দ্বিতীয় সাবমেরিন ক্যাবল ব্যাকহল ট্রান্সমিশন লিংক স্থাপন ও কিছু প্রশ্ন

রাশেদ মেহেদীবাংলাদেশ সাবমেরিন ক্যাবল কোম্পানি, বিএসসিসিএল দেশে উন্নতমানের ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথ সরবরাহে সবচেয়ে বড় পাইকারি বিক্রেতা। ব্যান্ডউইথ বিক্রিতে তার সুনাম আর দক্ষতার উদাহরণ দিয়ে যদি কখনও এই কোম্পানিকে পদ্মা সেতুর মতো কোনও সেতু নির্মাণের কাজের দায়িত্ব দেওয়া হয়, সেটি কি যুক্তিযুক্ত হবে? কিংবা এই সাবমেরিন ক্যাবল কোম্পানিকে যদি ‘সাবমেরিন’ পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়, সেটাও কি অতি হাস্যকর ঘটনা হবে না? যে কোনও সচেতন মানুষ উপরের প্রশ্ন থেকে অনেকে এটাও ভাবতে পারেন প্রশ্ন কর্তার মাথায় নিশ্চয় কোনও গণ্ডগোল হয়েছে!
আসলে দেশের দ্বিতীয় সাবমেরিন ক্যাবলের ব্যাকহল লিংক স্থাপন নিয়ে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ এবং বিভাগের অধীন রাষ্ট্রায়াত্ত টেলিকম কোম্পানি বিটিসিএল, বিএসসিসিএল এবং টেশিস যে ধরনের অভূতপূর্ব হাস্যকর কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে, তার ফলে ওপরের প্রশ্নের মতো উদ্ভট প্রশ্নের সৃষ্টি হচ্ছে।
ডিজিটাল বাংলাদেশ গঠনে সরকারের সদিচ্ছার কোনও অভাব নেই। ২০০৯ সাল থেকে এখন পর্যন্ত সরকারের নীতি নির্ধারক মহল দেশকে তথ্য প্রযুক্তিতে এগিয়ে নিতে সর্বোচ্চ আন্তরিকতা এবং সদিচ্ছা দেখিয়েছেন। ইউনিয়ন পরিষদ তথ্য কেন্দ্রগুলোর মাধ্যমে তৃণমূলের সাধারণ মানুষের কাছে ডিজিটাল সেবা পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ থেকে শুরু করে দেশে তথ্য প্রযুক্তির সুপার হাইওয়ের সর্বশেষ ও ভবিষ্যত সংস্করণে যুক্ত রাখতে দ্বিতীয় সাবমেরিন ক্যাবলে অন্তর্ভূক্ত করার সিদ্ধান্ত সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার বাস্তবায়নে সুপরিকল্পিত পদক্ষেপেরই প্রমাণ।
কিন্তু সরকারের এই সদিচ্ছা, সুপরিকল্পনা ভেস্তে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে পরিকল্পনা বাস্তবায়নে যুক্ত আমলাতন্ত্রের ভুল সিদ্ধান্তের ‘ভেলকিবাজিতে’। ‘ভেলকিবাজি’ শব্দটা ব্যবহার করছি, কারণ যেভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে তাকে কিন্তু নিছক ভুল বলা যায় না, বরং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভুল হিসেবেই বিবেচিত হয়। ভেবে দেখুন যে আমলাদের দায়িত্বে রাষ্ট্রায়াত্ত টেলিকম কোম্পানির কার্যক্রম তদারকির ভার রয়েছে তারা নিশ্চয় জানেন কোন কোম্পানির কাজ কী, কোন কাজে সক্ষমতা কত। টেলিফোন শিল্প সংস্থা টেশিসের সক্ষমতা সম্পর্কেও নিশ্চয় খুব ভালো করে জানতেন- পদাধিকার বলে এই কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যানের দায়িত্বে থাকা পদস্থ আমলা।

টেশিস তৈরি করে বিটিসিএল এর জন্য পিএবিএক্স, ল্যান্ডফোনের সস্তার হ্যান্ডসেট, ব্যাটারি, চার্জার সহ আরও কিছু আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতি। হাল আমলে বিদ্যুতের প্রি-পেইড মিটার তৈরি করছে। এর আগে এই টেশিস ল্যাপটপ এবং মোবাইল হ্যান্ডসেট তৈরির প্রকল্প নিয়ে চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। বিশেষ করে ল্যাপটপ প্রকল্পে সীমাহীন লুটপাটের কারণে শিক্ষার্থীদের হাতে সস্তায় ল্যাপটপ তুলে দেওয়ার জন্য সরকারের শুভ পরিকল্পনাও বাস্তবায়িত হয়নি। অবাক কাণ্ড! ধুঁকে ধুঁকে চলা সেই পরীক্ষিত ব্যর্থ টেশিসকেই দেওয়া হলো কুয়াকাটা-ঢাকা-আখাউড়া রুটে দ্বিতীয় সাবমেরিন ক্যাবলের ব্যাকহল লিংক স্থাপনের কাজ। অথচ টেশিস জন্মের পর থেকে কখনই ব্যাকহল লিংক তৈরিতে ব্যবহৃত কোনও ধরনের যন্ত্রপাতি উৎপাদন করেনি, যন্ত্রপাতি উৎপাদনের কোনও ধরনের ব্যবস্থাও নেই। তাহলে সেই টেশিসকে ডিজিটাল বাংলাদেশের ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই ব্যাকহল ট্রান্সমিশন লিংক স্থাপনের দায়িত্ব দেওয়া হলো কেন?

আসলে বিএসসিসিএল এর সঙ্গে এই লিংক তৈরিতে চুক্তিবদ্ধ বিটিসিএল। এটাই স্বাভাবিক, কারণ দেশে টেলিযোগাযোগ ট্রান্সমিশন ব্যবস্থা পরিচালনা করা সবচেয়ে বড় ও অভিজ্ঞতা সম্পন্ন প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রায়াত্ত এই কোম্পানিটিই। বিটিসিএল প্রথম সাবমেরিন ক্যাবল ব্যাকহল লিংকটিও(ঢাকা-কক্সবাজার) পরিচালনা করছে শুরু থেকেই। এবার কুয়াকাটা-ঢাকা-আখাউড়া ব্যাকহল ট্রানমিশন লিংক স্থাপনে বিটিসিএল এর সঙ্গেই চুক্তি করেছিল বিএসসিসিএল। বিটিসিএল সেই মতো ট্রান্সমিশন লিংক স্থাপনে উপযুক্ত ঠিকাদার নিয়োগে দরপত্র আহবান করে। ২০১৬ সালের এপ্রিল মাস থেকে শুরু হয়ে ছয় মাস ধরে সেই প্রক্রিয়া চলে। প্রক্রিয়া শেষে ট্রান্সমিশন লিংক তৈরিতে বিশ্বের অন্যতম সেরা প্রতিষ্ঠান যুক্তরাষ্ট্রের সিয়েনার যন্ত্রপাতি সরবরাহের অভিজ্ঞতায় যোগ্য নির্বাচিত হয় নেতাশ নামে একটি প্রতিষ্ঠান। খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, প্রথম সাবমেরিন ক্যাবলের  ব্যাকহল ট্রান্সমিশন লিংক (ঢাকা-কক্সবাজার) রুট তৈরিতেও এই সিয়েনার যন্ত্রপাতিই ব্যবহার করেছিল বিটিসিএল। কিন্তু এবার হঠাৎ করেই পাল্টে গেল দৃশ্যপট।

২০১৬ সালের অক্টোবরে এসে বিটিসিএল এর পরিচালনা পর্ষদ হঠাৎ করে সেই টেন্ডার বাতিল করলো। এরপর গত ৯ নভেম্বর থেকে ১৪ নভেম্বরের মধ্যে মাত্র চার কার্যদিবসে এই ট্রান্সমিশন লিংক স্থাপনে যন্ত্রপাতি সরবরাহের জন্য টেশিসের সঙ্গে চুক্তি সম্পন্ন করে ফেলে বিটিসিএল! এক্ষেত্রে ব্যবহার করা সরকারি ক্রয়বিধির জরুরি একটি ধারা ৭৬(ছ)। যেখানে স্পষ্টই বলা হয়েছে, জরুরি পরিস্থিতিতে সরকারি কোম্পানির কাছ থেকে কেনাকাটার ক্ষেত্রে অবশ্যই যন্ত্রপাতি ওই কোম্পানির উৎপাদিত হতে হবে। তৃতীয় পক্ষ বা অন্য কোনও কোম্পানির কাছ থেকে সংগ্রহ করা যাবে না। কিন্তু টেশিস তো কস্মিনকালেও ট্রান্সমিশন লিংক স্থাপনে ডিডব্লিউডিএম যন্ত্রপাতি তৈরি করেনি এবং তারা বিটিসিএল-এ যে আবেদন করেছে সেটাও অন্য একটি কোম্পানিকে স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার দেখিয়ে। এভাবে সরকারি ক্রয়বিধি সরাসরি লংঘনের মাধ্যমে নজির বিহীন অনিয়মের জন্ম দিয়ে সম্পূর্ণ অনভিজ্ঞ টেশিসকে বিটিসিএলের ঠিকাদার নিয়োগ করা হয়। কেন?

টেশিস ভাতের তেজাশ নামে একটি কোম্পানিকে স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার দেখিয়ে আবেদন করেছিল বিটিসিএলে। কিন্তু বিটিসিএল এর সঙ্গে চুক্তির সময় তারা তেজাশের নাম বাদ দিয়ে স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার দেখাল সিস্টেম অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড নামে আর একটা প্রতিষ্ঠানকে। আবার যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য ব্যাংকে এলসি খোলা হলো তেজাশ এবং ফার ইস্ট কমিউনিকেশন নামে দু’টি প্রতিষ্ঠানের নামে। প্রশ্ন হচ্ছে বিটিসিএল এর সঙ্গে চুক্তিতে তো সিস্টেম অ্যান্ড সার্ভিসের নাম বলা হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী তো তাদের নামে এলসি খোলার কথা। বুঝলাম আবেদনের সময় যেহেতু তেজাশের নাম ছিল সে কারণে তেজাশের নামে এলসি হয়েছে। এখানে ফান ইস্ট কমিউনিকেশন কারা? দেখা যাচ্ছে ব্যাংকে এলসি খোলা হয়েছে ২১ লাখ মার্কিন ডলারের আর টেশিসের পরিচালনা পর্ষদে সেই এলসি খোলার তথ্য অবহিত করে দুই কোটি ডলারের বেশি পরিমাণ এলসি খোলার তথ্য অনুমোদন করিয়ে নেওয়া হয়েছে। টাকার অংকে হিসেব করলে এলসি খোলা হয়েছে ১৭ কোটি টাকা দেখিয়ে আর বোর্ডে অনুমোদন করিয়ে নেওয়া হয়েছে ১৭১ কোটি টাকার। অথচ পুরো প্রকল্পের সর্বোচ্চ ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৩৫ কোটি টাকা। প্রতিটি পদে তথ্য গোপন কিংবা অসত্য তথ্য দিচ্ছে টেশিস। এর কারন কী? ফার ইস্ট কমিউনিকেশনকে নিয়েও রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে। এ প্রতিষ্ঠান কোথা থেকে কিভাবে এসে কেন যুক্ত হয়েছে তার কোনও জবাব নেই। সিস্টেম অ্যান্ড সার্ভিসেস এলসি খোলার সময় হাওয়া হয়ে গেল কেন, তাও এক রহস্যের ব্যাপার।

এত অনিয়মের পরও যদি টেশিস কুয়াকাটা-ঢাকা-আখাউড়া ব্যাকহল ট্রান্সমিশন লিংকটি ভালোভাবে করতে পারত, তাও কথা ছিল। কিন্তু তারা তা পারেনি। ২২ নভেম্ববর ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের এডিপি পর্যালোচনা সভায় ওই লিংক স্থাপনের চূড়ান্ত সময়সীমা ৩১ জানুয়ারি নির্ধারন করে দেওয়া হয়েছিল। বিএসসিসিএল ঘটা করে জানিয়েছিল ২১ ফেব্রুয়ারি আর্ন্তজাতিক মাতৃভাষা দিবসে দ্বিতীয় সাবমেরিন ক্যাবল ল্যান্ডিং স্টেশন চালু হবে। কিন্তু তা হয়নি। কারণ টেশিস ২১ ফেব্রুয়ারিতে এসেও সেই ব্যাকহল ট্রান্সমিশন লিংক স্থাপন করতে পারেনি। বাস্তব অবস্থা বিবেচনায় পারার কথাও ছিল না। কারণ তাদের যন্ত্রপাতি সরবরাহ করছে যে তেজাশ, তারাও এ ধরনের যন্ত্রপাতি উৎপাদনে বিশ্বের সেরা দশ কোম্পানির তালিকায় নেই। বিশেষ করে ১০০ জিবিপিএস সক্ষমতার ডিডব্লিউডিম কার্ড তৈরির পূর্ব অভিজ্ঞতাও তেজাশের নেই, তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে এটা স্পষ্ট। তাহলে কি তেজাশের পরীক্ষামূলক ১০০ জিবিপিএস যন্ত্রপাতি উৎপাদনের ‘টেস্ট কেস’ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে ঢাকা-কুয়াকাটা ব্যাকহল লিংক! দেশে ফোরজি আসছে। উন্নত বিশ্বে ফাইভ জি প্রযুক্তির ব্যবহারও শুরু হয়েছে। আর ফোরজি কিংবা ফাইভ জি’র জন্য জরুরি হচ্ছে অতি উচ্চ গতির ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথ, যেটা বাংলাদেশে নিশ্চিত হবে দ্বিতীয় সাবমেরিন ক্যাবল দ্বারাই। সেই সাবমেরিন ক্যাবলের ল্যান্ডিং স্টেশনের ব্যাকহল লিংক তৈরি নিয়ে এই ছেলেখেলা কেন? সর্বশেষ ওই ব্যাকহল লিংকের স্পেশিফিকেশনে পরিবর্তন দেখে এই ছেলেখেলার প্রশ্নটাই জোরালোভাবে ওঠে।

দেখা যাচ্ছে, বিটিসিএল এর প্রথম দরপত্রে এমন যন্ত্রপাতি চাওয়া হয়েছিল যাতে একটি লিংকের পথে একাধিক জায়গায় ক্যাবল কাটা গেলেও সংক্রিয় ভাবে একের পর এক বিকল্প পথে ব্যান্ডউইথ পরিবহন অব্যাহত থাকবে। দরপত্রে শুধু বর্তমান পরিবহন ক্ষমতাই নয়, ভবিষ্যতের পরিবহন ক্ষমতা বৃদ্ধি বিবেচনায় রেখে সেই সক্ষমতার যন্ত্রপাতি চাওয়া হয়েছিল।  এর পাশাপাশি যে জেলাগুলোর ওপর দিয়ে এই লিংক স্থাপন হচ্ছে কিন্তু বর্তমানে কোনও ব্যান্ডউইথ পরিবহন চাওয়া হয়নি কিন্তু ভবিষ্যতে ব্যান্ডউইথ পরিবহন করতে হবে, সে জেলাগুলোতেও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি চাওয়া হয়েছিল। অর্থাৎ সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ গঠনে প্রয়োজনীয় একটি নেটওয়ার্ক বাস্তবায়নের জন্য যা প্রয়োজন তাই ছিল ওই দরপত্রের চাহিদায়। দরপত্রের কার্য পরিধিতে, বর্তমান প্রয়োজন অনুসারে ৯টি লিঙ্ক এবং ভবিষ্যতের প্রয়োজন অনুসারে আরও ১১ টি লিঙ্ক , মোট ২০ টি লিঙ্ক ছিল।

অথচ টেশিসের সঙ্গে চুক্তির সময় ওই কারিগরি নকশা বদলে নতুন করে যে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তাতে বর্তমানের জন্য ১০ টি লিঙ্ক রেখে ভবিষ্যতের লিঙ্কগুলোর কথা সম্পূর্ণ বাদ দেওয়া হয়েছে। আর এই ১০টি লিংকের বর্তমান পরিবহন ক্ষমতা উল্লেখ থাকলেও, তার পরিবহন ক্ষমতা ভবিষ্যতে কত বাড়াতে হবে তার কোনও উল্লেখ নেই। ফলে ভবিষ্যতের কথা মাথায় রেখে তেজাশকে কোনও যন্ত্রপাতি দেওয়ারও দরকার পড়ছে না। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে প্রথম কারিগরি নকশা এমনভাবে হয়েছিল যেখানে একটা, দু’টো কিংবা তিনটা লিংক কাটলেও নিরবিচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সেবায় যেন সমস্যা নয়। কিন্তু পরিবর্তিত নকশায় মূল লিংকের সঙ্গে ‘প্রোটেকশন পাথ’ এবং ‘রেস্টোরেশন পাথ’ প্রায় একই রাখা হয়েছে। ফলে এ নকশা অনুযায়ী ‘স্মার্ট ইনটেলিজেন্ট নেটওয়ার্ক’ বলতে যা বোঝায় তা প্রকৃতপক্ষে হচ্ছে না। ফলে ভবিষ্যতে দেশের সবচেয়ে বড় ব্যান্ডউইথ ট্রান্সমিশন লিংকটি নিরবিচ্ছিন্ন সেবার উপযোগী হিসেবও গড়ে উঠছে না।

এখান থেকেই দ্বিতীয় সাবমেরিন কেবল লিংক স্থাপনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি সামনে এসেছে। এই ব্যাকহল লিংক বাস্তবায়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা কি ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সফল সরকারের সাফল্য অদূর ভবিষ্যতে ম্লান করে দেওয়ার ষড়যন্ত্র করছেন? কারণ এখন সব মহল থেকে বলা হচ্ছে, দেশের জন্য একটি শক্তিশালী টেলিযোগাযোগ ট্রান্সমিশন অবকাঠামো গড়ে তোলা খুব জরুরি। বিশেষ করে ফোরজি সেবার ক্ষেত্রে শক্তিশালী ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্কের কোনও বিকল্প নেই। সে সময় এভাবে অসত্য তথ্য, অনিয়মের মাধ্যমে দেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ট্রান্সমিশন লিংকটি কেন এভাবে অনভিজ্ঞ, দুর্বল প্রতিষ্ঠান দিয়ে যেনতেনভাবে করানো হচ্ছে? কার স্বার্থে?

এই ব্যাকহল লিংক স্থাপন নিয়ে আইনি লড়াইও হয়েছে। আপিল বিভাগের আদেশেও এই প্রকল্পে নিয়মতন্ত্রিক টেন্ডার বাতিলে অনিয়ম হয়েছে উল্লেখ করে এর জন্য প্রথম দরপত্রে যোগ্য বিবেচিত প্রতিষ্ঠান নেতাশকে দশ হাজার ডলার ক্ষতিপূরণ দিতেও বলা হয়েছে। আদালতের আদেশের মাধ্যমে যেহেতু অনিয়মের বিষয়টি প্রমাণিত হয়, উচিত ছিল এই অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের। বিশেষ করে বিটিসিএল এর পরিচালনা পর্ষদ এবং যে তিন কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ভারতীয় কোম্পানি তেজাশের টাকায় ব্যাঙ্গালোরে তাদের কারখানা ঘুরে এসে বলেছিলেন- তেজাশ নির্ধারিত সময়েই কাজ সম্পন্ন করতে পারবে। তাদের উল্লেখ করা সময়সীমা অনুযায়ী সর্বশেষ ২১ ফেব্রুয়ারি মধ্যে ট্রান্সমিশন লিংক স্থাপন করতে পারেনি। এটাই তাদের অসত্য তথ্য এবং ব্যর্থতা নির্দেশ করে। অবশ্যই তাদের কঠোর জবাবদিহি করা উচিত।

বাংলাদেশ ২০১১ সালে দ্বিতীয় সাবমেনির ক্যাবলে যুক্ত হতে সি-মিই-উই-৫ কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক সই করেছিল। আর মূল চুক্তি হয় ২০১৪ সালে। অথচ গত তিন-চার বছরে ল্যান্ডিং স্টেশনের সঙ্গে ব্যাকলিংক স্থাপন করতে পারেনি সংশ্লিষ্টরা। এটা পুরো ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগেরই চরম ব্যর্থতা।

লেখক: বিশেষ প্রতিনিধি, সমকাল