সেলিনা হায়াৎ আইভীকে আমি প্রথম দেখি আমেরিকান রাষ্ট্রদূতের বাসায় নৈশভোজের নিমন্ত্রণে। এধরনের দাওয়াত ঠিক যেমন হয় আর কী, বড় দুই তিনটি দলের হাতে গোনা কয়েকজন এবং সুশীল সমাজের সদস্যরা উপস্থিত থাকেন। ওই দাওয়াতটিও ঠিক তেমনই ছিল। ঘুরে ঘুরে কথা বলছি পরিচিতজনদের সঙ্গে, হঠাৎ উনি একটু এগিয়ে এসে আমার হাত ধরে বললেন, ‘আপনার কথা আমার খুব ভালো লাগে’। আমি চমকে উঠলাম। একে তো আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ভিন্ন দলের প্রশংসা করবার রীতি নাই, তার ওপর নিজ থেকে এগিয়ে এসে বয়স, অভিজ্ঞতা, পদমর্যাদাসহ সব অর্থেই তার অনুজ ভিন্ন আদর্শের একজনের প্রশংসা করতে অনেক বড় মনের সঙ্গে সঙ্গে নিজের প্রতি আস্থা ও প্রবল আত্মবিশ্বাসের প্রয়োজন হয়। একজন গণমানুষের নেতার জন্য এই বিশ্বাস বড় দরকার আর আইভীর তা আছে। যে কারণে মার্কাকে ছাপিয়ে নিজেকে অন্য উচ্চতায় নিতে পেরেছেন আইভী। বরং নানা অপকর্মের হোতা এই মার্কা তার জন্য কিছুটা ভীতির কারণ হয়েছিল, যেজন্যে তিনি প্রচারণায় বলেছেন মার্কা যাই হোক আমি কিন্তু আপনাদের সেই আইভীই। বলেছেন শামীম ওসমান থাকলে ভালো, না থাকলে আরও ভালো। প্রবল আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলেছেন দলমত নির্বিশেষে সব শ্রেণিপেশার মানুষ ভোট দেবে তাকে। পত্রিকায় কলাম হয়েছে প্রচারণায় নামলে সাধারণ এক নারী ভোটার তাকে বলছে ‘যাও বেটি আওগাও’। একটি দৈনিক পত্রিকায় এসেছে এক ভোটার বলছে ‘মার্কা-টার্কা বুঝি না, আইভী আপাই জিতবেন’। আর একজন বলেছেন, ‘আইভী কোনও দলের নয়, মাটির ভেতর থেকে আসা নেত্রী’। এসবই ইঙ্গিত দেয় মার্কা নয়, জিতেছেন আইভী।
নারায়ণগঞ্জ নির্বাচনটি খুব স্পষ্ট ভাবে কিছু বার্তা দিয়ে গেল। এক হলো যদি নির্বাচন কমিশন, সরকার, প্রার্থী আর দলগুলোর সদিচ্ছা থাকে তাহলে অবশ্যই সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব। ২০১৪ সালের পর থেকে ধারাবাহিকভাবে ভোট ডাকাতির যে নির্বাচন আমরা দেখে এসেছি তার থেকে অনেকটাই ব্যতিক্রম ছিল এই সিটি করপোরেশন নির্বাচন। নানা অর্থেই নির্বাচনটি ছিল ব্যতিক্রম। বড় দুটি দলের মেয়র প্রার্থী দুজনই সমাজে ভদ্র, সজ্জ্বন এবং স্বচ্ছ ইমেজের মানুষ হিসাবে পরিচিত। বিএনপি প্রার্থীর কিছু পোস্টার ছেঁড়া ছাড়া পুরো নির্বাচনি প্রচারণাটিতেই কোনও পক্ষের বিরুদ্ধে আচরণবিধি লঙ্ঘনের তেমন কোনও মারাত্মক অভিযোগ উত্থাপিত হয়নি। যদিও প্রথমে ১৭৪ টি পরে ১৩৭ টি কেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ বলা হয়েছে তথাপি তার তেমন প্রতিফলন দেখা যায়নি কোথাও। পুরো সময়টিই ছিল উৎসবমুখর। এমন কী আমাদের নিকট অতীতের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে বিরল হয়ে দুই দলের দুই প্রার্থীর পোস্টার শোভা পেয়েছে পাশাপাশি। দুই দলই ভোট গ্রহণের দিন শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বলেছে ভোট গ্রহণ সুষ্ঠু হয়েছে; কাউকেই মাঝ পথে নির্বাচন থেকে সরে যেতে বাধ্য করা হয়নি। যদিও পরে বিএনপি এই ফলকে ত্রুটিপূর্ণ বলে বিচার বিভাগীয় তদন্ত দাবি করেছে। দুই প্রার্থীই বলেছিলেন জয় পরাজয় যাই হোক না কেন মেনে নেবেন তারা এবং বাস্তবিকই মেনেও নিয়েছেন। সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্যটি মানুষ প্রত্যক্ষ করেছে নির্বাচনের পরদিন ভোরবেলা যখন আইভী বাসায় গিয়ে দেখা করেছেন তার প্রতিদ্বন্দী প্রার্থী সাখাওয়াত হোসেন সঙ্গে, সহযোগিতা কামনা করেছেন তার। আর সাখাওয়াত সাহেবও প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন পাশে থাকার। এ যেন নতুন প্রজন্মের নতুন রাজনীতির বার্তা। এ রাজনীতিতে দল, মত, আদর্শ ভিন্ন হতে পারে কিন্তু মানুষের কল্যাণে পাশাপাশি আছে সকলে। এ রাজনীতি নির্মূলের পরিবর্তে গঠনের বার্তা দেয়। অনেক তো ক্ষয় হলো, আর কত?
নির্বাচনটি ছিল স্থানীয়, সরকার পরিবর্তনের কোনও বার্তা এতে ছিল না। কিন্তু এই নির্বাচনটি শিখিয়ে গেল অনেক কিছু। দল, মত ভিন্ন হলেই যে নিঃশেষ করে দিতে হবে তা নয়। তোমার নিঃশেষ হওয়ার ওপরই নির্ভর করে আমার টিকে থাকা - এ বিভৎস রাজনীতির অবসান হোক, ভালো থাকুক মানুষ, বেঁচে থাক আমার প্রিয় বাংলাদেশ।
লেখক: আইনজীবী ও রাজনীতিবিদ