ঢাকা-১৭ আসনের উপনির্বাচনটি নিছক সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারণেই করা। মাস পাঁচেকের জন্য এমপি হওয়া না হওয়ায় কিছু যায় আসে না। এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগে জিতলেও কোনও অর্জন নেই, হারলেও সরকার পতন হয়ে যেত না। বরং নির্বাচন কমিশনের সামনে সুযোগ ছিল এই ‘অনুষ্ঠানিকতা’র নির্বাচনকেও নিজেদের প্রমাণের। বিদ্যমান ব্যবস্থায়ও যে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব, সেটা প্রমাণের দারুণ সুযোগ ছিল কমিশন এবং সরকারের সামনে। সুযোগ ছিল ৫ সিটি করপোরেশন নির্বাচন ও বিভিন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন দক্ষতার সাথে অনুষ্ঠানের সুনামকে ধরে রেখে আরও সামনে এগিয়ে যাওয়ার। বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রাক নির্বাচনি টিম বাংলাদেশ সফর করছে। ক’দিন আগে ঘুরে গেছেন মার্কিন আন্ডার সেক্রেটারি। দেশে-বিদেশের সবার নজর এখন বাংলাদেশের আগামী নির্বাচন এবং নির্বাচনি প্রক্রিয়ার দিকে। তাই প্রায় ‘অগুরুপূর্ণ’ উপনির্বাচনটি বাংলাদেশের রাজনীতি ও নির্বাচনি প্রক্রিয়ার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল।
এমনিতে রাজপথের প্রধান বিরোধী দল বিএনপিসহ অধিকাংশ বিরোধী দল অংশ না নেওয়ায় উপনির্বাচন নিয়ে ভোটারদের আগ্রহ ছিল কম। সরকারের মিত্র জাতীয় পার্টি ও জাকের পার্টি নির্বাচনে অংশ নিলেও নির্বাচনের আগে পরে তারা তাতে কোনও প্রভাব ফেলতে পারেননি। আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী মোহাম্মদ এ আরাফাতের জয়টা ছিল সময়ের ব্যাপার মাত্র। একতরফা, নিরুত্তাপ এই নির্বাচনে কিছুটা চাঞ্চল্য আনতে পেরেছিলেন স্বতন্ত্র প্রার্থী বহুল আলোচিত আশরাফুল আলম ওরফে হিরো আলম। জোকার ইউটিউবার হিরো আলমের নির্বাচন রোগও আছে। যখন যেখানে নির্বাচন, সেখানেই তিনি প্রার্থী হয়ে যান।
২০১৮ সালে নির্বাচন করেছেন। বিএনপি সংসদ সদস্যের পদত্যাগের পর বগুড়ার দুটি আসনে উপনির্বাচনে অংশ নিয়েছেন তিনি। অতীতেও আমরা বাংলাদেশে কৃষক সাদেক বা ছক্কা ছয়ফুরের মতো নির্বাচনে রোগে আক্রান্ত মানুষদের দেখেছি। ইউনিয়ন পরিষদ থেকে রাষ্ট্রপতি সব নির্বাচনেই তারা প্রার্থী হতেন। হিরো আলমও তাদেরই উত্তরসূরী। তবে ডিজিটাল বাংলাদেশের সুবিধা কাজে লাগিয়ে হিরো আলম নিজেকে তুলে এনেছেন অন্য উচ্চতায়। তিনি সবসময় আলোচনায় থাকতে পছন্দ করেন। টিকটকে, ইউটিউবে নানান ক্যারিকেচার করে তিনি আলোচনায় থাকেন। অনেকেই তার আচরণে বিরক্ত হলেও তার মতপ্রকাশের স্বাধীনতা আছে। এমনকি নির্বাচন করারও অধিকার আছে। বিপুল সংখ্যক মানুষকে বিরক্ত করে হলেও হিরো আলম তার গান গাওয়ার, অভিনয় করার, নাটক করার, নির্বাচন করার অধিকারের পূর্ণ প্রয়োগ করে যাচ্ছেন।
যদিও এক টক শো’তে গান, অভিনয় ও রাজনীতিতে নিজেকে নিজেকে দশে শূন্য দিয়েছেন। নির্বাচনে তিনি ভোট যতটা পান, আলোচনা হয় তারচেয়ে অনেক অনেক বেশি। এই আলোচনায় থাকাটাই তার মূল পেশা। যত বেশি আলোচনা, যত বেশি সমালোচনা; তত বেশি ভিউ, তত আয়। নির্বাচনি হলফনামায় নিজের বার্ষিক আয় আড়াই লাখ টাকা দাবি করলেও হিরো আলম বগুড়ায় গ্রামের বাড়িতে কোটি টাকায় বাড়ি বানাচ্ছেন।
অনেক আলোচনা, বিতর্ক, আওয়ামী লীগ বিরোধীদের সমর্থন পেলেও হিরো আলম কখনোই আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীর জন্য হুমকি হতে পারেননি। একটি নিস্তরঙ্গ নির্বাচনে আলোচনার ঢেউ তোলার জন্য হিরো আলমকে ধন্যবাদ দেওয়া উচিত ছিল নির্বাচন কমিশন ও আওয়ামী লীগের। তিনি ছিলেন বলেই অন্তত ইউটিউবে ঢাকা-১৭ আসন নিয়ে কৌতূহল ছিল সাধারণ মানুষের।
ঢাকা-১৭ আসনের উপনির্বাচনটি শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠানের ব্যাপারে সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নিয়েছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ডিএমপি কমিশনারও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় দৃঢ় অঙ্গীকারের কথা বলেছিলেন। সবই চলছিল ঠিকঠাক মতো। কিন্তু ভোট শেষ হওয়ার ৪৫ মিনিট আগে উল্টে গেলো গনেশ।
আগেই বলেছি, আলোচনার ঢেউ তুললেও হিরো আলম আওয়ামী লীগের প্রার্থীর জয়ের জন্য হতে পারেননি কখনোই। যদি সত্যি সত্যি হুমকি হতোও তাহলেও তো আওয়ামী লীগের কিছু করার নেই। এখন তো সবাই বলছেন, আওয়ামী লীগ হিরো আলমের মতো একজন স্বতন্ত্র প্রার্থীকেই সহ্য করতে পারছে না, অংশগ্রহণমূলক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন হলে তারা কী আচরণ করবে। ধরে নিচ্ছি, গণতন্ত্রের প্রতি, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর প্রতি আওয়ামী লীগের কোনও সহনশীলতা নেই। তাহলে তো নির্বাচনের শুরুতেই তারা হিরো আলমের ওপর হামলা করতে পারতো। শেষ বেলায় হামলা করে সারাদিনের সব আয়োজন ধুলায় মিশিয়ে দিতে হবে কেন? হিরো আলমের ওপর হামলায় আওয়ামী লীগের কী লাভ হলো? লাভ তো হয়ইনি, উল্টো এক হামলায় সরকারের আন্তরিকতা, নির্বাচন কমিশনের চেষ্টা, পুলিশের দৃঢ়তা সব ধুলো হয়ে গেলো।
এই হামলায় লাভ যদি কারো হয়ে থাকে, তবে সেটা হিরো আলমের। যিনি সবসময় আলোচনায় থাকতে চান, আওয়ামী লীগ মেরে তাকে আলোচনার এভারেস্টে তুলে দিয়েছে। হিরো আলম এতদিন শুধু বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে আলোচিত ছিলেন। এখন তার হামলার প্রতিবাদ জানাচ্ছে জাতিসংঘ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। হামলার প্রতিবাদে বিবৃতি দিয়েছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ১২ দেশের কূটনীতিকরা। শুধু আন্তর্জাতিক মহল নয় সরকার, সরকারি দল, বিরোধী দল, নির্বাচন কমিশন সবাই একবাক্যে এ হামলার নিন্দা করছে। আপনি কাউকে অপছন্দ করতে পারেন, ঘৃণা করতে পারেন; কিন্তু কাউকে আঘাত করার কোনও অধিকার আপনার নেই।
অপ্রয়োজনীয় হামলা করে একটা নন ইস্যু বানানোর এই আওয়ামী স্টাইলের কোনও উদাহরণ খুঁজে পাওয়া যাবে না। ‘পচা শামুকে পা কাটা’র এর চেয়ে ভালো দৃষ্টান্ত আর একটিও নেই। এ হামলা একটি অবাধ, শান্তিপূর্ণ নির্বাচন প্রক্রিয়ার আকাঙ্ক্ষার বিপরীত।
হামলাকারীরা যে আওয়ামী লীগের সমর্থক তাতে কারোই সন্দেহ নেই। সরকারি দলের কেউ কেউ ‘স্যাবোটাজ’ বলে অভিহিত করছেন। যদি স্যাবোটাজই হয়ে থাকে, তাহলে এই হামলা থেকে আওয়ামী লীগকে শিক্ষা নিতে হবে। গত ১৪ বছরে এমন স্যাবোটাজ করার মতো কত আগাছা আওয়ামী লীগে ঢুকেছে, আগামী নির্বাচনের আগেই তা খুঁজে বের করে দল থেকে বের করে দিতে হবে। নইলে এমন স্যাবোটাজ আরও ঘটবে, বারবার ঘটবে।
হিরো আলমের হামলার ঘটনা যে দল এবং সরকারের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হয়েছে, তা বুঝতে দেরি হয়নি। এরই মধ্যে বেশ কয়েকজনকে গ্রেফতারও করা হয়েছে। কিন্তু কিছু কিছু ক্ষতির আসলে কোনও পূরণ হয় না। যতই আন্তরিকতা থাকুক; আওয়ামী লীগ যতবার অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের অঙ্গীকারের কথা বলবে; ততবার পাল্টা যুক্তি হিসেবে হিরো আলমের ওপর হামলার প্রসঙ্গ আসবে। হিরো আলমের ওপর হামলার ছবি এরই মধ্যে দেশে-বিদেশে কোটি কোটি মানুষ দেখেছে। মানুষের স্মৃতি থেকে তো নয়ই, ডিজিটাল এই সময়ে ইউটিউব থেকেও এই ছবি মুছে ফেলা সম্ভব নয়।
হামলাকারীদের গ্রেফতার করা হচ্ছে, ভালো কথা। কিন্তু একই সাথে ব্যবস্থা নিতে হবে পুলিশের বিরুদ্ধেও। পুলিশ তার দায়িত্ব পালনে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। হামলার শুরুটা হয়েছিল পুলিশের সামনেই। একজন পুলিশ হিরো আলমকে ভোটকেন্দ্র থেকে বেরিয়ে যাওয়া পর্যন্ত সঙ্গ দিয়েছেন। এরপর তাকে ছেড়ে দিয়েছেন হামলাকারীদের মুখে। পুলিশের উচিত ছিল তাকে নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দেওয়া। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এক পুলিশ সদস্য বলেছেন, তাদের দায়িত্ব শুধু ভোট কেন্দ্রে, বাইরে নয়। এই পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। নিরুত্তাপ একটি উপনির্বাচনে একজন স্বতন্ত্র প্রার্থীর নিরাপত্তাই যারা নিশ্চিত করতে পারে না, অংশগ্রহণমূলক জাতীয় নির্বাচনে তারা কী করবে?
পুরো ঘটনায় আমার সবচেয়ে খারাপ লাগছে, ঢাকা-১৭ আসনের নবনির্বাচিত এমপি মোহাম্মদ এ আরাফাতের জন্য। এমনিতেই ৫ মাসের জন্য এমপি হওয়াটা গৌরবের কিছু নয়। তারমধ্যে ভোট পেয়েছেন মোট ভোটারের মাত্র ৯ ভাগের মতো। সেই অগৌরবের জয়কে কলঙ্কিত করে দিলো তার দলেরই কিছু অতি উৎসাহী সমর্থক। আরাফাতের মতো একজন শিক্ষিত, সজ্জন, যুক্তিবাদী মানুষের জন্য এটা বড্ড বেদনার।
লেখক: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ