একটি বিজ্ঞাপন। একটি প্রতিশ্রুতি বেতনের অঙ্ক। একটি বিমান টিকিট। আর তারপর—নীরবতা। প্রতিবছর এভাবেই হাজারো তরুণ-তরুণী দেশ ছাড়েন উজ্জ্বল ভবিষ্যতের আশায়, অথচ তাদের একটি বড় অংশের গন্তব্য হয়ে দাঁড়ায় এমন এক আবদ্ধ ভবন, যেখান থেকে ফেরার পথ থাকে না সহজে। এই পুরোনো অপরাধ—মানবপাচার, আজ নতুন রূপ নিয়েছে। আগে যেখানে মানুষ পাচার হতো কায়িক শ্রম বা যৌন শোষণের জন্য, আজ তাদের বন্দি করে বসানো হচ্ছে কম্পিউটারের সামনে, বাধ্য করা হচ্ছে অচেনা মানুষকে প্রতারণা করতে।
আজ ৩০ জুলাই। বিশ্বজুড়ে পালিত হবে মানবপাচার-বিরোধী বিশ্ব দিবস। প্রতিবছর এদিনে পাচারের শিকার মানুষদের দুর্দশা স্মরণ করে তাদের অধিকার সুরক্ষার অঙ্গীকার নবায়ন করা হয়। ২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য, ‘ট্রাপড বিহাইন্ড দ্য স্ক্যাম’ বা ‘প্রতারণার আড়ালে বন্দি’, মানবপাচারের এমন একটি দ্রুত সম্প্রসারমান রূপের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করছে, যেখানে আন্তর্জাতিক সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্র মানুষকে জোরপূর্বক ব্যবহার করছে শিল্প-পর্যায়ের আর্থিক জালিয়াতিতে। ভুক্তভোগীদের পাচার করা হচ্ছে জোরপূর্বক অপরাধ করানোর জন্য—রোমান্স স্ক্যাম, ক্রিপ্টোকারেন্সি জালিয়াতি এবং নানা অনলাইন প্রতারণায় বাধ্য করা হচ্ছে তাদের।
বাংলাদেশ থেকে প্রকৃতপক্ষে বছরে কত মানুষ পাচার হয়, তার কোনও একক নির্ভরযোগ্য জাতীয় পরিসংখ্যান আজও নেই এবং এই তথ্যশূন্যতা নিজেই একটি বড় সংকটের ইঙ্গিত দেয়। বেসরকারি সংগঠনগুলোর দীর্ঘদিনের জরিপ বলছে, প্রতি বছর অন্তত ১৫ থেকে ৩০ হাজার নারী ও শিশু পাচারের শিকার হন। পুরুষ শ্রমিকদের পাচারের হিসাব যোগ করলে প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি হওয়ার আশঙ্কা করেন গবেষকরা। যদিও তার সুনির্দিষ্ট পরিমাপ কারও কাছে নেই। সীমান্তরক্ষী বাহিনীর তথ্যই এই ভয়াবহতার একটি আভাস দেয়—শুধু একটি সীমান্ত অঞ্চল থেকেই গত এক বছরে প্রায় ৫০০ নারী ও শিশুকে উদ্ধার করা হয়েছে, যেখানে সারা দেশে পাচার প্রতিরোধ আইনে গত ৮ বছরে মামলা হয়েছে ৬ হাজারের বেশি। অথচ নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র ২৩৩টি। অর্থাৎ যত মামলা নথিভুক্ত হয়, প্রকৃত ঘটনা তার চেয়ে ঢের বেশি।
প্রতারণা-কেন্দ্রিক এই নতুন ধরনের পাচারের জন্য আলাদা কোনও জাতীয় হিসাব এখনও তৈরিই হয়নি। তবে বিক্ষিপ্ত তথ্য জোড়া দিলে স্কেলটা অনুমান করা যায়। গত বছর শুধু বৈধ কর্মসংস্থানের ছাড়পত্র নিয়েই ১৫ হাজারের বেশি বাংলাদেশি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি নির্দিষ্ট দেশে পাড়ি জমিয়েছেন। তাদের মধ্যে ঠিক কতজন শেষ পর্যন্ত প্রতারণা-কম্পাউন্ডে বিক্রি হয়েছেন, তার হিসাব কারও কাছে নেই। অথচ শুধু এ মাসেই সেই একই দেশ থেকে পাঁচশরও বেশি বাংলাদেশি উদ্ধার হয়ে দেশে ফিরেছেন, আর প্রতি মাসেই ফিরছেন আরও অনেকে ছোট ছোট গ্রুপে। উদ্ধার হওয়া মানুষের সংখ্যা যদি প্রকৃত বন্দি জনসংখ্যার একটি ভগ্নাংশ মাত্র হয়, তাহলে অনুমান করা যায়—যেকোনও সময়ে কয়েকশ’ থেকে ১০ হাজার বাংলাদেশি এই অঞ্চলের বিভিন্ন ‘স্ক্যাম-নির্দিষ্ট’ পাচার হয়ে বন্দি অবস্থায় থাকতে পারেন! এই সংখ্যাটি আনুমানিক পরিসংখ্যান—কিন্তু এই সংখ্যাগত অনিশ্চয়তাই বলে দেয়, রাষ্ট্র নিজেই জানে না তার নাগরিকদের কত বড় অংশ এই ফাঁদে আটকে আছে।
আর্থিক ক্ষতির চিত্রও বহুস্তরীয়। জাতিসংঘের একটি সংস্থার হিসাব বলছে, শুধু প্রতিবেশী অঞ্চলেই এই ধরনের প্রতারণায় ২০২৩ সালে বৈশ্বিক ক্ষতি হয়েছে ১৮ থেকে ৩৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই ক্ষতি শুরু হয় ভুক্তভোগীর পরিবার বিদেশযাত্রার আগেই দালালকে ৫ থেকে ছয় ৬ লাখ টাকা তুলে দেওয়ার মধ্য দিয়ে— প্রায়ই ধারদেনা বা জমি বন্ধক রেখে সংগৃহীত অর্থ। স্ক্যাম-নির্দিষ্ট পাচারে বন্দি থাকা অবস্থায় মুক্তি পেতে পরিবারকে আবার গুনতে হয় মুক্তিপণ। দেশের একটি তদন্ত সংস্থা সম্প্রতি একটি মাত্র ক্রিপ্টো প্রতারণা মামলাতেই পাচার হওয়া ৪৪ কোটি ১৪ লাখ টাকা উদ্ধার করেছে—যা থেকে অনুমান করা যায়, এই চক্রের মাধ্যমে মোট কত অর্থ দেশ থেকে বিদেশে পাচার যাচ্ছে। আর এসব স্ক্যাম-নির্দিষ্ট পাচার কম্পাউন্ড থেকে পরিচালিত প্রতারণায় প্রতিদিন প্রতারিত হচ্ছেন বাংলাদেশসহ বিশ্বের অসংখ্য সাধারণ মানুষ, যাদের সঞ্চয় হারিয়ে যাচ্ছে প্রেমের ছলনা বা ভুয়া বিনিয়োগের ফাঁদে।
সামাজিক ক্ষতির দিকটিও কম উদ্বেগজনক নয়। যারা এই বন্দিদশা থেকে বেঁচে ফেরেন, তাদের শরীরে-মনে থেকে যায় নির্যাতনের গভীর ক্ষত। অনেকে ফিরে আসেন সামাজিক কলঙ্ক নিয়ে। প্রতিবেশীরা তাদের ভুক্তভোগী নয়, বরং প্রতারক চক্রের অংশ হিসেবে সন্দেহ করে, যদিও তারা নিজেরাই বাধ্য হয়েছিলেন। যে পরিবার ধারদেনা করে সন্তানকে পাঠিয়েছিল উজ্জ্বল ভবিষ্যতের আশায়, সেই পরিবার এখন ঋণের বোঝা, আর সন্তান হারানোর আতঙ্ক নিয়ে বাস করে। বৈধ শ্রম রফতানির ওপর নির্ভরশীল দেশের রেমিট্যান্স অর্থনীতির জন্যও এটি একটি বিশ্বাসযোগ্যতার সংকট তৈরি করছে। তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ এখন বৈধ চাকরির বিজ্ঞাপনকেও সন্দেহের চোখে দেখতে বাধ্য হচ্ছে।
রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষতিও কম নয়। আন্তর্জাতিক একটি মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বাংলাদেশ টানা ষষ্ঠ বছরের মতো দ্বিতীয় স্তরে অবস্থান করছে। অর্থাৎ ন্যূনতম মানদণ্ড এখনও পূরণ হয়নি, যদিও উল্লেখযোগ্য প্রচেষ্টা স্বীকৃত হয়েছে। সরকার পাচার প্রতিরোধে বরাদ্দ ও নতুন আইন প্রণয়নে অগ্রগতি দেখিয়েছে। তবে অভ্যন্তরীণ পাচার, শরণার্থীদের সুরক্ষা এবং শ্রম পরিদর্শকদের সক্ষমতার ঘাটতি এখনও বড় দুর্বলতা হিসেবে চিহ্নিত। বিচারিক প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতাও উদ্বেগজনক। হাজার হাজার মামলা বছরের পর বছর ধরে আদালতে ঝুলে থাকছে। ফলে পাচারকারীরা প্রায়ই শাস্তির বাইরে থেকে যাচ্ছে। এই প্রাতিষ্ঠানিক শূন্যতাই দালাল চক্রকে সুযোগ করে দিচ্ছে।
এই সংকট মোকাবিলায় তিনটি স্তরে একযোগে কাজ করতে হবে। ব্যক্তি ও পরিবার পর্যায়ে বিদেশযাত্রার আগে চাকরির প্রস্তাব, নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান ও ভিসার ধরন সরকারি চ্যানেলে যাচাই করা বাধ্যতামূলক অভ্যাসে পরিণত করতে হবে। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে নতুন পাচারবিরোধী আইনের কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করা, বিচারিক সক্ষমতা বাড়ানো, ভুক্তভোগীদের অপরাধী না ভেবে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ হিসেবে দেখার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। আর আঞ্চলিক পর্যায়ে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক সমন্বয় বাড়িয়ে যৌথ অভিযান ও ভুক্তভোগী প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া আরও দ্রুততর করতে হবে।
‘প্রতারণার আড়ালে বন্দি’—এই প্রতিপাদ্য আমাদের মনে করিয়ে দেয়, একবিংশ শতাব্দীর মানবপাচার আর কেবল দৈহিক শ্রম বা যৌন শোষণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, এটি এখন সাইবার অপরাধেরও একটি হাতিয়ার। বেকারত্ব আর দারিদ্র্যের চাপে একটি ভালো চাকরির প্রলোভন প্রতিরোধ করা কঠিন হয়ে পড়ে হাজারো তরুণের জন্য। যতদিন না আমরা তথ্যের এই শূন্যতা পূরণ করছি এবং কাঠামোগত দুর্বলতাগুলো মেরামত করছি, ততদিন এই নীরব ট্র্যাজেডি চলতেই থাকবে—শুধু পরিসংখ্যানে সংখ্যা বাড়বে, বাস্তবতা বদলাবে না।
লেখক: বিভাগীয় প্রধান ও প্রকল্প পরিচালক,পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়