সাংবাদিক নিপীড়নের যে প্রশ্নগুলো রেখে যাচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকার

নির্বাচনের দিন এগিয়ে আসছে। সব ঠিকঠাক থাকলে এবং একটি সুষ্ঠু নির্বাচন হলে বাংলাদেশ পুনরায় একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ফিরবে, শেষ হবে এই অন্তর্বর্তী সময়। ইতিহাসের কাছে এই সময়টি কীভাবে দেখা দেবে- সেটি নিশ্চয়ই ভবিষ্যতে বলা যাবে। নানান যুক্তি-তর্ক নিশ্চিতভাবে উদিত হবে এই অন্তর্বর্তীকাল নিয়ে। তবে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার যে বড় প্রশ্নগুলো রেখে বিদায় নেবে তার মধ্যে অন্যতম হলো সাংবাদিক নিপীড়নের বাস্তবতা। বিষয়টি এমন নয় যে বাংলাদেশে কখনও সাংবাদিক নিপীড়ন হয়নি। স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের গণমাধ্যম কিংবা সাংবাদিকরা কখনোই স্বাধীন ছিল না। সব সরকার আমলেই গণমাধ্যমের কণ্ঠকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলেছে প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে।

শান্তিতে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস সরকারও বাংলাদেশের কোনও সরকারকে পেছনে ফেলতে পারেননি। তারাও সেই লিগেসি টেনে সাংবাদিক এবং গণমাধ্যমকে উত্তপ্ত, অস্থির এবং নিপীড়নের ফাঁদে ফেলেছে। এমন অনেক ঘটনা ঘটেছে যা অতীতে কখনও হয়নি। কিংবা হলেও এত বৃহৎ আকারে হয়নি। এমনকি সাংবাদিকতাও এতটা ভয়ংকর পরিস্থিতির মুখোমুখি অতীতে হয়েছে কিনা, সেসব নিয়েও নিশ্চয়ই ভবিষ্যৎ গবেষণা কিংবা বিচার বিশ্লেষণ হবে।

বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সাংবাদিক ও গণমাধ্যম নিপীড়নের নতুন কিছু তথ্য তুলে ধরে আলোচনাটি করা যাক। ২০২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানের পর ড. ইউনূস সরকার দায়িত্ব নেয়। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্যমতে দেশব্যাপী আগস্ট থেকে ডিসেম্বর (২০২৪) পর্যন্ত ১৩০ জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করা হয়। পরবর্তী বছরও (২০২৫) ৫২ জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা হয়। ২০২৫ সালে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ১১৮ জন সাংবাদিক নিপীড়নের শিকার হন এবং ৪ জন সাংবাদিকের মৃতদেহ উদ্ধার হয়। সম্প্রতি মানবাধিকার সহায়তা সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির তথ্যমতে, অন্তর্বর্তী সরকার আমলে ১৭ মাসে সাংবাদিকদের ওপর ৪২৭টি হামলায় ৬ জন নিহত হন। এছাড়াও ৮৩৪ জন নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হন।

যে নিপীড়ন ব্যবস্থার বিলোপ চেয়েছিল পুরো দেশের মানুষ। অন্তর্বর্তী সরকার তার বিলোপ তো করেইনি বরং তথ্য দেখে বোঝা যায় তারা সেই ব্যবস্থাই পুনরায় ব্যবহার করতে শুরু করেছিল। এ ক্ষেত্রে তারা ছিল সুচতুর। সরাসরি সরকারের পক্ষ থেকে কোনও ধরনের বাধা কিংবা নিপীড়ন করা না হলেও নন-স্টেট অ্যাকটররা পুরো সময়জুড়ে সে কাজটি করে গেছে। ‘নন-স্টেট অ্যাকটরস’ অর্থ হলো, যারা সরকারে নেই কিন্তু সরকারের সমর্থনপুষ্ট কিংবা বলা যায় আশীর্বাদপুষ্ট।

বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার কয়েকটি উপায়ে গণমাধ্যম এবং সাংবাদিকদের নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছে। প্রথমত, হলো নন-স্টেট অ্যাকটরদের ব্যবহার, দ্বিতীয় হলো আইনি ভয় এবং তৃতীয়ত প্রচলিত নিপীড়নমূলক আইনকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা।

আমরা দেখেছি, বাংলাদেশের বৃহৎ দুটি গণমাধ্যমের সামনে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি করে জেয়াফত আয়োজন করতে। সরকার এই বিশৃঙ্খলকারীদের বিরুদ্ধে কোনও শক্ত পদক্ষেপ নেয়নি। এছাড়াও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা কিংবা সমন্বয়ক পরিচয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে চাপ প্রয়োগ করে ‘স্বৈরাচারের দোসর’ ট্যাগ দিয়ে অনেককে চাকরিচ্যুত করার অভিযোগও আছে। জুলাই আন্দোলনের অন্যতম নেতার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছিল, তিনি একটি টেলিভিশনের মালিককে তালিকা দিয়ে কয়েকজন সাংবাদিককে চাকরিচ্যুত করার চাপ প্রয়োগ করেন। যদিও তিনি বরাবরই এই অভিযোগ অস্বীকার করে এসেছেন।

সংস্কৃতি উপদেষ্টাকে প্রশ্ন করার জের ধরে তিন জন সাংবাদিকের চাকরি চলে যায়। গণমাধ্যমের রিপোর্ট থেকে জানা যায়, তারা যেসব প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ছিলেন মবের ভয়ে চাকরিচ্যুত করতে বাধ্য হয়। কারণ ফেসবুকে ঘোষণা দিয়ে সেসব প্রতিষ্ঠান ঘেরাও ও হামলার হুমকি দেয়া হয়। সরকার থেকে জানানো হয় ওই তিন সাংবাদিকের চাকরিচ্যুত হওয়ার পেছনে সরকারের কোনও দায় নেই।

অথচ সরকারের দায়িত্ব ছিল বিবৃতি না দিয়ে সেই মব উসকানোদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া। যেখানে সরকারের দায়িত্ব গণমাধ্যমের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সাংবাদিকরা যেন নির্ভয়ে কাজ করতে পারেন সেই পরিবেশ তৈরি করা। সরকার সেটি করেনি। বিষয়টা এমন, সরকার যেহেতু কোনও হুমকি দেয়নি, সুতরাং সরকারের কোনও দায় এখানে নেই।

সাংবাদিক মুন্নী সাহা কাওরান বাজারে মবের শিকার হন। পুলিশ তাকে উদ্ধার করে। গণমাধ্যমে পুলিশ জানিয়েছিল- ‘মুন্নী সাহাকে পুলিশ আটক করেনি। কাওরান বাজারে স্থানীয় লোকজন তার ওপর বিক্ষুব্ধ হয়ে ঘেরাও করেছিল। পরে পুলিশ তাকে নিরাপত্তা দিতে সেখান থেকে ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে আসে। তবে তার বিরুদ্ধে চারটি মামলা রয়েছে। বর্তমানে তিনি অসুস্থ আছেন। তাই জামিনের শর্তে তাকে পরিবারের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।’ যারা মুন্নী সাহাকে মবে ফেলার চেষ্টা করলো, সরকার তাদের বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থাই নেয়নি।

সরকারের নির্বাক অবস্থান প্রমাণ করে তারা ঘটনাগুলোকে সমর্থন জুগিয়েছে। এদের অনেকের সঙ্গে সরকারের যেমন পরোক্ষ সম্পর্ক আছে, আবার কোনও ক্ষেত্রে সম্পর্ক না থাকলেও সরকার নীরব ভূমিকা পালন করেছে।  

দ্বিতীয় হলো, আইনি ভয় তৈরি করা। বেশ কয়েকজন সাংবাদিককে হত্যা মামলায় গ্রেফতার করা হয়। আর কতজনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা হয়েছে, সেই হিসাবটি শুরুতেই দিয়েছি। অর্থাৎ যখন ঢালাও হত্যা মামলা হয় এবং কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয় তখন বাকিরা নিজেদের গুটিয়ে ফেলে। স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিবেশে ভয়ের সংস্কৃতির কারণে সেলফ সেন্সরশিপ তৈরি হয়। অনেককেই মামলার কারণে চাকরিচ্যুত হতে হয়েছে কিংবা স্বেচ্ছায় চাকরি ছেড়ে আত্মগোপনে থাকতে হচ্ছে। যা তাদের অর্থনৈতিক ও মানসিক নিপীড়নের দিকে ঠেলে দিয়েছে।

যে ক’জন সাংবাদিক হত্যা মামলায় গ্রেফতার হয়েছেন, তাদের অধিকাংশই এখনও কারাগারে, তাদের জামিন হচ্ছে না। কেন জামিন হচ্ছে না, সেই প্রশ্নেরও কোনও উত্তর কারও কাছে নেই।  

মামলার বিষয়ে সরকারের আইন উপদেষ্টা বেশ কিছু বক্তব্যও দিয়েছেন। তিনি কখনও মনে করেন, দেশের যেকোনও নাগরিক যে কারও বিরুদ্ধে মামলা করার অধিকার রাখেন। আবার কখনও বলেন এসব বিষয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের। এখানে আইন মন্ত্রণালয়ের কিছু করার নেই। অথচ অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা দীর্ঘদিন ধরে বাকস্বাধীনতা, মানবাধিকার নিয়ে কথা বলে আসছেন। এখন ক্ষমতায় বসে ভুয়া মামলাকেও তিনি নাগরিক অধিকারের অংশ হিসেবে দেখছেন। ভুয়া মামলাকে তার অপরাধ মনে হয় না।  একইসঙ্গে কোন ডিপার্টমেন্টের কোন কাজ সেটা দেখাচ্ছেন, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। এই দায় তো পুরো সরকারের ওপর বর্তায়। সে ব্যর্থতার দায় নিয়ে দীর্ঘদিন মানবাধিকার নিয়ে সোচ্চার থাকা আইন উপদেষ্টা তো পদত্যাগ করেননি। কারণ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বের দায়ে তো তার সরকার পুরো আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে দিয়েছেন। সেখানে তো স্পেসিফিক কোনও ডিপার্টমেন্টের ব্যর্থতা তিনি দেখেননি কিংবা বিচার বিশ্লেষণ করেননি।  

তৃতীয়ত, আগের মতোই আইনকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছে সরকার। আমরা আওয়ামী লীগ আমলে দেখেছি ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট দিয়ে বাকস্বাধীনতাকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হয়েছিল। এছাড়াও কলোনিয়াল আমলের আইন অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টও সাংবাদিকের বিরুদ্ধে ব্যবহার করেছিল আওয়ামী লীগ সরকার। আওয়ামী লীগ সরকার ২০২৩ সালে ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টকে বদলে সাইবার সিকিউরিটি অ্যাক্ট তৈরি করে। অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা আশ্বাস দেন, এই আইন কারও ওপর ব্যবহার হবে না। সত্যিই! এখন পর্যন্ত সাংবাদিকতার জন্য সাইবার সিকিউরিটি অ্যাক্ট ব্যবহৃত হয়নি। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইন ব্যবহার করা শুরু করেছে। এখন পর্যন্ত তিন জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইন ব্যবহার করা হয়েছে। যার মধ্যে সর্বশেষ আনিস আলমগীরকে বিস্ময়করভাবে গ্রেফতার করা হয় শুধু টকশোতে মতামত প্রকাশের জন্য। তাকে জিজ্ঞাসাবাদের নাম দিয়ে ডিবি অফিসে নেওয়া হয়। গভীর রাতে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা হয় এবং পরদিন বিকালে তাকে ওই মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়। আদালত তাকে রিমান্ডেও পাঠায়। রিমান্ড শেষে তিনি কারাগারে যান। তাকে গ্রেফতার করার জন্য আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো সরকারের এই হস্তক্ষেপের সমালোচনা শুরু করে।

এখন দুর্নীতি দমন কমিশনের করা মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়েছে আনিস আলমগীরকে। অর্থাৎ সরকার যখন দেখলো মানবাধিকার প্রশ্নে তারা বিতর্কের মুখে পড়তে পারে ঠিক তখনই দুর্নীতির অভিযোগ সামনে নিয়ে আসা হলো। অর্থাৎ স্পষ্ট বার্তা হলো, তারা আনিস আলমগীরকে ছাড়বে না।

মাত্র ১৭ মাসে এত এত ঘটনার জন্ম দিয়েছে যে সরকার, তারা যদি ১৭ বছর থাকতো তবে নিপীড়নের মাত্রা কেমন হতো, সেটি খুব একটা অস্পষ্ট নয়।

এত এত হত্যা মামলা, গণমাধ্যমের পরিবেশকে অস্থির করে তোলা, অসংখ্য সাংবাদিককে চাকরিচ্যুত করার মতো কোনও ঘটনাতেই বস্তুত এই সরকার সরাসরি জড়িত নয়। প্রথম আলো এবং ডেইলি স্টারে যখন হামলা হয়, অফিস দুটোকে পুড়িয়ে দেওয়া হয়- তখনও সেই সরকার নির্বিকার ছিল। তারা এই ভয়ংকর হামলার সঙ্গেও জড়িত নয়। কিন্তু দীর্ঘ ১৭ মাসের ছোট ছোট ঘটনা এই বড় হামলার বৈধতা তৈরি করে দিয়েছে। তাই শেষ পর্যন্ত তারা আর নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত শুধু এই ঘটনার জন্যই তারা দুঃখিত হয়েছে, কিছু ব্যবস্থা নিয়েছে। অথচ বাকি সব ঘটনায় এখনও তারা নীরব।  

লেখাটি শেষ করতে হবে অন্তর্বর্তী সরকারের রেখে যাওয়া এই নিপীড়নগুলোর বিষয়ে প্রশ্ন রেখে। তারা সাংবাদিকদের নামে  হত্যা মামলার সুরাহা করেনি, একক সিদ্ধান্তে ঢালাওভাবে সকল সাংবাদিকদের অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড বাতিল করার বিষয়েও কোনও সুরাহা হয়নি। যাদের হত্যা মামলা দিয়ে দিনের পর দিন জেলে আটক রাখা হয়েছে সেই বিষয়েও কোনও সুরাহা হয়নি। যাদের মবের ভয়ে চাকরিচ্যুত হলো, তাদের বিষয়েও কোনও সুরাহা হয়নি। যারা ভয় দেখিয়ে গণমাধ্যমে মব করলো- তাদের বিষয়েও এই সরকার কোনও সুরাহা করেনি। তাহলে এর সুরাহা কে করবে?

এত কিছু তারা চাপিয়ে দিয়ে যাবে সামনের নির্বাচিত সরকারের কাছে। আশঙ্কা হলো, গণমাধ্যম ও সাংবাদিকতা নিপীড়নে কি অন্তর্বর্তীকাল শেষ হবে? নাকি আমরা একটি দীর্ঘ অন্তর্বর্তীকাল চক্রে পড়তে যাচ্ছি?

লেখক: হেড অব রিসার্চ অ্যান্ড প্ল্যানিং, বাংলা ট্রিবিউন