অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সুশাসনে দুর্নীতি দমন অন্যতম দিক। আগের যেকেনও সময়ের চেয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের নতুন চেয়ারম্যান ও তার সহকর্মীরা অনেক বেশি তৎপর। তবুও একথা বলার সময় এখনই আসেনি যে, দেশে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে উন্নতি হয়েছে। প্রতিবছরই বিশ্বের দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান থাকে উপরের দিকে। এ বছর জানুয়ারিতে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল প্রকাশিত দুর্নীতির ধারণা সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৩তম, যা গত বছর ছিল ১৪তম। অর্থাৎ ধারণা সূচক অনুযায়ী বাংলাদেশে দুর্নীতি বাড়ছে। দুর্ভাগ্য হল, কোনও বছরেই এমন কোনও প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি, যা নিয়ে আমরা গর্ব করতে পারি।
দুর্নীতি তখনই বাড়ে যখন সুশাসন ও জবাবদিহিতার অভাব বাড়ে। এ দুটি ক্ষেত্রে সরকারকে বিশেষভাবে নজর দিতে হবে। সরকারের জন্য সুযোগ এবং চ্যালেঞ্জ দুটিই আসলে সুশাসন। আর সুশাসনের জন্য দুর্নীতি দমন জরুরী। দুদকের বর্তমান চেয়ারম্যান দুর্নীতি প্রতিরোধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলেছেন। দুর্নীতির অভিযোগের তদন্ত এবং সরকারি সম্পদ পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে দুদকের কিছুটা দুর্বলতার কথাও বলেছেন তিনি। এখন দেখা দরকার এসব দুর্বলতা কিভাবে কাটিয়ে উঠা যায়। ব্যবসা বানিজ্যের জন্য জমি এক বড় প্রতিবন্ধকতা। জমিসংক্রান্ত মামলাগুলো বছরের পর বছর নিষ্পত্তি হয় না। জমির প্রাপ্যতা একজন উদ্যোক্তাকে বারবার হতাশ করে। একই অবস্থা ঋন পাওয়া ক্ষেত্রেও।
একটি বড় বানিজ্য সংগঠনের প্রধান সম্প্রতি একজন মন্ত্রীর সামনেই হতাশ হয়ে বলেছেন আমাদের পক্ষে এমন কি কিছু বলবার আছে, যা আকর্ষণীয়? কেন শিল্পপতিরা বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হবেন সে প্রশ্নের সদুত্তর দিতে হবে রাষ্টকেই। বিনিয়োগকারীরা কী চান তা কি জানা আছে সরকারের? যদি নতুন উদ্যোক্তা তৈরি করতে না পারি আমরা, তবে আপাত: দৃষ্টিতে প্রবৃদ্ধি যতই হোকনা কেন সর্বাঙ্গে কুশাসনের ক্ষত থাকবে।
সরকার অনেকগুলো অর্থনৈতিক অঞ্চল করছে। ফলে জমি প্রাপ্তির সমস্যা দূর হবে হয়তো। কিন্তু আস্থার জায়গাটি অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। যদিও বর্তমানে রাজনৈতিক পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে তবুও বাংলাদেশে বিনিয়োগে প্রধান বাধা হিসেবে রাজনৈতিক অস্থিরতাকেই বিচার করা হয়। বিদেশি নাগরিক হত্যা ও জঙ্গিবাদ নিয়ন্ত্রণে এলেও বিদেশিদের আস্থা ফিরেনি।
বিদেশি বিনিয়োগ আমরা চাই। কিন্তু কিছু বিষয়ে আমদের বড় ধরণের পরিবর্তন প্রয়োজন। কয়েকমাস আগে সচিবালয়ে ইইউ-বাংলাদেশ ব্যবসা পরিবেশ সংক্রান্ত এক সংলাপ অনুষ্ঠানে ইউরোপীয় রাষ্ট্রদূত পিয়েরে মায়েদু বলেছিলেন, বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের আর্থিক লেনদেনের স্বচ্ছতার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে।
বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে বাংলাদেশের অনেক সম্পদ রয়েছে, সুযোগ সুবিধা দেয়া হচ্ছে। তবুও বিদেশি বিনিয়োগ বাংলাদেশে বড় আকারে আসেনি। আমরা বলছি, বিনিয়োগের জন্য বাংলাদেশ এখন আকর্ষণীয়। বাংলাদেশে বিনিয়োগ করলে বিনিয়োগকারীরা লাভবান হবেন। বাংলাদেশ সরকার এখন বিনিয়োগকারীদের বিশেষ সুবিধা দিচ্ছে উল্লেখ করে মন্ত্রীরা প্রায়ই বলেন, সরকার যোগাযোগ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, বিদ্যুৎ সরবরাহ, অবকাঠামো নির্মাণসহ বিনিয়োগের সাথে সংশ্লিষ্ট সব কাজ গুরুত্বের সঙ্গে করে যাচ্ছে। কিন্তু বাস্তবতা অনেক ভিন্ন। বাংলাদেশভিত্তিক বিদেশি কোম্পানির পুনঃবিনিয়োগে হলেও সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ প্রত্যাশার তুলনায় কমে গেছে।
রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও জঙ্গি হামলার পাশাপাশি জ্বালানি স্বল্পতা এবং সীমিত অবকাঠামোও বিদেশিদের বাংলাদেশে বিনিয়োগে আসার কারণ বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা। গত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগের খরা চলছে। সবাই জানে, অপর্যাপ্ত অবকাঠামো, অর্থের সীমাবদ্ধতা,দুর্নীতি ও আমলাতন্ত্রই হচ্ছে বাংলাদেশে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) আসার ক্ষেত্রে বড় বাধা।
ধীর গতির বিচারব্যবস্থার পাশাপাশি কার্যকর বিকল্প নিষ্পত্তির ব্যবস্থা না থাকায় ব্যবসা-সংক্রান্ত বিরোধ-মীমাংসায গতি পাচ্ছেনা। দীর্ঘদিন ধরে ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরে রেখেছে বাংলাদেশ। আছে কর্মঠ ও তরুণ এক বিরাট কর্মী বাহিনী। বিশ্বের অষ্টম জনবহুল দেশ হিসেবে বাংলাদেশে আছে ভোগ্যপণ্যের চাহিদা। দেশটিতে বিনিয়োগের সুযোগ আছে। বিশেষ করে বিদ্যুৎ, ওষুধ, তথ্যপ্রযুক্তি, টেলিযোগাযোগসহ অন্যান্য অবকাঠামো উন্নয়ন। এ ছাড়া শ্রমনিবিড় খাত যেমন তৈরি পোশাক, গৃহস্থালি বস্ত্র ও চামড়া প্রক্রিয়াকরণে বিনিয়োগের সম্ভাবনা আছে।
উদ্যোক্তাদের প্রথম আগ্রহ অবশ্যই বিদ্যুৎ ও অন্যান্য অবকাঠামো উন্নয়নে বিনিয়োগ। অন্যদিকে ১৬ কোটি মানুষের এই দেশে ভোগ্যপণ্যের ব্যাপাক চাহিদা আছে। মধ্যম আয়ের দেশে পৌঁছালে এই চাহিদা বাড়বে। পাশাপাশি অন্যান্য খাতে বিনিয়োগের বিষয়টিও কম আগ্রহের নয়। যেমন তথ্যপ্রযুক্তি, চামড়াশিল্প। দেখতে হবে, এসব খাতে আমরা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আনতে পারছি কিনা।
পদ্মা সেতুর মতো বৃহৎ প্রকল্প নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়নের দুঃসাহস দেখিয়েছে। তবে দেশের সার্বিক উন্নয়নে বাংলাদেশকে বিদেশি অর্থায়নের ওপর নির্ভর করতেই হয়। নানা কারণে বাংলাদেশে বারবার বিদেশি বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় বাধা ছিল আমলাতান্ত্রিক জটিলতা। আবার রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণেও অনেক সময় বিদেশি বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হয়েছে বা ফিরে গেছে। দেশের অভ্যন্তরে মন্ত্রণালয়, সংস্থা ও প্রভাবশালীদের মধ্যে রেষারেষি, প্রকল্প প্রণয়নে মন্ত্রণালয়গুলোর অদক্ষতার পাশাপাশি তাদের মধ্যে আধিপত্য ও নিয়ন্ত্রণমূলক মনোভাবের কারণে বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হয়। অনেক সময় রাজনৈতিক সিদ্ধান্তহীনতাও বিদেশি বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হওয়ার কারণ হয়।
সরকার যদি ক্ষমতাসীন দলের ভেতরকার অন্তরকলহ, জঙ্গিবাদ আর আমলাতন্ত্রকে নির্মম ভাবে মোকাবেলা করে অগ্রসর হতে পারে, তাই হবে নূতন পথে চলা। তাই হবে যথার্থ অর্থনৈতিক নেতৃত্ব।
লেখক: পরিচালক বার্তা, একাত্তর টিভি