১২ ফেব্রুয়ারি: গণতন্ত্রের মোড় ঘোরানোর মুহূর্ত নাকি নতুন বাস্তবতার সূচনা

বাংলাদেশ আবারও একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক মুহূর্তের সামনে দাঁড়িয়ে। ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং একই দিনে একটি জাতীয় গণভোট। দীর্ঘ প্রায় ১৮ মাস দায়িত্ব পালন শেষে অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে এই নির্বাচন শুধু একটি সাংবিধানিক প্রক্রিয়া নয়, বরং দেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার একটি বড় পরীক্ষা হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।

এই নির্বাচন এমন এক বাস্তবতায় অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যেখানে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, আস্থার সংকট এবং দীর্ঘদিনের জমে থাকা প্রশ্নগুলো একসঙ্গে সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই রাজনীতি সচেতন মহল এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খেয়েছে, নির্বাচন কবে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোর একটি অংশ, বিশেষ করে বিএনপি, শুরু থেকেই দ্রুত নির্বাচনের দাবি জানিয়ে আসছিল। অন্যদিকে সরকার বারবার বলেছে, কেবল নির্বাচন আয়োজনই তাদের লক্ষ্য নয়; বরং রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার সম্পন্ন করেই নির্বাচন আয়োজন করা হবে।

এই দুই অবস্থানের টানাপোড়েনে একসময় জনমনে সংশয় তৈরি হয় নির্বাচন আদৌ সময়মতো হবে তো? ২০২৫ সালের শুরু থেকেই এই আলোচনা আরও জোরালো হয়। সরকারের বিভিন্ন বক্তব্য ও ব্যাখ্যা অনেক ক্ষেত্রে সেই সংশয় দূর করার বদলে বরং অনিশ্চয়তাই বাড়িয়েছে। শেষ পর্যন্ত সরকার নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেছে এবং এখন প্রশ্নটা আর ‘নির্বাচন হবে কি না’ নয়, বরং ‘নির্বাচন কতটা অবাধ ও নিরপেক্ষ হবে’-সেটাই মূল আলোচ্য।

এবারের নির্বাচনের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এটি অনুষ্ঠিত হচ্ছে ক্ষমতা হারানো বিগত সরকারের রাজনৈতিক দলটির অংশগ্রহণ ছাড়া। নির্বাহী আদেশে দলটির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ থাকায় তাদের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ নেই। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন পরিস্থিতি নতুন নয়, তবে এটি নিঃসন্দেহে একটি ব্যতিক্রমী বাস্তবতা তৈরি করেছে। বড় একটি রাজনৈতিক শক্তির অনুপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত নির্বাচন কতটা প্রতিনিধিত্বশীল হবে-এই প্রশ্ন ভবিষ্যতেও আলোচনায় থাকবে।

তবে এটাও সত্য, রাজনৈতিক প্রক্রিয়া থেমে থাকতে পারে না। নির্বাচন আয়োজনের মাধ্যমে অন্তর্বর্তী সরকার সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখার চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে এটি একটি বাস্তবতা যে, নিষিদ্ধ দলটির পক্ষ থেকে এখনও নির্বাচন প্রতিহত করার কোনও ঘোষণা আসেনি। বরং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের খবরে দেখা গেছে, তারা তাদের নেতাকর্মীদের ভোটকেন্দ্রে না যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। এই অবস্থান একদিকে সহিংসতার আশঙ্কা কিছুটা কমিয়েছে।  

নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা অবশ্য দৃশ্যমান। প্রচারণা, বক্তব্য ও মাঠপর্যায়ের তৎপরতায় বোঝা যাচ্ছে-এই নির্বাচনকে ঘিরে রাজনীতির চাকা ঘুরছে। তবে প্রতিযোগিতার পাশাপাশি সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা হলো সহনশীল আচরণ।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে জয়-পরাজয়কে স্বাভাবিকভাবে মেনে নেওয়ার সংস্কৃতি এখনও পুরোপুরি গড়ে ওঠেনি। নির্বাচন মানেই সহিংসতা, সংঘাত বা প্রতিহিংসার রাজনীতি-এই ধারণা থেকে বেরিয়ে আসার সময় অনেক আগেই পেরিয়ে গেছে। 

এবারের নির্বাচন আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি কারণে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি একই দিনে গণভোট অনুষ্ঠিত হচ্ছে। অর্থাৎ ভোটারদের সামনে দ্বৈত দায়িত্ব-একদিকে প্রতিনিধি নির্বাচন, অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মতামত প্রদান। গত কয়েকটি নির্বাচনে সাধারণ মানুষের বড় একটি অংশ ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছে। ফলে এবারের নির্বাচনে ভোটারদের অংশগ্রহণ যেন গণতান্ত্রিক অধিকার পুনরুদ্ধারের একটি সুযোগও বটে।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট ভোটকেন্দ্রের একটি বড় অংশকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে উদ্বেগের বিষয়। আমরা কোনও সহিংসতা প্রত্যাশা করছি না। বরং প্রত্যাশা করছি– রাষ্ট্র তার সর্বোচ্চ সক্ষমতা দিয়ে ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে এবং রাজনৈতিক দলগুলো দায়িত্বশীল আচরণ করবে।

নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হলো-ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা। বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতায় নির্বাচনকে ঘিরে অতীতে কিছু ক্ষেত্রে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ হয়রানি, ভয়ভীতি বা সহিংসতার শিকার হয়েছেন। এই বাস্তবতা থেকে বেরিয়ে আসা এখন সময়ের দাবি। এবারের নির্বাচনে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুরা যেন কোনও ধরনের অহেতুক হয়রানি, ভয়ভীতি বা বৈষম্যের শিকার না হন, এটি নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত।

বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার আরেকটি বড় দুর্বলতা হলো সংসদে কার্যকর বিরোধী দলের অভাব। একটি শক্তিশালী বিরোধী দল কেবল সরকারের সমালোচক নয়; বরং তা রাষ্ট্র পরিচালনায় ভারসাম্য আনে, জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে এবং গণতন্ত্রকে কার্যকর করে তোলে। এই নির্বাচন যদি একটি বাস্তব ও শক্তিশালী বিরোধী দল তৈরি করতে পারে, তবে সেটি হবে দেশের জন্য বড় অর্জন।

এ দেশের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং জবাবদিহিতার অভাব প্রত্যক্ষ করেছে। মানুষ এখন আইনের শাসনের বাস্তব প্রয়োগ দেখতে চায়। ধর্ম, মত বা রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে সমান নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করা– এই প্রত্যাশাও ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।

১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন তাই কেবল একটি নির্বাচন নয়– এটি রাষ্ট্র ও জনগণের মধ্যকার আস্থার সম্পর্ক পুনর্গঠনের একটি সুযোগ। দীর্ঘ অস্থিরতার পর মানুষ স্বস্তি চায়, স্থিতিশীলতা চায়, এবং এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি চায় যেখানে ক্ষমতা নয়, জনগণই হবে মূল শক্তি। 

এই প্রেক্ষাপটে সরকারের প্রতি জনগণের প্রত্যাশা অত্যন্ত স্পষ্ট। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জনসাধারণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রকে সর্বোচ্চ সতর্কতা, দায়িত্বশীলতা এবং দৃঢ়তা দেখাতে হবে। নির্বাচনের আগে, নির্বাচনের দিন এবং নির্বাচন পরবর্তী সময়- সব পর্যায়েই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা, সহিংসতা প্রতিরোধ করা, সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সাধারণ ভোটারদের নির্ভয়ে ভোট দেওয়ার পরিবেশ তৈরি করা, এসব ক্ষেত্রে কোনও ধরনের শৈথিল্য গ্রহণযোগ্য হবে না।

কারণ একটি নির্বাচন শুধু ব্যালটের হিসাব নয়; এটি রাষ্ট্রের চরিত্রের প্রতিফলন। এই নির্বাচন যদি অবাধ, সুষ্ঠু, সহিংসতামুক্ত এবং অংশগ্রহণমূলক হয়, তবে তা শুধু একটি সরকার গঠন করবে না; বরং বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ পথকে আরও শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করাবে।

১২ ফেব্রুয়ারি হোক এমন একটি দিন, যেদিন ভোটার নির্ভয়ে ভোট দেবেন, সংখ্যালঘু নিরাপদ বোধ করবেন, আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে এবং রাষ্ট্র প্রমাণ করবে, জনগণের নিরাপত্তা ও অধিকার রক্ষাই তার প্রথম অঙ্গীকার।

লেখক: মানবাধিকার কর্মী