আমরা আসলে দুর্ভাগা। অসুখ-বিসুখ আমাদের পিছু ছাড়ে না। ভয়াবহ করোনাভাইরাস দুই বছর বাংলাদেশসহ গোটা বিশ্বকে কাঁপিয়ে দিয়ে এখন কিছুটা শান্ত হয়েছে। আমরা ভেবেছি, যাক এবার তাহলে একটু স্বস্তি মিলবে। কিন্তু আমাদের দশা হয়েছে জলে কুমির, ডাঙ্গায় বাঘ। করোনার ভয়াবহতা কমার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয়েছে ডেঙ্গুর উৎপাত। করোনাভাইরাস আসার পর স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে প্রতিদিন একটা আপডেট বুলেটিন প্রকাশ করা হয়। তাতে করোনায় মৃত্যু, আক্রান্তের সংখ্যা, আক্রান্তের হারসহ নানা পরিসংখ্যান থাকে। গণমাধ্যম প্রতিদিন সে আপডেট বুলেটিন প্রকাশ করে। তবে ইদানীং স্বাস্থ্য অধিদফতরের বুলেটিনে যুক্ত হয়েছে ডেঙ্গুর পরিসংখ্যান। এখন ডেঙ্গুতে মৃত্যু আর আক্রান্তের সংখ্যা থাকে। গণমাধ্যমেও করোনাকে হটিয়ে ডেঙ্গু দখল করে নিয়েছে অনেকটা জায়গা।
পরিসংখ্যান আসলে খুব নিষ্ঠুর একটা বিষয়। ‘গত ২৪ ঘণ্টায় আরও ১৯ জনের মৃত্যু’, এটা আসলে ডেঙ্গুর ভয়াবহতা বোঝার জন্য যথেষ্ট নয়। পরিসংখ্যানে মৃত্যু একটা সংখ্যামাত্র। মৃত্যুর সংখ্যা আগের দিনের সংখ্যার সঙ্গে যোগ করে নেওয়া হয় শুধু। চলতি মৌসুমে মৃত্যুর সংখ্যা ২০০ ছাড়িয়েছে আগেই। ২০০ মানে কারও কারও কাছে নিছক সংখ্যা। কিন্তু ২০০ মৃত্যু মানে কিন্তু ২০০ পরিবারের কান্না, ২০০ পরিবারের হাহাকার। আর শুধু মৃত্যু কেন, একজন ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী একটি পরিবারকে কী পরিমাণ উৎকণ্ঠায় ফেলে, তার হাজার হাজার উদাহরণ এখন ঘরে ঘরে।
গত বুধবার ভোরে ছয় দিন ধরে ডেঙ্গু আক্রান্ত সাত বছরের শিশু কন্যা আদিবাকে নিয়ে মুগদা জেনারেল হাসপাতালে গিয়েছিলেন হাবিবুর রহমান ও সাথী আক্তার দম্পতি। গিয়ে প্রথমে রুমে ডাক্তার পাননি। ডাক্তার তখন ঘুমাচ্ছিলেন। ডেকে আনার পর ঘুম ঘুম চোখে ডাক্তার জানিয়ে দেন আসন খালি নেই। তাতে হাবিবুর রহমান ডাক্তারের সঙ্গে বিতণ্ডায় জড়ান। পরে ডাক্তার ও ওয়ার্ড বয় মিলে হাবিবুর রহমানের ওপর হামলা করে। হাবিবুর রহমানও পাল্টা আঘাত করেন। তাতে ডাক্তার বনি আমিনের আঙুল ভেঙে যায়। তিনি মুগদা থানায় মামলা করলে পুলিশ হাবিবুর রহমানকে ধরে নিয়ে যায়। হাবিবুর রহমান হাসপাতালে গিয়েছিলেন অসুস্থ কন্যার চিকিৎসা করাতে। চিকিৎসা তো দূরের কথা, আসনও পাননি। যেতে হলো হাজতে। অসুস্থ কন্যা আদিবাকে নিয়ে সাথী আক্তারের শুরু হয় থানা-পুলিশে দৌড়ঝাঁপ।
কোনও পরিস্থিতিতেই একজন মানুষ আরেকজন মানুষের গায়ে হাত তুলতে পারেন না। কিন্তু একবার ভাবুন, প্রিয় সন্তান জ্বরে কাতর। হাসপাতালে গিয়ে আসন পাচ্ছেন না। কেমন লাগবে আপনার। আমি কঠোরভাবে আইন মেনে চলা মানুষ। কিন্তু হাবিবুর রহমানের জায়গায় থাকলে আমি কতটা নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারতাম জানি না।
আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার হাজারটা অনিয়ম। কিন্তু সবকিছুর সামনে থাকেন ডাক্তাররা। আমাদের সব রাগ গিয়ে তাই পড়ে অসহায় ডাক্তারদের ওপরই। মারামারিটা তাই আমরা ডাক্তারদের সঙ্গেই করি। এই অব্যবস্থাপনার জন্য আসলে যারা দায়ী তাদের আমরা চিনিই না, টিকিটির নাগালও পাই না। হাসপাতালে আসন না থাকলে ডাক্তার তো তার বাড়ি থেকে আসন আনতে পারবেন না। কিন্তু চোখের সামনে একজন অসহায় রোগীকে ফিরিয়ে দেওয়াটাও কোনও কথা নয়। তারচেয়ে বড় কথা হলো হাসপাতালের যতই সীমাবদ্ধতা থাকুক, একজন ডাক্তারকে অবশ্যই মানবিক হতে হবে। এটাও বুঝি দিনভর শত শত রোগীর চাপ সামলাতে সরকারি হাসপাতালগুলোর ডাক্তারদের মধ্যে একটা রোবোটিক ভাব চলে আসে। তাদের আবেগ-অনুভূতি একটু ভোঁতা হয়ে যায়। মৃত্যু তাদের কাছে পরিসংখ্যান হয়ে যায়। হাবিবুর রহমানের সঙ্গে যে ডাক্তারের মারামারি হয়েছে, তার সন্তান আছে কিনা আমি জানি না। তিনি যদি পুরো বিষয়টা সংবেদনশীলতার সঙ্গে ম্যানেজ করতেন, তাতে হয়তো বিষয়টি অত দূর গড়াতো না। সেই ডাক্তার যদি নিজেকে একবার হাবিবুর রহমানের জায়গায় দাঁড় করাতেন, সেই অসুস্থ শিশুর মুখে যদি নিজের সন্তানের ছবি দেখতেন; তাতে কোনোভাবেই তিনি হাবিবুর রহমানকে পুলিশের হাতে তুলে দিতে পারতেন না। আবারও বলছি, কোনও পরিস্থিতিতেই কারও গায়ে হাত তোলা সমর্থনযোগ্য নয়। কিন্তু পরিস্থিতি বিবেচনায় হাবিবুর রহমানকে ক্ষমা করে দেওয়া উচিত ছিল। মামলা করলেও অন্তত সন্তানের চিকিৎসা শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাকে গ্রেফতার না করলেও চলতো। ডাক্তারের ওপর হামলা যতটা বেআইনি, একজন অসহায় পিতাকে কারাগারে পাঠানো তারচেয়ে অনেক বেশি অমানবিক। আইনের তবু নানা সীমাবদ্ধতা আছে, মানবিকতার তো কোনও সীমা-পরিসীমা নেই।
অসুস্থ সন্তান চিকিৎসা না পেলে কারোরই হিতাহিত জ্ঞান থাকে না। কিন্তু ডাক্তারকে মেরে কোনও সমাধান হবে না। ডাক্তারের কাছ থেকে বড় জোর মানবিকতা আশা করা যায়, সমাধান নয়। কিন্তু বনি আমিন যদি মানবিক না হন, আমরা তো জোর বরতে পারবো না। বেহাল স্বাস্থ্য ব্যবস্থার হাল ফেরাতে চাই সামগ্রিক উদ্যোগ। দেশবাসীকে ডেঙ্গুর ঝুঁকিতে রেখে যিনি সপরিবারে বেড়াতে যান, নিজের মন্ত্রণালয়ের প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণে যিনি কৌশলে লাভবান হতে চান; সেই স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে দিয়ে আর যাহোক, স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ঠিক হবে না। বনি আমিনরা মার খাবে, হাবিবুর রহমানরা হাজত খাটবে, সাথী আক্তাররা ব্যাকুল হবে, আদিবারা চিকিৎসা পাবে না; এটাই এখন বাস্তবতা।
একদিন পরই হাবিবুর রহমান জামিন পেয়েছেন। আইন হাতে তুলে নিয়েছেন, সাজা পেয়েছেন। কিন্তু এই একদিনে এই পরিবারটির ওপর দিয়ে কী সাইক্লোন বয়ে গেলো, ভাবুন একবার। সন্তান অসুস্থ, স্বামী হাজতে, সন্তানকে রাখার মতো কেউ নেই। অসুস্থ সন্তানকে নিয়েই থানায় দৌড়াদৌড়ি করতে হচ্ছে সাথী আক্তারকে। ভাবা যায়!
তবু আমরা সাথী আক্তারের অসহায়ত্বের কথা ভাবছি। এই ঘটনায় ডাক্তার বনি আমিন ও হাবিবুর রহমানের পক্ষে-বিপক্ষেও অনেক যুক্তি দেওয়া যাবে। কিন্তু আমরা একবারও আদিবার কথা ভাবছি না। সাত বছরের শিশু আদিবার তো জ্বর হলে চিকিৎসা পাওয়ার অধিকার আছে। কিন্তু তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে পারিনি। উল্টো তার পুরো পরিবারের ওপর ঝড় বইয়ে দিয়েছি। সেই ঝড়ের ধকল সবচেয়ে বেশি পোহাতে হয়েছে আদিবাকে। আমাদের, মানে আমাদের সবার উচিত আদিবার কাছে ক্ষমা চাওয়া– ‘মা আদিবা, আমরা তোর প্রাপ্য চিকিৎসা দিতে পারিনি, অসুস্থতার সময়ে বাবাকেও তোর পাশে রাখতে পারিনি। পারলে আমাদের ক্ষমা করে দিস।’
লেখক: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ