১৮০ দিনে বিএনপি সরকার: প্রতিশ্রুতি, প্রাপ্তি ও অপূর্ণতার হিসাব

তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসেছিল বড় প্রত্যাশা ও পরিবর্তনের স্বপ্ন জাগিয়ে। ছয় মাস পেরোতেই তাই স্বাভাবিক প্রশ্ন উঠেছে, কেমন করলো সরকার? প্রথম ১৮০ দিন দিয়ে অবশ্য কোনো সরকারের সাফল্য বা ব্যর্থতার চূড়ান্ত রায় দেওয়া যায় না। বিশেষ করে দীর্ঘদিনের জটিলতা, দুর্বল প্রতিষ্ঠান ও অর্থনৈতিক চাপ উত্তরাধিকারসূত্রে পেলে। কিন্তু এই সময়টুকু একেবারে তুচ্ছও নয়। বরং প্রথম ছয় মাসেই বোঝা যায়, সরকার কোন সমস্যাকে কতটা গুরুত্ব দিচ্ছে, সিদ্ধান্ত নিচ্ছে কীভাবে, প্রশাসনকে কতটা কাজে লাগাতে পারছে এবং নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিকে বাস্তব নীতিতে রূপ দেওয়ার সক্ষমতা কতটা। তাই বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের ১৮০ দিন পূর্তিতে আসল প্রশ্ন শুধু কী করা হয়েছে, তা নয়। প্রশ্ন হলো, মানুষের জীবনে কী বদল এসেছে, কোথায় প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির মধ্যে ফারাক রয়ে গেছে এবং কোন প্রতিশ্রুতি এখনো অপেক্ষমাণ।

গত ১৭ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব নেওয়ার পর সরকার দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা, দুর্নীতি দমন, কর্মসংস্থান এবং প্রশাসনকে জনবান্ধব করার বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। ঘোষিত ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনাতেও এসব বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে। অগ্রাধিকার নির্ধারণ অবশ্যই ইতিবাচক। কিন্তু সরকারের সাফল্য শেষ পর্যন্ত কর্মপরিকল্পনার সৌন্দর্যে নয়, তার বাস্তব ফলাফলে। জনগণ পরিকল্পনার কাগজ পড়ে বাজারে যায় না, বিদ্যুৎ অফিসে যায় না, হাসপাতালে যায় না। তারা ফলাফল অনুভব করে নিজেদের রান্নাঘর, কর্মস্থল, রাস্তাঘাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি দফতরে। এই জায়গাতেই সরকারের প্রথম ১৮০ দিনের কঠিন হিসাব শুরু।

জনস্বাস্থ্যের দিকে তাকালে উদ্বেগের যথেষ্ট কারণ আছে। হামে আক্রান্ত ও মৃত্যুর ঘটনা, টিকাদান কর্মসূচি নিয়ে অসন্তোষ ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগ এবং ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে কাঙ্ক্ষিত সাফল্যের অভাব স্বাস্থ্যব্যবস্থার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। আধুনিক রাষ্ট্রে জনস্বাস্থ্য কোনো বিলাসিতা নয়, নাগরিক নিরাপত্তার মৌলিক শর্ত। রোগ ছড়িয়ে পড়ার পর হাসপাতাল বাড়ানো বা তৎপরতা দেখানোর চেয়ে আগে থেকেই টিকাদান, রোগ শনাক্তকরণ, নজরদারি ও স্থানীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা বেশি জরুরি। ছয় মাসে এই জায়গায় আরও দৃশ্যমান, সমন্বিত ও দ্রুত উদ্যোগ প্রত্যাশিত ছিল।

জ্বালানি ও বিদ্যুৎ পরিস্থিতিও সরকারের বড় পরীক্ষা। গ্যাসের সংকটে কোথাও চুলা জ্বলছে না, বিদ্যুৎ সরবরাহের অনিয়মে ভোগান্তি বাড়ছে, শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। জ্বালানি সংকট শুধু মানুষের রান্নাঘরের সমস্যা নয়; এর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত শিল্প উৎপাদন, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, রফতানি এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি। ফলে বিদ্যুৎ-গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে না পারলে সরকারের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হবে। কিন্তু এক্ষেত্রে সরকারের উদ্যোগ ও দক্ষতা আশাব্যঞ্জক নয়। বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা সরকারের অন্যতম জরুরি কাজ। কেবল আগের সরকারের উপর দায় চাপিয়ে মানুষের ক্ষোভ দূর হবে না।

দ্রব্যমূল্যের ক্ষেত্রেও মানুষের প্রত্যাশা ছিল দ্রুত স্বস্তি। কিন্তু নিত্যপণ্যের বাজার এখনো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। আজ চাল, কাল ডিম, পরশু সবজি, তার পরদিন অন্য কোনো পণ্যের দাম বাড়ছে। কারণ হতে পারে সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতা, মধ্যস্বত্বভোগী, বাজার সিন্ডিকেট কিংবা দুর্বল নজরদারি। কিন্তু ভোক্তার কাছে কারণের চেয়ে ফলটাই গুরুত্বপূর্ণ। বেশি দাম দিয়ে কম পণ্য কিনতে হচ্ছে। সরকার যদি দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণকে প্রধান অগ্রাধিকার ঘোষণা করে, তাহলে বাজারে দৃশ্যমান স্বস্তি না আসা অবশ্যই সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

সারসহ কৃষি উপকরণের দাম নিয়ন্ত্রণেও বড় সীমাবদ্ধতা দেখা যাচ্ছে। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে কৃষিকে যেকোনো মূল্যে পৃষ্ঠপাষকতা দিতে হবে। সার, বীজ-ওষুধের দাম ও সরবরাহে সব রকম অনিয়ম দূর করতে হবে। 

আইনশৃঙ্খলার প্রশ্নটি আরও গুরুতর। গুলি করে হত্যা, প্রকাশ্য সহিংসতা এবং মব সংস্কৃতির বিস্তার এখনো পুরোপুরি থামেনি। কোনো নাগরিক যদি মনে করেন আদালতে যাওয়ার চেয়ে দলবদ্ধ হয়ে বিচার করে ফেলা সহজ, তাহলে সেটি শুধু অপরাধের সমস্যা নয়, রাষ্ট্রের কর্তৃত্বের সংকটও। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সবচেয়ে মৌলিক প্রতিশ্রুতি হলো আইন সবার জন্য সমান এবং অপরাধের বিচার রাষ্ট্রই করবে। জনতা বিচারক হয়ে গেলে আইনের শাসন দুর্বল হয়, আর আইনের শাসন দুর্বল হলে গণতন্ত্রও নিরাপদ থাকে না।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন পুরোপুরি দৃশ্যমান নয়। দলবাজি, মারামারি ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ এখনো আছে। বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যদি জ্ঞান, যুক্তি ও মুক্তচিন্তার জায়গার বদলে রাজনৈতিক আনুগত্যের প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়, তাহলে ক্ষতি শুধু একটি শিক্ষাবর্ষের নয়। ক্ষতি হয় একটি প্রজন্মের। রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর শিক্ষাঙ্গনের সংস্কৃতিতেও পরিবর্তন আসবে, এমন প্রত্যাশা ছিল স্বাভাবিক, যা এখনও দৃশ্যমান নয়।

প্রশাসন ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতার বদলে রাজনৈতিক পছন্দ প্রাধান্য পাচ্ছে, এমন অভিযোগ জোরালো হলে সরকারের স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতার প্রতিশ্রুতি প্রশ্নের মুখে পড়বে। রাজনৈতিক কর্মীদের পুরস্কৃত করার সংস্কৃতি গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে নতুন নয়। কিন্তু রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানকে দলীয় প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা বিপজ্জনক। সরকার বদলায়, প্রতিষ্ঠান থেকে যায়। প্রতিষ্ঠান দুর্বল হলে শেষ পর্যন্ত কোনো সরকারই শক্তিশালী থাকতে পারে না।

অর্থনীতির ক্ষেত্রেও নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ লক্ষ করা যাচ্ছে। বিদেশি বিনিয়োগে প্রত্যাশিত গতি এখনো ফেরেনি। একজন বিনিয়োগকারী শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য শোনেন না; তিনি বিদ্যুৎ, গ্যাস, আইনশৃঙ্খলা, দুর্নীতি, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, নীতির ধারাবাহিকতা এবং বিনিয়োগের নিরাপত্তা বিবেচনা করেন। এসব বিষয়ে অনিশ্চয়তা থাকলে বিনিয়োগ আকর্ষণ কঠিন। একইভাবে রফতানি খাত, বিশেষ করে তৈরি পোশাক, বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা, উৎপাদন ব্যয়, জ্বালানি সংকট ও আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার চাপের মধ্যে রয়েছে। এই খাতে এখনও নেতিবাচক প্রবণতা বিরাজ করছে। রফতানির গতি কমলে তার অভিঘাত পড়ে কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রা আয়ে।

সামাজিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ফ্যামিলি কার্ড সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। নিম্নআয়ের পরিবারের নারীপ্রধানের কাছে সরাসরি সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার ধারণা সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে এটি সামাজিক সুরক্ষায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে। খাল পুনঃখনন ও বনায়ন কর্মসূচিও সম্ভাবনাময়। তবে এসব প্রকল্পের সাফল্য নির্ভর করবে সুবিধাভোগী নির্বাচনে স্বচ্ছতা, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত বাস্তবায়ন, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ এবং দীর্ঘমেয়াদি ফলাফলের ওপর। কোনো প্রকল্প শুরু হওয়া আর সফল হওয়া এক কথা নয়।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেটও সরকারের সক্ষমতার বড় পরীক্ষা। বাজেটের আকার বড় হলেই সাফল্য নিশ্চিত হয় না। আসল প্রশ্ন হলো রাজস্ব কতটা আদায় হবে, সরকারি ব্যয় কতটা দক্ষ হবে, বেসরকারি বিনিয়োগ কতটা বাড়বে, কত কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং মূল্যস্ফীতির চাপ কতটা কমবে। শেষ পর্যন্ত বাজেটের সাফল্য হিসাবের খাতায় নয়, মানুষের আয়-ব্যয়ের ভারসাম্যে ফুটে উঠে। 

সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় বিষয় অবশ্যই প্রত্যাশা। নির্বাচনের আগে মানুষ পরিবর্তনের আশা করেছে, ক্ষমতায় আসার পর সেই আশা আরও বেড়েছে। মানুষ চায় বাজারে স্বস্তি, ঘরে গ্যাস-বিদ্যুৎ, রাস্তায় নিরাপত্তা, সন্তানের জন্য ভালো শিক্ষা, তরুণদের জন্য কাজ এবং সরকারি দপ্তরে হয়রানিমুক্ত সেবা। ছয় মাসে সব সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। কিন্তু পরিবর্তনের অন্তত কিছু দৃশ্যমান ইঙ্গিত মানুষ দেখতে চায়।

এখানে সরকারের অনেক উদ্যোগ এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে। ফ্যামিলি কার্ড, ই-হেলথ কার্ড, কর্মসংস্থানমুখী কর্মসূচি কিংবা বড় অবকাঠামো পরিকল্পনার ক্ষেত্রে শুরু হয়েছে এবং ফল দিয়েছে, এই দুইয়ের মধ্যে বিস্তর পার্থক্য। তাই ১৮০ দিনে এগুলোকে পুরোপুরি সফল বা ব্যর্থ বলা ঠিক হবে না। বরং দেখতে হবে, সরকার বাস্তবায়নের কাঠামো, সময়সীমা ও জবাবদিহির ব্যবস্থা কতটা কার্যকর করতে পারছে।

পররাষ্ট্রনীতিতেও বাস্তববাদ জরুরি। ভারতসহ প্রতিবেশী ও গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারদের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক বাংলাদেশের অর্থনীতি, বাণিজ্য, নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক স্বার্থের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক উন্নয়নের অনুকূল পরিবেশ তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। জাতীয় স্বার্থ, সীমান্ত, পানি, বাণিজ্য, নিরাপত্তা ও প্রবাসী কল্যাণের প্রশ্নে আবেগের চেয়ে বাস্তবভিত্তিক কূটনীতিই বেশি ফলপ্রসূ।

সব মিলিয়ে সরকারের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হতে পারে ঘোষণা-নির্ভর শাসন। জনগণ এখন শুধু পরিকল্পনা শুনতে চায় না, ফল দেখতে চায়। কর্মপরিকল্পনা যত আকর্ষণীয়ই হোক, তার মূল্য নির্ধারিত হয় বাস্তবায়নের গতি ও মানুষের জীবনে তার প্রভাব দিয়ে।

তাই বিএনপি সরকারের প্রথম ১৮০ দিনের হিসাব একরঙা নয়। কিছু উদ্যোগ আশার জায়গা তৈরি করেছে, কিছু ক্ষেত্রে নতুন চিন্তার সূচনা হয়েছে। কিন্তু স্বাস্থ্য, দ্রব্যমূল্য, গ্যাস-বিদ্যুৎ, আইনশৃঙ্খলা, শিক্ষা, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা, বিনিয়োগ ও রফতানির মতো মৌলিক ক্ষেত্রে ঘাটতিও স্পষ্ট।

এই ১৮০ দিন তাই পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট কার্ড নয়, বরং প্রথম অধ্যায়। এখানে সম্ভাবনার পাশাপাশি সতর্কসংকেতও আছে। এখন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় কাজ হলো ঘোষণা থেকে বাস্তবায়নে যাওয়া, নীতিকে কার্যকর কর্মসূচিতে এবং কর্মসূচিকে মানুষের দৃশ্যমান সুফলে পরিণত করা।

শেষ পর্যন্ত জনগণ খুব জটিল কিছু চায় না। তারা চায় নিরাপদ জীবন, সহনীয় বাজার, নিরবচ্ছিন্ন সেবা, কাজের সুযোগ এবং রাষ্ট্রের কাছে ন্যায্য আচরণ। ছয় মাসের শেষে তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন একটাই: মানুষ কি নিজের জীবনে রাষ্ট্রের পরিবর্তন অনুভব করতে শুরু করেছে? আগামী দিনের রাজনৈতিক মূল্যায়নের বড় অংশ নির্ধারিত হবে এই প্রশ্নের উত্তরেই।