাম কিছুটা কমলেও ২০১৫ থেকে ২০১৯ সালের গড় দামের তুলনায় তিন গুণের বেশি থাকবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।

এল নিনোর প্রভাব পড়তে পারে বাংলাদেশের চায়ে

প্রতিবেদনে চা উৎপাদন নিয়ে আলোচনায় বাংলাদেশের নাম উল্লেখ করেছে বিশ্বব্যাংক। এতে বলা হয়েছে, এল নিনোর প্রভাবে দক্ষিণ এশিয়ায় চায়ের উৎপাদন ও গুণগত মান কমতে পারে। বিশেষ করে বাংলাদেশ ও ভারতের কিছু অঞ্চলে এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়নে, দক্ষিণ এশিয়ার সব দেশই এল নিনোর প্রভাবে উচ্চ বা মাঝারি মাত্রায় ঝুঁকিতে রয়েছে। তবে চায়ের বৈশ্বিক বাজারে আপাতত সরবরাহের ঘাটতি নেই। উত্তর ভারত ও বাংলাদেশে উৎপাদন বাড়ায় বাজারে পর্যাপ্ত চা রয়েছে। তবে বাংলাদেশে চা উৎপাদন ঠিক কতটা কমতে পারে, সে বিষয়ে প্রতিবেদনে কোনো নির্দিষ্ট পূর্বাভাস দেওয়া হয়নি।

আবহাওয়াজনিত কারণে উৎপাদন কমলেও দুর্বল চাহিদার প্রভাবে বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে কলম্বো ও কলকাতার নিলামে চায়ের দাম ১ শতাংশ কমেছে।

বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস, ২০২৭ সালে চায়ের দাম ৪ শতাংশ এবং ২০২৮ সালে ২ শতাংশ বাড়তে পারে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে চায়ের চাহিদা বাড়লে দামের ওপর এর প্রভাব পড়বে।

সামনে আরও যেসব ঝুঁকি


সামগ্রিকভাবে ২০২৭ সালে বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম ৭ শতাংশ কমতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। তবে ভূরাজনৈতিক সংঘাত ও আবহাওয়াজনিত ধাক্কায় এই পূর্বাভাস পাল্টে যেতে পারে।

জ্বালানির উচ্চমূল্য, কৃষ্ণসাগরে শস্যবাহী জাহাজে হামলা এবং অত্যন্ত শক্তিশালী এল নিনো—এই তিনটি সংকট একসঙ্গে দেখা দিলে ২০২৭ সালে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের গড় দাম প্রতি ব্যারেল ১০৫ ডলারে পৌঁছাতে পারে।

এ পরিস্থিতিতে খাদ্যপণ্যের দাম পূর্বাভাসের তুলনায় ১২ শতাংশ বেশি হতে পারে। শস্যের দাম বাড়তে পারে ২০ শতাংশ। খাদ্যপণ্যের দাম ২০২২ সালের উচ্চতাকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে।

বিশ্বব্যাংকের আশঙ্কা, এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে আরও বেশি মানুষ চরম দারিদ্র্যের মুখে পড়বে। ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীকে সহায়তা, সরকারের আর্থিক সক্ষমতা ধরে রাখা এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও খামারগুলোর চলতি মূলধনের জোগান নিশ্চিত করতে বিশ্বব্যাংক গ্রুপ বিদ্যমান বিভিন্ন ব্যবস্থার আওতায় ৫০ থেকে ৬০ বিলিয়ন ডলার সহায়তার জন্য প্রস্তুত রেখেছে। এর মধ্যে ২৫ বিলিয়ন ডলার আগাম অর্থায়ন হিসেবে নির্ধারিত রয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের উপপ্রধান অর্থনীতিবিদ ও প্রসপেক্টস গ্রুপের পরিচালক আয়হান কোসে বলেন, ‘একসঙ্গে বেশ কয়েকটি বড় ধাক্কার মুখে পড়েছে পণ্যের বাজার। জ্বালানির বাড়তি খরচ ও বাণিজ্যিক বাধার কারণে বিভিন্ন পণ্যের দাম বাড়ছে। এতে মূল্যস্ফীতি, খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আরও ঝুঁকিতে পড়তে পারে।’

তিনি আরও বলেন, ‘সবচেয়ে দরিদ্র মানুষকে সুরক্ষা দেওয়া এবং ঋণের ভারে আগে থেকেই চাপে থাকা নিম্ন আয়ের দেশগুলোকে সহায়তা করাই এখন প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।’