বর্তমান যুগে মাদক কেবল কোনও নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি একটি ভয়াবহ বৈশ্বিক সংকটে পরিণত হয়ে জনস্বাস্থ্য, সামাজিক স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং তরুণ সমাজকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। আমাদের পরিবার, সমাজ, দেশ ও বিশ্বকে মাদকের এই ভয়াল থাবা থেকে রক্ষার লক্ষ্যে প্রতি বছর ২৬ জুন বিশ্বজুড়ে পালিত হয় মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচারবিরোধী আন্তর্জাতিক দিবস।
১৯৮৭ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এই দিবসটি উদযাপনের সূচনা ঘটে। এর মূল লক্ষ্য হলো—বিশ্বসমাজকে মাদকের ভয়াবহ ছোবল থেকে রক্ষা করা, মাদক কেনাবেচার আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক বা পাচারকারীদের প্রতিরোধ করা এবং এর অপব্যবহার রুখতে বৈশ্বিক সচেতনতা বৃদ্ধি করা। এই বছরের এই বিশেষ দিবসে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের বার্তা অনুযায়ী, মাদকের এই বহুমাত্রিক সংকট মোকাবিলায় বিশ্ববাসীকে একজোট হয়ে দূরদর্শিতা, উদ্ভাবন এবং সংহতির ওপর ভিত্তি করে কাজ করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচারবিরোধী দিবসের প্রতিপাদ্য হলো, “Solutions are within reach: Innovate, invest, and act” অর্থাৎ “সমাধান আমাদের হাতের নাগালে: উদ্ভাবন করুন, বিনিয়োগ করুন এবং কার্যকর পদক্ষেপ নিন।” প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে সাইবার-পাচার বন্ধ করা, সিন্থেটিক বা কৃত্রিম মাদকের উৎপাদন ও বিস্তার রোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধি করা এবং প্রতিরোধ, ক্ষতি-হ্রাস ও চিকিৎসা খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপরেই এবার জোর দেওয়া হয়েছে। তবে বর্তমান সময়ে মাদকের এই ভয়াবহতা কেবল জনস্বাস্থ্য, অর্থনীতি বা সামাজিক অবক্ষয়ের মাঝেই সীমাবদ্ধ নেই; এর একটি বিশাল এবং অত্যন্ত বিপজ্জনক অংশজুড়ে রয়েছে পরিবেশের বিপর্যয়। মাদক উৎপাদন থেকে শুরু করে এর চোরাচালান এবং অপব্যবহারের প্রতিটি স্তর আজ আমাদের প্রাকৃতিক পরিবেশ, জলবায়ু এবং জীববৈচিত্র্যকে এক অপূরণীয় ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে, যা সাধারণ মানুষের চোখের আড়ালেই থেকে যায়।
ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো বিশ্বব্যাপী মাদক চোরাচালানের প্রধান দুটি কেন্দ্র গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল গোল্ডেন ক্রিসেন্ট-এর ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ায় রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা আজ চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে। সীমান্ত দিয়ে প্রতিনিয়ত প্রবেশ করা ইয়াবা, ক্রিস্টাল মেথ (আইস) ও হেরোইনের মতো মাদকের এই অবৈধ ও শক্তিশালী অর্থনীতি দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে বিঘ্নিত করছে। একই সাথে, এই কালো টাকা অস্ত্র চোরাচালান, মানবপাচার এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের মতো জঘন্য অপরাধে অর্থায়নে ব্যবহৃত হয়ে রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ শান্তিশৃঙ্খলাকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দিচ্ছে।
অপরদিকে, মাদকের অবৈধ চাষাবাদ, প্রক্রিয়াকরণ এবং চোরাচালান বিশ্বব্যাপী পরিবেশের এক অদৃশ্য কিন্তু মারাত্মক ক্ষতিসাধন করছে। কোকা, আফিম বা গাঁজার মতো মাদক উৎপাদনের জন্য দক্ষিণ আমেরিকা, দক্ষিণ এশিয়া ও আফ্রিকার গহিন অরণ্য এবং পাহাড়ি অঞ্চলের হাজার হাজার একর বনভূমি পুড়িয়ে উজাড় করা হচ্ছে। আমাজন অববাহিকা এবং গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেলের মতো গুরুত্বপূর্ণ বনাঞ্চল ধ্বংসের ফলে মাটির ক্ষয় যেমন বৃদ্ধি পাচ্ছে, তেমেই কার্বন ডাই- অক্সাইড শোষণের ক্ষমতা কমে গিয়ে বৈশ্বিক উষ্ণতা ও জলবায়ু পরিবর্তন ত্বরান্বিত হচ্ছে। একইসঙ্গে বনের বাস্তুতন্ত্র মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় অনেক বিরল প্রজাতির বন্যপ্রাণী তাদের প্রাকৃতিক বাসস্থান হারিয়ে বিলুপ্তির মুখে পড়ছে।
বনাঞ্চল ধ্বংসের পাশাপাশি মাদকের এই অবৈধ চাষাবাদে ব্যবহৃত অনিয়ন্ত্রিত ও নিষিদ্ধ উচ্চমাত্রার রাসায়নিক সার ও কীটনাশক মাটির উর্বরতা নষ্ট করছে। এসব বিষাক্ত উপাদান বৃষ্টির পানির সঙ্গে ধুয়ে নিকটবর্তী নদী, খাল ও জলাশয়ে মিশে পানির অম্লতার ভারসাম্য নষ্ট করছে, যা মাছসহ জলজ প্রাণীর মৃত্যুর প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে নদী ও জলাশয়ের ওপর নির্ভরশীল স্থানীয় মানুষ ও আদিবাসী সম্প্রদায় ক্যানসার, চর্মরোগসহ বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছে। এছাড়া ক্ষতিকর রাসায়নিক মাটির গভীরে প্রবেশ করায় ভূগর্ভস্থ পানি বিষাক্ত হচ্ছে এবং জমি দীর্ঘ সময়ের জন্য চাষের অযোগ্য হয়ে খাদ্য নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলছে। পাশাপাশি, পরিবেশের জন্য আরও বড় বিপর্যয় ডেকে আনছে মাদকের চূড়ান্ত রূপ তৈরির গোপন ল্যাবরেটরিগুলো। বিশেষ করে কোকেন এবং মেথামফেটামিন বা আইসের মতো আধুনিক সিন্থেটিক মাদক তৈরির প্রক্রিয়া অত্যন্ত বিপজ্জনক।
প্রতি এককেজি মাদক উৎপাদনে প্রায় ৫ থেকে ৬ কেজি বিষাক্ত তরল ও শক্ত রাসায়নিক বর্জ্য তৈরি হয়। মাদক কারবারিরা এই ক্ষতিকর অ্যাসিড, সালফার ও ইথার জাতীয় বর্জ্য কোনও শোধন ছাড়াই সরাসরি মাটি, নালা বা বনাঞ্চলে ফেলে দেয়। এই বর্জ্য থেকে নির্গত বিষাক্ত গ্যাস একদিকে বায়ুদূষণ ও অ্যাসিড বৃষ্টির ঝুঁকি বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে মাটির অণুজীব ও আশেপাশের উদ্ভিদরাজি ধ্বংস করে প্রকৃতির স্বাভাবিক পুষ্টিচক্রকে সম্পূর্ণরূপে ব্যাহত করছে।
মাদকের এই মরণছোবলের সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছে দেশের মূল চালিকাশক্তি তরুণ প্রজন্ম। কৌতূহল, হতাশা, বেকারত্ব, পারিবারিক অশান্তি কিংবা সঙ্গদোষের কারণে কিশোর ও যুবসমাজ আজ ইয়াবা, ফেন্সিডিল, গাঁজা থেকে শুরু করে আধুনিক সিন্থেটিক মাদক আইস ও এলএসডিতে আসক্ত হয়ে পড়ছে। এই আসক্তি তরুণদের মেধা, সৃজনশীলতা, কর্মক্ষমতা ও বিবেককে পুরোপুরি গ্রাস করছে। ফলে তারা শিক্ষাজীবন থেকে ছিটকে পড়ে পরিবার ও সমাজের বোঝায় পরিণত হচ্ছে— যা একটি জাতির দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রাকে স্থবির করে দিচ্ছে।
ব্যক্তিগত ক্ষতির পাশাপাশি মাদকের অপব্যবহার পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে চরম বিপর্যয় ডেকে আনছে। মাদক ক্রয়ের অর্থ জোগাড় করতে গিয়ে আসক্ত ব্যক্তিরা পারিবারিক সম্পদ নষ্ট ও ধার-দেনায় জড়িয়ে পড়ছে, যা পরিবারগুলোতে কলহ, মানসিক নির্যাতন ও বিবাহবিচ্ছেদের মতো ঘটনা ঘটাচ্ছে। সামাজিকভাবেও এর কুপ্রভাব সুদূরপ্রসারী; সমাজে চুরি, ছিনতাই, খুন ও রাহাজানির মতো অপরাধের হার বহুগুণ বেড়ে গেছে। এমনকি মাদকের টাকার জন্য নিজ জন্মদাতা বাবা-মাকে হত্যার মতো লোমহর্ষক ঘটনাও ঘটছে। মাদকের এই অবাধ বিস্তার আমাদের চিরাচরিত সামাজিক মূল্যবোধ, নৈতিকতা এবং পারস্পরিক সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ককে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে দিচ্ছে।
মাদক গ্রহণের ফলে মানবদেহের প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। লিভার সিরোসিস, কিডনি বিকল হওয়া, হৃদরোগ, ফুসফুসের ক্যানসার এবং মস্তিষ্কের স্থায়ী ক্ষতিসাধন মাদকের অতি সাধারণ শারীরিক প্রতিক্রিয়া। বিশেষ করে ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণের ফলে এইচআইভি/এইডস এবং হেপাটাইটিস বি ও সি-এর মতো মরণব্যাধি অত্যন্ত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। শুধু শারীরিক ক্ষতিই নয়, মাদকাসক্তি মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যকেও পুরোপুরি ধ্বংস করে দেয়। তীব্র অবসাদ, সিজোফ্রেনিয়া, আত্মহত্যার প্রবণতা এবং চরম মাত্রার আগ্রাসী আচরণ মাদকাসক্তদের মাঝে দেখা যায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ মানুষ সরাসরি মাদক সেবনের কারণে অথবা মাদকজনিত রোগের কারণে অকালে মৃত্যুবরণ করেন। এই বিশাল স্বাস্থ্যঝুঁকি একটি দেশের চিকিৎসাব্যবস্থা এবং অর্থনীতির ওপরও অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে।
মাদক সংকট মোকাবিলায় দীর্ঘকাল ধরে অপরাধীদের শাস্তির ওপর জোর দেওয়া হলেও, বর্তমান চিকিৎসা ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে মাদকাসক্তদের অপরাধী না ভেবে রোগী হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। ২০২৬ সালের জাতিসংঘের মাদকবিরোধী দিবসের বার্তাতেও আসক্তদের প্রতি সহমর্মিতা ও সম্মান প্রদর্শনের আহ্বান জানানো হয়েছে। যেহেতু আসক্ত ব্যক্তিরা একটি মানসিক ও শারীরিক বৃত্তে বন্দি হয়ে পড়েন, তাই তাদের জেলখানায় বন্দি করার চেয়ে বিজ্ঞানসম্মত ও মানবিক চিকিৎসা সেবা দেওয়া বেশি জরুরি। রাষ্ট্র ও সমাজকে এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে যাতে আসক্তরা সামাজিক কলঙ্কের ভয়ে লুকিয়ে না থেকে স্বেচ্ছায় পুনর্বাসন কেন্দ্রে আসে। এক্ষেত্রে সঠিক কাউন্সিলিং ও সহানুভূতিশীল আচরণ তাদের সুস্থ জীবনে ফেরাতে সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখে। মাদকের বিস্তার রোধে সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার হলো প্রতিরোধ। এ জন্য প্রথম প্রতিরক্ষা ব্যূহ হিসেবে পরিবারকে সন্তানের মানসিক পরিবর্তন ও সঙ্গীদের প্রতি যত্নশীল হতে হবে। পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাদকবিরোধী সেমিনার, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও খেলাধুলার আয়োজন এবং গণমাধ্যমে ব্যাপক প্রচারণা চালানো প্রয়োজন।
তরুণদের জন্য সুস্থ বিনোদন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করার মাধ্যমেও তাদের মাদক থেকে দূরে রাখা সম্ভব। মাদকের অপব্যবহার কেবল স্বাস্থ্যগত বা সামাজিক সমস্যা নয়, এর সাথে পরিবেশের এক গভীর সম্পর্ক রয়েছে। মাদকের বহুমাত্রিক পরিবেশগত ক্ষতি রুখতে ২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য “দূরদর্শিতা, উদ্ভাবন এবং সংহতি” কে পরিবেশ নীতির সাথে যুক্ত করতে হবে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ প্রতিরোধ সংক্রান্ত সংস্থা এবং পরিবেশ বিষয়ক সংস্থাগুলোর মধ্যে শক্তিশালী আন্তর্জাতিক সমন্বয় গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। দুর্গম বনাঞ্চলে অবৈধ মাদকের চাষাবাদ এবং ক্ষতিকর রাসায়নিক বর্জ্য উৎপাদনকারী গোপন ল্যাবগুলো শনাক্ত করতে স্যাটেলাইট, ড্রোন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই -এর মতো উদ্ভাবনী প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে। একই সাথে, প্রলোভনে পড়া প্রান্তিক কৃষকদের জন্য বিকল্প ও টেকসই আয়ের উৎস নিশ্চিত করা জরুরি।
মাদকাসক্তি এবং এর অবৈধ পাচার কোনও একক দেশের পক্ষে এককভাবে দমন করা সম্ভব নয়। এটি একটি বৈশ্বিক সমস্যা, যার সমাধানও বৈশ্বিক সহযোগিতার মাধ্যমে করতে হবে। আন্তর্জাতিক সীমান্তগুলোতে কড়াকড়ি আরোপ, তথ্য আদান-প্রদান এবং পাচারকারী চক্রগুলোর বিরুদ্ধে সম্মিলিত অভিযান পরিচালনা করা অত্যন্ত জরুরি। তরুণ প্রজন্মকে একটি সুস্থ, সুন্দর, নিরাপদ এবং মাদকমুক্ত পৃথিবী উপহার দেওয়া আমাদের সকলের নৈতিক ও সামাজিক দায়িত্ব। মাদকবিরোধী আন্দোলনকে কেবল সামাজিক আন্দোলন না ভেবে পরিবেশ রক্ষার লড়াই হিসেবেও দেখতে হবে এবং সরকার, সুশীল সমাজ, গণমাধ্যম ও সাধারণ মানুষ সবাই যদি কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে পারি, তবেই একটি মাদকমুক্ত সুস্থ সমাজ, সমৃদ্ধিশালী ভবিষ্যৎ এবং দূষণমুক্ত সবুজ পৃথিবী বিনির্মাণ করা সম্ভব হবে।
লেখক: অধ্যাপক, পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগ ও ডিন, বিজ্ঞান অনুষদ, স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ