বাংলাদেশে ইদানীং আবারও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং সংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। এ বিষয়ে টুকটাক সেমিনার-টেমিনারও হচ্ছে। সেমিনারে একটি ‘স্বাধীন’ গণমাধ্যম কমিশন গঠনের কথা পুনরায় আলোচিত হয়েছে। সরকার ইতোমধ্যে একটি কমিশন গঠন করার লক্ষ্যে প্রাথমিক কাজ শুরু করেছে।
ঠিক এই সময়েই বগুড়ার একটি ঘটনা আবার স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে, সাংবাদিকরা কী ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। নিপীড়নমূলক আইনের অপব্যবহার সাংবাদিকের স্বাধীনতা কীভাবে হুমকির মুখে ফেলে, তার আরেকটি জলজ্যান্ত উদাহরণ বগুড়ার সাংবাদিক মোহাম্মাদ রেজানুর ইসলামকে কেন্দ্র করে প্রকাশ পেলো।
বগুড়ায় ‘মানহানির’ অভিযোগে সাইবার নিরাপত্তা আইনের অধীনে সাংবাদিক গ্রেফতারের ঘটনা যেভাবেই নিষ্পত্তি হোক না কেন, সরকারের জন্য এটা একটা পরিষ্কার বার্তা বহন করে—সাংবাদিকদের মাথার ওপর ফৌজদারি আইনের খড়গ বহাল রেখে স্বাধীন সাংবাদিকতার আলোচনা অর্থহীন।
সম্প্রতি যেসব আলোচনা হচ্ছে, সেখানে দেখা যাচ্ছে, সবাই গণমাধ্যম নিয়ে কিছু একটা করার জন্য সরকারের দিকেই তাকিয়ে আছে। কিন্তু তারা নিয়ম-কানুনের বেড়াজালে মিডিয়ার ওপর সরকারি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা নিয়েও উদ্বিগ্ন।
সরকার ‘স্বাধীন’ গণমাধ্যম কমিশন গঠনের লক্ষ্যে একটি ‘ন্যাশনাল অ্যাকশন প্ল্যান’ তৈরির কথা ঘোষণা দিয়েছে। এই কর্ম পরিকল্পনায় কী থাকবে—তা নির্ধারণ করার জন্য বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি কর্মশালাও অনুষ্ঠিত হয়ে গেলো গত ১৮ জুন।
মন্ত্রীদের বিভিন্ন বক্তৃতা-বিবৃতি, সভা-সেমিনারে দেওয়া ভাষণ এবং এই কর্মশালায় দেওয়া বক্তব্যে বলা হচ্ছে, সরকার গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর। একইসঙ্গে, নতুন গণমাধ্যম কমিশনের দায়িত্ব থাকবে ‘অপতথ্য’ থেকে জনগণকে নিরাপদ রাখা, যেটা জনমনে স্বস্তির সাথে দুশ্চিন্তারও উদ্রেক করতে পারে।
প্রতিমন্ত্রীর মানহানি
এসব কথাবার্তা এবং পরিকল্পনা যে গণমাধ্যমে কর্মরত পেশাজীবীদের মনে আশার সঞ্চার করছে, তা নিয়ে সন্দেহ নেই। কমিশন গঠনে সরকারের সদিচ্ছা নিয়েও প্রশ্ন তোলার তেমন কোনও কারণ এখনও সামনে আসেনি।
তবে সরকার যে সাংবাদিকের নিরাপত্তা দিতে আন্তরিক, তার প্রমাণ দেওয়ার একটা সুযোগ সরকারের সামনে হাজির হয়েছে। একই সঙ্গে, হয়রানি আর নিপীড়ন থেকে নিরাপদ না থাকলে সাংবাদিকের ‘স্বাধীনতা’ যে অর্থহীন হয়ে যায়, সে উপলব্ধিও যে সরকারের হয়েছে, তার প্রমাণও এই কাজের মধ্যে দেওয়া সম্ভব।
সুযোগটা সৃষ্টি করেছেন বগুড়া প্রেস ক্লাবের কোষাধ্যক্ষ তানভীর আলম। তিনি ‘দৈনিক অগ্রযাত্রা প্রতিদিন’ পত্রিকার সম্পাদক এবং ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকসহ ছয় জনের বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করেন। বাদীর মামলায় স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের মানহানি করার অভিযোগে দৈনিক অগ্রযাত্রা প্রতিদিন-এর সাংবাদিকদের অভিযুক্ত করা হয়।
সাইবার সুরক্ষা আইন, যা একসময়ের কুখ্যাত ডিজিটাল সুরক্ষা আইনের নতুন সংস্করণ, তার অধীনে করা মামলায় পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মোহাম্মদ রেজানুর ইসলামকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো হয়।
শাহে আলম পরে এক বিবৃতি দিয়ে দুঃখ প্রকাশ করে জানান, এই মামলা সম্পর্কে তার কোনও অনুমোদন বা নির্দেশনা নেই। তবে প্রতিমন্ত্রীর প্রেস সেক্রেটারি স্বাক্ষরিত বিবৃতিতে বলা হয়, ‘প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম এমপিকে নিয়ে বিভিন্ন ধরনের অপতথ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত হচ্ছে।’
এই নির্দিষ্ট মামলা খারিজ করার উদ্যোগ সরকার অবশ্যই নিতে পারে। তবে শুধু সে রকম একটি পদক্ষেপ হবে নিতান্ত জনতুষ্টিমূলক এবং রোগের মূল কারণ চিকিৎসা না করে রোগের একটি উপসর্গ নির্মূল করার শামিল।
পুরোনো রোগ, একই উপসর্গ
আসল রোগটা নতুন কিছু নয়, অজানা কিছু নয়, বহু বছর ধরে এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে, বিতর্ক হয়েছে। ব্রিটিশ আমল থেকে বিদ্যমান বাংলাদেশের দণ্ডবিধি অনুযায়ী সাংবাদিকদের মানহানির অভিযোগে গ্রেফতার করে জেলে পাঠানো যায়। সাম্প্রতিক সময়ে প্রণয়ন এবং সংশোধন করা সাইবার নিরাপত্তা আইন এই বিধি-নিষেধ আরও জোরদার করেছে।
এই আইনগুলোর কারণে যেকোনও ক্ষমতাধর ব্যক্তি নিয়ে রিপোর্ট বা মতামত লেখা—সেটা মূলধারার গণমাধ্যমে হোক বা সোশ্যাল মিডিয়াতে হোক—সাংবাদিকদের জন্য এখনও ঝুঁকিপূর্ণ। এই ঝুঁকি এখন ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক মাধ্যমে ‘নাগরিক সাংবাদিক’ হিসেবে যারা কন্টেন্ট প্রকাশ করেন, তাদের ওপরও।
অনেক দিন ধরেই একটি দাবি ছিল যে মানহানি বিষয়টি ফৌজদারি আইনে না রেখে সেটা শুধু দেওয়ানি আইনে রাখার জন্য। সাংবাদিকরা সাধারণত মানহানির অভিযোগেই দণ্ডবিধির ৫০০, ৫০১ এবং ৫০২ ধারায়, না হয় সাইবার নিরাপত্তা আইনে অভিযুক্ত হন। এ ধরনের মামলায় আদালতে হাজিরা দেওয়ার প্রশ্ন থাকে, এমনকি গ্রেফতারও হতে পারে। অতীতে দেখা গেছে, অনেক মানহানি মামলা হয় একটি উদ্দেশ্যে—প্রতিকার না, হয়রানির উদ্দেশ্যে।
সেরকম একটা বড় উদাহরণ হচ্ছে, ২০১৬ সালে দ্য ডেইলি স্টার পত্রিকার সম্পাদক মাহফুজ আনামের বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন জেলায় করা ৬৭টি মামলা। তাঁর বিরুদ্ধে ৭১ হাজার কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ চাওয়া হলেও, মামলাগুলো ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অধীনে করা হয়।
এসব মামলা সাধারণত আদালতে বিচার পর্যন্ত গড়ায় না। কারণ, মামলার উদ্দেশ্যই হচ্ছে হয়রানি করা। ক্ষেত্র বিশেষে জামিন না হওয়া পর্যন্ত কারাগারে রেখে হয়রানির সাথে বিনা বিচারে শাস্তিও যোগ হতে পারে। যেমন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী খাদিজাতুল কুবরা ইউটিউবে এক প্রবাসী অবসরপ্রাপ্ত সেনা অফিসারের সাক্ষাৎকার প্রচার করার পর ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে গ্রেফতার হয়ে এক বছরের বেশি সময় বিনাবিচারে কারাভোগ করেন।
ডিজিটাল যুগে ‘নাগরিক সাংবাদিক’
মানহানির অভিযোগ ফৌজদারি অপরাধের আওতায় রেখে সাংবাদিকদের মাথার ওপর যে খড়গ ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে, সেই খড়গই নেমে আসে বগুড়ার রেজানুর ইসলামের মাথায়।
তবে শুধু মূলধারার সাংবাদিক নয়, ডিজিটাল যুগে অনেক ‘নাগরিক সাংবাদিক’ সাইবার নিরাপত্তা আইনের রোষানলে গত কয়েক মাসেও পড়েছেন। ফেসবুকে স্ট্যাটাস কোনও ক্ষমতাধর ব্যক্তির কাছে ‘আপত্তিকর’ মনে হলে, বা সামাজিক মাধ্যমে প্রচারিত কোনও বক্তব্য কোনও প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতার কাছে ‘মানহানিকর’ মনে হলে এখনও এই আইনের ধারা নিপীড়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে।
সাংবাদিক সমাজের নেতারা এবং মানবাধিকার নিয়ে কাজ করেন যে আইনজীবীরা, তারা দীর্ঘদিন ধরে মানহানির বিষয় ফৌজদারি আইন থেকে সরিয়ে দেওয়ানি আইনে সীমাবদ্ধ করে দেওয়ার ওপর জোর দিয়ে আসছেন। বগুড়ার ন্যক্কারজনক ঘটনা সরকারকে এদিকে নজর দেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করেছে।
তবে সরকারের আরেকটি পরিকল্পনা সাংবাদিকদের ওপর নিপীড়নের হাতিয়ারে পরিণত হতে পারে।
তথ্যমন্ত্রী গণমাধ্যম কমিশন গঠনের সাথে ‘অপতথ্য এবং ভুল তথ্য’ থেকে জনগণকে ‘নিরাপদ’ রাখার জন্য পদক্ষেপ নেওয়ার পরিকল্পনা করছেন বলে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন। এটা আশ্চর্য হবার মতো কোনও বক্তব্য নয়, কারণ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এখন, বিশেষ করে সামাজিকমাধ্যমে ‘অপতথ্য এবং গুজব’ বন্ধ করার জন্য আইন তৈরি হচ্ছে।
কিন্তু অনেক দেশেই দেখা যাচ্ছে, এই আইন প্রয়োগের মাধ্যমে শুধু কথিত ‘অপতথ্য’ প্রচারকারীর বিরুদ্ধে অ্যাকশন নেওয়া হচ্ছে না—কোনও কোনও ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীনদের কাছে অপ্রিয় মতামতের জন্যও সাধারণ মানুষকে পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদের মুখে পড়তে হচ্ছে।
যেমন, ব্রিটেনে একাধিক আইন আছে যার মাধ্যমে ‘ঘৃণাসূচক’ তথ্য, ‘ভুয়া’ তথ্য ইত্যাদি যেকোনও মাধ্যমে নিষিদ্ধ করা আছে। এসব আইনের অধীনে ২০২৩ সালে ব্রিটেনে ১২ হাজারের বেশি মানুষকে পুলিশ গ্রেফতার করে।
প্রথম আলো আর ডেইলি স্টার
ব্রিটেন, জার্মানি এবং আরও কিছু দেশ যেভাবে ইন্টারনেটে, বিশেষ করে সামাজিক মাধ্যমে প্রচার করা মন্তব্য ‘অপরাধ’ হিসেবে গণ্য করে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর ঘোর আপত্তি রয়েছে। তাদের যুক্তি, শুধু সেসব মন্তব্যই নিষিদ্ধ করা উচিত—যেগুলো সরাসরি সহিংসতা উসকে দেয়, বা সহিংসতার ডাক দেয় বা কোনও সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে ঘৃণার উদ্রেক ঘটায়।
কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সরকারের হাতে নতুন হাতিয়ার তুলে দেওয়ার আগে চিন্তা করার প্রয়োজন আছে। ইন্টারনেটে ‘অপতথ্য’ বা ‘গুজব’ মোকাবিলার নামে যে বিরোধী মত বা সরকার বা সরকার প্রধানের সমালোচনা বন্ধ করার চেষ্টা করা হবে না, তার কি নিশ্চয়তা আছে?
বগুড়ার ঘটনা প্রমাণ করে যে নতুন আইনের প্রয়োজন নেই, যতদিন কোনও সাংবাদিকের বিরুদ্ধে যেকোনও অজুহাতে দণ্ডবিধি বা সাইবার নিরাপত্তা আইনের অধীনে একটি ফৌজদারি মামলা ঠুকে দেওয়া যাবে, ততদিন সাংবাদিকরা তাদের মন মতো, স্বাধীনভাবে লেখালেখি করতে দুবার চিন্তা করতে বাধ্য হবেন।
গত দুই বছরে বাংলাদেশে যে দুটি সরকার ক্ষমতা প্রয়োগ করেছে, তারা সবাই গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং সাংবাদিকের নিরাপত্তা সমুন্নত রাখার অঙ্গীকার করে। কিন্তু বাস্তবে ভিন্ন, বীভৎস এক চিত্র দেখা যায়।
দেশের প্রধান দুটি সংবাদপত্র, প্রথম আলোর একটি ভবন এবং দ্য ডেইলি স্টারের মূল ভবন উগ্রবাদী এক সহিংস মব মোহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নাকের ডগায় পুড়িয়ে দেয়। ঘটনার পর ছয় মাস পার হয়েছে, নতুন বিএনপি সরকার প্রায় চার মাস ইতোমধ্যে ক্ষমতায়। কিন্তু গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর এই ন্যক্কারজনক হামলার কোনও বিচার করার সাহস তাদের কেউ দেখালেন না।
হামলাকারীরা অজানা, অদৃশ্য কেউ না। তারা দুঘণ্টার বেশি সময় ধরে অগ্নিসংযোগ আর ভাঙচুর করেছে; ডেইলি স্টার ভবনে সাংবাদিক হত্যার চেষ্টাও তারা করেছে। ঘটনার প্রচুর ভিডিও বাজারে আছে, কিছু টেলিভিশনে লাইভ সম্প্রচার হয়েছে। তাদের ধরতে না পারা সরকারের গাফিলতি নয়—এটা সরকারের সদিচ্ছার অভাবের প্রতিফলন।
তথ্যমন্ত্রী জহিরুদ্দিন স্বপন বলেছেন, তারা গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সমুন্নত রাখতে ‘সবচেয়ে শক্তিশালী’ একটি কমিশন গঠন করতে চান। তিনি প্রথম আলো আর দ্য ডেইলি স্টারের অগ্নিসংযোগ করা মব বাহিনীকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে, এবং সাংবাদিকদের মাথার ওপর থেকে ফৌজদারি আইনের খড়গ সরিয়ে নিয়ে প্রমাণ করতে পারেন—সরকার গণমাধ্যমের স্বাধীনতা আর সাংবাদিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কতটুকু আন্তরিক।
লেখক: সাংবাদিক এবং পডকাস্টার
ইমেইল: sabir.mustafa@gmail.com