লেখক ও সাংবাদিক আহমদ ছফাকে অনেকেই জনবুদ্ধিজীবী বলে আখ্যায়িত করে থাকেন। এই পদবি অযৌক্তিক নয়। কিন্তু আমার বিবেচনায় আহমদ ছফা’র বিশেষত্ব হলো, তিনি ছিলেন সময়ের সাহসী কণ্ঠস্বর। তিনি সময়কে ভালো পড়তে ও বুঝতে পারতেন। দিতে পারতেন ভবিষ্যতের দিশা। সামনের দিনগুলোতে কী ঘটতে যাচ্ছে তা অনেকের চাইতে অনেক আগেই টের পেতেন।
আহমদ ছফা খুব কাছ থেকে দেখেছেন বাঙালি জাতির আত্মপরিচয় অনুসন্ধানের আন্দোলন, ১৯৭১ সালের জনযুদ্ধ, শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক মঞ্চের মহানায়ক থেকে একনায়ক হয়ে ওঠা, পঁচাত্তরের রক্তাক্ত পালাবদল, সেনাশাসন, স্বৈরশাসন, গণতান্ত্রিক স্বৈরশাসন, এমনকি রাষ্ট্রযন্ত্রে এনজিওতন্ত্রের অশুভ আধিপত্য। প্রায় প্রতিটি বিষয়ে তিনি সাহসী সত্য উচ্চারণ করেছেন। যেহেতু ব্যক্তিগত জীবনে তিনি বেশ দরিদ্র ছিলেন, যেহেতু সরকারি বা দলীয় পদ-পদবির প্রতি তাঁর কোনও লোভ-লালসা বা আকাঙ্ক্ষা ছিল না- তাই তাঁর সত্য উচ্চারণ অনেক সময় কালোত্তীর্ণ বিশ্লেষণ হিসেবে আজও প্রাসঙ্গিকতা ধরে রেখেছে। এখনও একজন মনোযোগী পাঠক তাঁর চিন্তার সাথে মিল খুঁজে পান। সত্য বচনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হন।
আহমদ ছফা দীর্ঘদিন বাংলাদেশের বিভিন্ন সংবাদপত্র ও সাময়িকীতে নিবন্ধ লিখেছেন। যাতে তিনি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অনেক অজানা তথ্য, ঘটনা, প্রেক্ষাপট ও অনন্য বিশ্লেষণ তুলে ধরেছেন। জাতির সংকট ও দুর্যোগে তুলে ধরেছেন নিজের চিন্তা ও মতামত। যাতে অবধারিতভাবে এসেছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রসঙ্গ। ‘বাংলাদেশের রাজনৈতিক জটিলতা’- তাঁর একটি অনবদ্য প্রবন্ধ। যা রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, এমনকি সমসাময়িক ঘটনাপ্রবাহ বুঝতে অবশ্য পাঠ্য। লেখক আহমদ ছফা’কে সমীহ করার আরেকটি বড় কারণ হলো তাঁর সাহস। স্বাধীন বাংলাদেশে শেখ মুজিবুর রহমানের সাড়ে তিন বছরের কর্তৃত্বপরায়ণ শাসনামলে তিনি যে সত্য উচ্চারণ করেছিলেন তা ছিল অনবদ্য, অনেক ক্ষেত্রে দুঃসাহসী। আবার শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর তিনি যা লিখেছেন সেটাও এক কথায় অবিস্মরণীয়।
উত্তরণ নামের একটি সাপ্তাহিক পত্রিকাতে ১৯৯০ সালে ১৯-২৫ আগস্ট সংখ্যায় আহমদ ছফা ‘শেখ মুজিব: ইতিহাসের নিরিখে’ শিরোনামের একটি নিবন্ধ লিখেন। এই নিবন্ধে তিনি বাঙালি জাতি রাষ্ট্রের গঠন প্রক্রিয়ার ওপর আলোচনা করেছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন, বাংলাদেশ একটি ভাষাভিত্তিক জাতীয় রাষ্ট্র। ১৯৭৫ সালে শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর প্রত্যেক সরকার জাতীয় রাষ্ট্র পরিচয় পাশ কাটিয়ে নানা রকম পরিচয় চিহ্ন আবিষ্কার করতে চেষ্টা করেছেন। কিন্তু তার কোনোটিই ধোপে টেকেনি। আহমদ ছফা এই ভাষাভিত্তিক রাষ্ট্রে শেখ মুজিবুর রহমানকে তিনি বিশেষভাবে কৃতিত্ব দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, ‘আমার মনে হয় বাঙালি জাতি রাষ্ট্রের স্থপতি হিসেবে শেখ মুজিবুর রহমান সবচেয়ে বড় আসনটি অধিকার করে থাকবেন। যতই দিন যাবে বাঙালির জনগোষ্ঠীর ইতিহাসে শেখ মুজিবুর রহমান দীর্ঘতর ছায়া প্রসারিত করতে থাকবেন।’ (পৃষ্ঠা:১১, হারানো লেখা, খান ব্রাদার্স অ্যান্ড কোম্পানি)
শেখ মুজিবুর রহমানকে বাঙালি জাতি রাষ্ট্রের প্রধান কান্ডারি বলে মনে করলেও যৌক্তিক প্রেক্ষাপটে শেখ মুজিবুর রহমানের কড়া সমালোচনা করতে পিছপা হননি আহমদ ছফা। বিশেষ করে ২৫ মার্চ কালরাতের পর বাঙালির মুক্তি-সংগ্রাম পরিচালনা নিয়ে আওয়ামী লীগ ও শেখ মুজিবুর রহমানের পরিকল্পনাহীনতা ও কার্যকলাপ নিয়ে তিনি অত্যন্ত কড়া সমালোচনা করেছেন। যার প্রতিফলন পাওয়া যায় তাঁর ‘শেখ মুজিবুর রহমান’ শিরোনামের নিবন্ধে। যেটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৮৪ সালে। তিনি লিখেছেন ‘কি ছিলেন শেখ মুজিব- বীর? প্রতারক? অনমনীয় একগুঁয়ে, উচ্চাকাঙ্ক্ষী, চরম ক্ষমতালোভী একনায়ক?... বারবার শেখ মুজিবের ঐতিহাসিক ভূমিকাটি অনির্ণীত থেকে যাচ্ছে বলেই বাঙলার, বাঙালি জাতির ইতিহাসের পরিক্রমণ-পথটি ক্রমাগত ঝাঁপসা, অস্পষ্ট এবং কুয়াশাচ্ছন্ন হয়ে উঠছে।’ (পৃষ্ঠা:২১৫, নির্বাচিত প্রবন্ধ, মাওলা ব্রাদার্স)
আহমদ ছফা স্পষ্ট করে বলেছেন, ১৯৭১ সালে যে মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে এবং যার গর্ভ থেকে বর্তমানের স্বাধীন বাংলাদেশ ভূমিষ্ঠ হয়েছে, তার চরিত্রটিও নির্ধারণ করা প্রয়োজন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও শেখ মুজিবুর রহমানকে দুটো যমজ শব্দ হিসেবে আখ্যায়িত করলেও ১৯৭১ সালের চূড়ান্ত জনযুদ্ধে শেখ মুজিবুর রহমানের ভূমিকার কড়া সমালোচনা করতে কোনও কার্পণ্য করেননি আহমদ ছফা। তিনি লিখেছেন, ‘শেখ মুজিবুর রহমান এবং তাঁর দল আওয়ামী লীগ কারোরই এ প্রচণ্ড পরিস্থিতির মোকাবেলা করার ক্ষমতা ছিল না। ফল যা হবার তাই হয়েছে। বাংলাদেশের প্রতিরোধযুদ্ধ এবং মুক্তিসংগ্রাম পায়ে হেঁটে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে আশ্রয়যাত্রা করতে গেল, আর তেজোদ্দীপ্ত মুজিব পাকিস্তানের কারাগারে চলে গেলেন।’ (পৃষ্ঠা:২১৬, নির্বাচিত প্রবন্ধ, মাওলা ব্রাদার্স)
এছাড়া ১৯৭১ সালে চূড়ান্ত অসহযোগ আন্দোলনের সময় ইয়াহিয়া খানের সাথে শেখ মুজিবুর রহমানের আলোচনারও কড়া সমালোচক ছিলেন আহমদ ছফা। তিনি উল্লেখ করেছেন, ‘যুদ্ধ করার সংকল্প নিয়ে জেগে ওঠা জাতিকে যুদ্ধ করার প্রস্তুতির দিকে চালিত না করে, তিনি ইয়াহিয়া খানের সাথে আলোচনার পথ বেছে নিলেন। আলোচনার ছল করে ইয়াহিয়া খান পাকিস্তান থেকে নৌপথে, আকাশ পথে সৈন্য এনে ব্যারাক ভর্তি করে চরম মুহূর্তটির জন্য অপেক্ষা করছেন। পঁচিশে মার্চের রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী নিস্তব্ধ নিরস্ত্র জনগণের ওপর যখন ঝাঁপিয়ে পড়লো, দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে মার খাওয়া ছাড়া আর উপায় ছিল কি?’ (পৃষ্ঠা:২২৩, নির্বাচিত প্রবন্ধ, মাওলা ব্রাদার্স)
স্বাধীন বাংলাদেশে শেখ মুজিবুর রহমানের ভূমিকা নিয়েও অত্যন্ত কঠোর সমালোচনা করে গেছেন আহমদ ছফা। তিনি স্পষ্ট করে বলে গেছেন, পাকিস্তান থেকে ফেরার পর শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘ক্ষমতামনস্কতা’ পেয়ে বসেছিল। যা একসময় তাঁকে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী করে কর্তৃত্বের আসনে বসিয়েছিল। এই সময়টিকে অত্যন্ত কঠোরভাবে বর্ণনা করেছেন আহমদ ছফা। তিনি লিখেছেন ‘ এ কোন বাংলাদেশ? চারদিকে ধ্বংসের স্তূপ। বাতাসে রোদন-ধ্বনি, হত্যা-লুটপাট সমানে চলছে। আওয়ামী লীগের লোকেরা শবভুক শকুনের মতো সর্বত্র চক্কর দিয়ে বেড়াচ্ছে। কী করবেন শেখ মুজিব? তাঁর কী করার আছে? (পৃষ্ঠা:২২৭, নির্বাচিত প্রবন্ধ, মাওলা ব্রাদার্স)
স্বাধীনতা পরবর্তী প্রায় সাড়ে তিন বছরের শাসনামলের কড়া সমালোচনা হলেও শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যু আহমদ ছফাকে ব্যথিত করেছিল। যার প্রতিফলন পাওয়া যায় ‘তাঁর নাম শেখ মুজিবুর রহমান’ প্রবন্ধে। এটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৮৮ সালে। যা পরের বছর সংকলিত হয় ‘শেখ মুজিবুর রহমান ও অন্যান্য প্রবন্ধ’ গ্রন্থে। এই নিবন্ধে আহমদ ছফা স্পষ্ট করে বলেছেন, ‘শেখ মুজিবুর রহমান সমালোচনার ঊর্ধ্বে কোন ব্যক্তি নন। শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক জীবন ও কর্মের যত কঠোর সমালোচনাই করা হোক না কেন, তিনি যে এ সংগ্রামটিকে (মুক্তিযুদ্ধ) চূড়ান্ত পর্যায়ে প্রবাহিত করে নিয়েছিলেন সেটা একটা তর্কাতীত সত্য।’ (পৃষ্ঠা: ২৩০, নির্বাচিত প্রবন্ধ, মাওলা ব্রাদার্স)
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের হত্যাযজ্ঞকে নির্দেশ করে আহমদ ছফা প্রশ্ন তুলেছেন, ‘সেদিন একটি কণ্ঠও এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ করেনি।’ (পৃষ্ঠা: ২৩০, নির্বাচিত প্রবন্ধ, মাওলা ব্রাদার্স)
লেখক আহমদ ছফা শেখ মুজিব সম্পর্কে তাঁর অনেকটা স্পর্শকাতর বিশ্লেষণ তুলে ধরেছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন, আততায়ীর হত্যাযজ্ঞে শেখ মুজিবকে মুছে ফেলার সুযোগ নেই। শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যা তাদের কাছে মুক্তি-দিবস হতে পারে, কিন্তু বাংলার মানুষের কাছে নয়। আহমদ ছফা শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন অনেকটা এভাবে, ‘আজ থেকে অনেক অনেক দিন পর হয়তো কোনো পিতা তাঁর শিশুপুত্রকে বলবেন, জানো খোকা! আমাদের দেশে একজন মানুষ জন্ম নিয়েছিলেন, যার দৃঢ়তা ছিল, তেজ ছিল আর ছিল অসংখ্য দুর্বলতা। কিন্তু মানুষটির হৃদয় ছিল, ভালোবাসতে জানতেন। দিবসের উজ্জ্বল সূর্যালোকে যে বস্তু চিকচিক করে জ্বলে তা হলো মানুষটির সাহস। আর জোছনা রাতে রুপালি কিরণধারায় মায়ের স্নেহের মতো যে বস্তু আমাদের অন্তরে শান্তি এবং নিশ্চয়তার বোধ জাগিয়ে তোলে, তা হলো তার ভালোবাসা। জানো খোকা তাঁর নাম। শেখ মুজিবুর রহমান।’ (পৃষ্ঠা: ২৩২, নির্বাচিত প্রবন্ধ, মাওলা ব্রাদার্স)
আহমদ ছফার বিশ্লেষণ এখানে খুবই প্রাসঙ্গিক। শেখ মুজিবুর রহমান মানুষ ছিলেন, দেবতা নন। তাঁকে দীর্ঘদিন ধরে দেবতা বানানো হয়েছে। দেবতার আসনে বসানোর কারিগররা বিনিময়ে লুটেছে বাংলাদেশের সম্পদ। লুটেছে ব্যাংক, বিমা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, এমনকি মানুষের ভোট। লুটেরা ও গণতন্ত্র হত্যাকারীদের হাত থেকে শেখ মুজিবুর রহমান মুক্তি পাক। ১৫ আগস্টে এই কামনা থাকলো। শেষ কথায়, কৃতজ্ঞতা জানাতেই হয় জনবুদ্ধিজীবী আহমদ ছফাকে, যিনি নির্মোহভাবে আগামী প্রজন্মের সামনে তুলে ধরে গেছেন একজন শেখ মুজিবুর রহমানকে। যে শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন একজন অতি সাধারণ মানুষ, যিনি ছিলেন আমাদেরই লোক।
সহায়ক গ্রন্থ:
১. ছফা, আহমদ (২০২৪), হারানো লেখা, ঢাকা: খান ব্রাদার্স অ্যান্ড কোম্পানি।
২. ছফা, আহমদ (২০১৫), নির্বাচিত প্রবন্ধ, ঢাকা: মাওলা ব্রাদার্স।
৩. ছফা, আহমদ (২০০৮), সেইসব লেখা, ঢাকা: খান ব্রাদার্স অ্যান্ড কোম্পানি।
লেখক: সহকারী অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।