বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি: অভিভাবক নাকি মধ্যস্থতাকারী?

বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি পদে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নির্বাচন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদটির ক্ষমতা, নিরপেক্ষতা ও কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা করার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। ২০২৬ সালের ২০ আগস্ট সংসদীয় ভোটে ২৫৫ ভোট পেয়ে তিনি নির্বাচিত হন এবং ২১ আগস্ট দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। আমার আজকের আলোচনার মূল প্রশ্নটি ব্যক্তি মির্জা ফখরুলকে নিয়ে নয়। প্রশ্ন হলো—বাংলাদেশের বর্তমান সাংবিধানিক কাঠামোয় একজন রাষ্ট্রপতি বাস্তবে কতটুকু স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেন? রাষ্ট্রপতি কি কেবল আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রপ্রধান, নাকি রাজনৈতিক সংকটে তিনি সংবিধানের রক্ষক ও নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করতে পারেন? পৃথিবীর অন্যান্য সংসদীয় প্রজাতন্ত্রে রাষ্ট্রপতির ভূমিকা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়—আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রপ্রধান হওয়া আর সম্পূর্ণ ক্ষমতাহীন হওয়া এক কথা নয়। ভারত, জার্মানি, আয়ারল্যান্ড ও ইতালির রাষ্ট্রপতিরা সরকার পরিচালনা করেন না, কিন্তু তাঁরা নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে সাংবিধানিক সতর্কবার্তা, পুনর্বিবেচনা, বিচারিক যাচাই, কিংবা রাজনৈতিক অচলাবস্থা নিরসনের প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ পান।

বাংলাদেশের রাষ্ট্রের পদমর্যাদাক্রমে তিনি সবার ওপরে, অথচ বেশিরভাগ কাজেই তাঁকে অনুসরণ করতে হয় প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ। রাষ্ট্রপতি সংবিধান রক্ষার শপথ নেন, কিন্তু সম্ভাব্য অসাংবিধানিক সিদ্ধান্ত ঠেকানোর স্বাধীন ক্ষমতা তাঁর হাতে প্রায় নেই। রাজনৈতিক সংকটে আমরা সবাই বঙ্গভবনের দিকে তাকাই, অথচ স্বাভাবিক সময়ে রাষ্ট্রপতিকে প্রায় অদৃশ্য মনে হয়। বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি পদটির এই বৈপরীত্য বহুদিনের। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের মতো একজন জ্যেষ্ঠ রাজনীতিক—যিনি একইসঙ্গে ছিলেন ক্ষমতাসীন দলের মহাসচিবও, তিনি রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচিত হওয়ার পর আমার মনে হয়—প্রশ্নটি আবারও করা উচিত, রাষ্ট্রপতি কি কেবল রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতার অলংকার, সংবিধানের অভিভাবক, নাকি জাতীয় সংকটে নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী?

বাংলাদেশের সংবিধানের ৪৮(২) অনুচ্ছেদ রাষ্ট্রপতিকে রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে রাষ্ট্রের অন্য সব ব্যক্তির ওপর স্থান দিয়েছে। কিন্তু ৪৮(৩) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘‘প্রধানমন্ত্রী নিয়োগের ক্ষেত্রে ৫৬(৩) অনুচ্ছেদ অনুসারে এবং প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রে ৯৫(১) অনুচ্ছেদ অনুসারে দায়িত্ব পালন ছাড়া রাষ্ট্রপতি তাঁর সব কাজ প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী সম্পাদন করবেন।’’ ফলে পদমর্যাদায় সর্বোচ্চ হলেও কার্যকর নির্বাহী ক্ষমতার দিক থেকে রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ-নির্ভর। এমনকি প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতিকে কী পরামর্শ দিয়েছেন, সে প্রশ্নও কোনও আদালতে অনুসন্ধানযোগ্য নয়। রাষ্ট্রপতির অবশ্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক কাজ আছে। তিনি সংখ্যাগরিষ্ঠ সংসদ সদস্যের আস্থাভাজন ব্যক্তিকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করেন, প্রধান বিচারপতি ও অন্যান্য সাংবিধানিক পদে নিয়োগ দেন, সংসদ আহ্বান ও ভেঙে দেওয়ার আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব পালন করেন, সংসদে পাস হওয়া বিলে সম্মতি দেন এবং সংসদ অধিবেশনে না থাকলে জরুরি পরিস্থিতিতে অধ্যাদেশ জারি করেন। তিনি সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক এবং ৪৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী যেকোনও আদালত, ট্রাইব্যুনাল বা কর্তৃপক্ষের দেওয়া দণ্ড ক্ষমা, স্থগিত, হ্রাস বা পরিবর্তন করতে পারেন। কিন্তু ৪৮(৩) অনুচ্ছেদের বিস্তৃত ভাষার কারণে এসব ক্ষমতার অধিকাংশই স্বাধীন বিবেচনাধীন ক্ষমতা নয়—কার্যত প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে প্রয়োগযোগ্য।

এখানেই বাংলাদেশের ব্যবস্থার একটি বড় বৈপরীত্য। রাষ্ট্রপতি সংবিধান রক্ষা করার শপথ নেন, কিন্তু কোনও সরকারি সিদ্ধান্তকে অসাংবিধানিক মনে হলে তিনি সেটি পুনর্বিবেচনার জন্য ফেরত পাঠাতে পারবেন কিনা, সে বিষয়ে ভারতের মতো স্পষ্ট সাধারণ ক্ষমতা তাঁর নেই। রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থবিরোধী কোনও পদক্ষেপে তিনি সতর্ক করতে পারেন, প্রশ্ন তুলতে পারেন, অথবা রাজনৈতিকভাবে পরামর্শ দিতে পারেন—কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ প্রত্যাখ্যান করার সাংবিধানিক সুযোগ অত্যন্ত সংকুচিত। তাঁর নৈতিক কর্তৃত্ব থাকতে পারে, কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিরোধক্ষমতা সামান্য। তবে রাষ্ট্রপতি একেবারে নিষ্ক্রিয় দর্শকও নন। ৪৮(৫) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রীকে দেশীয় ও বৈদেশিকনীতি সম্পর্কে রাষ্ট্রপতিকে অবহিত রাখতে হয় এবং রাষ্ট্রপতি চাইলে কোনও বিষয় মন্ত্রিসভার বিবেচনার জন্য উপস্থাপন করতে বলতে পারেন। এই বিধান যথাযথভাবে প্রয়োগ করলে রাষ্ট্রপতি নিয়মিত সাংবিধানিক ব্রিফিং গ্রহণ, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের অবস্থা সম্পর্কে প্রশ্ন উত্থাপন এবং গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত মন্ত্রিসভার আলোচনায় তোলার সুযোগ পান। সমস্যাটি হলো, বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এ বিধানের ব্যবহার সাধারণত দৃশ্যমান নয় এবং এর প্রয়োগ নিশ্চিত করার কোনও শক্তিশালী প্রক্রিয়াও নেই।

ভারতের ব্যবস্থাটি বাংলাদেশের সবচেয়ে নিকটবর্তী তুলনা। ভারতের রাষ্ট্রপতিকেও মন্ত্রিসভার পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করতে হয়। কিন্তু ভারতীয় সংবিধানের ৭৪ অনুচ্ছেদ রাষ্ট্রপতিকে মন্ত্রিসভার পরামর্শ একবার পুনর্বিবেচনার জন্য ফেরত পাঠানোর স্পষ্ট ক্ষমতা দিয়েছে। মন্ত্রিসভা একই পরামর্শ পুনরায় দিলে রাষ্ট্রপতিকে তা মানতে হয়—অর্থাৎ এটি চূড়ান্ত ভেটো নয়। তা সত্ত্বেও এই সাময়িক বিরতি সরকারকে সিদ্ধান্তের আইনগত, রাজনৈতিক ও নৈতিক পরিণতি দ্বিতীয়বার ভাবতে বাধ্য করতে পারে। রাষ্ট্রপতি কোনও সাধারণ বিলও একবার সংসদে পুনর্বিবেচনার জন্য ফেরত পাঠাতে পারেন। বাংলাদেশের জন্য ভারতীয় অভিজ্ঞতার তাৎপর্য হলো—রাষ্ট্রপতিকে সরকার পরিচালনার ক্ষমতা না দিয়েও একটি ‘সতর্কীকরণমূলক ক্ষমতা’ দেওয়া সম্ভব। পুনর্বিবেচনার ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর গণতান্ত্রিক কর্তৃত্ব কেড়ে নেয় না—বরং তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত, সাংবিধানিক অসঙ্গতি কিংবা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ঝুঁকি কমাতে একটি স্বল্পমেয়াদি বিরতি সৃষ্টি করে। এটি নির্বাহী ক্ষমতার বিকল্প কেন্দ্র নয়, বরং নির্বাহী সিদ্ধান্তের মান নিয়ন্ত্রণের একটি সীমিত ব্যবস্থা।

আয়ারল্যান্ডে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা আরও তাৎপর্যপূর্ণ একটি সাংবিধানিক রক্ষাকবচ তৈরি করেছে। দেশটির রাষ্ট্রপতি সাধারণত সরকারের পরামর্শে কাজ করেন এবং তাঁর কোনও নীতিনির্ধারণী নির্বাহী ভূমিকা নেই। কিন্তু তিনি নির্দিষ্ট বিলের সাংবিধানিকতা নিয়ে সন্দেহ হলে কাউন্সিল অব স্টেটের সঙ্গে পরামর্শ করে বিলটি সুপ্রিম কোর্টে পাঠাতে পারেন। সুপ্রিম কোর্ট বিলটিকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করলে রাষ্ট্রপতি সেটিতে সই করতে পারেন না। আবার সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানো, প্রধানমন্ত্রীর সংসদ ভেঙে দেওয়ার অনুরোধ নির্দিষ্ট অবস্থায় প্রত্যাখ্যান করার স্বাধীনতাও আইরিশ রাষ্ট্রপতির রয়েছে। এই আইরিশ মডেলে রাষ্ট্রপতি নিজে বিচারকের ভূমিকা নেন না। তিনি কেবল সম্ভাব্য সাংবিধানিক প্রশ্নটি সর্বোচ্চ আদালতের কাছে পাঠান। এতে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ থাকে, আবার কোনও বিতর্কিত আইন কার্যকর হওয়ার আগেই সাংবিধানিক যাচাইয়ের সুযোগ তৈরি হয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এমন একটি সীমিত প্রাক-প্রণয়ন বিচারিক পর্যালোচনা মানবাধিকারবিরোধী আইন, তাড়াহুড়ো করে পাস হওয়া আইন, অথবা সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক আইন ঠেকাতে সহায়ক হতে পারে।

জার্মানির ফেডারেল প্রেসিডেন্টও সরকার পরিচালনা করেন না। তবে তিনি চ্যান্সেলর পদের প্রার্থী প্রস্তাব করেন, নির্বাচিত চ্যান্সেলর ও মন্ত্রীদের আনুষ্ঠানিকভাবে নিয়োগ দেন এবং আইন জারির আগে সেটি সংবিধানসম্মত প্রক্রিয়ায় গৃহীত হয়েছে কিনা যাচাই করেন। জার্মান রাষ্ট্রপতির দফতরের তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত আটটি ঘটনায় ফেডারেল প্রেসিডেন্ট আইন জারি করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। অর্থাৎ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা প্রতিদিনের রাজনীতিতে ব্যবহৃত না হলেও ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতে এটি একটি বাস্তব সাংবিধানিক নিয়ন্ত্রণ হিসেবে কাজ করে।

ইতালিতে রাষ্ট্রপতি সংসদীয় ব্যবস্থার মধ্যে তুলনামূলকভাবে সক্রিয় সাংবিধানিক মধ্যস্থতাকারী। তিনি প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ, সরকার গঠনের সম্ভাবনা যাচাই, রাজনৈতিক অচলাবস্থায় দলগুলোর সঙ্গে পরামর্শ এবং নির্দিষ্ট শর্তে সংসদ ভেঙে দেওয়ার ভূমিকা পালন করেন। সংসদে পাস হওয়া আইন তিনি কারণ উল্লেখ করে একবার পুনর্বিবেচনার জন্য ফেরত পাঠাতে পারেন। তবে সংসদ দ্বিতীয়বার তা অনুমোদন করলে তাঁকে আইনটি জারি করতে হয়। ইতালির অভিজ্ঞতা দেখায়—খণ্ডিত সংসদ ও জোট-রাজনীতির পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপতি দলীয় সরকারের প্রতিদ্বন্দ্বী না হয়েও সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার নিশ্চয়তা দিতে পারেন।

২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার সংবিধান, নির্বাচনব্যবস্থা, বিচার বিভাগ, জনপ্রশাসন, পুলিশ ও দুর্নীতি দমনসহ বিভিন্ন খাতে সংস্কার কমিশন গঠন করে। ২০২৫ সালে সংবিধান সংস্কার কমিশন তার সুপারিশে প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নিরঙ্কুশ ক্ষমতা কমানো, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ প্রতিষ্ঠা এবং জাতীয় সাংবিধানিক কাউন্সিল গঠনের ওপর গুরুত্ব দেয়। রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, প্রধান বিচারপতি, বিরোধীদলীয় নেতা ও সংসদের বিভিন্ন প্রতিনিধিকে নিয়ে প্রস্তাবিত কাউন্সিলের উদ্দেশ্য ছিল গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক নিয়োগে একক নির্বাহী কর্তৃত্ব কমানো।

এ সময় জনপরিসরে ‘রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বাড়ানো’ কথাটি বহুল ব্যবহৃত হলেও সংস্কার-আলোচনার প্রকৃত লক্ষ্যকে শুধু রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত ক্ষমতা বৃদ্ধি হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। কমিশনের কেন্দ্রীয় উদ্বেগ ছিল—প্রধানমন্ত্রী ও একক দলীয় নির্বাহীর হাতে ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণ বন্ধ করে রাষ্ট্রের প্রধান প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ভারসাম্য সৃষ্টি করা। অর্থাৎ রাষ্ট্রপতিকে নতুন শক্তিশালী নির্বাহী বানানো নয়—বরং কিছু নিয়োগ, সাংবিধানিক সুরক্ষা ও সংকটকালীন সিদ্ধান্তকে বহুপক্ষীয় এবং জবাবদিহিমূলক করা ছিল প্রস্তাবগুলোর মূল দর্শন।

অন্তর্বর্তী সরকারের নিজস্ব অভিজ্ঞতাও রাষ্ট্রপতির ভূমিকার গুরুত্ব সামনে এনেছিল। ২০২৪ সালের আগস্টে কার্যকর তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংবিধানে না থাকায় রাষ্ট্রপতি সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদ অনুসারে আপিল বিভাগের মতামত চেয়েছিলেন। সাংবিধানিক শূন্যতা পূরণ ও রাষ্ট্র পরিচালনার জরুরি প্রয়োজনের যুক্তিতে আদালতের মতামতের ভিত্তিতে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। পরবর্তী সময়ে সংসদ না থাকায় বিভিন্ন আইনগত পরিবর্তন রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। এতে প্রমাণিত হয়, সাধারণ সময়ে পদটি সীমিত হলেও রাষ্ট্রীয় শূন্যতা বা সাংবিধানিক সংকটে রাষ্ট্রপতির দফতর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

তবে সংবিধান সংস্কার কমিশনের সুপারিশ, রাজনৈতিক ঐকমত্যের আলোচনা কিংবা কোনও সংস্কার সনদ—নিজে থেকেই সংবিধানের অংশ হয়ে যায় না। প্রয়োজনীয় সাংবিধানিক সংশোধনী পাস ও কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বিদ্যমান সংবিধান অনুযায়ীই নির্ধারিত হবে। বর্তমানে সরকারি আইনভান্ডারে প্রকাশিত সংবিধানের ৪৮(৩) অনুচ্ছেদ এখনও রাষ্ট্রপতিকে প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগের দুটি নির্দিষ্ট ক্ষেত্র ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করতে বাধ্য করে। ফলে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ায় পদটির আইনি ক্ষমতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাড়েনি।

বাংলাদেশের সাংবিধানিক সমস্যার সমাধান কেবল রাষ্ট্রপতিকে বেশি ক্ষমতা দেওয়া নয়, বরং ক্ষমতাকে এমনভাবে বণ্টন করা—যাতে কোনও ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রের ওপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে না পারে।  বাংলাদেশের জন্য উপযুক্ত পথ সম্ভবত একটি সীমিত কিন্তু কার্যকর রাষ্ট্রপতি—যিনি সরকার পরিচালনা করবেন না, কিন্তু সংবিধান লঙ্ঘনের আশঙ্কায় একবার সতর্ক করতে পারবেন, বিতর্কিত বিল বিচারিক যাচাইয়ে পাঠাতে পারবেন, গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক নিয়োগে বহুপক্ষীয় প্রক্রিয়ার অংশ হবেন এবং সরকার গঠন বা সংসদীয় অচলাবস্থায় লিখিত বিধি অনুসারে নিরপেক্ষভাবে কাজ করবেন। নতুন রাষ্ট্রপতির নির্বাচন সেই পুরোনো প্রশ্নটিকেই নতুন জরুরিতায় সামনে এনেছে—রাষ্ট্রপতি কি কেবল রাষ্ট্রের অলংকার হবেন, নাকি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার একটি সংযত ও জবাবদিহিমূলক রক্ষাকবচ?

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, আইন বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। পিএইচডি গবেষক, ইউনিভার্সিটি অব লেস্টার, যুক্তরাজ্য