আগামীকাল ১২ ফেব্রুয়ারি, বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচন। একটি নির্বাচনের আগে যেমন উত্তেজনা থাকে, তেমনি থাকে আশঙ্কা, প্রত্যাশা এবং আত্মসমালোচনার প্রয়োজন। ভোটের ঠিক আগমুহূর্তে দাঁড়িয়ে যে বাস্তব প্রশ্নটি উঠে আসে তা হলো– আমরা কি সত্যিই ‘নতুন বাংলাদেশ’-এর দিকে এগোচ্ছি, নাকি কেবল নতুন স্লোগানের আড়ালে পুরনো রাজনীতিকেই ফিরিয়ে আনছি?
জুলাই গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশকে শুধু একটি রাজনৈতিক বাঁকেই এনে দাঁড় করায়নি; এটি রাষ্ট্রচিন্তার ভেতর এক মৌলিক প্রশ্নও উত্থাপন করেছে। রাজপথে নামা মানুষের কণ্ঠে সেদিন যে দাবি উচ্চারিত হয়েছিল, তা কেবল ক্ষমতা পরিবর্তনের ছিল না; ছিল শাসনের ধরন, ক্ষমতার সীমা ও রাষ্ট্রের চরিত্র বদলের আকাঙ্ক্ষা।
‘নতুন বাংলাদেশ’ তখন আর স্লোগানমাত্র ছিল না; এটি হয়ে উঠেছিল এমন এক রাষ্ট্রকল্পনার প্রতিশব্দ, যেখানে নাগরিক ভয়ের পরিবর্তে মর্যাদায় বাঁচবে, ক্ষমতা হবে সীমিত ও জবাবদিহিমূলক, আর রাজনীতি হবে নৈতিক ও জনমুখী।
গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে তাই প্রশ্ন ওঠে, নতুন বাংলাদেশের পথে আমরা আসলে কতটা এগোতে পেরেছি?
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, জুলাই সনদ এবং জাতীয় সংসদ নির্বাচন– এই সময়টি ছিল প্রকৃত রূপান্তরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। প্রত্যাশা ছিল- এই পর্বে রাজনীতির ভাষা, আচরণ ও নৈতিক মানদণ্ডে দৃশ্যমান পরিবর্তন দেখা যাবে। কিন্তু নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক মাঠের চিত্র সেই প্রত্যাশাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে সহিংস সংঘর্ষ, প্রতিপক্ষকে প্রকাশ্যে হেনস্তা, অর্থের বিনিময়ে ধর্মগ্রন্থ ছুঁয়ে ভোটের শপথ করানো- এসব দৃশ্য বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন নয়। এগুলো পুরোনো বাংলাদেশেরই পরিচিত চর্চা। মুখে নতুন বাংলাদেশের অঙ্গীকার থাকলেও মাঠপর্যায়ে বহু দলের আচরণে ক্ষমতাকেন্দ্রিক ও সুবিধাবাদী রাজনীতির প্রত্যাবর্তন স্পষ্ট। নির্বাচন সামনে রেখে ব্যবসায়ীদের ওপর অঘোষিত চাপ, ‘ভারতপন্থি’ বা ‘স্বাধীনতাবিরোধী’ তকমা ছোড়াছুড়ি, দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির অভিযোগ-সব মিলিয়ে রাজনীতি যেন আবার পুরনো শব্দভাণ্ডারেই কথা বলছে।
‘নতুন বাংলাদেশ’ আলোচনায় জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-এর নাম বিশেষভাবে উচ্চারিত হয়। নিজেকে নতুন প্রজন্মের শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করা এই দলটির কাছে প্রত্যাশা ছিল আদর্শিক দৃঢ়তা এবং পুরনো রাজনৈতিক চর্চা থেকে স্পষ্ট বিচ্ছেদ। কিন্তু প্রচলিত রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে সমঝোতার অভিযোগ, জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্ক ঘিরে বিতর্ক এবং দলীয় অভ্যন্তরীণ বিভাজন ইঙ্গিত দেয় যে, তাদের ‘নতুনত্বের’ দাবি এখনও কঠিন পরীক্ষার মুখে। আদর্শের বদলে যদি কেবল নির্বাচনি সাফল্যই মুখ্য হয়ে ওঠে, তবে নতুন বাংলাদেশের ধারণা খুব সহজেই পুরনো রাজনীতির নতুন মোড়কে রূপ নিতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকা আরও সংবেদনশীল। নৈতিকতা ও শুদ্ধতার রাজনীতির দাবি থাকলেও মাঠপর্যায়ে ধর্মীয় আবেগকে ভোটের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ নতুন বাংলাদেশের রাষ্ট্রচিন্তার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ধর্ম যদি রাজনৈতিক চাপ বা ভয়ের ভাষায় ভোট আদায়ের মাধ্যম হয়, তবে রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্ক আর আস্থার থাকে না; তা নিয়ন্ত্রণের সম্পর্কে পরিণত হয়। জুলাই আন্দোলনের রাষ্ট্রচিন্তায় ধর্ম ছিল ব্যক্তিগত বিশ্বাসের জায়গায়। ধর্ম রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ছিল না। এই সীমারেখা অতিক্রম করা হলে শুদ্ধতার রাজনীতির দাবি বিশ্বাসযোগ্য থাকে না।
বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় সবচেয়ে প্রভাবশালী শক্তি বিএনপি। ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে তাদের ঐতিহাসিক ভূমিকা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবে ক্ষমতার সম্ভাবনা যত স্পষ্ট হয়েছে, ততই মাঠপর্যায়ে পুরনো সংস্কৃতির পরিচিত চিত্র ফিরে আসার অভিযোগ শোনা যাচ্ছে। শোনা যাচ্ছে এলাকাভিত্তিক আধিপত্য, দলীয় পরিচয়ে প্রভাব খাটানো এবং অতীতে ক্ষমতার ছায়ায় সক্রিয় থাকা গোষ্ঠীগুলোর পুনরুত্থানের কথা। এসব প্রবণতার বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয়ভাবে দৃঢ় ও নিঃশর্ত অবস্থান না এলে এটি স্পষ্ট হবে যে, পুরনো রাজনীতি থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে আসার মানসিক প্রস্তুতি এখনও অসম্পূর্ণ।
বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপিসহ অধিকাংশ দলের বক্তব্যে যে মিল লক্ষ করা যায় তা হলো, সবাই ক্ষমতায় গেলে দুর্নীতি, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির রাজনীতি বন্ধ করার আশ্বাস দিচ্ছে। কিন্তু রাজনৈতিক ইতিহাস বলে ভিন্ন কথা। দুর্নীতিবাজ ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠী বরাবরই ক্ষমতাসীন রাজনীতির ছায়াতলেই টিকে থেকেছে। নির্বাচন ঘিরে তারাই আবার সক্রিয় হয়ে উঠছে-সবাই তাদের চেনে, কিন্তু বাস্তবে কেউই যেন স্পষ্টভাবে তাদের পরিত্যাগ করতে প্রস্তুত নয়।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শিক্ষা ছিল ভিন্ন। নতুন বাংলাদেশ কোনও ভবিষ্যৎ প্রতিশ্রুতি নয়; এটি বর্তমান আচরণেই প্রমাণ করতে হবে। ক্ষমতার আগে নৈতিকতা, ক্ষমতার আগে সংযম, ক্ষমতার আগে আইনের প্রতি শ্রদ্ধা–এই মানদণ্ডেই নতুন রাজনীতির বিচার হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নেতাকর্মীদের সহিংসতা ও চাঁদাবাজিকে বারবার ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’ হিসেবে ব্যাখ্যা করার প্রবণতা দেখাচ্ছে, রাজনৈতিক সংস্কৃতির জায়গায় বাস্তব পরিবর্তন এখনও অনিশ্চিত।
ভোটের আগের এই সন্ধিক্ষণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো– নির্বাচন যেন কেবল ক্ষমতার পালাবদলের আয়োজন না হয়; এটি যেন রাজনৈতিক আচরণের মানদণ্ড নির্ধারণের পরীক্ষাও হয়। নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে যেই সরকার গঠন করুক, তাদের প্রথম দায়িত্ব হবে আইনের সমান প্রয়োগ নিশ্চিত করা, দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা বজায় রাখা এবং সহিংস রাজনীতির বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ও নিরপেক্ষ ব্যবস্থা নেওয়া। অন্যথায় ‘নতুন বাংলাদেশ’ কেবল পোস্টার, মঞ্চ ও ইশতেহারের অলংকার হয়ে থাকবে।
নাগরিকেরা এমন একটি রাষ্ট্র দেখতে চায়, যেখানে আইন সবার জন্য সমান; দলীয় পরিচয় কাউকে ন্যায়বিচারের ঊর্ধ্বে তুলবে না; যেখানে উন্নয়ন কেবল অবকাঠামোয় নয়, মানুষের জীবনমান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও মর্যাদায় প্রতিফলিত হবে। জুলাই আন্দোলন সেই রাষ্ট্রচিন্তার দরজা খুলে দিয়েছিল। কিন্তু সেই দরজা দিয়ে এগিয়ে যাওয়া নির্ভর করছে রাজনীতির আচরণগত রূপান্তরের ওপর।
শেষ পর্যন্ত নাগরিক বিবেকের সামনে প্রশ্নটি অত্যন্ত সরল– ‘নতুন বাংলাদেশ’ কি কেবল নির্বাচনি স্লোগানেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি ক্ষমতার ব্যবহার, দলীয় শৃঙ্খলা ও আইনের শাসনে তার বাস্তব প্রতিফলন ঘটবে? যদি পুরনো সংস্কৃতি ও দ্বিচারিতাই টিকে থাকে, তবে জুলাই গণঅভ্যুত্থান ইতিহাসে আরেকটি হারানো সুযোগ হিসেবেই বিবেচিত হবে। আর যদি রাজনীতি সত্যিই বদলায়, তবে নতুন বাংলাদেশ কোনও দূরের স্বপ্ন নয়-এটি এবারের ভোটের পর থেকেই রাজনৈতিক আচরণের ভেতর দৃশ্যমান হতে শুরু করতে পারে।
এ সময়ের রাজনীতিকরা যদি বিচক্ষণতা, সংযম ও নৈতিক সাহস নিয়ে দেশকে ‘নতুন বাংলাদেশ’-এর ঠিকানায় নিয়ে যেতে ব্যর্থ হন, তবে গণঅভ্যুত্থানের ত্যাগ কেবল স্মারক হয়ে থাকবে; আর যদি সফল হন, তবে এ নির্বাচনই হতে পারে রাষ্ট্রের চরিত্র বদলের ঐতিহাসিক সূচনা।
লেখক: কথাসাহিত্যিক