জনস্বাস্থ্য সংকট কেবল হাসপাতালেই শুরু বা শেষ হয় না। এসব সংকটের শিকড় পোঁতা থাকে মানুষের বসবাসের জায়গায়। যেমন, পাড়া-মহল্লা, গ্রাম ও জেলা পর্যায়ে, যেখানে মানুষ প্রতিদিন নিজের স্বাস্থ্য নিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়। অথচ জনস্বাস্থ্য বিষয়ক প্রচারণা প্রায়ই রাজধানী শহর থেকে শুরু হয় এবং নীতিপত্রে গিয়ে শেষ হয়। কিন্তু স্বাস্থ্য আচরণ পরিবর্তনের প্রকৃত কাজ ঘটে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু থেকে বহু দূরে- জেলা হাসপাতাল এবং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ধুলিধূসর করিডোরে, যেখানে কিছু অপ্রতুল সম্পদপ্রাপ্ত স্বাস্থ্য শিক্ষা কর্মী বিজ্ঞান ও সমাজের মাঝে সেতুবন্ধন গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। বাংলাদেশে এই ফ্রন্টলাইন কর্মীরাই স্বাস্থ্য ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু উপেক্ষিত স্তম্ভ। তাদের জন্য নেই পর্যাপ্ত সম্পদ, প্রশিক্ষণ বা প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা। জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে টেকসই করতে হলে, এই স্থানীয় পরিবর্তনের দূতদের শক্তিশালী করেই শুরু করতে হবে। আর তা না হলে এই অবহেলার খেসারত আমাদের চড়া দামেই দিতে হবে।
বৈশ্বিক স্বাস্থ্য নীতিনির্ধারকরা দীর্ঘদিন ধরেই প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা জোরদার ও সেবায় প্রবেশাধিকার বৃদ্ধির কথা বলে আসছেন। কিন্তু জনবিশ্বাস গড়ে তোলার মানবিক কাঠামো– যারা ব্যাখ্যা করেন, বোঝান এবং স্বাস্থ্য বার্তাগুলোকে বাস্তব কর্মকাণ্ডে রূপ দেন– তাদের প্রতি মনোযোগ দেওয়া হয়নি। বাংলাদেশে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সিভিল সার্জন কার্যালয়ের অধীন স্বাস্থ্য শিক্ষা কর্মীরা এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি: দায়িত্ব অনির্ধারিত, প্রশিক্ষণ সীমিত, বাজেট নেই বললেই চলে, আর প্রয়োজনীয় সরঞ্জামেরও অভাব। অথচ তাদের উপরই দায়িত্ব– কোটি মানুষকে শিশুদের টিকাদান, পরিবার পরিকল্পনা গ্রহণ, কিংবা মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা নিতে রাজি করানো।
কোভিড-১৯ মহামারির সময় স্বাস্থ্য যোগাযোগের গুরুত্ব নতুনভাবে সামনে আসে– বিশেষ করে বাংলাদেশে, যেখানে ভুল তথ্য, কুসংস্কার এবং সামাজিক কলঙ্ক বাস্তব তথ্যের চেয়ে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। মহামারির সময় জেলা পর্যায়ের কর্মকর্তারা স্বাস্থ্য বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া, গুজব প্রতিরোধ, এবং আচরণগত পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। কিন্তু তাদের এ কাজ ছিল প্রায় সম্পূর্ণই তাৎক্ষণিক প্রয়াস এবং ব্যক্তিগত উদ্যোগের ওপর নির্ভরশীল। অধিকাংশেরই স্বাস্থ্য শিক্ষায় কোনও আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ ছিল না, আবার প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, জনবল বা বাজেটের অভাবে তারা স্থায়ীভাবে জনসম্পৃক্ত হতে পারেননি।
এই সমস্যার কেন্দ্রে রয়েছে একটি কাঠামোগত ত্রুটি– জেলা পর্যায়ের সিভিল সার্ভিস কাঠামোর মধ্যে স্বাস্থ্য শিক্ষা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে অন্তর্ভুক্তই নয়। চিকিৎসক ও নার্সদের মতো স্বাস্থ্য শিক্ষকদের নেই কোনও নির্দিষ্ট পদ, নির্ধারিত বাজেট বা পেশাগত অগ্রগতির পথ। তারা বিচ্ছিন্নভাবে কাজ করেন– প্রায়ই একাধিক প্রশাসনিক দায়িত্ব সামলাতে হয়, অথচ জনস্বাস্থ্য যোগাযোগ, আচরণ বিজ্ঞান বা কমিউনিটি এনগেজমেন্ট বিষয়ে বিশেষায়িত প্রশিক্ষণের সুযোগ থাকে না। এটি কেবল স্থানীয় প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়; বরং এটি বৈশ্বিক স্বাস্থ্য কৌশলের একটি অন্ধকারাচ্ছন্ন দিক। দাতারা ডায়াগনস্টিক, ভ্যাকসিন ও অবকাঠামোতে বিপুল বিনিয়োগ করলেও, স্বাস্থ্য শিক্ষা থেকে যায় পাদটীকা হিসেবে। অথচ বহু বছরের গবেষণা বলছে– আচরণগত পরিবর্তন, শুধু চিকিৎসা সুবিধা নয়, স্বাস্থ্যফল উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি।
এর ফলাফল ভয়াবহ। বিশ্বাসযোগ্য, ধারাবাহিক এবং সাংস্কৃতিকভাবে প্রাসঙ্গিক স্বাস্থ্য শিক্ষার অভাবে টিকাদান, মাতৃস্বাস্থ্য থেকে শুরু করে মানসিক সুস্থতা পর্যন্ত জাতীয় স্বাস্থ্য লক্ষ্যগুলো স্থানীয় পর্যায়ে বাস্তবায়ন করা কঠিন হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশ যখন অ-সংক্রামক রোগের বিস্তার, অ্যান্টিবায়োটিক অপব্যবহার, ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত স্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, তখন এই তৃণমূল পর্যায়ের কার্যকর স্বাস্থ্য যোগাযোগ পূর্বের যেকোনও সময়ের চেয়ে জরুরি হয়ে উঠেছে।
তবে এটি কেবল বাংলাদেশের সমস্যা নয়। গ্লোবাল সাউথের বহু দেশেই বিকেন্দ্রীকরণ জনগণের কাছে সেবা পৌঁছে দিলেও, স্বাস্থ্য শিক্ষা থেকে যায় অবহেলিত ও বিচ্ছিন্ন একটি দায়িত্ব হিসেবে। ইউনিভার্সাল হেলথ কাভারেজ এবং ওয়ান হেলথ-এর মতো বৈশ্বিক স্বাস্থ্য কাঠামোগুলোকে স্বীকার করতে হবে– তথ্য ও যোগাযোগ অবকাঠামোর মতোই গুরুত্বপূর্ণ, এবং যারা এই বার্তা পৌঁছে দেয়, তাদের স্বীকৃতি ও সহায়তা প্রয়োজন।
বাংলাদেশে স্বাস্থ্য অধিদফরের অধীন স্বাস্থ্য শিক্ষা কর্মী কাঠামো প্রায় অনুপস্থিত। অনেক উপজেলাতেই স্বাস্থ্য শিক্ষার জন্য আলাদা কোনও জনবল নেই। যারা দায়িত্বে আছেন, তাদের নেই যোগাযোগ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ, উপকরণ তৈরির জন্য বাজেট বা দুর্গম এলাকায় যাওয়ার পরিবহন সুবিধা। অথচ তাদের ওপর দায়িত্ব রয়েছে টিবি থেকে শুরু করে ডেঙ্গুর মতো জলবায়ু-সংশ্লিষ্ট রোগ পর্যন্ত জনসচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো।
তাহলে কী করা যেতে পারে?
প্রথমত, বাংলাদেশে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে স্বাস্থ্য শিক্ষা কার্যক্রমকে প্রাতিষ্ঠানিক ও পেশাগত রূপ দিতে হবে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্য অফিসে স্বাস্থ্য শিক্ষা কর্মকর্তার জন্য আলাদা পদ সৃষ্টি করা যেতে পারে। নির্ধারণ করতে হবে এই পদের স্পষ্ট দায়িত্ব, প্রশিক্ষণ ও বাজেট। এসব কর্মীদের হাতে কেবল পোস্টার বা মাইক্রোফোন নয়, থাকতে হবে আচরণবিজ্ঞান, স্থানীয় সংস্কৃতি এবং ডিজিটাল যোগাযোগের বিষয়ে প্রশিক্ষণ।
দ্বিতীয়ত, স্থানীয় পর্যায়ে স্বাস্থ্য শিক্ষা কার্যক্রমের জন্য নির্ধারিত বাজেট রাখতে হবে। বাজেট ছাড়া সবচেয়ে দক্ষ কর্মীও কার্যকর হতে পারেন না। পরিবহন ভাতা, কমিউনিটি থিয়েটার কিংবা আইইসি উপকরণের জন্য সামান্য বিনিয়োগও জনসচেতনতা ও প্রতিরোধমূলক আচরণের দিক দিয়ে বড় রিটার্ন দিতে পারে।
চতুর্থত, স্বাস্থ্য শিক্ষাকে অন্যান্য সব সেবার সঙ্গে একীভূত করতে হবে– টিকাদান অভিযান থেকে শুরু করে দীর্ঘমেয়াদী রোগের ক্লিনিক পর্যন্ত। যাতে প্রতিটি রোগীর সঙ্গে যোগাযোগ হয় একটি শেখার সুযোগ। কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মী, নার্স এবং মিডওয়াইফদের সেবাদানকারী হিসেবে নয়, শিক্ষকের ভূমিকায়ও প্রস্তুত করতে হবে।
পঞ্চমত, বিশ্ববিদ্যালয় ও এনজিওদের সঙ্গে অংশীদারত্ব তৈরি করে দক্ষতা উন্নয়ন করা যেতে পারে। পাবলিক হেলথ ও মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগগুলো যৌথভাবে প্রশিক্ষণ মডিউল তৈরি করতে পারে– যেখানে প্রমাণভিত্তিক যোগাযোগ কৌশলের সঙ্গে যুক্ত হবে স্থানীয় গল্প বলার ধরন।
ষষ্ঠত, প্রযুক্তিকে একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। মোবাইলভিত্তিক স্বাস্থ্য প্রচারণা, কমিউনিটি রেডিও এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে ব্যাপক জনগণকে পৌঁছানো সম্ভব– যদি জেলা পর্যায়ের কর্মকর্তারা সেগুলো ব্যবহারে প্রশিক্ষিত এবং প্রস্তুত থাকেন।
সপ্তমত, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আনতে হবে। স্বল্পমেয়াদী সচেতনতামূলক প্রচারাভিযানের পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদী ‘ইকোসিস্টেম বিল্ডিং’ বা অবকাঠামো উন্নয়নকে গুরুত্ব দিতে হবে। জেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্য শিক্ষা কর্মীদের সহায়তা বৈশ্বিক স্বাস্থ্য বিনিয়োগের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে হবে।
ডিজিটালাইজেশন, স্কেলআপ আর উদ্ভাবনের দৌড়ে আমরা যেন মূল বিষয় ভুলে না যাই। স্বাস্থ্য কেবল ওষুধ বা নীতির মাধ্যমে পৌঁছায় না। এটি তৈরি হয় মানুষে মানুষে সম্পর্কের মাধ্যমে– যেখানে একজন কম বেতন পাওয়া স্বাস্থ্যশিক্ষক গ্রামবাসীদের সামনে দাঁড়িয়ে ব্যাখ্যা করেন কেন হাত ধোয়া জরুরি, কিংবা অ্যান্টিবায়োটিক কীভাবে কাজ করে। স্বাস্থ্য শিক্ষা কোনও বিলাসিতা নয়– এটি জনস্বাস্থ্য রক্ষার প্রথম সারির প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। যদি আমরা সত্যিকার অর্থে একটি টেকসই, জনগণকেন্দ্রিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়তে চাই, তাহলে আমাদের যাত্রা শুরু করতে হবে তাদের ক্ষমতায়নের মাধ্যমে– যারা স্বাস্থ্যসেবাকে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেন।
লেখক: জনস্বাস্থ্য ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ, সিনিয়র লেকচারার, মিডিয়া স্টাডিজ অ্যান্ড জার্নালিজম বিভাগ, ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশ (ইউল্যাব)।