ডাকসুর সংগ্রহশালায় জিন্নাহর ছবি: আমরা কোন ইতিহাস লিখছি? 

ছোটবেলায় ইতিহাস পড়ার সময় একটা বিষয় আমাকে সবসময় বিস্মিত করতো— একটা জাতি কীভাবে তার নায়কদের মনে রাখে? কীভাবে একটি প্রজন্ম আরেকটি প্রজন্মের কাছে তার সংগ্রামের গল্প পৌঁছে দেয়? তখন বুঝিনি, ইতিহাস শুধু বইয়ের পাতায় থাকে না, ইতিহাস থাকে দেয়ালে টানানো ছবিতে, স্মৃতিস্তম্ভে, নামফলকে, মানুষের মুখে মুখে বলা গল্পে। দিনদুয়েক আগে ডাকসু সংগ্রহশালাকে ঘিরে বিতর্ক দেখে সেই পুরোনো প্রশ্নটাই আবার মনে পড়ছে। সংস্কার করা ডাকসু সংগ্রহশালায় পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর তিনটি ছবি স্থান পেয়েছে। অথচ ভাষা আন্দোলন, ছয় দফা, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭০ সালের নির্বাচন কিংবা ৭ মার্চের মতো বাঙালির  মুক্তিসংগ্রামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলোর সঙ্গে যার নাম অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে, সেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কোনও গৌরবোজ্জ্বল একক ছবি সেখানে নেই। তার দুই ছেলের বিয়ের ছবি আছে, কিছু পেপারকাটিং আছে, একটি খোদাইচিত্রে প্রতিকৃতি আছে, কিন্তু বাংলাদেশের স্বাধীনতার রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতীক হিসেবে বঙ্গবন্ধুর উপস্থিতি কার্যত অনুপস্থিত।

স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, বাংলাদেশে কিছু মানুষের কাছে জিন্নাহ ইতিহাসের অংশ। তাকে মুছে ফেলার কথা আমি বলছি না। তাদের ইতিহাসে জিন্নাহ আছেন, থাকবেন। কিন্তু আমার প্রশ্ন অন্য জায়গায়। বাংলাদেশের ইতিহাসে জিন্নাহ আর বঙ্গবন্ধুর অবস্থান কি এক? একজন পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা। অন্যজন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্থপতি। একজনের রাজনৈতিক প্রকল্পের চূড়ান্ত ফল ছিল পাকিস্তান। অন্যজনের রাজনৈতিক সংগ্রামের চূড়ান্ত পরিণতি ছিল বাংলাদেশ।ভাবতেই অবাক লাগে বাংলাদেশের সেরা একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগ্রহশালায় কিছু ছাত্র এমন পরিস্থিতি তৈরি করেছে, যেখানে জিন্নাহ দৃশ্যমান কিন্তু বঙ্গবন্ধু নেই, কি ভয়ঙ্কর !

বাংলাদেশ সৃষ্টি হয়েছে পাকিস্তানি রাষ্ট্রধারার সীমাবদ্ধতা ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে। ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত যে রাজনৈতিক অভিযাত্রা, তার চূড়ান্ত রূপকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ফলে স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসের কেন্দ্রে বঙ্গবন্ধু থাকবেন, সেখানে জিন্নাহর আলোচনা থাকতে পারে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট হিসেবে। যখন এই সম্পর্কটি উল্টে যেতে দেখি, তখন উদ্বেগ সৃষ্টি হওয়াই স্বাভাবিক নয় কি ?

বিশ্ববিদ্যালয় মানেই মুক্ত চিন্তার জায়গা, ইতিহাসের সঙ্গে পরিচয়ের জায়গা। বিশ্ববিদ্যালয় এমন একটি স্থান, যেখানে নতুন প্রজন্ম শিখবে কীভাবে বাংলাদেশ জন্ম নিয়েছে। সেখানে যদি ভাষা আন্দোলনের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার, ছয় দফার সংগ্রাম, ৭ মার্চের ডাক কিংবা মুক্তিযুদ্ধের পূর্বাপর ইতিহাস থেকে বঙ্গবন্ধুকে কার্যত সরিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে প্রজন্মের কাছে কেউ বার্তা যাবে? কী শিখবে তারা ?

আরও অবাক হয়েছি সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল ব্যক্তির মন্তব্য শুনে। বঙ্গবন্ধুর ছবি কেন রাখা হয়নি, সে প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেছেন, ‘‘ইচ্ছা হয়নি, তাই রাখিনি।’ এই একটি বাক্যই আমাকে সবচেয়ে বেশি ভাবিয়েছে। কারণ ইতিহাস কখনও ব্যক্তিগত ইচ্ছা-অনিচ্ছার বিষয় হতে পারে না। আমি বঙ্গবন্ধুর সব রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত সমর্থন করতে বাধ্য নই। কেউই বাধ্য নন। কিন্তু ইতিহাসের বাস্তবতা অস্বীকার করার অধিকারও কারও নেই। ব্যক্তিগত অপছন্দের কারণে যদি কোনও ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বকে আড়াল করা যায়, তাহলে আগামীকাল কেউ শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হককে বাদ দেবে, কেউ ভাসানীকে বাদ দেবে, কেউ ভাষা আন্দোলনকেই গুরুত্বহীন বলবে।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রশ্নে জামায়াতে ইসলামী ও তাদের ছাত্ররাজনীতির অতীত ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্ক রয়েছে। স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী পরও সেই বিতর্ক পুরোপুরি শেষ হয়নি। ফলে যখন দেখা যায়, মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক নেতৃত্বকে আড়ালে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে এবং পাকিস্তানি রাষ্ট্রধারার প্রতীক হিসেবে পরিচিত ব্যক্তিত্বদের নতুন করে সামনে আনা হচ্ছে, তখন মানুষের মনে প্রশ্ন জাগা অস্বাভাবিক নয়। আমার কাছে বিষয়টি অভিযোগের নয়, আস্থার। আপনার কাছে কি খুব স্বাভাবিকভাবে মনে হবে না, এটি কি শুধুই একটি সংগ্রহশালার বিন্যাস, নাকি এর ভেতরে বাংলাদেশের ইতিহাসকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করার একটি প্রবণতা কাজ করছে? সবচেয়ে বড় কথা, বঙ্গবন্ধুকে সরিয়ে দিলে বাংলাদেশের ইতিহাস ভেঙে পড়ে। ১৯৪৮, ১৯৫২, ১৯৫৪, ১৯৬৬, ১৯৬৯, ১৯৭০, ১৯৭১— এই ধারাবাহিকতাকে বঙ্গবন্ধু ছাড়া ব্যাখ্যা করা যায় না। ইতিহাসের সঙ্গে ন্যূনতম পরিচয় আছে, এমন কেউ এটি অস্বীকার করবেন না। ইতিহাসের একটি মজার বৈশিষ্ট্য আছে, তাকে কিছুদিনের জন্য চাপা দেওয়া যায়, কিন্তু হারিয়ে ফেলা যায় না। দেয়াল থেকে ছবি নামানো যায়, কিন্তু মানুষের চেতনা থেকে ইতিহাস মুছে ফেলা যায় না। বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক অবস্থান কোনও সরকার, কোনও রাজনৈতিক দল, কোনও ছাত্রসংগঠন বা কোনও সংগ্রহশালার দয়া থেকে সৃষ্টি হয়নি। তার অবস্থান তৈরি হয়েছে বাঙালি জাতির দীর্ঘ সংগ্রাম, আত্মত্যাগ এবং স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার ভেতর দিয়ে।

বিশ্বের উন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলো তাদের জাতীয় ইতিহাসের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি অনুসরণ করে— আপনি দেখবেন, তাদের মধ্যে রাজনৈতিক মতভেদ থাকতে পারে, কিন্তু জাতির ভিত্তি নির্মাণকারী ব্যক্তিত্বদের ঐতিহাসিক অবদান তারা কখনোই অস্বীকার করে না। যুক্তরাষ্ট্রে জর্জ ওয়াশিংটন, দক্ষিণ আফ্রিকায় নেলসন ম্যান্ডেলা কিংবা ভারতে মহাত্মা গান্ধীকে ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক রয়েছে, কিন্তু তাদের রাষ্ট্রগঠন ও জাতীয় ইতিহাসে অবদান অস্বীকার করার চেষ্টা মূলধারায় গ্রহণযোগ্যতা পায় না। কারণ একটি জাতির টিকে থাকার জন্য তার মৌলিক ঐতিহাসিক সত্যের প্রতি ন্যূনতম ঐকমত্য প্রয়োজন।

বাংলাদেশেও একই নীতি প্রযোজ্য হওয়া উচিত। বঙ্গবন্ধুকে রহমানকে নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক হতে পারে, তার সরকারের সমালোচনা হতে পারে, তার কিছু সিদ্ধান্ত নিয়ে মতভেদ থাকতে পারে। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে তার কেন্দ্রীয় ভূমিকা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। রাজনৈতিক অবস্থান ভিন্ন হওয়ার অর্থ এই নয় যে, ইতিহাসের মৌলিক সত্যকেও অস্বীকার করতে হবে। বিশেষত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এই দায়িত্ব আরও বেশি। কারণ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাঙালির রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জাগরণের অন্যতম কেন্দ্র। ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত অসংখ্য সংগ্রামের ইতিহাস এই ক্যাম্পাসের সঙ্গে জড়িত। ডাকসু সেই ইতিহাসেরই প্রতীকী ধারক। ফলে ডাকসুর সংগ্রহশালায় কী থাকবে আর কী থাকবে না, তা নিছক প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, এর সঙ্গে জাতীয় স্মৃতির প্রশ্ন জড়িত।

ইতিহাসের সঠিক মূল্যায়ন মানে কোনও ব্যক্তিকে পূজা করা নয়, আবার কাউকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে মুছে দেওয়াও নয়। ইতিহাসের সঠিক মূল্যায়ন মানে হলো— প্রত্যেক ব্যক্তিত্ব ও ঘটনাকে তার প্রকৃত অবদান এবং প্রভাবের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম, বিকাশ এবং আত্মপ্রতিষ্ঠার ইতিহাসে বঙ্গবন্ধুর ভূমিকা যে কেন্দ্রীয়, তা অস্বীকার করলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সামনে একটি বিকৃত ইতিহাস উপস্থাপিত হবে। আর বিকৃত ইতিহাস কখনোই সুস্থ জাতীয় চেতনার ভিত্তি হতে পারে না। আজকের বাংলাদেশ নানা রাজনৈতিক বিতর্ক, মতপার্থক্য ও পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু রাজনৈতিক পরিবর্তন কখনোই জাতীয় ইতিহাসের মৌলিক সত্যকে পরিবর্তন করে না। রাষ্ট্রক্ষমতা বদলাতে পারে, রাজনৈতিক মতাদর্শ পরিবর্তিত হতে পারে, কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস এবং বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভূমিকা জাতির যৌথ স্মৃতির অংশ হিসেবেই থাকবে।

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, আইন বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। পিএইচডি গবেষক, ইউনিভার্সিটি অব লেস্টার, যুক্তরাজ্য