প্রায় সবকিছুই আমরা জবরদস্তি করে করতে চাই। বাইনারি আর কর্তৃত্ব চাপিয়ে দিতে চাই। একটা আস্ত পাহাড়কে খণ্ড-বিখণ্ড করে চিনামাটির বাসন বানাই। কিংবা কাঠের বাজারে দাম নাই বলে একটা প্রবীণ বটগাছ খুন করি। হয়তো তার তলায় কোনও সমাজের পবিত্র পূজাস্থল বা থান ছিল। ষাটের দশকে যেমন জোর করে বিষনির্ভর কৃষিপদ্ধতির প্রচলন ঘটানো হয়েছে এই জনপদে ‘সবুজবিপ্লবের’ নামে। এরপর থেকে দেশ থেকে হারিয়ে গেছে শস্য ফসলের শতবিভার রঙ। দিনে দিনে নিখোঁজ হচ্ছে ষড়ঋতুর পঞ্জিকা। অথচ আমাদের গ্রামীণ কৃত্য, পার্বণ, উৎসব, মেলা কিংবা যাপিতজীবন সকলকিছুই গড়ে ওঠেছে ঋতুচক্রের বোঝাপড়ার ভেতর দিয়ে।
বাঙালি অঞ্চলে নবান্ন হেমন্তের উৎসব। এটি জোর করে আউশ বা বোরো মওসুমে হবে না। কার্তিক-অগ্রহায়ণে ধান কাটার পর, নতুন ধান সামাজিকভাবে গ্রহণের কৃত্য হিসেবে গড়ে ওঠেছে নবান্ন। এর সঙ্গে যোগ আছে শালি বা শাইল ধানের। পৌষের কৃত্য পুষরা বা সাংরাইন। ভাদ্রে যেমন ভাদু বা ফাল্গুনে ঘাটাবান্ধা বর্ত কিংবা বসন্ত নিবারণী শীতলা পরব।
বৈশাখের আয়োজন নিয়ে আলাপে বহুজন ‘বাদশাহ জমিদারদের’ কর্তৃত্ববাদী ইতিহাসকে টেনে এনে গায়েব করে দেন গ্রামীণ নিম্নবর্গের যাপিতজীবনের আখ্যান। যে আখ্যান গড়ে ওঠেছে চারধারের প্রাণ, প্রকৃতি এবং কৃষি উৎপাদনব্যবস্থার ভেতর থেকে। বৈশাখের অধিপতি আলাপে তাই চাপা পড়ে থাকে বর্ষবিদায়ের সন্ধিক্ষণের নিম্নবর্গীয় আয়োজনের ঐতিহাসিকতা। চাপিয়ে দেওয়া বয়ানের ভেতর দিয়ে অধিপতি ব্যবস্থা বারবার প্রমাণ করে তার সঙ্গে এই জনপদের গ্রামীণ জীবনযাপন এবং কৃষি উৎপাদনব্যবস্থার কোনও ধারাবাহিক দায়িত্বশীল সম্পর্ক নাই। তাই দেখা যায়, বর্ষবরণের শোভাযাত্রা ‘মঙ্গল’ নাকি ‘আনন্দ’ হবে এ নিয়েই আমাদের শহুরে নাগরিক তর্কগুলো প্রতিষ্ঠিত থাকে।
অথচ বর্ষবিদায় ও বরণের কৃত্যগুলো যে গ্রামীণ সমাজধারায় বিকশিত হয়েছে, সেখানে সেসব আয়োজনের উপকরণ ও প্রাকৃতিক নির্দেশনা সুরক্ষিত আছে কিনা এ নিয়ে অধিপতি ‘মঙ্গল’ বা ‘আনন্দ’ বয়ানের কোনও বার্তা নাই। ঠিক যেভাবে বলা নেই কওয়া নেই দুম করেই বাংলাদেশে বৈশাখের এক রূপকল্প দাঁড়িয়েছে পান্তা আর ইলিশ মাছের আয়োজনে। যার সঙ্গে প্রকৃতির কোনও নির্দেশনা ও গ্রামীণ জনগণের যাপিতজীবনের ঐতিহাসিক সম্পর্ক নেই।
নিম্নবর্গের আয়োজন ও পরবের উপর জারি রাখা সব জুলুম, বাহাদুরি, কর্তৃত্ব, বাইনারি, উপনিবেশিকতা এবং বর্ণবাদকে আমাদের প্রশ্ন করা জরুরি। আলাপ ও তর্কের ময়দানে আনা জরুরি। তা না হলে এসব আয়োজনের বিজ্ঞান ও সামাজিক জরুরত কোনও স্বীকৃতি ও গুরুত্ব পায় না। নতুন প্রজন্ম এক প্রবল ভুল বার্তা ও উপনিবেশিক লিগাসির ক্ষত টেনে বড় হতে থাকে।
কীভাবে কোনও বহিরাগত চাপ বা কর্তৃত্ব আমাদের বর্ষবিদায় কিংবা বরণের আয়োজনকে বিপদাপন্ন করতে পারে, তা বোঝার জন্য চলতি আলাপে আমরা একটি প্রশ্নবিদ্ধ দ্বি-পাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি এবং হাওরাঞ্চলের এক বর্ষবিদায় কৃত্যকে হাজির করবো।
প্রতিটি ঋতুর মুকুলের ভাষা বোঝায় দায়
একটি মাসের পর আরেকটি মাসের শেষ ও শুরুর চক্রে এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ থাকে। সাধারণত প্রতিটি বাংলা মাসের শেষ দিনই এই সন্ধিস্থল, ক্রান্তিকালিন সময়। সংক্রান্তি নামে যা পালিত হয়ে আসছে নিম্নবর্গের ঐতিহাসিকতায়। প্রতিটি সন্ধিক্ষণ আর ক্রান্তিকালে প্রকৃতির সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা থাকে। ফুল ফল মাছ পাখি রঙ রূপ আর নানা শব্দব্যাঞ্জনা। মানুষের সমাজ প্রকৃতির এসব নির্দেশনাকে মান্য করে। সখ্য ও সম্পর্ক গড়ে তুলে। তাই রচিত ও পালিত হয় নানা কৃত্য আর পরব।
সাঁওতাল সমাজে বর্ষ শুরু হয় ফৗগুন (ফাল্গুন মাসে)। এ সময় শাল, ইচৗক, মুরুপ্আর মহুয়া ফুল ফোটে। প্রকৃতির নির্দেশনাকে মেনে এসব নতুন ফুলের মধু পান ও সাজসজ্জার জন্য ফুল ব্যবহারের অনুমতি নেয় সাঁওতাল সমাজ। আয়োজিত হয় বাহা পরব। এ পরবের পরই এসব ফুলের ব্যবহার চলে। আয়োজিত হয় পাতা পরব। রবিদাসদের ভেতর হাজরা নামের এক কৃত্যের মাধ্যমে বর্ষবিদায় পালিত হয়। এদিন যবের ছাতু ও কাঁচা আম একত্রে মিশিয়ে আম-ছাতুয়া খাওয়া হয়। মৌসুমি ফল আমকে বর্ষবিদায়ের এ রীতির ভেতর দিয়েই সমাজ গ্রহণ করে। ভাতজরা ফুল বা বেইফুল ছাড়া চাকমাদের বর্ষবরণ উৎসব বিজু জমে না। ভাতজরা ফুল বিজুর সময়ে ফুটে বলে অনেকে একে বিজুফুলও বলে। সাংগ্রাইং উৎসবের প্রথমদিনকে চাকরা বলেন পাইংছোয়েত বা ফুল দিন। চাকরা সাংগ্রাইংয়ের সময় কাইনকো বা নাগেশ্বর ফুল সংগ্রহে মুখরিত হয়ে ওঠেন। আদিবাসী বেদিয়া-মাহাতোসহ অনেক বাঙালি সমাজে চৈত্রসংক্রান্তির দিন বথুয়া, কাঁটাখুঁড়ে, গিমাসহ নানান জাতের তিতাশাক খায়। বাঙালি সমাজে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চৈত্রসংক্রান্তি ও বর্ষবরণ আয়োজনের ভিন্নতা দৃশ্যমান। তবে তিতা জাতীয় শাক খাওয়া এবং নিম পাতা ও কাঁচা হরুদ বেটে গায়ে মেখে স্নান করার রীতি অধিকাংশ এলাকাতেই দেখা যায়। বৈশাখের প্রথম দিন মিষ্টি ও একটু ভালো খাবার রান্না হয় এবং এই সময়ে গ্রামীণ মেলার চল বহু পুরনো।
এখন প্রশ্ন হলো তিতাশাক, ভাতজরা, শাল বা নাগেশ্বর ফুল কিংবা কাঁচা আম ছাড়া বর্ষবিদায় ও বরণের কৃত্য গুলোর আয়াজন কোনো ঐতিহাসিক বার্তা দেয় কিনা। কিংবা শ্রাবণ বা কার্তিক মাসে বর্ষবিদায় ও বরণের আয়োজন এই ভূগোলে সম্ভব কিনা। বিষয়টি নিশ্চয়ই করপোরেট ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট নয় বা চাইলেই দোকানে সাজিয়ে রাখা পসরা থেকে কিনে এনে ‘লোক দেখানো’ কোনও পরিবেশনও নয়। এখানে প্রকৃতির সুস্পষ্ট নির্দেশনা আছে, প্রকৃতির নির্দেশনা পাঠ করেছে মানুষের সংস্কৃতি। গড়ে ওঠেছে এসব কৃত্য, আচার ও আয়োজন। কারণ মানুষ তার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা এবং লোকায়ত বিজ্ঞান কারিগরি দিয়ে এসব আয়োজনের প্রয়োজন অনুভব করেছে। এসব আয়োজন কোনও মঞ্চের মহড়া বা জাদুঘরের বাক্সবন্দি সংগ্রহ নয়। আর তাই নিদারুণভাবে দেশজুড়ে বদলাচ্ছে, চুরমার হয়ে পড়ছে নিম্নবর্গের ঋতুভিত্তিক কৃত্য-উৎসব। কারণ বাংলাদেশের সমতল থেকে পাহাড় প্রতিটি গ্রামেই নয়াউদারবাদী বাহাদুরি আছে, করপোরেট বাজার ও উন্নয়নের কর্তৃত্ব আছে। নির্দয়ভাবে খুন হচ্ছে প্রতিদিন কৃত্য-পার্বণ-উৎসবের সঙ্গে জড়িত প্রাণ, প্রকৃতি এবং প্রতিবেশের সহস্র ব্যঞ্জনা। আর তাই বদল ঘটেছে বর্ষবিদায় ও বরণের আয়োজনে। নিয়ম হিসেবে তাও ধরে রাখবার জন্য লড়াই করছে মানুষ, কারণ এখনো নিম্নবর্গের জীবনদর্শন প্রকৃতি ও সংস্কৃতির যৌথতাকে মান্য করে।
মার্কিন দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি ও হাওরের চইত পরব
হাওরাঞ্চলে চৈত্র সংক্রান্তির দিন আয়োজিত এক কৃত্যের নাম ‘বেগুন পাতার বর্ত’। এ দিনটিকে অনেকে ‘হার বিষ্ণু’ বলেন, কেউ বলেন ‘চইত পরব’। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ভতর দিয়ে গঠিত অর্ন্তবর্তীকালীন সরকার দেশের জনগণের সস্মতি ছাড়াই একটি দ্বি-পাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি করে। এই চুক্তি বাংলাদেশের গ্রামীণ জনগণের কৃত্য, পার্বণ, উৎসব, কৃষি ও জীপনযাপনের উপর একটি চাপিয়ে দেওয়া নয়াউদারবাদী বাণিজ্যিক কর্তৃত্ব। এটি বাস্তবায়িত হলে আমাদের উৎপাদন, অর্থনীতি, স্বাস্থ্যব্যবস্থার পাশাপাশি এবং ঋতুভিত্তিক গ্রামীণ আয়োজনগুলোও প্রবলভাবে ঝুঁকি ও হুমকিতে পড়বে। কারণ এই চুক্তিতে ‘ইউনিয়ন ফর দ্য প্রটেকশন অব নিউ ভেরাইটিজ অব প্ল্যান্টস বা ইউপিওভি কনভেনশন’ স্বাক্ষর করার শর্ত আছে। প্রাণবৈচিত্র্য, কৃষকের অধিকার ও খাদ্যব্যবস্থাকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলার কারণে বাংলাদেশ এখনো ইউপিওভি কনভেনশনে স্বাক্ষর করেনি। এই কনভেনশনে বাংলাদেশের প্রবেশের শর্ত মেনেই মার্কিন দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যচুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে বাংলাদেশ।
কেন এই ইউপিওভি কনভেনশন বিপজ্জনক? ইউপিওভি (১৯৯১) অনুযায়ী উদ্ভিদ প্রজননবিদেরা নতুন জাতের ওপর ২০-২৫ বছরের একচেটিয়া বাণিজ্যিক অধিকার পাবে। যার ফলে দেশের গ্রামীণ কৃষক সমাজে তাঁর স্থানীয় শস্য ফসলের জাতের বীজ সংরক্ষণ, পুনরায় বপন, বীজ বিনিময় ও নিজেদের ভেতর বিক্রির অধিকার হারাবে। কারণ প্রজননবিদ হবে কোনো বহুজাতিক কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠানের, গ্রামাঞ্চলের কোনো গরিব প্রান্তিক কৃষক নয়। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতেই নতুন জাত উদ্ভাবনের পরেও কৃষক হরিপদ কপালী, ফকুমার ত্রিপুরা, সেন্টু নকরেক, নুয়াজ আলী ফকির, দিলীপ তরফদার বা নূর মোহাম্মদদের ‘প্রজননবিদ’ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে পারেনি রাষ্ট্র। উক্ত কনভেনশন বাস্তবায়িত হলে খাদ্য সার্বভৌমত্ব, প্রাণবৈচিত্র্য এবং কৃষকের লোকায়ত জ্ঞান বহুমুখী ঝুঁকির ভেতর পড়বে। বীজ, শস্য ফসল এবং সামগ্রিক কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থায় বহুজাতিক কোম্পানির একতরফা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হবে।
তো হাওরের চইত পরবের সাথে এই কনভেনশন বা মার্কিন দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তির সম্পর্ক কী? সম্পর্ক হলো চইত পরবের দিন হাওরে বেগুন পাতার বর্ত নামে একটি কৃত্য আয়োজন করেন হাওরের নারী কৃষকেরা। আর এই বেগুনের জাতগুলি নানা নামের দেশি বেগুনের বৈচিত্র্য ইউপিওভি কনভেনশন বাস্তবায়িত হলে দেশি জাতের বেগুনের উপর গ্রামীণ কৃষক তার অধিকার হারাবে। আবার বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই জিন প্রযুক্তির ভেতর দিয়ে বিকৃত (রূপান্তরিত) ‘বিটিবেগুনের’ অনুমোদন দিয়েছে। আর এই অন্যায় বিটিবেগুন তৈরিতে ব্যবহৃত হয়েছে মার্কিন মনস্যান্টো কোম্পানির পেটেন্টকৃত বিটি জিন। এমনতিইে দেশি জাতের বেগুনগুলো টিকে থাকার জন্য লড়ছে। এর ওপর আছে বিটিবেগুনের খবরদারি। তার সাথে যদি ইউপিওভি কনভেনশন স্বাক্ষর করা হয়, তবে আরো বহুস্তরীয় জটিলতা বাড়বে। দেশি বেগুনের সঙ্গে গড়ে ওঠা বর্ষবিদায়ের চইত পরবের মতো কৃত্য গুলো তখন কীভাবে আয়োজন সম্ভব? কৃত্য, পরব ও উৎসব তো জনআয়োজন, কোনো একক ব্যক্তিগত কর্তৃত্ববাদী সিদ্ধান্ত নয়।
বিটিবেগুন গবেষণার নামে কী ঘটেছিল?
বেগুনের ফল ও ডগা ছিদ্রকারী পোকা মারার জন্য দেশের নয়টি দেশীয় বেগুন জাতের ভেতর একটি ব্যাক্টেরিয়ার জিন ঢুকিয়ে দিয়ে গবেষণাগারে এই কৃত্রিম বেগুন তৈরি করা হয়েছে। মাটিতে বসবাসকারি একটি ব্যাকটেরিয়ামের বৈজ্ঞানিক নাম হলো ‘ব্যাসিলাস থুরিনজিএনসিস’। এই ব্যাক্টিরিয়ার বিটি জিন ঢুকানো হয়েছে বলে এর নাম বিটিবেগুন। বিটি জিন এবং বিটি জিন প্রযুক্তির মেধাসত্ত্ব ও মালিকানা মার্কিন বহুজাতিক কৃষিবাণিজ্য কোম্পানি মনস্যান্টোর। ভারতীয় কোম্পানি মাহিকো মনস্যান্টোর এই বিটি জিন প্রযুক্তি ব্যবহারের অনুমোদন লাভ করে। পরবর্তীকালে মাহিকো কোম্পানির এ প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিটিবেগুন উৎপাদন ও ব্যবহারের জন্য ‘পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের’ মাধ্যমে বাংলাদেশ, ভারত ও ফিলিপাইনকে নিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার জন্য ‘কৃষি প্রাণপ্রযুক্তি সহায়তা প্রকল্প-২নামে ২০০৫ সনে বিটিবেগুন প্রকল্প চালু হয় মার্কিন দাতাসংস্থা ইউএসএইডের সহায়তায়। ২০০৫ সনের ১৪ মার্চ বাংলাদেশের পক্ষে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি), মহারাষ্ট্র হাইব্রিড সীড কোম্পানি লিমিটেড (মাহিকো) এবং কৃষি প্রাণপ্রযুক্তি সহায়তা প্রকল্প-২ এর পক্ষে শতগুরু ম্যানেজমেন্ট কনসালট্যান্টস প্রাইভেট লিমিটেড এক ত্রিপক্ষীয় ‘শতগুরু চুক্তি’ স্বাক্ষর করে। পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় ২০১৩ সনের ৩০ অক্টোবর বারি কর্তৃক ছাড়পত্রের জন্য আবেদনকৃত চারটি বিটিবেগুন জাত বিষয়ে ৭টি শর্তসহ একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে। উক্ত প্রজ্ঞাপনে সীমিত চাষাবাদ, নিয়ন্ত্রিত চাষাবাদ, পরিবেশ ও স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি যাচাই এবং বিটিবেগুন মোড়কীকরণের শর্ত দেয়া হয়। জনগণের যাবতীয় প্রশ্নকে দাবিয়ে জাতীয় বীজ বোর্ড ২০১৩ সালে রাষ্ট্র বিটিবেগুনকে অনুমোদন দেয়।
চইত পরবের বেগুন পাতার বর্ত
চইত পরবে বর্তের আগ পর্যন্ত বাড়ির নারীরা উপবাস থাকেন। ভোর রাতে ওঠে বাড়ি ঘর লেপামোছা করতে হয়। বেগুন পাতার বর্তের জন্য বাড়ির বিছরাক্ষেতের (আঙ্গিনা বাগান) বেগুন গাছ থেকে ৫ থেকে ১৩টি পাতা সংগ্রহ করা হয়। পাতাগুলো ধুয়ে ১৩টি পাতায় ১৩ জাতের তরিতরকারি রান্না করে ভাতসহ দেওয়া হয়। এ বর্তে সবরি আম, কাঁঠাল, কলা, আম, মনকাঁটা, ডেফল, জাম্বুরা, ভুবি, কয়ফল, লেবু, জাম, লিচু, নেওয়া, আতাফল এরকম ১৩ জাতের দেশি ফল লাগে। গিমাই, নাইল্যা, ডেঙ্গা, লাল ডেঙ্গা, পালং, ঠুনিমানকুনি, দন্ডকলস, হেলেঞ্চা শাক রান্না করা হয়। ঘরের মইধ্যম পালার কাছে একটি মাটির ঘট বসানো হয়। বেগুন পাতাগুলো ঘটের কাছে ও মইধ্যমপালায় রাখা হয়। তারপর উপবাসীবর্তী নারীরা বেতুন পাতা বর্তের কিচ্ছা বয়ান করেন। কিচ্ছা শেষে উপবাসী নারীরা ঘটের কাছে দেওয়া ভোগ থেকে ফল-ফলাদি খেয়ে উপবাস ভাঙেন এবং সবার মাঝে প্রসাদ বিলিয়ে দেন। বর্ত শেষে বেগুন পাতাগুলো নদীর জলে ভাসিয়ে দেওয়া হয়। এভাবেই বেগুন পাতা বর্তের ভেতর দিয়ে হাওরাঞ্চল একটি বছরকে বিদায় জানায় এবং প্রকৃতির সংকেতগুলোকে আগলে নতুন বছরকে আহ্বান জানায়। প্রকৃতির নতুন শস্য লতাগুল্ম গ্রহণের জন্য সামাজিকভাবে চইত পরব কৃত্যের মাধ্যমে অনুমতি নেয়।
জনগণের ফসল ও পরবের মুক্তি
বাংলাদেশ বেগুনের আদি জন্মভূমি। এই ভূগোল দুনিয়াকে বেগুন উপহার দিয়েছে। বাংলাদেশে কৃষক ও জুমিয়াদের অবিরত গবেষণার পাশাপাশি চৈতন্য নার্সারিতেই প্রথম ১৮৮৪ সালে বেগুন নিয়ে বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণা শুরু হয়। চৈতন্য নার্সারির অনেক বেগুনই আজ নিরুদ্দেশ।
দেশে এখনও টিকে আছে শিংনাথ, খটখটিয়া, লম্বা, মোটা, তবলা, গোল, কালা, লতা, পুতা, সাদা, লাল, ঝুমকি, ডিম, তিতা, বারোমাইস্যা, কামরাঙ্গা, তাল, টুপরি, কুলি, টোপা, আউশা, হিংলা, ঘিকাঞ্চন, আমঝুপি, কাঁটা নানান নামের নানান স্বাদের বেগুন। আদিবাসী অঞ্চলে আছে বারেং মেকব্রেও, কামরাঙ্গা বারেং, খুমকা, বারেং দচি, বারেং মিগন এরকম কতজাতের জুমবেগুন। টকস্বাদের একটি বেগুনের চাকমা নাম বেরুলগুলো, তিতাস্বাদের একটি বেগুনকে কোচভাষায় বলে টরা-খাংখা। নানা জাতের বেগুন মানে নানা মাটি আর নানা জলবায়ুর বেগুন। নানান জাতের বেগুন মানে নানান সমাজ, নানান আচার, নানান কৃত্য।
প্রাণপ্রকৃতিও মানুষের জীবনসংস্কৃতির বৈচিত্র্যের কারণেই বর্ষবিদায় কী বরণের আয়োজন দেশব্যাপি এত বৈচিত্র্যময়। কিন্তু সেই বৈচিত্র্য বৈভবের আহাজারি, ক্ষত, সংকট ও লড়াইয়ের গল্পগুলোর পাশে না দাঁড়িয়ে বর্ষবিদায় ও বরণের যাবতীয় ‘বৈশাখী আলাপ’ প্রবলভাবে অধিপতি ও কর্তৃত্ববাদী হয়ে যায়। আমরা আশা করবো রাষ্ট্র সকল কর্তৃত্ব এবং খবরদারি থেকে নিম্নবর্গের ঋতুভিত্তিক আয়োজনগুলোকে সুরক্ষিত রাখবে। অন্যায় বাণিজ্য চুক্তি বাতিল করে ইউপিওভির মতো কনভেশন স্বাক্ষর থেকে বিরত থাকবে। রাষ্ট্র দেশিয় বেগুনের জাত এবং এর সঙ্গে গড়ে ওঠা বর্ষবদায়ের সামাজিক কৃত্যগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। দেশের সব শস্যফসল, প্রাণপ্রকৃতি এবং এর সাথ গড়ে ওঠা গ্রামীণ সংস্কৃতির মুক্তি ঘটুক। প্রকৃতি ও সংস্কৃতির যুগলসন্ধিতে মানুষই জীবন্ত রাখবে চইতপরব, বিজু, বিষু, সাংগ্রাই, বৈসুকের মতো বর্ষ বিদায় ও বরণের জনআয়োজন।
পাভেল পার্থ: লেখক ও গবেষক