২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনের পূর্ববর্তী নানামুখী বাস্তবতা ব্রিটিশ মুসলিম কমিউনিটি ও লেবার পার্টির মধ্যে দীর্ঘ শতাব্দীর রাজনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি বড় ধরনের ফাটল ধরিয়েছিল।
ইতিহাসের প্রথমবারের মতো গাজা সংঘাত এবং মুসলমানদের অভ্যন্তরীণ অবহেলার বিরুদ্ধে ক্ষোভের জোয়ারে ভেসে চার জন স্বতন্ত্র মুসলিম এমপি ওয়েস্টমিনস্টারে জায়গা করে নেন। আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারের দাবিতে গড়ে ওঠা এই ‘ইন্ডিপেন্ডেন্ট অ্যালায়েন্স’ আজ দুই বছর পর এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। গাজা ইস্যুকে কাজে লাগিয়ে মুসলমান পরিচয়ে এমপি হওয়া এ নেতারা পার্লামেন্টে গাজা ইস্যুতে সোচ্চার ভূমিকা রাখলেও সমালোচকদের মতে স্থানীয় আবাসন সমস্যা, ইসলামোফোবিয়া এবং জীবনযাত্রার ব্যয় সংকটে নীতিগত পর্যায়ে দৃশ্যমান কোনও পরিবর্তন আনতে ব্যর্থ হয়েছেন। নিদেনপক্ষে ব্রিটিশ সংসদেও তাদের এসব ইস্যুতে উজ্জ্বল্য ছড়ানো বক্তব্য রাখতেও দেখা যায়নি তাদের। ফলে ২০২৬ সালের স্থানীয় নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে মুসলমান ভোটারদের মধ্যে এক ধরনের প্রত্যাশা প্রাপ্তির সমীকরণজনিত আক্ষেপ বা ‘ভোটার্স রিমোর্স’ দানা বাঁধছে।
টাওয়ার হ্যামলেটসের ত্রিমুখী বাংলাদেশি বিভাজন:
ব্রিটেনে অন্তত ১৫ লাখ তিন প্রজন্মের ব্রিটিশ বাংলাদেশিসহ বাংলাদেশিদের বাস শতবর্ষের বেশি সময় ধরে। একই সময়ে ব্রিটেনে পথচলা শুরু করা ব্রিটিশ ভারতীয় বা ব্রিটিশ পাকিস্তানিদের তুলনায় মূলধারার রাজনীতিতে ব্রিটিশ বাংলাদেশিদের প্রভাব প্রায় এক-তৃতীয়াংশেরও কম। পূর্ব লন্ডনের দুটো সংসদীয় আসন ছাড়া দেশটির ভোটের সমীকরণে বৃহৎ দলগুলো ও সরকারের পলিসি লেভেলে বাংলাদেশিরা কোনও ফ্যাক্টর হয়ে উঠতে পারেননি এখনও। চার জন ব্রিটিশ বাংলাদেশি এমপির কেউ দল থেকে বিভিন্ন সময়ে সাসপেন্ড হয়েছেন, বাকিরা বিতর্কের মুখে ছেড়েছেন মন্ত্রিত্ব। চার জনই লেবার পার্টির এমপি। কিন্তু নিজেদের দল ক্ষমতায় থাকলেও দল বা সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তারা কোনও অবস্থান গড়তে, ধরে রাখতে পারেননি।
ব্রিটেনের সংসদ নির্বাচনে বা স্থানীয় নির্বাচন কোথাও বাংলাদেশিরা জয়-পরাজয়ের মূলশক্তি বা নিয়ামক নন, শুধু টাওয়ার হ্যামলেটস ছাড়া। এই একটি জায়গার নির্বাচন নিয়ে কমিউনিটিতে আলোচনা হয়। উপভোগ্য প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ পরিবেশ সৃষ্টিতে মূল ভূমিকায় অবতীর্ণ হন ব্রিটিশ বাংলাদেশি প্রার্থীরা।
কিন্তু আসন্ন নির্বাচনে জমে ওঠা নির্বাচনি লড়াইয়ের কোনও সম্ভাবনা এখনও সৃষ্টি হয়নি। বরং ব্রিটিশ বাংলাদেশিদের রাজনৈতিক হৃৎপিণ্ড টাওয়ার হ্যামলেটসে বাংলাদেশি কিছু রাজনীতিবিদদের দীর্ঘদিনের কুৎসিত ক্ষমতা-চেয়ারের বিরোধ ও নিজের নাক কেটে অন্যের যাত্রাভঙ্গের শত্রুতার লড়াই এখন প্রকাশ্য। আসন্ন মেয়র নির্বাচন সামনে রেখে বর্তমান মেয়র লুৎফুর রহমানের বিরুদ্ধে তুমুল স্বেচ্ছাচারিতা ও প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের অভিযোগ এনে তার দল এস্পায়ার পার্টির একটি অংশ ‘ইনডিপেনডেন্ট পার্টি’ নামে গত সপ্তাহে নতুন একটি রাজনৈতিক দল গঠন করেছেন। তাদের লক্ষ্য বহুল আলোচিত ও তুমুল বিতর্কিত বর্তমান মেয়র লুৎফুর রহমানকে চ্যালেঞ্জ করা।
অন্যদিকে, লেবার পার্টির বর্ষীয়ান প্রার্থী সিরাজুল ইসলামও জয়ের জন্য মরিয়া। টাওয়ার হ্যামলেটসের ৩৮ শতাংশের কিছু বেশি বাংলাদেশি ভোট যদি লুৎফুর রহমান, সিরাজুল ইসলাম এবং নতুন স্বতন্ত্র প্রার্থীর মধ্যে শেষ পর্যন্ত ভাগ হয়ে যায়, তবে তার ফলাফল হবে বাংলাদেশি কমিউনিটির জন্য ভয়াবহ। এই বিভক্তি শেষ পর্যন্ত শ্বেতাঙ্গ কমিউনিটির প্রার্থীর হাতে ক্ষমতার চাবি তুলে দিতে পারে। সে উদ্বেগ সত্য হলে ব্রিটেনে বাংলাদেশিদের প্রাণকেন্দ্রে বাংলাদেশিরা এবার শেষ পর্যন্ত পুরোনো নিয়ন্ত্রণ হারাতে পারেন।
বড় দলগুলোর প্রার্থী বাছাইয়ে নব্বই দশক থেকে বাংলাদেশিদের দমিয়ে রাখার ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে পরিচিত একসময়ের বাংলাদেশিদের ঐক্যের পরিচায়ক ‘স্বতন্ত্র’ শব্দটি এখন বিভক্তির কদর্য প্রতীকে পরিণতি পেয়েছে।
শীর্ষ নেতা হিসেবে লুৎফুর রহমানের নেতৃত্বে উদারহীনতার ব্যর্থতা ও কুক্ষিগত করার প্রবণতাকে এ বিভক্তির জন্য দায়ী করছেন অনেকে।
রিফর্ম ইউকের মুসলমান কার্ড
মুসলমান কমিউনিটির এরকম অনেক ঐক্যহীনতার সুযোগ নিতে কট্টর অভিবাসন বিরোধী দল ‘রিফর্ম ইউকে’ নানা সুচতুর কৌশল নিয়ে মাঠে নেমেছে। লন্ডনের আসন্ন মেয়রের লড়াইয়ে মুসলিম কার্ড খেলতে তারা মিসরীয় বংশোদ্ভূত মুসলিম নারী প্রার্থী লাইলা কানিংহামকে সামনে এনেছে। কানিংহাম বোরকা নিষিদ্ধ করার পক্ষে কথা বলে এবং একে ‘ব্রিটিশ মূল্যবোধের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ’ আখ্যা দিয়ে পরিকল্পিত বিতর্ক উসকে দিয়েছেন। লায়লা লন্ডনের বহুত্ববাদী সংস্কৃতির ওপর সরাসরি আঘাত হেনে দাবি করেছেন, লন্ডনের কিছু অংশ এখন ‘মুসলিম শহর’ বলে মনে হয়, যেখানে যত্রতত্র ভিন্ন ভাষার সাইনবোর্ড এবং বাজারে বোরকা বিক্রি হতে দেখা যায়। বিশেষ করে টাওয়ার হ্যামলেটসের মতো ব্রিটিশ বাংলাদেশি অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে থাকা বাংলাসহ দ্বিভাষিক সাইনবোর্ডগুলোকে তিনি ব্রিটিশ সংস্কৃতির পরিপন্থি হিসেবে চিত্রিত করার চেষ্টা করেছেন, যা ব্রিটেনে বাংলাদেশিদের দীর্ঘদিনের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের প্রতি চরম অবমাননাকর।
তিনি বোরকা পরা নারীদের ওপর পুলিশের ‘স্টপ অ্যান্ড সার্চ’ ক্ষমতা প্রয়োগের প্রস্তাব দিয়ে মুসলিম নারীদের অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করার পরিকল্পনা জানিয়েছেন প্রকাশ্যে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তাকে প্রার্থী করে মুসলিম ভোট জয়ের চেষ্টা নয়, বরং রিফর্ম ইউকে’র গায়ে লেগে থাকা ‘ইসলামোফোবিক’ তকমা ধুয়ে ফেলার একটি কৌশল। অতি-ডানপন্থি বয়ানের মুসলিম রীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার মুসলমান পরিচয়ের একজন প্রার্থীকে দিয়ে মুসলমান বিরোধী ইস্যুগুলো ফের মাঠে ছেড়ে পুরোনো বিদ্বেষ ও ঘৃণার আগুনে নতুন করে বাতাস দিয়েছে।
শুধু লন্ডন নয়, ব্রিটেনজুড়ে লেবার গ্রিন এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীদের লড়াইয়ের মাঝখানে ডান ও উগ্র ডানপন্থি ভোটগুলো নিজেদের বাক্সে টানতে নানা কৌশল নিয়েছে দলটি। মুসলমানবিরোধী হিসেবে দলটির নেতিবাচক পরিচয় ভোটের মাঠে আড়াল করতে নাদিম জাওহারির মতো ডানপন্থি কনজারভেটিভ পার্টির মূল নেতৃত্বে গুরুত্বহীন মুসলিম নেতাদের দলে ভিড়াচ্ছে রিফর্ম ইউকে। তাদের দলে এরই মধ্যে ভারতীয় পাকিস্তানিদের পাশাপাশি কিছু সুযোগ উন্মুখ বাংলাদেশিও যোগ দিয়েছেন।
অন্যদিকে, এমন নানামুখী কূটকৌশলের বিপরীতে ব্রিটেনে বাংলাদেশিদের মতো দেশটির মুসলিম কমিউনিটিতেও ঐক্যের প্রয়াস দারুণভাবে অনুপস্থিত। উগ্র ডানের উত্থানের বিপরীতে মধ্য ডান ও বাম রাজনীতি ম্রিয়মাণ। নতুন বামপন্থি দল হিসেবে জেরেমি করবিনের দলটি শুরুতে যতটা ভিন্নমুখী ও বর্ণবাদ বিরোধী রাজনীতির আশা জাগিয়েছিল, জারাহ সুলতানার সাথে করবিনের নেতৃত্ব-কর্তৃত্বের বিরোধ সে আশাবাদে তুমুলভাবে হতাশা ছড়িয়েছে। দলটির ব্যর্থতার শূন্যস্থানে বাম দল হিসেবে গ্রিন পার্টি অভিবাসী ও মুসলমানদের নতুন করে সমর্থন অর্জন করছে; সর্বশেষ জনমত জরিপগুলোর ফলাফলে তা স্পষ্ট। পরবর্তী নির্বাচনে ডানপন্থি নাইজেল ফারাজকে ঠেকাতে ও নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান টিকিয়ে রাখতে গ্রিন, ইয়োর পার্টি ও লেবার বৃহত্তর রাজনৈতিক জোট গঠনের সম্ভাবনা প্রবল।
৭০ বিলিয়ন পাউন্ডের অর্থনৈতিক অবদানের বিপরীতে বঞ্চনার হাহাকার:
২০২৬ সালে এসে ৪.৪ মিলিয়ন ব্রিটিশ মুসলিমের অর্থনৈতিক চিত্র তুমুল বৈষম্যপূর্ণ বাস্তবতার প্রমাণ। একদিকে দেশটির মুসলমান কমিউনিটি ব্রিটিশ অর্থনীতিতে বার্ষিক ৭০ বিলিয়ন পাউন্ডের বেশি অবদান রাখছে। উচ্চশিক্ষিত এবং পেশাদার শ্রেণির বিকাশ ঘটছে দ্রুত। আবার এই সাফল্যের উল্টো পিঠে রয়েছে চরম দারিদ্র্য। সাম্প্রতিক ২০২৫-২৬-এর তথ্য অনুযায়ী, ৩৯ শতাংশ ব্রিটিশ মুসলিম এখনও ইংল্যান্ড এবং ওয়েলসের সবচেয়ে সুবিধাবঞ্চিত ১০ শতাংশ এলাকায় বসবাস করেন। ‘মুসলিম পরিবারগুলো’ সংকটে রয়েছে, কারণ এই সম্প্রদায়ের ৬৮ শতাংশ মানুষ উচ্চ বেকারত্বের এলাকায় বসবাস করেন। মূলত এই অর্থনৈতিক বৈষম্যই তরুণ প্রজন্মকে মূলধারার রাজনীতির বাইরে ‘স্বতন্ত্র’ আন্দোলনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। আর তাদের স্বতন্ত্রভাবে মাঠে নামিয়ে ও মাঠে নামার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার গড়েছেন কিছু সুযোগসন্ধানী রাজনীতিবিদ।
আত্মপরিচয়ের সংকট এবং ইসলামোফোবিয়ার নতুন সংজ্ঞা:
ব্রিটিশ সরকারের ‘অ্যান্টি-মুসলিম হেট্রেড’ বা মুসলিম বিদ্বেষের নতুন সংজ্ঞা নির্ধারণ নিয়ে মুসলমানদের মধ্যে গভীর অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। মুসলমানদের প্রস্তাবিত ‘ইসলামোফোবিয়া’ শব্দের বদলে সরকার ‘অ্যান্টি-মুসলিম হসটালিটি’ শব্দটি বেছে নেওয়ায় অনেকেই নিজেদের নিরাপত্তাহীন মনে করছেন।
এই সংজ্ঞায় ‘বর্ণবাদ’ বা ‘রেশিয়ালাইজেশন’-কে অন্তর্ভুক্ত না করায় টুপি, দাড়ি বা হিজাবের কারণে যারা আক্রান্ত হন, তাদের আইনি সুরক্ষা পাওয়া আরও কঠিন হয়ে পড়েছে। গত এক বছরে মসজিদে হামলার ঘটনা ২০ শতাংশ বেড়েছে।
ব্রিটিশ বাংলাদেশিদের মতো ব্রিটিশ মুসলিমরা কি নিজেদের মধ্যে নানা বিভেদের লড়াই চালিয়ে যাবে, নাকি মৌলিক তাগিদে ন্যূনতম ঐক্যবদ্ধ হয়ে নিজেদের অধিকারের কণ্ঠ সোচ্চার করতে পারবে, সে প্রশ্ন এখন দুয়ারে দাঁড়িয়ে।
পুঁজিবাদের বিশ্বমোড়ল ট্রাম্পের যুক্তরাজ্য সংস্করণ ব্রিটেনে প্রয়োজনীয় জনপ্রিয়তা কিনতে আগেই সক্ষমতা দেখিয়েছে।
ব্রিটিশ রাজনীতির প্রবল ডানে ঝুঁকে যাওয়া বাঁকবদলের এই সময়ে নিজেদের অনৈক্য ব্রিটিশ মুসলমান-ব্রিটিশ বাংলাদেশিদের ‘কিংমেকার’ হওয়ার বদলে শুধু বিভক্ত, বঞ্চিত ও ব্যবহার শেষে অবহেলিত জনতাত্ত্বিক গোষ্ঠীতেই সীমাবদ্ধ থাকার ঝুঁকি বাড়িয়েছে নিঃসন্দেহে।
লেখক: প্রবাসী সাংবাদিক