দিন বদলের জমানায় এও এক বড় পরিবর্তন। কত সহজেই না কত কথা বলা যায়। কিন্তু মানুষ আশ্বাস পায় না। কোথায় যেন একটা শঙ্কা মানুষকে তাড়িয়ে বেড়ায়। ঘরে ঘরে পাহারা দিতে পারবো না বলে মানুষকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে যতই সাফল্যের গান শোনানো হোক না কেন, সে সুর মানুষকে ভরসা দেয় না।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রেজাউল করিম আর কলাবাগান জোড়া খুনের পর সম্প্রতি জাপান টাইমস একটি মন্তব্য প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। শিরোনাম দিয়েছে- ‘বাংলাদেশ ইন ডিপ ট্রাবল’ বা গভীর সঙ্কটে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ যে গভীর সঙ্কটে সেজন্য জাপান টাইমস পড়া লাগে না। কিন্তু আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে তা এখন ভাবনার বিষয়। যে লেখক এটি লিখেছে তার লেখা একসঙ্গে ৪৫টি দেশে ছাপা হয়। আর একই দিনে জানা গেলো জঙ্গি সন্দেহে সিঙ্গাপুরে ৮ বাংলাদেশি আটক হয়েছে। তারা নাকি ইসলামিক স্টেট ইন বাংলাদেশ (আইএসবি) নামে সিঙ্গাপুরে একটি গোপন সংগঠন প্রতিষ্ঠা করে বাংলাদেশে বড় ধরনের জঙ্গি হামলার পরিকল্পনা করছিল।
বিশ্বব্যাপী এখন অর্থনীতির মন্দার মতই আইসিস বা আইএস প্রভাব। বিশ্বব্যাপী আইএস-এ যোগ দেওয়ার যে হিড়িক পড়েছিল তাতে এখন ভাটার টান। কিন্তু কী অদ্ভূতভাবে বাংলাদেশে বাংলাদেশিদের মধ্যে হঠাৎ করে জঙ্গি মনোভাব বাড়লো, সে লক্ষণ স্পষ্ট। রাজনৈতিক হানাহানি, খুনোখুনিতে আমাদের শাসক বা বিরোধী পক্ষ সবসময় সক্রিয়। বাংলাদেশের শান্তিপ্রিয় মানুষ তা চায় না। কিন্তু রাজনৈতিক দলের নেতা-নেত্রীরা ক্ষমতার দম্ভে প্রায়ই এই সত্যটি ভুলে যান। আর এই যে সংঘাতের রাজনীতি, তার মাঝ দিয়ে নিজেদের জায়গা করে নিচ্ছেন জঙ্গিরা।
অনেকেই বলে থাকেন জঙ্গি তৎপরতা এখন আর সাধারণ আইন-শৃঙ্খলা ঘটনা নয় যে শুধু পুলিশ দিয়ে তা দমন করা যাবে। তা সত্য। কিন্তু পুলিশ, র্যাবতো আমাদের প্রধান নির্ভরতা। জঙ্গি আর দুষ্কৃতিকারী দমনে তাই সরকারও ‘কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্স ন্যাশনাল ক্রাইম’ নামের নতুন একটি ইউনিট গঠন করেছে। দেশে ও দেশের বাইরের সন্ত্রাসীদের তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ, তাদের অপ-তৎপরতা প্রতিরোধ, সন্ত্রাসীদের গতিবিধি সব সময় তদারক করা এবং তাদের গ্রেফতারে কাজ করবে এই ইউনিট।
আরও পড়তে পারেন: এবার পাঠ্যপুস্তক থেকে ‘নাস্তিক ও ইসলামবিরোধী’দের লেখা বাতিলের দাবি
পরপর দুটি ঘটনা শুধু নয়, প্রায় প্রতিটি ঘটনার পর পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। বেশি উঠছে আরও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও পুলিশ প্রধানের বক্তব্যকে কেন্দ্র করে। খুন, দুষ্কৃতিকারীদের তৎপরতাও বেড়েছে। এবং পুলিশের চোখেই ধুলো দিয়ে দুর্বৃত্তরা তাদের চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। চাপাতি খুনের ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা যেমন প্রশ্নের মুখে, তেমনি তাদের পেশাদারিত্বের অভাবের বিষয়টিও প্রকট হয়ে উঠেছে। যে পুলিশ মানুষের নিরাপত্তার দায়িত্বে সেই দায়িত্বশীল ব্যক্তিই যদি মানুষকে বলেন- যার যার নিরাপত্তা তার তার, তাহলে কার ওপর ভরসা রাখবে মানুষ?
পেশাদার মানসিকতার অভাব নাকী অতি রাজনীতিকীকরণের কারণে কথাবার্তা এমন হচ্ছে তা নিয়ে বিতর্ক হবে। কিন্তু দিন শেষে মানুষের আশ্রয় কিন্তু পুলিশ, র্যাব ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। পুলিশের দক্ষতা আর সক্ষমতার ওপরই মানুষের নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা নির্ভরশীল। বিভিন্ন জায়গায় হাঙ্গামা, খুন, সন্ত্রাস যেভাবে চলছে তাতে মানুষ আতঙ্কিত। সেই আতঙ্ককে আরও বাড়িয়েছে জঙ্গি উত্থান।
রাজনৈতিক শক্তি যারা ক্ষমতায় আছেন তাদের আর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, এ দু’পক্ষের মধ্যে বোঝাপড়াটাই সন্ত্রাস দমনের সাফল্যের চাবিকাঠি হয়ে উঠতে পারে। চমক তৈরির রাস্তায় না গিয়ে রাষ্ট্রের উচিত পুলিশি ব্যবস্থায় যে সব ফাঁক রয়েছে, আগে সে দিকে নজর দেওয়া। পুলিশ বাহিনী মজবুত করতে, গোয়েন্দা ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ ও তাদের পরিকাঠামো সুবিধা দিতে আরও সক্রিয় হতে হবে সরকারকে।
সরকার বলছে- আইএস নেই, কিন্তু আইএস মনোভাবাপন্ন ব্যক্তি ও জঙ্গি সংগঠন আছে। জঙ্গিদের নতুন রূপ আর কৌশল নিয়ে বিতর্ক নেই। তারা যে এখন মাদ্রাসার ছায়া থেকে বের হয়ে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত পৌঁছে গেছে, তা মানতেই হবে। রাজনৈতিকভাবে সরকারকে অনেক কিছু বলতে হয়। কিন্তু পেশাদার বাহিনীর কাছে মানুষ পেশাদারিত্ব আশা করে, রাজনীতি নয়।
আরও পড়তে পারেন: ব্যক্তিগত গাড়িতে সাংবাদিক-পুলিশ লেখা স্টিকার নিষিদ্ধ
বাংলাদেশের এখনকার পরিস্থিতি বলে দেশে জঙ্গিবাদের একটা আবহ তৈরি হয়েছে। এমনিতেই আমাদের রাজনীতির ঐতিহ্যের মধ্যে সহিংসতার উপকরণ সব সময়ই বিরাজমান। আর তাই একটা চরমপন্থার আশঙ্কা থেকে বাংলাদেশ কখনোই মুক্ত ছিল না। এটাও ঠিক যে অতীতে বাংলাদেশের রাজনীতিতে চরমপন্থি রাজনীতি দীর্ঘ মেয়াদে গ্রহণযোগ্যতা ও জনপ্রিয়তা লাভ করেনি কারণ সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ শান্তিপ্রিয়, নির্লিপ্ত। সেই মানুষ এখনও শান্তি চায়।
২০০৫ সালের পর থেকে বাংলাদেশে মোট ছয়টি জঙ্গি সংগঠন নিষিদ্ধ করা হয়। এগুলো হলো – জামাআতুল মুজাহেদীন বাংলাদেশ (জেএমবি), জাগ্রত মুসলিম জনতা বাংলাদেশ (জেএমজেবি), হরকাতুল জিহাদ, শাহদাতই আল-হিকমা এবং হিযবুত তাহরীর এবং আনসারুল্লাহ বাংলা টিম। এ পর্যন্ত পুলিশ ও র্যাব বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনের প্রায় ৩ হাজার সদস্য আটক করলেও, তাদের বড় একটা অংশ জামিনে ছাড়া পেয়ে নতুনভাবে তৎপর।
এখানেই পুলিশ ও সংশ্লিষ্টদের দক্ষতা ও আন্তরিকতার প্রশ্ন। কেমন করে এরা জামিন পায়? তদন্তে দুর্বলতা, আইনি দুর্বলতা, আন্তরিকতার অভাব? জানিনা এসব প্রশ্নের উত্তর কে দেবে?
তাই পুলিশকে মানুষের আস্থা অর্জন করতে হবে। মানুষ সবসময়ই তাদের সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে রেখেছে। প্রতিটি ঘটনায় লোক দেখানো বা দায়সারা গোছের কোনও গ্রেফতার নয়, পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে সংগঠিতভাবে। অন্যথায় শুধু লেখক, ব্লগার বা উদারপন্থি মানুষ নয়, আক্রমণ থেকে বাদ যাবে না স্বয়ং পুলিশও। এবং আমরা পুলিশের ওপর নির্মম আক্রমণ কীভাবে জামায়াত-শিবির কর্মীরা করেছে তা সাম্প্রতিক সময়ে দেখেছি।
লেখক: পরিচালক বার্তা, একাত্তর টেলিভিশন