কেন বিলুপ্ত হবে বাংলা ভাষার গাণিতিক সংখ্যা?

মো. আবুসালেহ সেকেন্দার
মুঘল সম্রাট আকবর একবার তার দরবারে পণ্ডিতদের আমন্ত্রণ জানালেন ভাষা মানুষ কীভাবে রপ্ত করে তা জানতে। উপস্থিত পণ্ডিতরা বললেন, ভাষা ঐশ্বরিকভাবে মানুষ শেখে। পণ্ডিতরা এর পক্ষে বহু যুক্তি দেন। কিন্তু তিনি পণ্ডিতদের কোনও যুক্তিতে সন্তুষ্ট হতে না পেরে নিজেই একটি পরীক্ষার আয়োজন করেন। এ লক্ষ্যে তিনি সদ্য জন্মলাভকারী দুই নবজাতককে একটি দ্বীপে নির্বাসনে পাঠালেন এবং যাদের এদের তত্ত্বাবধায়ক নিযুক্ত করেন, তাদের প্রতি নির্দেশনা দেন যে এই নবজাতকরা কোনোভাবেই যেন ভাষার সংস্পর্শ না পায়। রাজাজ্ঞা বলে কথা, শূলে চড়ার ভয়ে ভীত রাজকর্মচারীরা রাজার নির্দেশ যথাযথভাবে পালন করেন। এভাবে চার বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পর তাদের রাজদরবারে নিয়ে আসা হয়। দেখা যায়, নবজাতকরা কোনও কথাই বলতে পারে না। অতঃপর তাদের কিছু দিন রাজদরবারে রাখা হলে দেখা যায় আস্তে আস্তে কথা বলতে শুরু করেছে। এর অর্থ তারা যখন মানুষের মুখের কথা শুনেছে তখনই সেটি রপ্ত করেছে এবং পরে তাই বলতে শুরু করেছে।

ভাষা মানুষ তার পরিবার ও পরিবেশ থেকে শেখে। তাই একই দেশে বসবাস করার পরও মানুষের মধ্যে ভাষার শব্দ প্রয়োগ ও উচ্চারণে পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। পরিবার ও পরিবেশে যে ভাষার চল আছে, সদ্য জন্ম নেওয়া শিশু আস্তে আস্তে সেই ভাষার উচ্চারণ ও শব্দের প্রয়োগ রপ্ত করে। এ কারণে বাঙালির সন্তান বংশপরম্পরায় বাংলা ভাষা চর্চা করে। ইংরেজের সন্তান ইংরেজি। কিন্তু এই বাঙালি যখন বিদেশ গিয়ে ইংরেজি পরিবেশে নিজের সন্তানকে বড় করেন তখন ওই শিশুর প্রধান ভাষা হয় ইংরেজি। বিদেশে জন্ম নেওয়া অনেক বাঙালি পরিবারের অনেক শিশু অনেক সময় একেবারে বাংলা বলতে পারে না। কারণ, বাংলা ভাষামুক্ত পরিবেশে বড় হওয়ায় সে বাংলা শিখতে পারেনি। ইংল্যান্ড, আমেরিকার কুলি-মুজুররা ইংরেজি ভাষায় সাবলীল কথা বলে কোনও অ্যাকাডেমিক শিক্ষা ছাড়া। অন্যদিকে আমাদের দেশের শিক্ষার্থীদের ইংরেজি ভাষায় কথা বলার জন্য ইংরেজি ভাষা শিক্ষাকেন্দ্রে পড়তে হয়। তার অর্থ এই নয় যে আমাদের দেশের লোকেরা ওদের তুলনায় কম মেধাবী। বরং তারা জন্মের পর থেকেই ইংরেজি ভাষা চর্চা হয় এমন পরিবেশে বড় হওয়ায় ইংরেজি শিখেছে।

বাংলাদেশের ভিক্ষুক থেকে শুরু করে কোটিপতি প্রায় সবাই মোবাইল ব্যবহার করছেন। আর মোবাইল ব্যবহার করতে গিয়েই বাংলা ভাষার গাণিতিক সংখ্যার বদলে বাঙালিরা ইংরেজি ভাষার গাণিতিক সংখ্যা ব্যবহার করছেন। অর্থাৎ এই প্রযুক্তির কল্যাণে বাংলা ভাষার গাণিতিক সংখ্যা (০১...)-এর ব্যবহার কমে গিয়ে সাধারণ মানুষের মনে দ্রুত ইংরেজি ভাষার সংখ্যা (01…) জায়গা করে নিচ্ছে।

উদাহরণ দিলে বিষয়টি বুঝতে সহজ হবে: মোবাইলের মাধ্যমে অন্যের সঙ্গে কথা বলার জন্য টাকার প্রয়োজন হয়। সবাই জানি যে, মোবাইল ফোন কোম্পানিগুলো টাকার বিনিময়ে কথা বলার সুযোগ দেয়। ফলে প্রতিনিয়ত টাকার বিনিময়ে প্রিয়জনের সঙ্গে প্রেমালাপ অথবা অতি প্রয়োজনীয় বা ব্যবসায়িক কথা বলে থাকি। সাধারণত কোম্পানিগুলো অগ্রিম টাকা প্রদান করতে হয়। ওই টাকা রিচার্জ করার সময় প্রায় সর্বক্ষেত্রে মোবাইল কোম্পানির এজেন্টকে আমরা ইংরেজি ভাষার সংখ্যায় অর্থাৎ ‘জিরো ওয়ান নাইন ওয়ান…’ এভাবে আমরা আমাদের মোবাইল নম্বর বিনিময় করছি। বিকাশ অথবা নগদ মাধ্যমে অর্থের আদান প্রদানের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটছে। ফলে বাংলা ভাষার গাণিতিক সংখ্যা ‘শূন্য এক নয় এক…’-এর বদলে বদলে ইংরেজি ভাষার গাণিতিক সংখ্যা ‘জিরো ওয়ান নাইন ওয়ান…’ আমাদের মগজে নিজস্ব ভাষা হিসেবে গেঁথে যাচ্ছে। আমরা নিজেদের ভাষা হিসেবে বলতে আনন্দবোধ করছি। 

একইভাবে অন্যের সাথে যখন মোবাইল নম্বর বিনিময় করি তখনও ইংরেজি ভাষার গাণিতিক সংখ্যা ব্যবহার করছি। এভাবে একজন থেকে আর একজনের মধ্যে ইংরেজি ভাষার গাণিতিক সংখ্যা সংক্রমিত হচ্ছে। এভাবে উচ্চশিক্ষিত থেকে অশিক্ষিত সবার মগজে ইংরেজি ভাষার গাণিতিক সংখ্যা ঢুকে যাচ্ছে। এ থেকে সহজে অনুমান করা যায় যে বাংলা ভাষার সংখ্যার স্থলে প্রান্তজনের মনে ইংরেজি ভাষার নম্বরগুলো জায়গা করে নিচ্ছে। ফলে সংস্কৃতির মতো বাংলা ভাষার সংখ্যাগুলো শুধু বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থীদের পাঠ্য তালিকার মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে, সেই দিন আর বেশি দূরে নয়। কারণ, ইংরেজি মাধ্যমে শিক্ষার প্রসার, উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ইংরেজি মাধ্যমে শিক্ষা এবং ইংরেজি ভাষাই যখন চাকরি পাওয়ার একমাত্র মাপকাঠি হয়ে দাঁড়িয়েছে, তখন উচ্চশিক্ষিতরা বাংলা ভাষার চর্চা করবে বলে মনে হয় না। তাই বাংলা ভাষার টিকে থাকা নির্ভর করছে প্রান্তজনের ওপর। কিন্তু বর্তমান বাংলাদেশের মোবাইল সংস্কৃতি এই প্রান্তজনের মনে যেভাবে ইংরেজি ভাষার গাণিতিক সংখ্যা জায়গা করে দিচ্ছে, তার ফলে বাংলা ভাষার গাণিতিক সংখ্যা বিলুপ্তির আশঙ্কা প্রবল হচ্ছে। একটু ভাবলেই উপলব্ধি করতে পারবেন, আমরা যে ভাষাতে কথা বলছি তা আমরা আমাদের পরিবার এবং চারপাশের পরিবেশ থেকে শিখেছি। আমার মা-বাবা, ভাই-বোন ও অন্যরা বাংলা ভাষায় কথা বলছেন, তাই আমার ভাষা হয়েছে বাংলা। তাই আমরা যখন নিয়মিত বাংলা ভাষার সংখ্যাবাচক শব্দের পরিবর্তে ইংরেজি ভাষার সংখ্যাবাচক শব্দ ব্যবহার করব তখন ওই শব্দই আমাদের নিজের ভাষা বলে মনে হবে। পরিবারের সবাই যখন ‘শূন্য এক নয় এক...’-এর বদলে ‘জিরো ওয়ান নাইন ওয়ান...’ বলবেন তখন পরিবারের সদ্য জন্মলাভকারী শিশুটি ওই শব্দ নিজের মায়ের ভাষা মনে করে রপ্ত করবে। এক সময় প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে যখন ইংরেজি গাণিতিক উচ্চারণ চলতে থাকবে তখন একসময় হয়তো বাংলা ০১৯১৩... কে জাদুঘরে পাঠাতে হবে।

পরিশেষে, ভাষার ইতিহাস বলে ভাষা কখনও উচ্চশিক্ষিতের মাধ্যমে টিকে থাকে না। উঁচু স্তরের লোকের মাধ্যমে যদি ভাষা টিকে থাকত, তবে বাংলা নয়, পুরোহিতদের ভাষা সংস্কৃত এ দেশের প্রধান ভাষা হতো। ভাষা টিকে থাকে প্রান্তজনের অর্থাৎ চাষা-ভুষা, কলকারখানার শ্রমিক, রিকশাওয়ালা বা কুলি-মুজুরের মাধ্যমে। সেই প্রান্তজনের মধ্যে মোবাইল যে প্রভাব ফেলছে; সে বিষয়টি বিবেচনা করে এই আশঙ্কাকে উড়িয়ে দেওয়া যায় না যে, বাংলা ভাষার গাণিতিক সংখ্যা একদিন বাংলা একাডেমির ভাষা ও সাহিত্য জাদুঘরে অথবা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা কেন্দ্রে অথবা এরকম কোনও প্রতিষ্ঠানের প্রদর্শনীতে শুধু স্থান পাবে। এ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে আসুন না আমরা সবাই এখন থেকে মুঠোফোনে টাকা পাঠানোর সময় অথবা অন্যকে নিজের মুঠোফোনের সংখ্যাটি (নাম্বারটি) দেওয়ার সময় বাংলা ভাষার গাণিতিক সংখ্যা ব্যবহার করি ০১...। প্রথম প্রথম হয়তো নিজের ভিতর সংকোচ কাজ করবে। কিন্তু একসময় দেখবেন সব ঠিক হয়ে গেছে। মানুষ অভ্যাসের দাস। তার ওপর আমাদের সংখ্যার সৌন্দর্য বা শ্রুতিমাধুর্য অন্য ভাষার গাণিতিক সংখ্যার চেয়ে কোনও অংশে কম নয়।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। 
salah.sakender@outlook.com