সংবাদপত্রের রিপোর্ট অনুযায়ী পরীক্ষার রুটিন ও তারিখ ঘোষণাসহ কয়েকটি দাবিতে বৃহস্পতিবার সকাল ১০টার দিকে শাহবাগের জাতীয় জাদুঘরের সামনের রাস্তায় অবস্থান নেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হওয়া ৭ সরকারি কলেজের শিক্ষার্থীরা। পৃথিবীতে সম্ভবত এই প্রথম কোনও দেশে শিক্ষার্থীরা রুটিন ও পরীক্ষার তারিখ ঘোষণার জন্য আন্দোলনে পথে নেমেছিলো। আর এই অধিভুক্ত হওয়া সাতটি কলেজ হলো- ঢাকা কলেজ, ইডেন মহিলা কলেজ, বেগম বদরুন্নেসা কলেজ, সরকারি তিতুমীর কলেজ, কবি নজরুল ইসলাম কলেজ, শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ ও মিরপুর বাংলা কলেজ। মাস ছয়েক আগে এই কলেজগুলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভূক্ত হয়। সেদিন বেলা সাড়ে ১১টার দিকে শাহবাগ ছেড়ে যেতে বলে পুলিশ। এরপর শিক্ষার্থীরা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুটওভার ব্রিজের পাশের অংশে অবস্থান নেন। এসময় তাদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ লাঠিচার্জ করে ও কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে। এতে বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হন। এই শিক্ষার্থীদের মধ্যে গুরুতর আহত একজনই হলেন সিদ্দিকুর।
এই ধরনের পরিস্থিতির প্রেক্ষাপট কী? কেন শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে নামতে হলো সেটি অন্তত শিক্ষক হিসেবে আমার কাছে বড় প্রশ্ন। কেনইবা সেদিন সেই আন্দোলন দমাতে পুলিশকে গুলি ছুড়তে হলো? আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা কি পুলিশের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো? কোনও পুলিশকে আঘাত করেছিল? তারা গাড়ি ভাঙচুর করছিলো? রাস্তা-ঘাট বন্ধ রেখেছিল? বোমা মেরেছিলো? কোনও মানুষ কি অকারণে আক্রমণ কিংবা নিপীড়ন করছিল? তাদের প্রতি সমর্থন আদায় করতে কাউকে বাধ্য করেছিল? তাদের দিক থেকে কোনও বড় ধরনের হামলার আভাস পেয়েছিলো পুলিশ? তাদের মধ্যে কি সহিংস তৎপরতা ছিল? তারা কোনও সরকারি সম্পত্তি নষ্ট করেছিল? না... অন্তত সেদিনের টিভি ফুটেজে সেই রকম কিছু দেখা যায়নি। তাহলে কেন এই রকম দমন নিপীড়ন করা হলো এবং একজন শিক্ষার্থীর চোখের আলো নিভে দেওয়ার ব্যবস্থা হলো?
বাংলাদেশের এক কৃষক পরিবারের লড়িয়ে জীবনের অধিকারী সিদ্দিকুর। ভেবেছিলেন তাড়াতাড়ি পড়ালেখা শেষ করে একটি চাকরি নিয়ে পরিবারে হাল ধরবেন, পরিবারকে বাঁচাবেন নিজেও বাঁচবেন। কিন্ত স্বপ্ন অনেক সময়ই উল্টে যায়, জীবনকে পরিহাস করে স্বপ্ন দেখাকে উপেক্ষা করে। স্বপ্ন ফেরী করা সিদ্দিকুর এখন অনেকটাই পরিবারের বোঝা হয়ে যাচ্ছেন। কারণ চিকিৎসকরা ইতোমধ্যেই জানিয়ে দিয়েছেন, সিদ্দিকুরের একটি চোখ অকেজো, আরেকটি চোখেও অস্ত্রপচার চলছে। প্রায় চোখের আলো হারনো এখন সিদ্দিকুর তার চোখের আলো ফেরত চাচ্ছেন শুধু। আর এই চাওয়ার মধ্য দিয়ে আর কোনও চাওয়ার প্রতি অনাগ্রহতাও জানান দিচ্ছেন। এক অধিকারের লড়াই তার জীবন পাওয়ার অধিকারের পথ বন্ধ করে দিয়েছে।
কোনও অর্থেই সিদ্দিকুরের কোনও দোষ ছিল না। জন্মগত অধিকারের বোধটিকে সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলো আন্দোলনে। ভালোভাবে শিক্ষা শেষ করা একজন শিক্ষার্থী হিসেবে তার মৌলিক অধিকার। কিন্তু সেটি শেষ পর্যন্ত চোখ হারানোর জমিন হিসেবে তার জীবনে গেঁথে থাকবে- নিঃসন্দেহে এটি তার কোনোভাবেই মাথায় আসেনি।
সিদ্দিকুরের চোখ নষ্ট হয়েছে, তাতেও ক্ষোভ কমেনি পুলিশ প্রশাসনের। তারা মামলা দিয়েছে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে। শিক্ষার্থীরা নতুন দফা নিয়ে আবারও আন্দোলনে। তাদের দাবি সরকার যেন সিদ্দিকুরের চোখের চিকিৎসার দায়িত্ব নেন এবং শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে করা মামলা যেন প্রত্যাহার করেন। আমরাও সেই দাবির সাথে একমত। শিক্ষার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রত্যেকটি আন্দোলই শিক্ষা আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটিকে দমিয়ে নিপীড়ন চালিয়ে কখনও শিক্ষা ব্যবস্থার অগ্রগতি বা পরিবর্তন কোনও সময়ই সম্ভব নয়। সিদ্দিকুরের হারিয়ে যাওয়া চোখ আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার অন্ধত্বকেই প্রকাশ করেছে।
সিদ্দিকুরের চোখ আলো হারিয়ে যাওয়া আমাদের স্বপ্ন দেখারে সাহসকে চুরমার করে দেয়...আমরা স্বপ্ন দেখতে ভয় পেতে শিখি এমনকী দুঃস্বপ্ন দেখতেও... আর আমরা এই ভাবেই জীবিত থাকতেও এক একজন মৃত মানুষ হয়ে যাই... আমাদের চোখ হারায় স্বপ্নরা মরে যায়... আর আমরা বেশিরভাগই চোখের আলো নিয়েও দৃষ্টিহীন মৃত মানুষ হিসেবেই বেঁচে থাকি... কারণ সিদ্দিকুরের চোখ হারায় না চোখ হারাচ্ছি আমরা... কারণ আমরা যেটি দেখার কথা তা দেখতে পাইনা...
লেখক: শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
ইমেইল: zobaidanasreen@gmail.com