অস্তিত্বের সংকটে গণমাধ্যম

প্রভাষ আমিনদেশের গণমাধ্যম এখন এক ভয়াবহ সংকটকাল পার করছে। সংকটটা রীতিমত অস্তিত্বের। গণমাধ্যমে চলছে পালাবদলও। এই সংকটটা শুরু হয়েছে কয়েক বছর আগেই। গণমাধ্যমের দ্রুত বিস্তারে ছোট হয়ে যায় বিজ্ঞাপনের বাজার। আর বিদ্যমান বাজারের বিজ্ঞাপনের বড় একটা অংশ চলে যায় ফেসবুক, ইউটিউব আর বিদেশি গণমাধ্যমে। তাই দেশি গণমাধ্যমের আয়ে টান পড়ে। সেই টানাটানির সংসারে আঘাত হেনেছে করোনা। গণমাধ্যমে যে সংকট ঘনীভূত হচ্ছিল, করোনা এসে তাকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে। মরার ওপর খাড়ার ঘা’এর প্রকৃত উদাহরণ বুঝি একেই বলে।

বাংলাদেশের গণমাধ্যমের বর্তমান সংকটটা বহুমুখী। প্রথম সংকট আস্থা আর বিশ্বাসের। গণমাধ্যম সব সময় জনগণের পক্ষে থাকার কথা। কিন্তু কীভাবে জানি না, জনগণের সঙ্গে গণমাধ্যমের একটা দূরত্ব তৈরি হয়েছে। কালে কালে সে দূরত্বটা বাড়ছেই শুধু। সাধারণ মানুষ তাদের মনের সব ঝাল, ক্ষোভ, নিজেদের সব ব্যর্থতা, অক্ষমতা, অসহায়ত্ব ঝাড়ে সাংবাদিকদের ওপর। সাধারণ মানুষের গালি খাওয়ার তালিকায় পুলিশ, ডাক্তারদের টপকে সাংবাদিকরাই এখন শীর্ষে। এখানে একটা মজার ব্যাপার আছে। এখনও কিন্তু সাধারণ মানুষ গণমাধ্যমকেই শেষ আশ্রয় মানে। সব দাবি-দাওয়া আন্দোলন কিন্তু জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনেই। এখনও মানুষ বিপদে পড়লে থানা-পুলিশের আগে সাংবাদিকদের কাছেই ছুটে আসে। আবার গালি দেওয়ার সময়ও সবার আগে। তবে সাধারণ মানুষের এই গালিকে আমি আশীর্বাদ বলেই মানি। সাংবাদিকদের কাছে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা আকাশচুম্বী। তাই একটু এদিক-সেদিক হলেই তারা হতাশ হয়ে যান। সাংবাদিকদের বলা হয় সমাজের ওয়াচডগ। আর সাধারণ মানুষ ওয়াচ করে সাংবাদিকদের। কোথাও কোনও ব্যত্যয় ঘটলেই তারা ঝাঁপিয়ে পড়েন। সাধারণ মানুষ আমাদের ওয়াচ করছেন, ভুল করলে গালি খেতে হবে; এই ভয়ে আমরা আরও সতর্ক থাকি।

সাম্প্রতিক সময়ে কলেজছাত্রী মুনিয়ার আত্মহত্যার পর গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রবল সংশয় তৈরি হয়। কারণ, মুনিয়ার মৃত্যুর পর তার বোন আত্মহত্যায় প্ররোচনার যে মামলা করেছেন তার একমাত্র আসামি বসুন্ধরা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সায়েম সোবহান আনভীর। এ ঘটনায় গণমাধ্যমের যেভাবে প্রতিক্রিয়া দেখানো উচিত ছিল সেভাবে দেখাতে পারেনি। এই ঘটনায় ‘চুপ সাংবাদিকতা’ হয়েছে, ‘অতি উৎসাহী’ সাংবাদিকতা হয়েছে, ‘অপসাংবাদিকতা’ হয়েছে; ভালো সাংবাদিকতাটাই হয়েছে সবচেয়ে কম।

তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম যেভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে, গণমাধ্যম সেভাবে পারে না। গণমাধ্যমকে কিছু নিয়ম-নীতি মেনে চলতে হয়। এই ঘটনায় সেই নিয়ম-নীতি মানার ব্যাপারটিও হয়নি। গণমাধ্যমের অনেক বিপদের একটি হলো, গণমাধ্যম আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবধান দ্রুত ঘুচে যাওয়া। আমি এমন অনেককে চিনি যারা সংবাদ তৃষ্ণা মেটানোর জন্য পত্রিকা পড়েন না বা টিভিও দেখেন না। তারা শুধু ফেসবুক পড়েন। জরুরি খবরের লিংক তারা পেয়ে যান সেখান থেকেই। তাই অনেকে গণমাধ্যমের কাছে প্রত্যাশাকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রতিক্রিয়ার সমান্তরাল ধরে নেন। এটাই সবচেয়ে বিপজ্জনক। মুনিয়ার মৃত্যুর পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি স্ট্যাটাস ভাইরাল হয়েছে, আগে মানুষ ফেসবুকে খবর পেলে সত্যতা যাচাই করতে গণমাধ্যমের কাছে যেতো। আর এখন গণমাধ্যমে সত্য না পেলে সত্যের খোঁজে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যায়। এই প্রবণতা ঠেকাতে না পারলে গণমাধ্যমের সামনে ভয়ংকর বিপদের দিন অপেক্ষা করছে।

বাংলাদেশে গণমাধ্যমের সামনে আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ- স্বাধীনতা। এই চ্যালেঞ্জের সঙ্গে সম্পর্কিত আরও অনেক সমস্যা। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা না থাকলে বিশ্বাসযোগ্যতা থাকে না। বিশ্বাসযোগ্যতা না থাকলে পাঠক বা দর্শক প্রত্যাখ্যান করে। দর্শক বা পাঠক না থাকলে বিজ্ঞাপনদাতাদের আগ্রহ কমে যায়। তাতে ক্ষতির মুখে পড়ে পত্রিকা, টেলিভিশন, নিউজপোর্টাল তথা গণমাধ্যম। চাকরি হারান সাংবাদিকরা। অস্থিরতা তৈরি হয় গণমাধ্যমে। এ এক বিশাল চক্র। এ চক্র সৃষ্টির দায় আমাদের, ভাঙতে হলেও আমাদেরই।

তবে গণমাধ্যমের স্বাধীনতারও নানা চ্যালেঞ্জ আছে। এই চ্যালেঞ্জ শুধু সরকারের দিক থেকে নয়। ব্যবসায়ী, প্রভাবশালীরা নানাভাবে গণমাধ্যমের ওপর চাপ দেন। এটা ঠিক বাংলাদেশে এই মুহূর্তে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় নয়। এর জন্য সরকারের নানা আইনি প্রতিবন্ধকতা যেমন আছে, তেমনি আছে আমাদের দায়ও। আমরা যতটা না সরকারের ভয়ে, তারচেয়ে বেশি স্বেচ্ছায় নিজেদের কণ্ঠ চেপে রেখেছি। এটা কিছুটা স্বার্থে, কিছুটা আনুগত্যে। গত এক যুগে গণমাধ্যম কোয়ানটিটিতে বাড়লেও কোয়ালিটি বাড়ে তো নাই-ই, বরং কমেছে। এই সেলফ সেন্সরশিপ আর ভালো কনটেন্টের অভাবের কারণেই গণমাধ্যমের প্রতি আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে। এ কারণেই গণমাধ্যমে এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।

এতসব অস্থিরতার মধ্যে আরও অনেক খাতের মতো গণমাধ্যমেও চলমান সংকটকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে করোনাভাইরাস।

স্বাধীনতা বলেন, বিশ্বাসযোগ্যতা বলেন; সবকিছু ঠিক করতে অর্থ লাগবে। আর গণমাধ্যমের অর্থের প্রধান উৎস বিজ্ঞাপন। ছাপা পত্রিকা তবু বিক্রি থেকে অল্প হলেও কিছু টাকা পায়। কিন্তু টিভি, রেডিও বা অনলাইনের আয়ের একমাত্র উৎস বিজ্ঞাপন। বিজ্ঞাপনদাতার স্বার্থে গণমাধ্যমে অনেক অসংবাদ সংবাদের মর্যাদা পায়, আবার অনেক সঠিক সংবাদ ছাপাই হয় না। আয় করে টিকে থাকা গণমাধ্যমের জন্য একটা বড় চ্যালেঞ্জ। করোনা সেই লড়াইকে অজেয় করে তুলেছে। করোনা অনেক দিক থেকে গণমাধ্যমকে আক্রান্ত করেছে। করোনার কারণে কিছু মিডিয়া বন্ধ হয়ে গেছে। অনেক মিডিয়া খরচ কমিয়েছে। খরচ কমাতে গিয়ে তারা পত্রিকার পৃষ্ঠা সংখ্যা কমিয়েছে, কর্মীদের বেতন কমিয়েছে, বেতন অনিয়মিত হয়েছে বা কর্মী ছাঁটাই করেছে। অনেক গণমাধ্যমে গণছাঁটাই হয়েছে। গণমাধ্যমের এখন যে অবস্থা, বেকার কারও পক্ষে চাকরি পাওয়া কঠিন নয় শুধু, অসম্ভবও। একদিকে চাকরির ঝুঁকি, বেতনের অনিশ্চয়তা; তার ওপর এই করোনার সময়ে গণমাধ্যম কর্মীদের দায়িত্ব ও চ্যালেঞ্জ আরও বেড়ে গেছে। এই সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানান গুজব ছড়ায়। মানুষ তখন আস্থা রাখে মূল ধারার গণমাধ্যমে। সেই আস্থার প্রতিদান দিতে আরও নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করতে হয় গণমাধ্যমকর্মীদের। যেহেতু মানুষ ঘরে বন্দি, তাই তার হাতে টিভি দেখার, পত্রিকা পড়ার অঢেল সময়। কিন্তু টিভি বা পত্রিকা যারা চালায় তারাও তো মানুষ। আপনারা সুযোগ পেলেই যাদের সাংঘাতিক বলে গালি দেন, সেই সাংবাদিকরাই কিন্তু জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মাঠে ময়দানে কাজ করছেন। আপনার কাছে সঠিক তথ্য পৌঁছে দিচ্ছেন। আপনি যখন মাসের বাজারে ফ্রিজ ভর্তি করে দরজায় খিল এঁটে নেটফ্লিক্সে নতুন ছবি খুঁজছেন, সাংবাদিকরা তখন হাসপাতালে হাসপাতালে ঘুরে ঘুরে করোনার খবর সংগ্রহ করছেন। নেটফ্লিক্সে ক্লান্তি এলে টিভি চ্যানেল অন করেই হয়তো আপনি গালি দিলেন, সব সরকারের দালাল। কোনও খবর নেই। এটা ঠিক সাংবাদিকরা আপনার চাহিদা মতো গুজব ছড়াতে পারে না। থানকুনি পাতায় করোনা মুক্তির মতো কোনও অব্যর্থ আবিষ্কার করতে পারে না। তারপরও এই ‘দালাল’রা দিনরাত কাজ করে। আপনার অফিস বন্ধ, কিন্তু সব টিভি কিন্তু ২৪ ঘণ্টাই চলছে।

তবে গণমাধ্যমের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ নিজেদের অস্তিত্বের এবং সামনের দিনগুলোতে সেই চ্যালেঞ্জ আরও জটিল হবে। এখন সব গণমাধ্যমই কোনও না কোনোভাবে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখছে। কিন্তু এখন আয়ে যে টান পড়েছে তার প্রভাব পড়বে সামনের দিনগুলোতে। আর সামনে যে মহামন্দার আশঙ্কা করা হচ্ছে, তার প্রভাবও পড়বে গণমাধ্যমে। এমনিতেই সব গণমাধ্যম ঠিকমতো কর্মীদের বেতন দিতে পারে না। সামনের দিনগুলোতে এই সংকট আরও প্রকট হবে। আয় না হলে মালিকরা বেতন দেবেন কোত্থেকে। তখন ঝুঁকি আরও বাড়বে। এখন যে গণমাধ্যম কর্মীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছে, ভবিষ্যতে তাদেরই চাকরি ঝুঁকির মুখে পড়বে। এই সংকট উত্তরণে আমাদের সবচেয়ে বেশি দরকার আপনাদের সমর্থন, আপনাদের মানে জনগণের। মাধ্যমটা যেহেতু জনগণের, তাই জনগণ পাশে থাকলেই সেটা সবচেয়ে সুরক্ষিত থাকবে।

সংকটকাল কবে কাটবে, গণমাধ্যমের ভবিষ্যতই বা কী? আমি বরাবরই আশাবাদী মানুষ। আমি জানি সংকট কেটে যাবে। তবে এ জন্য সরকারের কিছু নীতি সহায়তা লাগবে। প্রযুক্তি ও আধুনিকতাও গণমাধ্যমে নানামাত্রিক চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করেছে। পুরনো ধারার গতানুগতিক সাংবাদিকতার দিন ফুরিয়ে আসছে। যারা সময়ের সঙ্গে, প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারবে, টিকে থাকবে তারাই। টিকে থাকার সূত্র পুরনো- সারভাইভাল অফ দ্য ফিটেস্ট। যিনি যোগ্য, দক্ষ, দূরদর্শী; তাদের কোনও সংকট থাকবে না। এখন পত্রিকা মানে শুধু ছাপার পত্রিকা নয়। অনেক পত্রিকারই ছাপার চেয়ে অনলাইনে পাঠক বেশি। পত্রিকায় থাকে ভিডিও কনটেন্টও। টেলিভিশনও আর নিছক টেলিভিশন নয়; তারও থাকছে অনলাইন ভার্সন। অনলাইন নিউজপোর্টালও আর শুধু নিউজ নয়, থাকে নানা ভিডিও কনটেন্টও। এসব কনটেন্ট দিয়ে ইউটিউব থেকে বাড়ছে আয়। এভাবেই যারা সব মিলিয়ে ভাবতে পারবে, টিকবে তারাই।

তবে অবশ্যই গণমাধ্যম আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ফারাকটা স্পষ্ট রাখতে হবে। গণমাধ্যমকে সাহসের সঙ্গে সত্য তুলে ধরতে হবে। বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করতে হবে। স্বাধীনতার সঙ্গে দায়বদ্ধতার কথাও মাথায় রাখতে হবে। সব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার একমাত্র উপায় ভালো সাংবাদিকতা। একমাত্র আরও ভালো সাংবাদিকতা দিয়েই সব সমালোচনার জবাব দেওয়ার সম্ভব। জনগণের পাশে থাকতে পারলে, আস্থায় নিয়ে জনগণকে পাশে রাখতে পারলেই টিকে থাকবে গণমাধ্যম। জনগণই গণমাধ্যমের একমাত্র রক্ষাকবচ।

লেখক: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ