এবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরের পর বাংলাদেশের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ছবি খুব ভাসছে। ছবিতে দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশের একটি ম্যাপ ঢাকা ভারতের জাতীয় পতাকায়। এর মধ্য দিয়ে একটি ট্রেন চলছে। ছবিটির বার্তা নিশ্চয়ই এখন আর বলার অপেক্ষা রাখে না। ন্যূনতম বোধসম্পন্ন মানুষও ধরতে পারবেন যে এখানে বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে ভারতীয় ট্রেন চলাচলের বিষয়টিকে কটাক্ষ করা হয়েছে। কারণ এবারের সফরে ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে হওয়া ১০ সমঝোতা স্মারকের ৬ নম্বরটি হচ্ছে দুই দেশের মধ্যে রেল সংযোগ সমঝোতা সংক্রান্ত।
এই রেল চলাচল কটাক্ষ করে আরও কয়েকটি ছবি চোখে পড়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। এর বেশিরভাগ করা হয়েছে সাপ জড়িয়ে। বোধকরি সাম্প্রতিক রাসেল ভাইপার নিয়ে দেশময় যে ভাইরালিজম, এরই প্রভাব এসব ছবিতে। সম্ভবত ভারতের সঙ্গে রেল যোগাযোগ কতটা ভয়ংকর হতে পারে তা ছড়ানোর জন্যে তারা বিষাক্ত সাপের ওপর ভর করেছেন। অবশ্য ভারত সফর থেকে দেশে ফেরার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলনে তারই এক কথায় এই সাপ-চিন্তকদের জবাব হয়ে গেছে।
ওই সংবাদ সম্মেলনে এক সাংবাদিক প্রধানমন্ত্রীকে প্রশ্ন করেন, রাসেল ভাইপার প্রতিরোধে সরকারের কোনও ব্যবস্থা আছে কিনা? তিনি তখন সবাইকে সাবধান থাকতে বললেন। পাশাপাশি এও বললেন, ক্ষতি না করলে সাপ বিপদজনক নয়। এদিক দিয়ে বিপদজনক হচ্ছে মানুষ।
প্রধানমন্ত্রী খানিকটা হাস্যরসের মধ্যে কথাটা বললেও বিষয়টি আসলেই খুবই অপ্রিয় সত্য। আসলেই আমরা মানুষেরা কোনও কারণ ছাড়াই অন্য মানুষের ক্ষতি করি। যাহোক কথা বলছিলাম বাংলাদেশ-ভারত ট্রেন চলাচল বিষয়ক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রতিক্রিয়া নিয়ে। এখন রাজনৈতিক দলের প্রতিক্রিয়ায় আসি, রাসেল ভাইপার টেনে না আনলেও এ নিয়ে খুবই উদ্বেগ জানিয়েছেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। তিনি বলেছেন, এই রেল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের চাবিকাঠি ভারতের কাছে দেওয়া হবে, যারা বাংলাদেশের জনগণের প্রতি বৈরী মানসিকতা পোষণ করে।
বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের চাবিকাঠি! শুনতেই আবার ওই ভারতীয় পতাকায় ঢাকা ম্যাপের কথা মনে পড়লো। আমি বলছি না যে এই কল্পনা ছড়ানোর সঙ্গে রিজভী সাহেব বা তার দল জড়িত। কিন্তু কীভাবে যেন কথা ও ছবি মিলে যায়। অবশ্য অনেক দিন ধরেই দেশ গেলো বা দেশ বিক্রি হওয়ার গল্প আমরা শুনতে পাচ্ছিলাম না। গত সংসদ নির্বাচনের আগে থেকে আবার শোনা যাচ্ছে। এবার প্রধানমন্ত্রীর সফরে রেল সমঝোতা এমওইউর পর এই ‘জিগির’ আরেক দফা বাড়লো। এবি পার্টি নামে নতুন আরেকটি রাজনৈতিক দল দেখলাম একই সুরে কথা বলছে। দেশের সব মানুষই জানে এবি পার্টি আরেক ভারতবিরোধী শিবির জামায়াতে ইসলামিরই ভগ্নাংশ।
আমাদের রাজনীতিতে ভারতবিরোধী সুর নিয়ে আমার কোনও মাথা ব্যথা নেই। কারণ এটা আমাদের অনেক পুরনো ‘ট্যাবু’। এই চিন্তার সঙ্গে দেশ ভাগ এবং ধর্মের মতো কিছু মসলা মিশিয়ে একটা শ্রেণি রাজনীতি করছে দীর্ঘদিন। এর সঙ্গে তারা যেটা মেশায় না সেটা হচ্ছে যুক্তি। আমার ধারণা এটা তারা খুব সচেতনভাবেই করে। ভারত-বিরোধিতা ছেড়ে দিলে তাদের আর কিছুই থাকে না। বলা যায়, এটা তাদের টিকে থাকার অবলম্বন। কারণ এটা ছাড়া তারা আর কিছু শেখেইনি। যাহোক, তাদের কাজ তারা করবেন এবং নিজেদের চিন্তা ছড়াতে সর্বোচ্চ কৌশল করবেন এটা খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু আমার প্রশ্ন হচ্ছে, এর শেষ কোথায়?
সেই কবে ব্রিটিশ বন্ধুরা ডিভাইড অ্যান্ড রুলের ফ্রেমে ধর্মীয় ইস্যু তুলে রাজনীতি শিখিয়ে গেলো, আর আমরা সেটা ভুললামই না। বিরোধিতার সুর বেজেই যাচ্ছে। নিজের রাজনীতির অবকাঠামো বদলাতেই পারলাম না। অথচ সারা পৃথিবীর মানুষ আজ প্রগতির দিকে। যে যেখানে ছিল সেখান থেকেই প্রগতিমুখী হচ্ছে। প্রগতি বলতে আমি বুঝি মানুষমুখী রাজনীতি। বুঝি বেশি বেশি মানুষের মঙ্গলের কথা। এই উপমহাদেশে কোনও কোনও দল, এরইমধ্যে নিজের রাজনীতি ঠিক রেখে মানুষের কথা বলার আলাদা জানালা খুলেছে। কিন্তু আমাদের দেশের বেশিরভাগ দল সেটা পারলো না।
বাংলাদেশের কয়েকটি রাজনৈতিক দল জাতীয় কবি নজরুলের কবরে গিয়ে রাজনীতি করে, কান্নাকাটি করে, খানিকটা মিথ্যাচারও করে। নিরক্ষর লোকজনের মধ্যে লেখা চুরি করে নোবেল পাওয়ার গল্পও ছড়ায়। আজ জাতীয় কবির জন্য আমার খুব মন খারাপ হয়, আহা কী সেই অমোঘ বাণী!“ বিশ্ব যখন এগিয়ে চলেছে, আমরা তখনও বসে- বিবি তালাকের ফতোয়া খুঁজেছি, ফিকাহ ও হাদিস চষে”।
তিনি দ্রোহের কবি, মুক্তির কবি, অসাম্প্রদায়িকতার কবি, অথচ তাকে আমরা কেউ কেউ অনায়াসে বিশেষ ধর্মের কবি বানিয়ে ফেললাম। তাঁর দর্শন চাদরে ঢেকে রাজনীতি করলাম অথচ তাঁর চিন্তার প্রতি সম্মান দেখালাম না। সেই গোষ্ঠী এখন যদি, আজকের আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থার পৃথিবীতে, এক দেশ থেকে আরেক দেশে ট্রেন চলাকে বলে সার্বভৌমত্ব হারিয়ে যাচ্ছে, দুঃখ না পেয়ে উপায় কী?
আজকের এগিয়ে যাওয়া বিশ্বের কথা যখন বললামই, তখন একটু দেখে নিতে পারি কী হচ্ছে সারা বিশ্বে? ২০১৭ সাল থেকে চীন থেকে লন্ডন যাচ্ছে যাত্রীবাহী ট্রেন। ২০১৩ সালে তাদের ইয়ু স্টেশন থেকে প্রথম পণ্যবাহী ট্রেন ছেড়ে যায় জার্মানির হাম্বুর্গে। ইউরোপের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্যের উন্নয়ন ও বিনিয়োগ বাড়াতে এ সার্ভিস শুরু করেছে চীন। এরইমধ্যে মাদ্রিদ, হাম্বুর্গসহ ইউরোপের বেশ কিছু শহরে মালবাহী ট্রেন সার্ভিস শুরু করেছে তারা। ১২ হাজার কিলোমিটার রেলপথ পাড়ি দেওয়ার অভিজ্ঞতা হচ্ছে বেইজিংয়ের। ট্রেন যোগাযোগের নতুন এই পথকে বলা হচ্ছে ‘নিউ সিল্ক রুট’। চীন থেকে কাজাখস্তান, রাশিয়া, বেলারুশ, পোল্যান্ড, জার্মানি, বেলজিয়াম ও ফ্রান্স হয়ে পূর্ব লন্ডনের মালবাহী ট্রেনের স্টেশন বার্কিংয়ে পৌঁছাচ্ছে। এছাড়া ইউরোপ আফ্রিকার দেশগুলোর মধ্যে অবাধ ট্রেন যোগাযোগের গল্প তো বিশ্বস্বীকৃত।
এখন সেই স্বপ্নের সিল্করুটে যুক্ত হওয়ার স্বপ্ন দেখছে বাংলাদেশও। যে স্বপ্নের সঙ্গে বাংলাদেশ যুক্ত করতে চায় তার প্রতিবেশী দেশগুলোকেও। এরইমধ্যে নির্মিত পদ্মা সেতুর মাধ্যমে এশিয়ার রেলপথের সবচেয়ে বড় প্রকল্প ট্রান্স এশিয়ান রেলওয়ের স্বপ্নও পূরণ হচ্ছে। এই কাজ পুরোপুরি বাস্তবায়ন হলে এশিয়ার ২৮টি দেশের সঙ্গে রেল যোগাযোগব্যবস্থা চালু হবে। এখন সিঙ্গাপুর থেকে ইউরোপে ট্রেন যেতে পারে পদ্মা সেতু হয়েই। দেশের দক্ষিণাঞ্চলকে ট্রান্স-এশিয়ান হাইওয়ে এবং ট্রান্স-এশিয়ান রেলওয়ের সঙ্গেও যুক্ত করবে এই সেতু। আর এই নেটওয়ার্ক চালু হলে ভারত, ভুটান ও নেপালে সরাসরি যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের দুয়ার খুলছে।
ভারতের সঙ্গে সাম্প্রতিক রেল চলা বিষয়ক এমওইউকে নানান জনে নানান নামে ডাকছে। ট্রানজিট, ট্রান্সশিপমেন্ট, করিডোর নানান নাম। আসলে একে একটি আন্তর্জাতিক রেল চলাচল বিষয়ক সমঝোতা বললেই সব কূল রক্ষা হয়। কারণ এই প্রক্রিয়া ভবিষ্যতে আরও বাড়তে থাকবে। কিন্তু এই বিষয়টি আমাদের অনেকেই কেন যেন মানতেই পারছেন না? সরকারের যেকোনও পদক্ষেপের সমালোচনা থাকতেই পারে। আমি একধাপ এগিয়ে বলতে চাই, সমালোচনা থাকাই উচিত। কারণ এতে চিহ্নিত হতে পারে নকশায় কোনও দুর্বলতা থাকছে কিনা? পরিবেশের কোনও ক্ষতি হচ্ছে কিনা? দেশ ন্যায্য পাওনাটা পাচ্ছে কিনা? এমনকি পুরো বিষয়টি আন্তর্জাতিক মানসম্মত হচ্ছে কিনা? সেটাই সভ্য সমালোচনা। কিন্তু এক্ষেত্রের সমালোচনা সেই পর্যায়ে যাচ্ছে না। কথাবার্তা আটকে যাচ্ছে সাপ ও ট্রেনের অনুকাব্যে।
লেখক: গণমাধ্যমকর্মী।