রোহিঙ্গা ঢলের আট বছর

আজ রোহিঙ্গা ঢলের (রোহিঙ্গা ইনফ্লাক্স) আট বছর পূর্ণ হলো। প্রতিবছর আগস্ট মাসের ২৫ তারিখ আমি এই রোহিঙ্গা ঢলের বর্ষপূর্তি উপলক্ষে একটা লেখা লেখার চেষ্টা করি এবং সে লেখায় বিগত এক বছরের নানান ঘটনা প্রবাহ নিয়ে আলোচনা করি যা রোহিঙ্গাদের জীবনে

প্রভাব বিস্তার করে। পাশাপাশি বাংলাদেশের বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে আমি রোহিঙ্গা সমস্যার বর্তমান অবস্থা এবং এর ভবিষ্যৎ পরিণতি নিয়ে নানান ধরনের মতামত প্রদান করি এবং বক্তব্য উপস্থাপন করি। এবারও বেশ কিছু প্রিন্ট মিডিয়া এবং ইলেকট্রনিক্স মিডিয়ায় আমার বক্তব্য, বিশ্লেষণ ও কমেন্ট্রি দিয়েছি। কিন্তু যে বিষয়টা আমি লক্ষ করেছি, সেটা হচ্ছে এবার প্রায় সব কর্নার থেকে সব জায়গা থেকে মিডিয়ার একটা কেন্দ্রীয় মনোযোগ হচ্ছে রোহিঙ্গা সমস্যা সমস্যার সমাধান কী? রোহিঙ্গা সমস্যার কি আদৌ কোনও সমাধান আছে? রোহিঙ্গারা কি বাংলাদেশ থেকে যাবে?

রোহিঙ্গারা বাংলাদেশ থেকে কবে যাবে? প্রশ্নের ধরন এবং গতিমুখ দেখে সহজে অনুমান করা যায় যে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশ দীর্ঘদিন বসবাস করার কারণে বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে রোহিঙ্গাদের একটা নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি দাঁড়িয়ে গেছে এবং রোহিঙ্গাদেরকে বাংলাদেশে তারা আর দেখতে চায় না।

আজকে আমি কথা বলবো প্রধানত রোহিঙ্গা সমস্যা এবং সংকট কোন জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে, তা নিয়ে।

সত্যি বলতে কী, দীর্ঘদিনের গবেষণায় আমি দেখেছি যে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানের জন্য রোহিঙ্গাদেরকে মিয়ানমারে রাখাইন রাজ্যে প্রত্যাবর্তন করানোটাকেই একমাত্র পথ হিসেব বিবেচনা করা হয়েছে। বাংলাদেশের জায়গা থেকে বিবেচনা করলে এর মধ্যে দোষের কিছু নেই এবং রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদেরকে মানবিক কারণে আশ্রয় দিলেও একটা নির্দিষ্ট সময়ের পরে রোহিঙ্গাদেরকে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর চেষ্টা করবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু মিয়ানমারের ব‍‍র্তমানে বিদ্যমান মিয়ানমারে অভ্যন্তরে রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং রাখাইনের বর্তমান অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে রোহিঙ্গাদেরকে ফেরত পাঠানোই রোহিঙ্গা সমস্যার একমাত্র সমাধান- এটা কি খুব একটা স্বাভাবিক?

আমি মনে করি এই মুহূর্তে রোহিঙ্গাদেরকে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর ব্যাপারে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে যে দৌড়ঝাঁপ করা হচ্ছে সেটা হয়তো জরুরি কিন্তু এর কোনও কার্যকর প্রতিফল এই মুহূর্তে আমি দেখি না। এর অন্যতম কারণ তিনটি।

প্রথমত: মিয়ানমারের যে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা সেখানে মিয়ানমারের বিভিন্ন রাজ্যে সীমান্তবর্তী রেজিস্ট্যান্স গ্রুপগুলো বিভিন্ন রাজ্যের বিপুল অংশ নিজেদের কর্তৃত্বে এবং দখলে নিয়েছে। বিশেষ করে রাখাইন রাজ্যের আরাকান আর্মি রাখাইন রাজ্যের প্রায় ৯০ শতাংশ নিজেদের অধিকারে নিয়েছে বলে দাবি করছে এবং আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম সে দাবিকে অনেকখানি সমর্থন করছে। এরকম অবস্থায় ঢাকা যদি ইয়াঙ্গুনের সাথে কোনও একটা দেন দরবারের মধ্য দিয়ে রোহিঙ্গাদেরকে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর জন্য যৌথভাবে কোনও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করার সক্ষমতা বর্তমান মিয়ানমারের জান্তা সরকার রাখে না। কারণ রাখাইন রাজ্যের উপরে মিয়ানমারের জান্তা সরকারের একক কর্তৃত্ব এখন আর নেই।

সুতরাং চাইলেই মিয়ানমারে জান্তা সরকার রাখাইন রাজ্যে সরকারের কোনও পলিসি বিশেষ করে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের মতো কোনও সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে পারবেন না। তাই, এসব কূটনৈতিক দৌড়ঝাঁপ এ মুহূ‍র্তে খুব একটা কাজে আসবে বলে আমার মনে হয় না।

দ্বিতীয়ত: রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে রাখাইন রাজ্যে ফিরে যাবে কী যাবে-না বা যেতে পারবে কী পারবে-না, এর অনেকটা নির্ভর করছে আরাকান আর্মি রোহিঙ্গাদের প্রতি কী ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে তার ওপর।

যদি আরাকান আর্মি না-চায়, তাহলে রোহিঙ্গাদেরকে কেউই রাখাইন রাজ্যে ফেরত পাঠাতে পারবে না; এবং এটাই হচ্ছে বাস্তবতা। আর রোহিঙ্গাদের সাথে আরাকান আর্মির সম্পর্কের মাত্রাটা কোন পর্যায়ে আছে সেটা আমরা সহজে অনুমান করতে পারি বিগত এক বছরের নতুন শরণা‍র্থীর সংখ্যা দেখে। বিগত এক বছরে আরাকান আর্মির অত্যাচার নির্যাতন থেকে বাঁচার জন্য প্রায় দেড় লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। যারা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে তাদের অনেকের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী রাখাইনে রোহিঙ্গাদের উপরে যে অত্যাচার নির্যাতন চালিয়েছিল আর ২০২৪-২০২৫ সালের আরাকান আর্মি রোহিঙ্গাদের উপরে যে পরিমাণ অত্যচার-নির্যাতন চালাচ্ছে, সেটা কোনও অংশে কম নয়। বরং কোন কোন ক্ষেত্রে বেশি। এ অত্যাচার নির্যাতন থেকে বাঁচার জন্যই প্রায় দেড় লক্ষাধিক রোহিঙ্গা নিজের বসতভিটা ফেলে ‘জান’ নিয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে এসে আশ্রয় নিয়েছে। এখান থেকে সহজেই অনুমান করা যায় যে আরাকান আর্মি রোহিঙ্গাদের প্রতি কোনও ধরনের সংবেদনশীল নয়; সুতরাং আরাকান আর্মি না চাইলে রোহিঙ্গাদেরকে ফেরত পাঠানো সম্ভব নয়।

তৃতীয়ত: আমাদের এটাও বিবেচনায় নিতে হবে যে, রোহিঙ্গারা আদৌ ফেরত যেতে চায় কিনা। আমি আমার গবেষণার অভিজ্ঞতায় দেখেছি যে রোহিঙ্গারা নিজ মাতৃভূমিতে স্বেচ্ছায় ফেরত যেতে চায় কিন্তু ফেরত যাওয়ার সাহস এবং আস্থা তারা পায় না। কারণ রোহিঙ্গারা রাখাইন রাজ্যে ফেরত গেলে তারা কোথায় যাবে; কোথায় থাকবে; তাদের বসতভিটা ফেরত পাবে কিনা; তাদেরকে নাগরিকত্ব দেওয়া হবে কিনা; তাদের প্রতি যে জেনোসাইড হয়েছে সেটার বিচার হবে কিনা; তাদের জীবনের নিরাপত্তা কে দেবে; এবং তারা মানবিক মর্যাদা বসবাস করতে পারবে কিনা;… এসব প্রশ্নের কোন বিশ্বাসটুকু উত্তর তাদের কাছে নাই।

কোন পক্ষই রোহিঙ্গাদেরকে এমন কোনও বিশ্বাসযোগ্য প্রতিশ্রুতি এখনও পর্যন্ত দেয়নি বা দিতে পারেনি যার ওপরে রোহিঙ্গারা আস্থা রাখতে পারে। ফলে রোহিঙ্গারা স্বেচ্ছায় রাখাইনে ফেরত যাবে এরকম কোনও পরিবেশ পরিস্থিতি এখনও রাখাইনে আছে বলে রোহিঙ্গারা মনে করে না।

এরকম একটি অবস্থায় শুধু প্রত্যাবাসনকেই একমাত্র সমাধান হিসেবে চিন্তা করে মিয়ানমারের সাথে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানের ডায়ালগ করা এই মুহূর্তে খুব একটা বেশি কার্যকর হবে বলে আমি মনে করি না।

তাহলে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান কীভাবে হতে পারে? আমি মনে করি ‘প্রায় ১৫ লাখ রোহিঙ্গাকে রাতারাতি মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো যাবে না’-এই বাস্তবতাটাকে স্বীকার করতে হবে। তাই রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানের জন্য কিছু স্বল্প মেয়াদী, মধ্য মেয়াদী এবং দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।

যেমন, তরুণ-যুবক রোহিঙ্গাদের কারিগরি শিক্ষা দিয়ে দক্ষ জনশক্তি হিসেবে তৈরি করা যেতে পারে; এসব দক্ষ জনশক্তিকে রফতানিও করার ব্যবস্থা করা যেতে পারে; তৃতীয় কোন দেশে (থা‍‍‍র্ড কান্ট্রি রিসেটেলমেন্ট) পুনর্বাসনের চিন্তাও নতুন করে করা যেতে পারে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সক্রিয়ভাবে সংযুক্ত করে কীভাবে একটি কার্যকর প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু করা যায় তার জন্য একটা কার্যকর অ্যাকশন প্ল্যান নিতে হবে।

পাশাপাশি রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের ক্ষেত্রে রোহিঙ্গাদেরকেও সম্পৃক্ত করতে হবে এবং রোহিঙ্গাদেরও সহযোগিতা অন্তর্ভুক্ত করতে হবে যাতে করে একটা পার্টিসিপেটরি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে একটা সম্মানজনক সমাধানের দিকে আমরা পৌঁছতে পারি। তার জন্য একটি বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা প্রণয়ন জরুরি।

বিষয়ের গভীরে প্রবেশ না-করে সংকটের ভেতর থেকে সংকটকে উপলব্ধির চেষ্টা না-করে এবং সক্রিয় অংশীজনের সথে সংলাপ না-করে কেবল উপর থেকে চাপিয়ে দিয়ে মডেল এবং দ্বিপাক্ষিক সংলাপের মধ্য দিয়ে রোহিঙ্গা সংকট খুব সহজে দূর হওয়ার কথা নয়। এটাও মনে রাখতে হবে যে, রোহিঙ্গাদেরকে আমরা যেন সবসময় অপরাধের কাঠগড়ায় না-দাঁড় করাই। কেননা রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান শুধু বাংলাদেশ চায় না কিংবা বাংলাদেশের মানুষ চায় না; খোদ রোহিঙ্গারাও চায়। কেননা, কেউ স্বেচ্ছায় শরণার্থী হয় না বা হতে চায় না। শর‍‍ণা‍র্থী হচ্ছে একটা ব্যবস্থার প্রোডাক্ট; সে ব্যবস্থাকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে হবে এবং সে ব্যবস্থা বদলের জন্য এবং রূপান্তরের জন্য আমাদের সকলকে একত্রে কাজ করতে হবে।

লেখক: নৃবিজ্ঞানী ও অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।