তিস্তা চুক্তি ত্বরান্বিত করতে সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি

বাংলাদেশ ও ভারত একে অপরের সঙ্গে তাদের সীমান্তবর্তী দেশগুলোর মধ্যে দীর্ঘতম সীমান্ত ভাগাভাগি করে। ফলে অর্থনীতি, রাজনীতি, বাণিজ্য, চিকিৎসা ও যোগাযোগসহ নানা বিষয়ে দুই দেশের একে অন্যের প্রতি ঐতিহাসিক নির্ভরশীলতার সম্পর্ক রয়েছে। গত ১৫ বছরে ভারত-বাংলাদেশ কূটনৈতিক সম্পর্ক সবচেয়ে ভালো সময় অতিক্রম করছে বলে মনে করা হয়। এ সময় দুই দেশের মধ্যে ছিটমহল বিনিময়, ট্রানজিট-ট্রান্সশিপমেন্ট চুক্তি, সীমান্তে হত্যা ও চোরাচালান বন্ধ, কুশিয়ারা ও ফেনী নদীর পানিবণ্টনের মতো বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য চুক্তি সম্পাদিত হলেও দীর্ঘদিনের আলোচিত তিস্তা সমস্যার কোনও সমাধানে পৌঁছাতে পারেনি। তবে সর্বশেষ গত ২৬ জুলাই ভারতের পররাষ্ট্র বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটি বাংলাদেশের সঙ্গে তিস্তার পানিবণ্টন সমস্যা দ্রুত সমাধানের জন্য কেন্দ্রীয় সরকারকে অনুরোধ করেছে।

ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের মোট ৫৪ টি আন্তসীমান্ত নদী রয়েছে। এগুলোর মধ্যে আটটি নদীর পানিবণ্টন নিয়ে দীর্ঘদিন থেকে আলোচনা চলে এলেও শুধু গঙ্গা নদীর পানিবণ্টন ছাড়া অন্য কোনোটিরই সমাধান হয়নি। বর্তমানে তিস্তা ছাড়াও আরও ছয়টি নদী- মনু, মুহুরী, গোমতী, খোয়াই, ধরলা ও দুধকুমারের পানিবণ্টন চুক্তি ঝুলে আছে। তবে তিস্তা সমস্যার সমাধান না হওয়ায় অন্যগুলোর আলোচনাও থমকে আছে।

কিন্তু ভারত বর্তমানে অমীমাংসিত এ সমস্যা সমাধানের মাধ্যমে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়ন করতে চায়, যা সংসদীয় কমিটির সুপারিশে স্পষ্ট। সেখানে বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও উন্নত করতে সরকারকে স্থবির হয়ে থাকা তিস্তার পানিবণ্টন সমস্যা দ্রুত সমাধানে জোর দেওয়া হয়েছে। মূলত ২০২৪ সালে আসন্ন বাংলাদেশ ও ভারতের জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দুই প্রতিবেশীই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরেকটু ঝালাই করে নিতে চাইছে। কিন্তু সেটি কতখানি সম্ভব হবে তা কেবল সরকার তিস্তা নিয়ে কতটা আগ্রহী তার ওপর নির্ভর করবে।

তবে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার ও কেন্দ্রীয় সরকারের মধ্যকার মতবিরোধই তিস্তা সমস্যাটি থমকে থাকার প্রধান কারণ। ২০১১ সালে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের বাংলাদেশ সফরকালে তিস্তা চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার দ্বারপ্রান্তে থাকলেও শেষ পর্যায়ে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরোধিতায় তা পণ্ড হয়ে যায়। সেই থেকে কেন্দ্রীয় সরকারে রদবদল হয়ে বিজেপি মসনদে বসলেও তিস্তা চুক্তির একবিন্দুও অগ্রগতি হয়নি।

কিন্তু পররাষ্ট্র বিষয়ক সংসদীয় কমিটির এই সুপারিশটি যথেষ্ট গুরুত্ব পাওয়ার কারণ, এই কমিটিতে লোকসভা ও রাজ্যসভার যেসব সদস্যরা রয়েছেন তারা শাসক দল ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্য। স্ট্যান্ডিং কমিটির প্রধান প্রেমপ্রকাশ চৌধুরী বিজেপির সংসদ সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী। এছাড়াও কমিটিতে আছেন সাবেক কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কংগ্রেসের পি চিদাম্বরম, পশ্চিমবঙ্গ তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বদলীয় সাধারণ সম্পাদক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাইপো অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, বিজেপি সংসদ সদস্য স্বপন দাশগুপ্তাসহ লোকসভা ও রাজ্যসভার আরও ২৭ জন সংসদ সদস্য। লক্ষণীয় হলো, কোনও দলের সদস্যই স্ট্যান্ডিং কমিটির এই সুপারিশের বিরোধিতা করেনি। অর্থাৎ তিস্তা সমস্যার আশু সমাধানে যে ভারতের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও এক ধরনের আগ্রহ রয়েছে তা স্পষ্ট।

আগামী সেপ্টেম্বরে জি-২০ সম্মেলনে ভারত সফর করবেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। গত বছর সেপ্টেম্বরে ভারত সফরের ঠিক ১ বছর পর এবং বাংলাদেশের নির্বাচনের আগে এটিই তার সর্বশেষ ভারত সফর। এ সফর তাই দুই দেশের জন্যই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ সফরের সফলতার দিকে তাই বাংলাদেশের জনগণের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি থাকবে। বাংলাদেশের জন্য এ সফরের প্রধান সফলতাই হতে পারে তিস্তা সমস্যার সমাধান। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের যেহেতু বাংলাদেশের আগামী নির্বাচন নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে, তাই এটি তাদের জন্যও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন দলভেদে ভারত-বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক কূটনীতির গতি-প্রকৃতি ভিন্নরকম হয়ে থাকে। ভারতে বিজেপি ও বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের শাসনামলে ভারত জলপথ, স্থলপথ ও রেলপথে ট্রানজিট সুবিধা পেয়েছে। চট্টগ্রাম ও মংলা সমুদ্রবন্দর ব্যবহার করে ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা পেয়েছে। যার ফলে ভারতের উত্তর-পূর্বের রাজ্যগুলোতে যোগাযোগ ও পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা অনেক সহজ হয়েছে। মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে ভারতের অনুন্নত এই অঞ্চলে মাত্র কয়েক বছরেই অভূতপূর্ব উন্নয়ন হয়েছে। ভারত এখন এই ট্রানজিট রুটগুলোর পূর্ণ সুফল পেতে সড়ক ও অবকাঠামো উন্নয়নে বিনিয়োগ করছে।

এছাড়াও বাংলাদেশের প্রচেষ্টায় উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিচ্ছিন্নতাবাদীরা আর বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলে আশ্রয় নিতে পারে না। ভারতের এ অঞ্চলটি এখন সন্ত্রাসবাদীদের কবল থেকে রক্ষা পেয়ে দীর্ঘদিন যাবৎ স্থিতিশীল রয়েছে, যার সম্পূর্ণ অবদান বাংলাদেশের। ফলে ভারতের এ অঞ্চলে স্থিতিশীলতার জন্য তাদের পাশে বাংলাদেশকে প্রয়োজন। কিন্তু উভয়ের মাঝখানে ঝুলে আছে তিস্তা সমস্যা। এ সমস্যার সমাধান হলে তা বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের বিরাট সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হবে। দীর্ঘদিনের একটি সমস্যা সমাধানের মাধ্যমে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উন্নতি ও ভবিষ্যৎ সহযোগিতার পথ সুগম করে বাংলাদেশের জনগণের আস্থা অর্জন করতে পারলে তা ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের জন্যও একটি অর্জন হয়ে থাকবে। মোদি সরকারের কূটনৈতিক সফলতা ভারতের জনগণের মধ্যে ইতিবাচক ধারণা তৈরি করবে।

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে আলোচনা ছাড়াই তিস্তা চুক্তিতে সম্মত হওয়ায় কেন্দ্রীয় সরকার তখন মমতার তোপের মুখে পড়ে। মমতার বিরোধিতার মূল যুক্তি ছিল তিস্তার পানি ভাগাভাগি করলে উজানে পশ্চিমবঙ্গের কৃষকেরা পানি সংকটে পড়বে। তবে এটির পেছনে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিই বড় কারণ বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। কিন্তু মমতার এই অবস্থান থেকে সরে আসার সময় এসেছে। কারণ, পশ্চিমবঙ্গ বাংলাদেশের সবচেয়ে নিকটতম রাজ্য হওয়ায় এবং ভাষা ও সাংস্কৃতিক সাদৃশ্যের কারণে দুই বাংলার মানুষের মধ্যে ঐতিহাসিকভাবেই সুসম্পর্ক রয়েছে। তাই বাংলাদেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ঘটনাবলির প্রভাব সরাসরি পশ্চিমবঙ্গের ওপর পড়ে। ফলে বাংলাদেশের সঙ্গে রাজ্য সরকারের সম্পর্ক সেখানকার জনমনেও প্রভাব বিস্তার করে। অন্যদিকে তিস্তার পানি আটকে রেখে এর পূর্ণ ব্যবহারও নিশ্চিত করতে পারেনি পশ্চিমবঙ্গ সরকার। ৯ লক্ষাধিক কৃষককে সেচের আওতায় আনার জন্য প্রকল্প হাতে নিলেও তার ১০-১৫ শতাংশের বেশি পূরণ করতে পারেনি এই প্রকল্প। রাজ্য সরকারের আগ্রহ থাকলেও কেন্দ্রীয় সরকারের অর্থায়নের অভাবে এর সুফল পশ্চিমবঙ্গের নাগরিকেরাও পায়নি। বরং গজলডোবাসহ একাধিক ব্যারাজের ফলে পলি জমে তিস্তার ভারতীয় অংশেও নাব্য সংকট তৈরি করেছে। ফলশ্রুতিতে সেখানকার নাগরিকদের মধ্যেও বাঁধবিরোধী আন্দোলন তৈরি হয়েছে।

তাছাড়া মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রথম দুই মেয়াদে রাজ্যে তৃণমূল কংগ্রেসের যে প্রতিপত্তি ও জনপ্রিয়তা ছিল তাতে বিজেপি ভাগ বসাতে শুরু করেছে। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচন ও লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির উত্থানে যা স্পষ্ট হয়। এ নির্বাচনে তৃণমূলের ২১৫টি আসনের বিপরীতে বিজেপি ৭৭টি আসন পেয়েছে, যা ২০১৬ সালে ছিল মাত্র ৬টি। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে ৪২টি আসনের মধ্যে বিজেপি পেয়েছিল ১৮টি আসন, যা আগে ছিল মাত্র ২টি। অর্থাৎ এ ফলাফল থেকে স্পষ্ট হয় যে বাংলাদেশকে তিস্তার পানির ভাগ না দিয়েও নিজের দিকে ভোটব্যাংক টানতে পারেনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

এমনকি তিস্তা অববাহিকার জলপাইগুড়ি, কালিম্পং ও  দার্জিলিং জেলার ১৩ আসনের মধ্যে মাত্র ৩টি তৃণমূলের দখলে। এ ফলাফল থেকে বোঝা যায়, তিস্তার পানিবণ্টন আটকে রেখে সেখানকার জনগণের আস্থা ধরে রাখতে পারেনি তৃণমূল সরকার।

ফলে এই মুহূর্তে কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে আলোচনার মধ্য দিয়ে তিস্তা চুক্তি ত্বরান্বিত করার মাধ্যমে দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা নিরসন করতে পারলেই তা উভয়ের জন্যই কৃতিত্বের। ২০১১ সালে মনমোহন সিংয়ের বিরুদ্ধে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অভিযোগ করেছিলেন তিস্তা চুক্তির ব্যাপারে তার সঙ্গে আলোচনা করেনি কেন্দ্র। ফলে কেন্দ্র সরকারের উচিত তিস্তা সমস্যার টেকসই সমাধানের প্রক্রিয়ায় রাজ্য সরকারকে অন্তর্ভুক্ত করা ও আলোচনা চলমান রাখা। তবে বিশ্লেষকরা মনে করেন, তিস্তা নিয়ে যথেষ্ট গবেষণারও ঘাটতি রয়েছে, যা তিস্তা সমস্যা প্রলম্বিত হওয়ার আরেকটি কারণ। যথাযথ গবেষণার মাধ্যমে তিস্তার নাব্য, পানি প্রবাহের হার প্রভৃতি তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের মাধ্যমেই একটি দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি বাস্তবায়ন সম্ভব।


লেখক: পিএইচডি গবেষক, বস্টন ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাজ্য