ইরান যুদ্ধ এখন আর বাংলাদেশের জন্য কেবল দূরবর্তী কোনও ভূ-রাজনৈতিক গল্প নয়। এর প্রভাব ইতোমধ্যেই জ্বালানি খরচ, বিদ্যুৎ সরবরাহের ওপর চাপ, পণ্য পরিবহনে বিঘ্ন এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামের মধ্য দিয়ে দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে।
তেলের দাম কত বাড়বে, সেটিই এখন বড় কথা নয়; বড় চ্যালেঞ্জ হলো হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনার কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহের যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে তা মোকাবিলা করা। জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরশীল বাংলাদেশের জন্য এটি এখন কেবল তেলের বাজার নয়, বরং আমাদের আর্থিক ব্যবস্থাপনা, বৈদেশিক অর্থায়ন এবং সরবরাহ চেইনের সক্ষমতা প্রমাণের লড়াই।
তেলের দাম আগামী দিনগুলোতে কিছুটা কমুক বা বাড়ুক, বাংলাদেশের মূল সংকট অপরিবর্তিতই থেকে যাচ্ছে। কেননা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ এবং পণ্য পরিবহনের যেকোনও অস্থিরতায় আমাদের সামগ্রিক অর্থনীতি এখনও ভীষণভাবে নাজুক।
এই সংকটের কারণে সর্বপ্রথম এবং সরাসরি আঘাত আসবে জ্বালানি খাতের ওপর। বর্তমানে জ্বালানি আমদানিতে বাংলাদেশের বছরে খরচ হচ্ছে প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলার। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখন যদি বিশ্ববাজারে তেলের দাম ১০ ডলারও বাড়ে, তবে এই খাতে আমাদের খরচ আরও প্রায় ৯০০ মিলিয়ন ডলার বেড়ে যাবে।
এই চাপের প্রভাব বাংলাদেশে ইতোমধ্যেই দৃশ্যমান। জ্বালানি রেশনিং, ডিজেল বিক্রিতে বিধিনিষেধ, গ্যাস সাশ্রয় নীতি, বিদ্যুৎ উৎপাদন সচল রাখতে পাঁচটি সরকারি সার কারখানার মধ্যে চারটির উৎপাদন বন্ধ রাখা, বিদ্যুৎ বাঁচাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস দ্রুত শেষ করা এবং চড়া দামে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কেনার মতো ঘটনাগুলো তারই প্রতিফলন।
সরকার এখন কেবল তাৎক্ষণিক রেশনিংয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং একটি বৃহত্তর ‘কনটেইনমেন্ট স্ট্র্যাটেজি’ বা সংকট নিয়ন্ত্রণ কৌশলের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। জ্বালানি আমদানির জন্য নতুন নতুন দেশ খোঁজার পাশাপাশি জ্বালানি তেল ও এলএনজি কেনা অব্যাহত রাখতে সরকার বিদেশ থেকে ২ বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ সংগ্রহের চেষ্টা চালাচ্ছে।
এই চাপগুলো দ্রুত অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে ছড়িয়ে পড়ছে।
দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে খাদ্য ও পণ্য পরিবহনের মূল চাবিকাঠি হলো জ্বালানি ও পরিবহন খরচ। যখন ডিজেলের দাম বাড়ে বা সরবরাহ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে, তখন শাকসবজি, পোল্ট্রি, চাল, ভোজ্যতেল এবং অন্যান্য নিত্যপণ্যের পরিবহন খরচ বেড়ে যায়।
এই বর্ধিত খরচ ধাপে ধাপে কৃষক থেকে পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতা হয়ে সাধারণ ক্রেতার ঘাড়ে চাপে, যার ফলে স্থানীয় বাজারে দাম বেড়ে যায়।
এমনকি পরিবহন ও লজিস্টিক খরচের সামান্য বৃদ্ধিও সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে বড় প্রভাব ফেলে।
বাংলাদেশ এমন এক সময়ে এই বৈশ্বিক সংকটের মুখে পড়েছে, যখন দেশের মূল্যস্ফীতি আগে থেকেই ছিল ঊর্ধ্বমুখী। গত ফেব্রুয়ারিতে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছিল ৯.১৩ শতাংশে, যার মধ্যে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৯.৩০ শতাংশ। এই পরিসংখ্যানই বলে দেয় যে, বিশ্ববাজারে জ্বালানি ও পরিবহন খরচ বাড়ার আগেই সাধারণ মানুষের অবস্থা কতটা নাজুক অবস্থায় ছিল।
এই সংকটের ধাক্কা এখন আর শুধু পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ নেই। এশীয় জ্বালানি বাজারের মাধ্যমে একটি দ্বিতীয় পর্যায়ের আঞ্চলিক চাপ তৈরি হচ্ছে। চীনের জ্বালানি তেল রফতানির ওপর সাময়িক নিষেধাজ্ঞা এই অঞ্চলে ডিজেল, গ্যাসোলিন এবং জেট ফুয়েলের সরবরাহকে আরও সংকুচিত করেছে। এর ফলে জ্বালানির দাম যেমন বাড়ছে, তেমনি বিকল্প উৎসের সন্ধানে দেশগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতাও তীব্র হচ্ছে।
আমদানিনির্ভর দেশ হিসেবে বাংলাদেশের জন্য এই সংকট সামাল দেওয়া এখন আরও কঠিন হয়ে উঠবে। কারণ শুধু উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে সরবরাহ বন্ধ হওয়াই নয়, বরং এশিয়ার বাজারে বিকল্প জ্বালানির চড়া দাম এবং সরবরাহের অনিশ্চয়তা আমাদের খরচকে কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে।
জ্বালানি ও জাহাজ ভাড়া বাড়ার যে আশঙ্কার কথা বলা হচ্ছিল, বাংলাদেশের রফতানি খাতের জন্য তা এখন আর কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ নেই। বাস্তবিকভাবেই এই খাতের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হতে শুরু করেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের আকাশপথ বন্ধ হওয়া এবং পণ্য পরিবহনে বাড়তি খরচ ও বিমার বোঝা বাংলাদেশসহ পুরো দক্ষিণ এশিয়ার রফতানিকে বাধাগ্রস্ত করছে। সময়মতো পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা আমাদের রফতানি খাতের প্রধান শক্তি। কিন্তু বর্তমান বিশৃঙ্খলা আমাদের ব্যবসায়িক লেনদেনে টানাপড়েন তৈরি করছে এবং সময়মতো অর্ডার সরবরাহ করতে না পারায় বিশ্ববাজারে আমাদের সক্ষমতা ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
সময়মতো পণ্য পৌঁছানো যাদের জন্য জরুরি, সেই রফতানিকারকরাই এখন সবচেয়ে বিপাকে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে শাকসবজি ও পচনশীল দ্রব্য পাঠানো গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে বন্ধ। এর ওপর কার্গো লজিস্টিকসে জট এবং একের পর এক ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় এই খাতে অস্থিরতা চরমে পৌঁছেছে।
আমাদের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান স্তম্ভ রেমিট্যান্সের সঙ্গেও এই সংকটের নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। বাংলাদেশ এখনও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে আসা প্রবাসীদের আয়ের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। আশার কথা হলো, চলমান সংঘাতের মধ্যেও প্রবাসী আয়ের গতি কমেনি; বরং ঈদের আগে প্রবাসীরা বেশি টাকা পাঠানোয় মার্চের শুরুতেই রেমিট্যান্স প্রবাহে বড় ধরনের উল্লম্ফন দেখা গেছে।
তবে রেমিট্যান্সের এই বর্তমান গতি দেখে আত্মতুষ্টির সুযোগ নেই। যুদ্ধ যদি দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে শ্রমের চাহিদা, নতুন জনশক্তি রফতানি কিংবা প্রবাসীদের ব্যক্তিগত আয় কমে যেতে শুরু করে— তবে তার নেতিবাচক প্রভাব শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের ওপর গিয়ে পড়বে।
স্বল্পমেয়াদে এই অস্থিতিশীলতা নিয়ন্ত্রণে দক্ষ অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা অপরিহার্য। এর মধ্যে রয়েছে জ্বালানি ও গ্যাস সংকটের হাত থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনকে রক্ষা করা, পণ্য পরিবহনের বাধা দূর করা এবং রফতানিমুখী শিল্প যাতে লজিস্টিক জটিলতায় পঙ্গু হয়ে না পড়ে তা নিশ্চিত করা।
কৃষি ও রফতানিমুখী শিল্প খাতের জন্য নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। সরকারি প্রতিষ্ঠান ও শিল্প কারখানায় জ্বালানি সাশ্রয়ী অভ্যাস গড়ে তোলার পাশাপাশি গ্যাস ও জ্বালানি বণ্টন ব্যবস্থাকে আরও উন্নত করতে হবে।
একইভাবে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের সঠিক ব্যবস্থাপনাও অত্যন্ত জরুরি। এজন্যই জ্বালানি ও এলএনজি আমদানির জন্য ২ বিলিয়ন ডলারের বেশি বৈদেশিক অর্থায়ন সংগ্রহের সরকারি প্রচেষ্টাটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এটি মূলত একটি জ্বালানি সংকটকে ‘ব্যালেন্স-অফ-পেমেন্ট’ বা লেনদেনের ভারসাম্য এবং প্রবৃদ্ধির বড় ধরনের সংকটে রূপান্তর হওয়া থেকে ঠেকানোর একটি সক্রিয় চেষ্টা।
যখন বিশ্বব্যাপী তেলের দাম বাড়ে, তখন আমদানি খরচ বাড়ে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ তীব্র হয়। তাই নীতিনির্ধারকদের উচিত বিলাসবহুল পণ্যের আমদানি সীমিত করে জ্বালানি, খাদ্যপণ্য এবং শিল্পের কাঁচামালের মতো জরুরি আমদানিতে অগ্রাধিকার দেওয়া।
বৈধ পথে রেমিট্যান্সের প্রবাহ একটি বড় রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করছে, তবে যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে এই প্রবাহ নাও থাকতে পারে।
তাই মনে রাখা জরুরি, সাময়িক দুর্যোগ মোকাবিলাই শেষ কথা নয়। বিশ্ববাজারের যেকোনও নেতিবাচক প্রভাব যাতে আমাদের অর্থনীতিকে বারবার পঙ্গু করতে না পারে, সেজন্য দেশের অর্থনৈতিক কাঠামোগত দুর্বলতাগুলোও কমাতে হবে।
আমদানিকৃত জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর অতি-নির্ভরশীলতা আমাদের অর্থনীতিকে বিশ্ববাজারের মুখাপেক্ষী করে করে রাখে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং জ্বালানি সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এই নির্ভরতা কমানো সম্ভব।
সৌরশক্তি, গ্রিড আধুনিকীকরণ এবং সাশ্রয়ী প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ দীর্ঘমেয়াদে আমাদের তেলের বাজারের অস্থিরতা থেকে মুক্তি দিতে পারে।
একই সঙ্গে শিল্পের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। আধুনিক উৎপাদন প্রযুক্তি এবং ডিজিটাল সরবরাহ চেইন ব্যবস্থা গ্রহণ করলে উৎপাদন খরচ কমবে এবং বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বাড়বে।
শিল্প-কারখানাগুলো যখন আরও দক্ষতার সঙ্গে পরিচালিত হবে এবং অস্থির উপকরণগুলোর ওপর কম নির্ভরশীল হবে, তখন তারা জ্বালানির দামের ওঠানামা কিংবা পণ্য পরিবহনের বিঘ্ন আরও সহজে সামলাতে পারবে।
বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি একটি গভীর সত্যকে সামনে নিয়ে এসেছে: অর্থনৈতিক সক্ষমতা বা ‘রেজিলিয়েন্স’কে কেবল প্রবৃদ্ধির একটি উপজাত হিসেবে দেখলে চলবে না, বরং এটিকে অর্থনৈতিক কাঠামোর অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
তাৎক্ষণিক চাপ সামলানো জরুরি, কিন্তু বৈশ্বিক অস্থিরতার ঝুঁকি না কমালে একই ধরনের ধাক্কা বারবার দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে আঘাত হানতে থাকবে।
এই বৃহত্তর চ্যালেঞ্জটি আমার চলমান গবেষণা ‘আফনান ইকুইলিব্রিয়াম’-এর মাধ্যমেও বোঝা যায়। এটি এমন একটি ফ্রেমওয়ার্ক যা প্রযুক্তি, উৎপাদনশীলতা, সক্ষমতা এবং বৈশ্বিক চাপের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করে।
আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর অধিক নির্ভরশীলতা আমাদের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিয়েছে। অন্যদিকে জ্বালানি, লজিস্টিকস এবং রফতানি ব্যবস্থায় সীমিত সক্ষমতা বৈশ্বিক সংকটকে দ্রুত অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ করে দিয়েছে।
সক্ষমতার অভাব থাকলে বৈশ্বিক সংকটের ধাক্কা শুধু আমদানিতেই আটকে থাকে না। এটি দাবানলের মতো পুরো অর্থনীতিতে ছড়িয়ে যায়— যার প্রভাবে মূল্যস্ফীতির মাধ্যমে জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যায়, ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবির হয়ে পড়ে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় অসহনীয় হয়ে ওঠে।
তাই বর্তমান সংকটটি কেবল একটি সাময়িক গোলযোগ নয়, বরং এটি দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতার এক বৃহত্তর পরীক্ষা।
যুদ্ধ হয়তো একদিন থেমে যাবে, কিন্তু বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর ওপর এর অর্থনৈতিক প্রভাব আরও দীর্ঘস্থায়ী হবে। শিক্ষাটা পরিষ্কার: চ্যালেঞ্জ শুধু আজকের ধাক্কা সামলানো নয়, বরং ভবিষ্যতের ধাক্কাগুলো সইবার মতো কাঠামোগত সক্ষমতা তৈরি করা। বাংলাদেশ এটি কতটা ভালোভাবে করতে পারে, তার ওপরই নির্ভর করবে এই সংকট থেকে উত্তরণ এবং পরবর্তী সংকটের বিরুদ্ধে আমাদের টিকে থাকা।
লেখক: বিশ্লেষক ও লেখক