বাংলাদেশ ভূখণ্ডে অবস্থিত ১১১টি ছিটমহলের সবচেয়ে বেশি লালমনিরহাটে ৫৯টি, পঞ্চগড়ে ৩৬টি, কুড়িগ্রামে ১২টি এবং নীলফামারীতে ৪টি। এই সাত দশকে (সাবেক ছিটমহলে) জমি আদান-প্রদানে কোনও দলিল ছিল না, বিবাহ নিবন্ধন হতো না, জন্মনিবন্ধন হতো না, ছেলেমেয়েরা স্কুলে যেতে পারতো না, জন্মনিয়ন্ত্রণে অনীহা, বহুবিবাহ এবং বাল্যবিবাহ সামাজিক ব্যাধি হিসাবে ছিল। সবচেয়ে ভয়ংকর ছিল কাজের কোনও নিশ্চয়তা ছিল না। ছিল না বিদ্যুৎ, রাস্তাঘাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।
সাত দশক ধরে সরকারি বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা বঞ্চিত এসব মানুষকে দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের মূল স্রোতধারায় যুক্ত করতে হলে সরকারের বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন। প্রথমে ভাবতে হবে এসব মানুষের মৌলিক অধিকার কীভাবে নিশ্চিত করা যায়। যদিও এই বিষয়গুলোর আলোচনা ছিটমহল বিনিময়ের সময়ে হওয়ার কথা। আলোচনা যে হয়নি মোটেও এমনটি নয়। তাহলে তার বাস্তবায়ন কি হয়েছে? যদি না হয় তার কারণগুলো কী?
মুক্ত জীবনের সাধ কি তাঁদের সঙ্গে কথা বললে বোঝা যায়, দেবীগঞ্জ উপজেলার মাঝাপাড়া গ্রামের রিপন ইসলাম বলছিলেন, ভাই, ‘আমরা চায়ের দোকানে বসতে পারতাম না, বাজারে গেলে অযথা গালাগালি করতো, ছেলেমেয়েরা স্কুলে যেতে পারতো না, আমাদের মা-বোনদের ওপর নির্যাতন চলতো, কোনও বিচার পেতাম না, জোর করে জমি দখল করলেও কিছু বলার ছিল না, অনেক দুঃখ ভাই, সেগুলো থেকে আমরা মুক্তি পেয়েছি। রাস্তাঘাট হইচে, কারেন্ট (বিদ্যুৎ) পাইচি, সরকারি অনুদান পাই।’
হ্যাঁ, আরও অনেক কিছু পেয়েছে তাঁরা, কিন্তু যার দ্বারা তাদের রাষ্ট্রের মূল স্রোতধারায় যুক্ত করা যায় সেই বিষয়টি থেকে গেছে উপেক্ষিত।
সাত দশক সেখানে জমি আদান-প্রদানে রেজিস্ট্রি ,বিবাহের নিবন্ধন, জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন, শিক্ষাগ্রহণের সুযোগ হয়নি। তবে অনেকেই ভুয়া ঠিকানা ব্যবহার করে স্কুল, কলেজে পড়েছে! বর্তমানে তাদেরই দু-একজনকে সরকার চাকরিতে নিয়োগ দিয়েছে। এখানেও এক ধরনের বিড়ম্বনা তৈরি হয়েছে। আইন অনুযায়ী ছিটমহলের কোনও বাসিন্দার বাংলাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ ছিল না। তাহলে ছিটমহলে শিক্ষিত ছেলেমেয়ে এলো কোথা থেকে। সরকার চাকরির ক্ষেত্রে যে বিশেষ সুবিধা দেওয়া কথা বলেছিল, ভুয়া ঠিকানা ব্যবহারের ফলে সেই সুযোগও অনেকে নিতে পারছে না। পাঁচ বছর পার হলেও বিবাহ নিবন্ধনের প্রতি আগ্রহ কম, বাল্যবিবাহের প্রচলন ব্যাপক। চুক্তি বাস্তবায়নের পর ১৭ হাজার ১৬০ দশমিক ৬৩ একর ভূমি বাংলাদেশের সম্পদ হিসাবে বিবেচিত হয়। এছাড়া সেখানের ২ হাজার ২৬৭ দশমিক ৬৮২ একর অপদখলীয় ভূমি বাংলাদেশের দখলে আসে। আগেই উল্লেখ করেছি, ছিটমহলে ভূমি বিনিময় হতো মুখে মুখে বা সাদা কাগজে লিখে। নতুন বাংলায় ভূমি জরিপ সম্পূর্ণ হলেও বেশ কিছু জটিলতা রয়ে গেছে, যেগুলোর দ্রুত সমাধান হওয়া জরুরি।
শুধু রাস্তাঘাট আর বিদ্যুৎ দিয়ে মানুষের জীবনমান উন্নত করা যায় না; বরং গ্রাম্য এলাকায় উন্নয়ন উন্নয়ন একটা ভাব আসে মাত্র। গ্রামে বিদ্যুৎ আসার ফলে পরিবার প্রতি গড়ে ১০০০ টাকা খচর বেড়েছে, কিন্তু উপার্জন বাড়েনি এক টাকাও। জীবনমান উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন ব্যাপক শিক্ষিত জনশক্তি এবং কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা। ১১১টি বিলুপ্ত ছিটমহলে ২৫টি প্রাইমারি স্কুল, ২৭টি হাইস্কুল এবং ৫টি কলেজ স্থাপিত হলেও গুটিকয়েক প্রাইমারি স্কুল এমপিওভুক্ত হলেও কোনও মাধ্যমিক স্কুল কিংবা কলেজ এমপিওভুক্ত হয়নি। বিনিময়ের ফলে যে ৪১ হাজার ৪৩৩ জন মানুষ বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পেলো তাঁদের শিক্ষিত না করে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা না করে কীভাবে মূল স্রোতধারায় নিয়ে আসা সম্ভব?
রাষ্ট্রের ভুল নীতি, ভুল সিদ্ধান্ত যেকোনও জনগোষ্ঠীর ওপর ভয়ংকর বিপদ ডেকে আনতে পারে। যেহেতু আমাদের ছোট ভূখণ্ডে প্রচুর জনসংখ্যা, তাই সীমিত সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার না করতে পারলে পুরো রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় ভয়ংকর প্রভাব পড়ে। ২০১৮ সালে বিলুপ্ত ছিটমহলের তরুণ যুবকদের জন্য আইসিটি প্রশিক্ষণ কর্মসূচির জন্য ৮ কোটি ৩ লক্ষ ৪ হাজার টাকার একটি প্রকল্প অনুমোদন পায়। এই প্রকল্পের কার্যক্রম হলো-
ক. বিলুপ্ত ছিটমহলের ৯০০ তরুণ/তরুণীকে প্রশিক্ষণ প্রদান।
খ. ৩০০ জন তরুণ/তরুণীকে উচ্চতর প্রশিক্ষণ প্রদান।
গ. বিলুপ্ত ছিটমহল এলাকার ৮টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কম্পিউটার ল্যাব স্থাপন।
ঘ. ৪টি সুবিধাজনক স্থানে ডিজিটাল সেন্টার স্থাপন। ডিজিটাল সেন্টার স্থাপন এখনও পরিকল্পনা পর্যায়ে আছে। এক বছর আগে যারা ট্রেনিং নিয়েছে তারাও বসে আছে। এদের না আছে নিজস্ব কম্পিউটার, না আছে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা! ঠিক যেন ব্যবহার না হওয়া ভোঁতা অস্ত্র। এ তো গেলো গুটিকয়েক শিক্ষিত বেকারের বিষয়। বিলুপ্ত ছিটমহলের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের অবস্থা আরও খারাপ।
শুধু বিলুপ্ত ছিটমহল নয়, সমগ্র জনসাধারণের জন্যই পরিকল্পনা করা দরকার। রাষ্ট্রের ইচ্ছা থাকলে এটা করা সম্ভব। শোনা যাচ্ছে পঞ্চগড় জেলার দেবীগঞ্জ উপজেলায় অর্থনৈতিক জোন হবে, নানান দেশি-বিদেশি কোম্পানি এখানে আসবে। সেটা অবশ্যই একটা ভালো দিক। কিন্তু পঞ্চগড়ের উৎপাদিত পণ্যের সঙ্গে মিলিয়ে শিল্প-কারখানা গড়ে না উঠলে কিছু মানুষের কর্মসংস্থান হয়তো হবে কিন্তু সমগ্র এলাকাবাসীর মুক্তি হবে না এটা বলা যায়। পঞ্চগড়ের পুরো জেলাতেই বাদামের ব্যাপক চাষ হয়। এছাড়া ভুট্টা, আলু, পাট, আদা, হলুদ, তেজপাতা, জলপাই, চা ইত্যাদি বাণিজ্যিকভাবেই চাষ হয়। আলু ও বাদাম বোম্বে সুইটস সরাসরি খোদ কৃষকের কাছ থেকে সংগ্রহ করে এবং দেবীগঞ্জে তাদের নিজস্ব কারখানায় প্রক্রিয়াজাত করে। সেখানে ১০০ জন নারী ও কয়েকশ’ পুরুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। তাছাড়া কৃষকরাও ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন। কয়েকটি চা কারখানায় বেশ কিছু মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। চা পাতা সংগ্রহের প্রশিক্ষিত লোকবল না থাকায় ডগা কেটে পাতা সংগ্রহ করার কারণে উৎপাদনে ব্যাঘাত ঘটছে, আবার বহু নারীর কর্মসংস্থানের সুযোগ নষ্ট হচ্ছে। প্রাণ কোম্পানি ফড়িয়ার মাধ্যমে যে জলপাই ও বাদাম কিনে ঢাকায় নিয়ে যায়, সেই কাজটি যদি এখানে কারখানা স্থাপন করে প্রক্রিয়াজাত করে তাহলে উৎপাদনকারীরা লাভবান হবে এবং বহু মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। ঠিক একইভাবে দরকার পাটকল স্থাপন করা।
তবে শিল্প-কারখানা স্থাপন করার আগে অবশ্যই পরিবেশের দিকটা খেয়াল রাখতে হবে, কোনোভাবেই যেন কারখানাগুলো পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে না পারে। ভালো ব্যাপার হচ্ছে, পঞ্চগড় জেলায় ঘনবসতি নেই বললেই চলে এবং অনাবাদি প্রচুর রাষ্ট্রীয় ভূমি আছে, যার পরিকল্পিত ব্যবহার করতে পারলে এই অঞ্চলের মানুষের তথা দেশের সমগ্র অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
লেখক: ফিল্ড অফিসার, পিপিজে প্রজেক্ট, আরডিআরএস বাংলাদেশ, দেবীগঞ্জ, পঞ্চগড়।
ইমেইল-ssfmithu@gmail.com