হেফাজতে নির্যাতন: আইন আছে, বিচার নেই কেন? 

বাংলাদেশের সংবিধান, প্রচলিত আইন এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড—সবই রাষ্ট্রকে নাগরিকের জীবন, স্বাধীনতা ও মর্যাদা রক্ষার বাধ্যবাধকতায় আবদ্ধ করেছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, দেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যুর ঘটনা এখনও গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে রয়েছে। মাঝে মাঝে দেখা যায়, হেফাজতে মৃত্যু বা নির্যাতনের অভিযোগ গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়, মানবাধিকার সংগঠনগুলো উদ্বেগ জানায়, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে তদন্তের ঘোষণা দেওয়া হয়; কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আইনি প্রতিকার প্রক্রিয়া শুরু হয় না। মামলা দায়ের হয় না, কিংবা হলেও তা বিচার পর্যন্ত পৌঁছায় না। ফলে প্রশ্ন ওঠে, শক্তিশালী আইন থাকা সত্ত্বেও কেন ভুক্তভোগী বা তাদের পরিবার আইনগত প্রতিকার চাইতে পারছে না?

২০১৩ সালে জাতীয় সংসদে ‘নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন’ প্রণয়ন নিঃসন্দেহে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ ছিল। জাতিসংঘের নির্যাতনবিরোধী সনদ (সিএটি)-এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রণীত এই আইনের উদ্দেশ্য ছিল রাষ্ট্রীয় হেফাজতে নির্যাতনের সংস্কৃতির অবসান ঘটানো এবং দায়মুক্তির সংস্কৃতি ভাঙা। আইনটি শুধু ভুক্তভোগী বা তার পরিবারের সদস্যদেরই নয়, তাদের পক্ষে অন্য যেকোনো ব্যক্তিকেও মামলা দায়েরের সুযোগ দিয়েছে। কিন্তু আইন প্রণীত হলেও আমাদের বাস্তবতা অত্যন্ত হতাশাজনক। আইনটি প্রণয়নের পর গত একযুগে অসংখ্য নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যুর অভিযোগ উঠলেও মামলা হয়েছে হাতে গোনা কয়েকটি ঘটনায়। এর মধ্যে মিরপুর মডেল থানায় পুলিশের নির্যাতনে ইমতিয়াজ হোসেন জনির মৃত্যুর মামলাটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে এ মামলায় দোষী পুলিশ সদস্যদের দণ্ড হয়েছে। এখনও পর্যন্ত এটিই এমন একটি বিরল উদাহরণ, যেখানে ভুক্তভোগীর পরিবার বিচারিক আদালতে বিচার পেয়েছে। কিন্তু একটি মাত্র উদাহরণ দিয়ে সামগ্রিক পরিস্থিতির মূল্যায়ন করা যায় না। প্রশ্ন হলো, কেন মামলা হয় না?

প্রথমত, ভয়ের সংস্কৃতি এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা বলে প্রতীয়মান হয়। হেফাজতে নির্যাতনের শিকার ব্যক্তি কিংবা নিহত ব্যক্তির পরিবার সাধারণত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধেই অভিযোগ আনতে চান। ফলে তারা হয়রানি, ভয়ভীতি কিংবা মিথ্যা মামলার আশঙ্কায় থাকেন। অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীর পরিবার সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল হওয়ায় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার প্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে দীর্ঘ আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতাও তাদের থাকে না।

দ্বিতীয়ত, আইন সম্পর্কে অজ্ঞতা এবং আইনি সহায়তার সীমাবদ্ধতা একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। দেশের অধিকাংশ মানুষ এখনও জানেন না যে, হেফাজতে নির্যাতন আইনের অধীনে সরাসরি আদালতে মামলা করা সম্ভব। অনেকেই মনে করেন, পুলিশি নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিকার চাইতে হলে পুলিশের কাছেই যেতে হবে, যা স্বাভাবিকভাবেই ভুক্তভোগীদের নিরুৎসাহিত করে। তৃতীয়ত, প্রাতিষ্ঠানিক দায়মুক্তির সংস্কৃতি দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যমান। প্রায়শই অভিযোগ ওঠে যে, নির্যাতনের অভিযোগের তদন্ত সংশ্লিষ্ট বাহিনীর সদস্যরাই করে থাকেন। ফলে তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়।

তদন্তের নামে সময়ক্ষেপণ, প্রমাণ নষ্ট হওয়া কিংবা ঘটনাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার অভিযোগও নতুন নয়। গত মে মাসে পিরোজপুরে ডিবি পুলিশের হাতে পুলিশ মেসের ব্যবস্থাপককে অমানবিক নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে, যেখানে ভুক্তভোগীর পুরুষাঙ্গে গলিত মোমবাতির ছ্যাঁকা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এসব ঘটনায় তদন্তের ঘোষণা এলেও ভুক্তভোগী এখনও কার্যকর আইনি প্রতিকার পাননি। সম্প্রতি ফরিদপুরে ডিবি হেফাজতে ২৪ বছর বয়সী এক তরুণের মৃত্যু হয়েছে। এ ধরনের হেফাজতে মৃত্যুর সঠিক তদন্তসাপেক্ষে ন্যায়বিচার নিশ্চিত জরুরি।

বাংলাদেশের সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদে প্রত্যেক নাগরিকের আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার স্বীকৃত হয়েছে। ৩২ অনুচ্ছেদে আইন ব্যতীত কারও জীবন বা ব্যক্তিস্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত না করার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, ৩৫(৫) অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, ‘কোনও ব্যক্তিকে নির্যাতন কিংবা নিষ্ঠুর, অমানবিক অথবা লাঞ্ছনাকর দণ্ড বা আচরণের শিকার করা যাবে না।’ অর্থাৎ হেফাজতে নির্যাতন শুধু একটি ফৌজদারি অপরাধই নয়; এটি সংবিধান লঙ্ঘনেরও শামিল।

আন্তর্জাতিক আইনও নির্যাতন বিষয়ে একই অবস্থান গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশ ১৯৯৮ সালে জাতিসংঘের নির্যাতনবিরোধী সনদে অনুসমর্থন প্রদান করে। সনদের অধীনে রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো নির্যাতন প্রতিরোধ, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা এবং ভুক্তভোগীদের প্রতিকার নিশ্চিত করা। তদুপরি, সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণাপত্র এবং আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সনদ (আইসিসিপিআর)ও নির্যাতন নিষিদ্ধ করেছে। ফলে হেফাজতে নির্যাতন বন্ধ করা বাংলাদেশের জন্য কেবল নৈতিক বা রাজনৈতিক দায়িত্ব নয়, এটি সাংবিধানিক ও আন্তর্জাতিক আইনগত বাধ্যবাধকতা। সেজন্য, কেবল আইন প্রণয়ন করলেই চলবে না—আইন কার্যকর করার রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সদিচ্ছাও থাকতে হবে। এ জন্য কয়েকটি পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

প্রথমত, হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যুর প্রতিটি ঘটনার বাধ্যতামূলক বিচার বিভাগীয় তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, অভিযোগ তদন্তের জন্য সংশ্লিষ্ট বাহিনীর বাইরে একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। তৃতীয়ত, ভুক্তভোগী ও সাক্ষীদের সুরক্ষার জন্য কার্যকর সাক্ষী সুরক্ষা ব্যবস্থা প্রণয়ন অপরিহার্য। চতুর্থত, হেফাজতে জিজ্ঞাসাবাদ পদ্ধতি বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের নিয়মিত মানবাধিকার বিষয়ক প্রশিক্ষণ দিতে হবে। পঞ্চমত, নির্যাতনের অভিযোগে অভিযুক্ত সদস্যদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও দৃশ্যমান শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে, যাতে দায়মুক্তির সংস্কৃতি ভাঙে।

সবশেষে, একটি মৌলিক প্রশ্ন থেকে যায়-আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কবে নির্যাতনের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসবে?

পেশাদার আইন প্রয়োগকারী সংস্থার শক্তি নির্যাতনে নয়; বরং আইনের শাসন, পেশাগত দক্ষতা, প্রযুক্তিনির্ভর তদন্ত এবং জনগণের আস্থার ওপর নির্ভর করে। নির্যাতনের মাধ্যমে আদায় করা স্বীকারোক্তি কখনোই পেশাদার তদন্তের বিকল্প হতে পারে না। বরং এটি বিচারব্যবস্থাকে দুর্বল করে এবং রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকের আস্থা ক্ষুণ্ণ করে।

লেখক: মানবাধিকার কর্মী