‘সত্য লিখে বাঁচা সহজ নয়’

সাংবাদিক বিভুরঞ্জনের বিদায়ী বার্তাটি অনলাইনে প্রকাশিত হওয়ার কিছুক্ষণ পরেই পড়েছিলাম। তখনও তাঁর মৃত্যুর খবর আসেনি। অত্যন্ত বেদনার্ত এই লেখাটি পড়তে পড়তে বারবার কবি জীবনানন্দ দাশের কথা মনে পড়ছিল। দুঃখ-যাতনা ও অভাবে ক্লিষ্ট জীবনানন্দ দাশের প্রধান অবলম্বন ছিল তাঁর কবিতা। কবিতায় খাতাতেই বেঁচে ছিলেন খেয়ালী জীবনানন্দ। তাতেই তিনি লিখতেন অভাব, অবজ্ঞা, যাতনা আর জীবনের কথা। খোলা চিঠি পড়তে পড়তে কেন যেন মনে হলো সাংবাদিক বিভুরঞ্জন তাঁর বিদায় বেলায় লিখে গেছেন বাংলাদেশের সাংবাদিকতার একটি ধূসর পাণ্ডুলিপি। যার প্রতিটি লাইনে অভাব, অনটন, অপমান আর উপেক্ষার আলেক্ষ্য। কবি জীবনানন্দ দাশ ও  সাংবাদিক বিভুরঞ্জনের  পরিণতিও প্রায় এক। যতদূর জানা যায় জীবনানন্দ ইচ্ছাকৃতভাবেই কলকাতায় ট্রামের নিচে নিজেকে সমর্পিত করেছিলেন আর সাংবাদিক বিভুরঞ্জন ডুব দিয়েছেন মেঘনার গহীন অন্ধকারে। যেখান থেকে উঠে পৃথিবীর আলো দেখার ইচ্ছে তাঁর আর ছিল না।  

বিভুরঞ্জন সরকার স্বেচ্ছা মৃত্যুর আগে একটি খোলা চিঠিতে তাঁর জীবন ও সাংবাদিকতা পেশা নিয়ে অত্যন্ত হৃদয়বিদারক, মর্মস্পর্ষী একটি চিত্র তুলে ধরে গেছেন। পুরো লেখাটি আমাদের সমাজ জীবনের এক ভয়াবহ চিত্র আমাদের সামনে তুলে ধরে। বিভুরঞ্জন সরকারের ভাষ্য নিয়ে নানা দিক থেকে আলোচনা হতে পারে। তর্ক-বিতর্ক ও প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ হতে পারে। তাঁর পুরো ভাষ্যে একটি বিষয় খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। যা বাংলাদেশের সাংবাদিকতা অঙ্গণে প্রাসঙ্গিক থাকবে দীর্ঘ দিন। সত্য লিখে বাঁচা সহজ নয়- এই বাক্যটি আলোচিত হবে দীর্ঘদিন।

উল্লেখ করা প্রয়োজন বাংলাদেশে সত্য লেখার বিপদ কিন্তু খুব সাম্প্রতিক নয়। বরং এই প্রচলন দীর্ঘ দিনের। একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। বাংলাদেশের ইতিহাসে এক বরেণ্য সাংবাদিক আবদুস সালাম। বাংলাদেশের সাংবাদিকতায় তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। এক সময় আবদুস সালাম ও ইংরেজি দৈনিক অবজারভার প্রায় সমার্থক ছিল। তিনি কাজ শুরু করেছিলেন পাকিস্তান অবজারভার এ, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর যার নাম হয়েছিল বাংলাদেশ অবজারভার। এই সংবাদপত্রে ১৯৭২ সালের ১৫ মার্চ আবদুস সালাম লিখেছিলেন ‘The Supreme Test’ শিরোনামের একটি নিবন্ধ। যাতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সরকারের কড়া সমালোচনা ও শঙ্কা ছিল। তিনি লিখেছিলেন , The Awami League Government is today in a peculiar position. Although the party was elected overwhelmingly by the people, the government we have today is not an elected representative and constitutional government, because of the fact that there is no constitution yet and there is, therefore, no democratic legal basis for its existence. It holds office by virtue of coming out victorious in a revolutionary war and is therefore a revolutionary, provisional government ... (The Supreme Test, Bangladesh Observer, 15th March 1975)

সাংবাদিক আবদুস সালামের প্রশ্ন ও বিশ্লেষণ শেখ মুজিবুর রহমান সরকারের মনোপুত ছিল না। ফলাফল অবজারভার থেকে অবসর নিতে বাধ্য হন এই গুণী সাংবাদিক।

শুধু তাই নয় অতি সম্প্রতি শেখ হাসিনার কর্তৃত্বপরায়ণ সরকারের সময়েও সাংবাদিকরা সত্য উচ্চারণ করতে পেরেছেন- তা বলার সুযোগ নেই। বরং শেখ হাসিনার প্রেস উইং, ডিজিএফআই এবং এক শ্রেণির আওয়ামী সুবিধাভোগী সাংবাদিক অনেক পেশাদার সাংবাদিকের জীবন দুর্বিষহ করে ছেড়েছেন। অনেকে চাকরি হারিয়েছেন, অনেকে নতুন চাকরি পাওয়া থেকে বঞ্চিত হয়েছেন, অনেকেই শিকার হয়েছেন জেল-জরিমানা ও নিপীড়নের। বিএনপি-জামায়াতের দোসর ট্যাগেও অনেকেই হারিয়েছেন জীবিকা। একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। বর্তমান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী শাহেদ আলম চ্যানেল টোয়েন্টিফোরে ২০১৪ সালের নির্বাচন নিয়ে শুধু যথাযথ সাংবাদিকতা করার জন্য সাংবাদিকতা জগতে মোটামুটি অচ্ছুত হিসেবে গণ্য হয়েছিলেন। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান অধ্যাপক ইউনূসের বিশেষ সহকারী মনির হায়দার দেশত্যাগে বাধ্য হয়েছিলেন। এরকম অনেক উদাহরণ পাওয়া যাবে।

এবার আশা যাক বিভুরঞ্জনের বেদনাদায়ক উপাখ্যানে। সাংবাদিক বিভুরঞ্জন সরকারের আওয়ামী লীগের প্রতি অনুরাগ ছিল বিষয়টি লুকানোর নয়। শেষ চিঠিতে তিনি নিজেও তা লুকানোর চেষ্টা করেননি। এমনকি তিনি যে বিভিন্ন সময় আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ হাসিনার অনুকম্পা পাওয়ার চেষ্টা করেছেন সেটাও তিনি অকপটে স্বীকার করেছেন। স্বীকার করেছেন লাজলজ্জা ভুলে শেখ হাসিনার দরবারে সাহায্যের আবেদন করার কথাও। বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনাকে নিয়ে বই লিখেও যে কোনও ফায়দা করতে পারেননি সেটাও উল্লেখ করেছেন গভীর বেদনার সাথে।

শেখ হাসিনার পতন ও পলায়নের পর বিভুরঞ্জন সরকারের জগতটা অনেক ছোট হয়ে এসেছিল। কপালে জুটেছিল- আওয়ামী ট্যাগ। আবার কুঁড়েকুঁড়ে খাচ্ছিলো স্বাধীনভাবে কাজ করতে না পারার প্রতিকূলতা। শেষ চিঠিতে যে কথা বিস্তারিত লিখেছেন এই সাংবাদিক। হ্যাঁ, মাজহারুল ইসলাম বাবলার একটি লেখার জন্যও তাঁকে নেতিবাচক পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়েছে। মাজহারুল ইসলাম বাবলার লেখা নিয়ে সমালোচনা করায় যায়। কিন্তু প্রেক্ষাপট নিয়ে প্রশ্নও তোলা যায়। কিন্তু এজন্য একজন পেশাদার সাংবাদিকের জীবন দুর্বিষহ করে তোলা কাম্য নয়। অত্যন্ত আক্ষেপের সাথে তিনি লিখেছেন- সজ্জন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক চাপ সইতে না পেরে আমার সঙ্গে কথা বলাই বন্ধ করেছেন।

পালাবদলের এই স্রোতে অনেকেই ভাবতে পারেন বিভুরঞ্জন সরকারের এই পরিণতির পেছনে তাঁর রাজনৈতিক অনুরাগ দায়ী। হ্যাঁ, হয়তো কথাটি অযৌক্তিক নয়। কিন্তু রাজনীতিতো জোয়ার-ভাটার খেলা। দশ বছর পর অথবা তারও আগে পরে আবারও রাজনীতির পাশা পরিবর্তিত হতে পারে। তখন কি আবার বাংলাদেশের সাংবাদিকরা বিভুরঞ্জন সরকারের ভাগ্য বরণ করে নেবেন। এই চর্চা কি চলতেই থাকবে। নাকি এর পরিবর্তন জরুরি।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভুরঞ্জন সরকারের লেখা দুটি বইয়ের কাভার নিয়ে অনেকেই টিপ্পনী কাটছেন। কিন্তু তারপরও রাজনীতির মারপ্যাঁচ ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর নিপীড়ক চরিত্রের কাছে একজন বিভুরঞ্জন সরকারের যে আত্মসমর্পণ, আত্মহনন তা একটি কালো অধ্যায় হয়ে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। যুগে যুগে মত প্রকাশ ও সাংবাদিকতার স্বাধীনতার প্রেক্ষাপটে নিপীড়িত সাংবাদিকরা উচ্চারণ করবেন, সত্য লিখে বাঁচা সহজ নয়। যে লাইনটিকে অমর করে গেলেন বাংলাদেশের সাংবাদিকতার জীবনানন্দ দাশ– বিভুরঞ্জন সরকার।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়