জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সংকোচনমূলক শিক্ষানীতি কেন? 

বাংলাদেশে জ্বালানি সাশ্রয়ের উদ্দেশ্যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে অনলাইন-অফলাইন মিলিয়ে হাইব্রিড শিক্ষাব্যবস্থা চালুর যে সিদ্ধান্ত বা আলোচনা সামনে এসেছে, তা নিয়ে ইতোমধ্যে নানা প্রশ্ন উঠেছে। সরকার মনে করছে, শিক্ষার্থীদের নিয়মিত যাতায়াত কমালে পেট্রোল, ডিজেল ও অকটেনের ব্যবহার কমবে এবং এতে জ্বালানি সংকট কিছুটা লাঘব হবে। নিজেও শিক্ষার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থেকে করোনাকালীন সময়ে অনলাইন শিক্ষার কুফলের যে বাস্তবতা দেখেছি এবং উপলব্ধি করেছি, অন্যান্য শিক্ষকেরাও ঠিক একই রকম অনুভূতির প্রকাশ করবে, এটা বলতে পারি| এই অনুভূতির আলোকে সরকারের সিদ্ধান্তটি ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছি। 

হাইব্রিড শিক্ষাব্যবস্থা চালুর সিদ্ধান্ত আসলেই কি একটি বাস্তবমুখী সিদ্ধান্ত? হিসাবের বিদ্যমান সমীকরণটাই কি আসলেই এত সহজ? বিষয়টিকে কি গভীরভাবে  দেখার সুযোগ নেই? নাকি জ্বালানি সংকটকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে হাম অথবা অজানা কোনও মহামারি ছড়িয়ে পড়েছে বলে আড়ালে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে? হাম ছাড়াও, জ্বর-সর্দি এবং ডায়রিয়ার প্রকোপ সারা দেশে যেভাবে ছড়িয়ে পড়েছে তাতে এ ধরনের আশঙ্কা অনেকেই করছেন। 

প্রথমেই জ্বালানি সাশ্রয়ের বিষয়টি দেখা যাক। বাংলাদেশে প্রতিদিন যে পরিমাণ জ্বালানি ব্যবহৃত হয়, তার বড় অংশ বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা ও পণ্য পরিবহনে ব্যবহৃত হয়। পরিবহন খাতে শিক্ষার্থীদের যাতায়াত একটি অংশ হলেও সেটি মোট ব্যবহারের তুলনায় খুব বড় নয়। বেশিরভাগ শিক্ষার্থী বাস, লেগুনা, অটোরিকশা বা রিকশায় করে যাতায়াত করে, যেগুলো একসঙ্গে অনেক যাত্রী বহন করে। হরতাল কিংবা ধর্মঘট,  অথবা কঠোর বিধি নিষেধ না থাকলে যোগাযোগের এই মাধ্যমগুলো বন্ধ হয়ে যায় না। ফলে বাস্তবে জ্বালানি সাশ্রয় খুব সীমিত। 

অপরদিকে অনলাইন শিক্ষার জন্য যে বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট ব্যবহার হয়, সেটিও জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি বড় অংশ গ্যাস, ডিজেল ও আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর নির্ভর করে। অর্থাৎ, অনলাইন ক্লাস করার জন্য যে বিদ্যুৎ ব্যবহৃত হয়, সেটিও জ্বালানি খরচ বাড়ায়। একটি সাধারণ হিসাব করলে দেখা যায়, যদি দেশের কয়েক কোটি শিক্ষার্থী প্রতিদিন ২-৩ ঘণ্টা অনলাইন ক্লাস করে, তাহলে মোবাইল, ল্যাপটপ, রাউটার ও সার্ভার চালাতে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয়। ফলে একদিকে যাতায়াতে কিছুটা সাশ্রয় হলেও অপরদিকে বিদ্যুৎ খাতে খরচ বেড়ে যায়। 

এবার আসা যাক ডিজিটাল অবকাঠামোর বাস্তবতায়। বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা অনেক বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু মানসম্মত ও নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট এখনো সবার কাছে পৌঁছায়নি। ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ বসবাসকারী শহরাঞ্চলে যেখানে ব্রডব্যান্ড সহজলভ্য, সেখানে গ্রামাঞ্চলে এখনো অনেক জায়গায় নেটওয়ার্ক দুর্বল। অনেক সময় ফোর-জি সিগন্যালও ঠিকমতো পাওয়া যায় না। তার ওপর বিদ্যুৎ বিভ্রাট একটি বড় সমস্যা। ফলে অনলাইন ক্লাস চালানো অনেক শিক্ষার্থীর জন্যই কষ্টকর হয়ে পড়ে। 

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, গ্রামীণ পরিবারের একটি বড় অংশের কাছে স্মার্টফোন বা কম্পিউটার নেই। আবার অনেক পরিবারে একটি ডিভাইস একাধিক সদস্য ব্যবহার করে। ধরুন, একটি পরিবারে দুই বা তিনজন শিক্ষার্থী আছে, কিন্তু একটি মাত্র স্মার্টফোন। তখন তারা একই সময়ে ক্লাস করতে পারবে না। এতে শিক্ষার ধারাবাহিকতা ভেঙে যায় এবং অনেক শিক্ষার্থী পিছিয়ে পড়বে। 

কোভিড-১৯ সময়ের অভিজ্ঞতা আমাদের সামনে স্পষ্ট উদাহরণ হিসেবে রয়েছে। তখন প্রায় দুই বছর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল এবং অনলাইন ক্লাস চালু ছিল। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, এই সময় শিক্ষার্থীদের শেখার মান উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। প্রাথমিক স্তরের অনেক শিক্ষার্থী পড়া ও লেখা ভুলে গেছে, মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীরা পরীক্ষার প্রস্তুতিতে পিছিয়ে পড়েছে এবং বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে গবেষণা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। 

২০২১ সালে কোভিড-১৯ সময়ে বাংলাদেশের ৭১টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫,০৪০ জন শিক্ষার্থীর ওপর আমার নিজস্ব কোনও একটি জরিপে দেখা যায়, অনলাইন শিক্ষা গুরুতর সীমাবদ্ধতার মধ্যে পরিচালিত হয়েছে। যদিও ৬৪ শতাংশ শিক্ষার্থীর ডিভাইস ছিল, মাত্র ৪৪ শতাংশ নিয়মিত ইন্টারনেট পেত এবং প্রায় ৪২ শতাংশ শিক্ষার্থী ইন্টারনেটের অভাবে ক্লাসে অংশ নিতে পারেনি, গ্রামাঞ্চলে এই সমস্যা আরও বেশি (৬৪ শতাংশ)। পাশাপাশি ৪০ শতাংশ শিক্ষার্থী প্রয়োজনীয় পাঠ্যসামগ্রী পায়নি এবং ২৫ শতাংশ পড়াশোনার উপযুক্ত পরিবেশ পায়নি। এর ফলে ৫৪.৯ শতাংশ শিক্ষার্থী ৬-১২ মাস এবং ২৭.২ শতাংশ এক বছরের বেশি সময় অ্যাকাডেমিকভাবে পিছিয়ে পড়ে, বিশেষ করে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে এমন প্রভাব খুব সহজেই বলে দিতে পারে কলেজ এবং স্কুল পর্যায়ে এর আকার কেমন হতে পারে। পাঁচ বছর পরে হলেও আবারও অনলাইন ক্লাস চালু হলে চিত্রটির খুব একটা পরিবর্তন হওয়ার কথা নয়। 

শিক্ষা শরীরের চাহিদা খাদ্যের মতো  কোনও ব্যাপার নয় যে মুখে জোর করে ঢুকে নিলেই তা শরীরের কাজে লাগবে। শিক্ষা গ্রহণের পাশাপাশি শেখার ব্যাপার রয়েছে। বিশ্বব্যাংক এক প্রতিবেদনে বলেছিল, কোভিডের সময় উন্নয়নশীল দেশগুলোতে “learning loss” বা শেখার ক্ষতি মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। বাংলাদেশেও এর প্রভাব পড়েছে। অনেক শিক্ষার্থী আর স্কুলে ফিরে আসেনি, ড্রপআউট হার বেড়েছে। এই বাস্তবতা মাথায় রেখে আবার অনলাইননির্ভর শিক্ষায় ফিরে যাওয়া কতটা যুক্তিসঙ্গত- সেটি ভাবার বিষয়। 

শিক্ষার মানের প্রশ্নটি এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অনলাইন ক্লাসে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর সরাসরি যোগাযোগ কমে যায়। ক্লাসে প্রশ্ন করা, আলোচনা করা, বোঝার সমস্যা দূর করা, এসব অনেক বোঝাপড়া হীন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে ছোট শিক্ষার্থীরা দীর্ঘ সময় স্ক্রিনের সামনে বসে থাকতে পারে না। ফলে তারা ঠিকমতো শেখে না। 

বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে সমস্যা আরও জটিল। ল্যাব ক্লাস, প্রোগ্রামিং, প্র্যাকটিক্যাল কাজ, গ্রুপ ডিসকাশন এসব অনলাইন মাধ্যমে পুরোপুরি করা সম্ভব নয়। বিজ্ঞান, প্রকৌশল বা চিকিৎসা শিক্ষায় তো এটি আরও বড় সমস্যা। ফলে শিক্ষার গুণগত মান কমে যায় এবং একরকম স্থবির হয়ে পড়ে। 

শিক্ষা শুধু জ্ঞান অর্জনের বিষয় নয়, এটি একটি সামাজিক প্রক্রিয়া। স্কুল বা বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে শিক্ষার্থীরা বন্ধুদের সাথে মিশে, দলগতভাবে কাজ করতে শেখে, ব্যক্তিত্ব গঠন, ব্যক্তি আচরণ, নেতৃত্বের গুণাবলি অর্জন করে। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কার্যক্রম, খেলাধুলা, বিতর্ক এসব শিক্ষার্থীর ব্যক্তিত্ব গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অনলাইন শিক্ষায় এই সবকিছু প্রায় অনুপস্থিত। 

মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘ সময় মোবাইল বা কম্পিউটারের সামনে বসে থাকলে চোখের সমস্যা, মাথাব্যথা, ঘুমের সমস্যা দেখা দেয়। পাশাপাশি একাকীত্ব ও মানসিক চাপ বাড়ে। অনেক শিক্ষার্থী বিষণ্নতায় ভুগতে শুরু করে। মানসিক স্বাস্থ্যের এই ব্যাপারটিকে বাংলাদেশের মানুষ এবং সরকার সব সময় গুরুত্বহীন ভাবে  দেখে আসছে। আমাদের দেশে এই বিষয়গুলো নিয়ে সচেতনতা কম হওয়ায় সমস্যা আরও বাড়তে পারে। 

অর্থনৈতিক দিক থেকেও অনলাইন শিক্ষা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। একটি স্মার্টফোন কিনতে কমপক্ষে ১০-১৫ হাজার টাকা লাগে। একটি ল্যাপটপ কিনতে ৪০-৫০ হাজার টাকা বা তার বেশি প্রয়োজন। এর সঙ্গে প্রতি মাসে ইন্টারনেট খরচ যোগ হয়। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য এটি একটি বড় বোঝা। ফলে অনেক শিক্ষার্থী অনলাইন ক্লাসে অংশ নিতে পারে না বা নিয়মিত থাকতে পারে না। 

শিক্ষকদের ক্ষেত্রেও সমস্যা রয়েছে। অনেক শিক্ষক এখনো অনলাইন শিক্ষাদানে পুরোপুরি অভ্যস্ত নন। অনলাইন ক্লাসে কীভাবে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ বাড়ানো যায়, কীভাবে মূল্যায়ন করা যায়, এসব বিষয়ে প্রশিক্ষণের অভাব রয়েছে। ফলে অনেক সময় ক্লাস একমুখী হয়ে যায় এবং শিক্ষার্থীরা আগ্রহ হারায়। 

সবচেয়ে বড় বিষয় হলো— শিক্ষা একটি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ। আজকের শিক্ষার্থীরা আগামী দিনের কর্মশক্তি। যদি তাদের শিক্ষার মান কমে যায়, তাহলে ভবিষ্যতে দেশের উন্নয়ন ব্যাহত হবে। দক্ষ জনশক্তি তৈরি না হলে অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে, বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় দেশ পিছিয়ে পড়বে। 

তাই হাইব্রিড শিক্ষানীতি চালুর আগে ভালোভাবে চিন্তা করা জরুরি। হঠাৎ করে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়। আগে পরীক্ষামূলকভাবে কিছু প্রতিষ্ঠানে চালু করে ফলাফল দেখা যেতে পারে। পাশাপাশি অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিগত সহায়তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। 

এখানে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নীতিনির্ধারণের সময় ডাটা-ভিত্তিক বিশ্লেষণের অভাব। একটি জাতীয় পর্যায়ের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সাধারণত বিস্তারিত পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ প্রয়োজন হয় যেমন, শিক্ষার্থীদের যাতায়াতে মোট কত লিটার জ্বালানি ব্যবহার হয়, সেটি মোট জাতীয় ব্যবহারের কত শতাংশ, এবং হাইব্রিড ব্যবস্থা চালু করলে বাস্তবে কতটুকু সাশ্রয় হবে। এখন পর্যন্ত এ ধরনের নির্দিষ্ট পরিসংখ্যান বা বিশ্লেষণ জনসমক্ষে খুব কমই এসেছে। ফলে এই সিদ্ধান্ত অনেকটাই অনুমাননির্ভর বলে মনে হয়। 

বাংলাদেশে প্রায় ৪ কোটির বেশি শিক্ষার্থী রয়েছে (প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা মিলিয়ে)। যদি ধরে নেওয়া হয়, এর মধ্যে অন্তত ২-২.৫ কোটি শিক্ষার্থী নিয়মিত অনলাইন ক্লাসে অংশ নেবে, তাহলে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ ইন্টারনেট ডাটা ব্যবহার হবে। একটি অনলাইন ক্লাসে গড়ে ৫০০ এমবি থেকে ১ জিবি পর্যন্ত ডাটা খরচ হতে পারে (ভিডিও অন থাকলে আরও বেশি)। তাহলে প্রতিদিন দেশের ডাটা ব্যবহার কয়েক কোটি জিবিতে পৌঁছাতে পারে। এই ডাটা ব্যবহারের পেছনে যে সার্ভার, ডাটা সেন্টার ও নেটওয়ার্ক অবকাঠামো কাজ করে, সেগুলো চালাতে বিশাল পরিমাণ বিদ্যুৎ লাগে যা শেষ পর্যন্ত জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। 

আবার শিক্ষার্থীদের যাতায়াত পুরোপুরি বন্ধ হয় না। অনেক শিক্ষার্থী কোচিং, প্রাইভেট টিউশন বা অন্যান্য কাজে বাইরে যায়। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে অনেক শিক্ষার্থী লাইব্রেরি, ল্যাব বা গ্রুপ স্টাডির জন্য ক্যাম্পাসে যেতেই হয়। ফলে যাতায়াত আংশিক কমলেও পুরোপুরি বন্ধ হয় না। এতে জ্বালানি সাশ্রয়ের যে ধারণা দেওয়া হচ্ছে, তা বাস্তবে অনেকটাই সীমিত হয়ে পড়ে। 

আরেকটি বিষয় হলো, গ্রামাঞ্চলে গ্রীষ্মকালীন সময়ে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সংকট এখনও একটি বড় বাস্তবতা। গ্রীষ্মকালে লোডশেডিং বেড়ে যায়, গ্রামে অনেক সময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না। এই অবস্থায় অনলাইন শিক্ষার ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ালে শিক্ষার্থীরা নিয়মিত ক্লাস করতে পারবে না। এতে শিক্ষার ধারাবাহিকতা আরও ভেঙে পড়বে। 

ডিজিটাল শিক্ষার ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও গোপনীয়তার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের সময় অনেক সময় তথ্য সুরক্ষার ঝুঁকি থাকে, পরীক্ষায় নকল বা অনিয়ম বাড়ে, এবং মূল্যায়নের স্বচ্ছতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। কোভিডের সময় আমরা দেখেছি, অনেক ক্ষেত্রে পরীক্ষার মান ও নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। 

এছাড়া দীর্ঘমেয়াদে এই ধরনের নীতি অবচেতনভাবে একটি “কম মানের শিক্ষা গ্রহণযোগ্য” সংস্কৃতি তৈরি করতে পারে। যদি শিক্ষার্থীরা নিয়মিত পূর্ণাঙ্গ ক্লাসরুম অভিজ্ঞতা না পায়, তাহলে তাদের শেখার মান ধীরে ধীরে কমে যেতে পারে, যা হয়তো তাৎক্ষণিকভাবে বোঝা যাবে না, কিন্তু ভবিষ্যতে কর্মক্ষেত্রে গিয়ে এর প্রভাব স্পষ্ট হবে। 

উন্নত দেশগুলোতে হাইব্রিড শিক্ষা কিছু ক্ষেত্রে সফল হয়েছে, কিন্তু সেখানে শক্তিশালী ডিজিটাল অবকাঠামো যার মাধ্যমে সুষ্ঠুভাবে পরীক্ষা নেওয়া এবং শিক্ষা প্রদানের নিশ্চয়তা থাকে, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, সবার জন্য ডিভাইস এবং প্রশিক্ষিত শিক্ষক রয়েছে। বাংলাদেশে এই সবকিছু এখনও পুরোপুরি নিশ্চিত হয়নি। ফলে সেই মডেল সরাসরি এখানে প্রয়োগ করা বাস্তবসম্মত নয়। 

বিদ্যমান পরিস্থিতিতে জ্বালানি সাশ্রয় একটি জরুরি জাতীয় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে বটে, কিন্তু এর সমাধান হিসেবে শিক্ষা খাতকে পরীক্ষামূলক ব্যবহার করা উচিত নয়, শিক্ষার মান ও সমতা নষ্ট করে নয়। শিক্ষা এমন একটি খাত, যেখানে ছোট একটি ভুল সিদ্ধান্তের প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে পুরো জাতির ওপর পড়ে। তাই এই ধরনের নীতি গ্রহণের আগে আরও গভীর গবেষণা, বাস্তবভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণ এবং পর্যাপ্ত প্রস্তুতি অত্যন্ত প্রয়োজন। শিক্ষা যদি দুর্বল হয়, তাহলে দেশের ভবিষ্যৎও দুর্বল হয়ে পড়বে, এই সত্যটি মাথায় রেখেই আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে। 

লেখক: অধ্যাপক, ফলিত পরিসংখ্যান এবং ডাটা সায়েন্স, পরিসংখ্যান গবেষণা ও শিক্ষণ ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।