আমার ধারণা এই লেখাটির মূল সুর বোধকরি এতক্ষণে অনেকেই ধরতে পেরেছেন। তবুও একটু পরিষ্কার করেই বলি। ইংরেজিতে ইগনোর, বাংলায় তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য বলে কিছু শব্দ আছে। আমাদের ক্রিকেটে এই শব্দগুলোর মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব বেশ স্পষ্ট। কিছুদিন আগেও হাথুরেসিং ছিলেন আমাদের ক্রিকেটের প্রধান কোচ। তারই আদেশ, নির্দেশ অথবা দেখানো পথে হেঁটেছে আমাদের ক্রিকেট। সাফল্য যে আসেনি তা বলা যাবে না। হাথুরেসিংয়ের আমলে বাংলাদেশের ক্রিকেটের অর্জন অনেক। অথচ হঠাৎ শোনা গেলো এই হাথুরেসিং বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের সঙ্গে আর থাকছেন না। কেন থাকছেন না সে ব্যাপারে মুখে কোনও অভিযোগ তুললেন না। কিন্তু তার বডি ল্যাঙ্গুয়েজসহ বিভিন্ন উপসর্গ দেখে বোঝা গেলো বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের সঙ্গে তার সম্পর্ক ভালো যাচ্ছে না। দলের সিনিয়র খেলোয়াড়রা নাকি তার কথা শোনেন না। এই অভিযোগগুলো বাতাসে উড়তে শুরু করলো এমন এক সময় যখন বাংলাদেশ ক্রিকেট দল অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে খেলতে গেছে। বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশ অব্যাহত গতিতে হেরে যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে দলের প্রধান কোচের ভূমিকা কী হওয়া উচিত? সহজ-সরল উত্তর–দলের খেলোয়াড়দের পাশে গভীর মমতা ও সাহস নিয়ে দলের প্রধান কোচের দাঁড়ানো উচিত। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে তা ঘটেনি। বিভিন্ন সূত্রের মতে, বাংলাদেশ বিদেশের মাটিতে যখন অব্যাহতভাবে হারছিলো তখন শ্রীলঙ্কার প্রধান কোচ হওয়ার ব্যাপারে নাকি হাথুরেসিং অতিমাত্রায় তৎপর হয়ে উঠেছিলেন। যদি তাই ঘটে থাকে তাহলে ভাবুন তো একবার, দেশের তরুণ ক্রিকেটারদের মনের ভেতর কী ধরনের মনস্তাত্ত্বিক লড়াই চলছিলো? দলের প্রধান কোচ তো এক অর্থে একটা ক্রিকেট পরিবারের প্রধান ব্যক্তি। পিতা সমতুল্য। সন্তানেরা ভুল করলে তিনি তা শুধরে দেবেন এটাই তো নিয়ম। অথচ তিনি তা না করে সন্তানদের ফেলে রেখে অন্য সংসারে যাওয়ার কথা ভাবছেন। এমন পরিস্থিতিতে সন্তানদের মাঝে মনস্তাত্ত্বিক লড়াই কোন পর্যায়ে পৌঁছায় তা বোধকরি সকলেই অনুভব করেছেন।
‘প্রফেশনালিজম’ বলে একটা শব্দ আছে। ক্রিকেটে এই শব্দটিকে বেশ গুরুত্ব দেওয়া হয়। সে কারণে এখন যিনি একটা দলের সঙ্গে আছেন আগামী বছর তিনি সেই দলেই থাকবেন এমনটা আশা করা যায় না। হাথুরেসিং সব সময় বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের সঙ্গেই থাকবেন এমনটা কেউ আশা করেনি। কিন্তু বাংলাদেশ ক্রিকেট দলকে তিনি যেভাবে ছেড়ে গেছেন তাতে এক ধরনের অবজ্ঞার বহিঃপ্রকাশ ছিল। অথবা তিনি ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের প্রতি। সেই হাথুরেসিং বাংলাদেশে ফিরলেন তার নতুন ক্রিকেট সংসার নিয়ে। লড়াইটা কার সঙ্গে? তার আগের ক্রিকেট সংসার অর্থাৎ বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের সঙ্গে। যার ফলে দুই পক্ষেই একটা মনস্তাত্ত্বিক লড়াই শুরু হয়ে গেলো। হাথুরেসিং বাংলাদেশে তার ক্রিকেট সংসার যেভাবে ছেড়ে গেছেন তা অনেকের কাছে ভালো লাগেনি। বিশেষ করে জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের অনেকের পক্ষে তা ছিল বেশ কষ্টের এবং চ্যালেঞ্জেরও। সে কারণে ত্রিদেশীয় সিরিজে শ্রীলঙ্কা বনাম বাংলাদেশের ক্রিকেট ম্যাচ এক অর্থে হয়ে উঠলো বাংলাদেশ বনাম হাথুরেসিংয়ের মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক লড়াই। এই লড়াইয়ের প্রথম ধাপে বাংলাদেশ সফলভাবেই উতরে গেল। ত্রিদেশীয় সিরিজের প্রথম খেলায় শ্রীলঙ্কা বাংলাদেশের কাছে শোচনীয়ভাবে হেরে গেলো! ধন্য ধন্য রব উঠলো বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের পক্ষে। অনেকেই ভেবে বসলেন বাংলাদেশ ক্রিকেট দল হাথুরেসিংকে উচিত জবাব দিয়েছে। ‘আপনাকে ছাড়া আমরাও পারি। দেখুন তার নমুনা...’
তবে হ্যাঁ, খেলার নমুনা দেখানো পর্যন্ত সবকিছুই ঠিক ছিল। একটা যোগ্য দল হয়েই সেদিন শ্রীলঙ্কার সঙ্গে ক্রিকেট খেলেছিল বাংলাদেশ। কিন্তু তারপর বোধকরি কচ্ছপ আর খরগোশের গল্পের মতোই হয়ে যায় সবকিছু। ত্রিদেশীয় সিরিজের প্রথম খেলায় শ্রীলঙ্কাকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করে বাংলাদেশ বোধকরি খরগোশের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। ভাবটা এমন–শ্রীলঙ্কা তো কচ্ছপ। কাজেই ও আর কতটুকু দৌড়াবে? এই সুযোগে আমরা একটু ঘুমিয়ে নেই–এ ধরনের অবজ্ঞা করার মনস্তাত্ত্বিক মনোভঙ্গি বোধকরি পেয়ে বসেছিল বাংলাদেশ ক্রিকেট দলকে। ফলে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের অনেকে বোধকরি শ্রীলঙ্কাকে পাত্তা দিতেই চাইল না। কিন্তু শ্রীলঙ্কা তো থেমে নেই। কচ্ছপ গতিতে হাঁটছে ঠিকই, কিন্তু লক্ষ্য স্থির। খরগোশের অবজ্ঞার জবাব দিতে হবে। এবং অবশেষে কচ্ছপেরই জয় হলো।
অনেকে মনে করেন বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের সাবেক প্রধান কোচ হাথুরেসিং যেহেতু বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের খেলোয়াড়ি প্রতিভার সবকিছুই জানেন সেহেতু গেম প্ল্যানটা সেভাবেই করে এসেছিলেন। শ্রীলঙ্কা প্রথম খেলায় বাংলাদেশের কাছে শোচনীয়ভাবে হারবে এটাই হয়তো তার গেম প্ল্যান ছিল। কারণ, প্রথম খেলায় শ্রীলঙ্কাকে হারাতে পারলে বাংলাদেশ পরবর্তীতে হয়তো তাদের আর সেভাবে গুরুত্ব দেবে না। হাথুরেসিংয়ের এ ধরনের গেম প্ল্যান যদি নাও থেকে থাকে তাহলেও বাংলাদেশ অজান্তে এ ধরনের গেম প্ল্যানের ফাঁদে পা দিয়েছে। শ্রীলঙ্কাকে কচ্ছপ ভেবে ভুল করেছে বলেই ত্রিদেশীয় সিরিজের ফাইনালে শোচনীয়ভাবে পরাজয়বরণ করেছে। লেখার এই অংশের মোরাল অব দ্য স্টোরি হলো অহেতুক কাউকে অবজ্ঞা করতে নেই। মাঠের প্রতিযোগিতায় তো নয়ই... মাঠের খেলায় দুর্বল প্রতিপক্ষও যে কোনও দিন ভয়ঙ্কর হয়ে উঠতে পারে। পচা শামুকেও পা কাটে...।
এবার চট্টগ্রামে বাংলাদেশ বনাম শ্রীলঙ্কার প্রথম টেস্ট প্রসঙ্গে কিছু বলতে চাই। এখানেও মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়ে বাংলাদেশকে জিতিয়ে দিয়েছে মোমিনুল। হাথুরে জমানায় মোমিনুল জাতীয় ক্রিকেট দলে বলা যায় চরম উপেক্ষিত ছিল। হাথুরেসিং তাকে অনেকটা অবজ্ঞাই করেছেন। মাঠের ক্রিকেট লড়াইয়ে মোমিনুলের মাঝে সেই অবজ্ঞার জবাব দেওয়ারই বোধকরি একটা প্রত্যয় ছিল। মোমিনুল জয়ী হয়েছেন। সাথে সাথে বাংলাদেশ লজ্জাজনক হার থেকে নিষ্কৃতি পেয়েছে।
আবারও বলি, এই লেখাটির মূল সুর হলো মাঠের লড়াইয়ে প্রতিপক্ষকে কখনই দুর্বল ভাবতে নেই। এ কথা সত্য, ত্রিদেশীয় সিরিজে প্রথম খেলায় জয়লাভ করার পর শ্রীলঙ্কার ব্যাপারে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল বোধকরি অনেকটাই নির্ভার ছিল। একেই বলে প্রতিপক্ষকে অবজ্ঞার চোখে দেখা। ফলে যা হওয়ার তাই হয়েছে। শ্রীলঙ্কা বিপুল বিক্রমে অবজ্ঞার জবাব দিয়েছে। একইভাবে চট্টগ্রামে প্রথম টেস্টে শ্রীলঙ্কার খেলোয়াড়দের শারীরিক ভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছিলো তারা এবার বাংলাদেশকে অবজ্ঞা করছে। এবার তার জবাব দিয়েছে বাংলাদেশ।
ঢাকায় দ্বিতীয় টেস্টে বোঝা যাবে ক্রিকেটে আসলে কে কতুটুক এগুলো? বাংলাদেশ নাকি শ্রীলঙ্কা? ইতিমধ্যে দুই দলই পরস্পরকে বুঝে ফেলেছে। কাজেই ঢাকার টেস্ট বেশ প্রতিদ্বন্দ্বিতা মুখর হবে একথা বলাই যায়।
লেখাটি শেষ করি একটি স্বপ্নের কথা বলে। আমাদের ক্রিকেটের রাজপুত্র সাকিব আল হাসান একটি শিশুতোষ বই লিখেছেন। বাংলা একাডেমি আয়োজিত একুশে বইমেলায় ‘হালুম’ নামে তার এই বইটি পাওয়া যাচ্ছে। গত সোমবার তিনি একুশে বইমেলায় গিয়েছিলেন। তাকে একনজর দেখার জন্য বইমেলা প্রাঙ্গণে মানুষের ঢল নামে। অশীতিপর এক বৃদ্ধা সাকিবের সাথে দেখা করার সুযোগ খুঁজছিলেন। কিন্তু ভিড়ের চোটে তার কাছাকাছি যেতে পারছিলেন না। সাকিবকে তিনি একটাবার ছুঁয়ে দেখতে চান। তাকে প্রশ্ন করলাম–সাকিবকে কেন ছুঁয়ে দেখতে চান? উত্তরে তিনি বললেন, আপনি এটা কি ধরনের প্রশ্ন করলেন বাবা? সাকিবকে ছুঁয়ে দেখা মানেই তো বাংলাদেশকে ছুঁয়ে দেখা। ওরা যখন মাঠে বাংলাদেশের জন্য লড়াই করে আমি তখন মুগ্ধ হয়ে দেখি। আমাদের ১১টা ছেলে যেদিন মন দিয়ে মাঠে খেলে সেদিন ঠিকই বাংলাদেশের জয় হয়। ভাবতে পারেন, ১১টা ছেলে কীভাবে একটা দেশকে জিতিয়ে দেয়?
স্বপ্নটা এমন–সকল অবজ্ঞাকে ডিঙিয়ে বাংলাদেশের ক্রিকেটের জয় হোক। কারণ, ক্রিকেট বাংলাদেশে এখন শুধু একটি খেলা নয়। ক্রিকেট দেশের মান ও মর্যাদার প্রতীক হয়ে উঠেছে। ক্রিকেট হাসালে গোটা বাংলাদেশ হাসে। ক্রিকেট কাঁদলে গোটা বাংলাদেশ কাঁদে! আমরা ক্রিকেটের হাসি দেখতে চাই।
লেখক: নাট্যকার, কথাসাহিত্যিক, সম্পাদক, আনন্দ আলো।