নারীর নিরাপত্তা কি শুধু আইনের পাতায়? 

ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ে এক নারীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগ এবং তাঁর ১৪ বছর বয়সী ছেলেকে বেঁধে রাখার ঘটনা সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ডাকাতির সময় ওই নারীকে তাঁর সন্তানের সামনে যৌন সহিংসতার শিকার হতে হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, ঘটনার ভিডিও ধারণ করে তা ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে অর্থ দাবির অভিযোগও উঠেছে। ঘটনাটি তদন্তাধীন এবং অভিযোগের সত্যতা বিচারিক প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত হবে। কিন্তু অভিযোগের ভয়াবহতা এমন যে এটি কেবল একটি ফৌজদারি অপরাধের অভিযোগ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই—এটি একইসঙ্গে নারী ও শিশুর নিরাপত্তা, ব্যক্তিগত মর্যাদা, রাষ্ট্রের সুরক্ষা দেওয়ার দায়িত্ব এবং আমাদের বিচারব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনে।

একজন নারী তাঁর নিজের ঘরেও যদি এমন সহিংসতার শিকার হন, তাহলে আমাদের প্রথম প্রশ্ন হওয়া উচিত—তিনি কোথায় নিরাপদ? নিরাপত্তা কি শুধু রাস্তাঘাট, কর্মক্ষেত্র বা গণপরিবহনের প্রশ্ন? নাকি একজন নারীর নিজের ঘর, তাঁর শরীর, তাঁর মর্যাদা এবং তাঁর ব্যক্তিগত পরিসরও রাষ্ট্রীয় সুরক্ষার আওতায় পড়ে? নিঃসন্দেহে পড়ে। কারণ নিরাপত্তা কোনও অনুগ্রহ নয়—এটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার।

বাংলাদেশের সংবিধান নাগরিকের সমতা, আইনের আশ্রয় এবং জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার সুরক্ষাকে মৌলিক অধিকারের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, সব নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী। ২৮ অনুচ্ছেদে নারী-পুরুষের সমান অধিকারের কথা বলা হয়েছে। ৩১ অনুচ্ছেদে আইনের সুরক্ষা পাওয়াকে প্রত্যেক নাগরিকের অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে এবং ৩২ অনুচ্ছেদে জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার সুরক্ষা নিশ্চিত করা হয়েছে।

অর্থাৎ কোনও নারী যখন সহিংসতার শিকার হন, তখন তাঁর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু পুলিশের প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়; এর সঙ্গে রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়ও যুক্ত। এই দায় অপরাধ সংঘটনের পর অপরাধী গ্রেফতার করার মধ্যেই শেষ হয় না। অপরাধ প্রতিরোধ, ঝুঁকি শনাক্ত করা, দ্রুত প্রতিকার, নিরপেক্ষ তদন্ত, ন্যায়বিচার এবং ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা- সবকিছুই রাষ্ট্রীয় সুরক্ষার অংশ।

ধর্ষণের মতো অপরাধের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের আইনে কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ধারা ৯ অনুযায়ী কোনও নারী বা শিশুকে ধর্ষণের জন্য মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। ২০২৬ সালের সংশোধনের পরও এই মূল শাস্তির বিধান বহাল রয়েছে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, কঠোর শাস্তির বিধান কি এককভাবে নারীকে নিরাপদ করতে পারে?

অভিজ্ঞতা বলে, পারে না। একটি আইনের শক্তি শুধু তার শাস্তির মাত্রায় নয়—তার প্রয়োগ কতটা নিশ্চিত, দ্রুত ও ন্যায়সংগত- তার ওপরও আইনের কার্যকারিতা নির্ভর করে। অপরাধী জানবে যে অপরাধ করলে তাকে আইনের মুখোমুখি হতে হবে, তদন্তে প্রভাব বিস্তার বা আলামত নষ্ট করার সুযোগ থাকবে না, বিচারপ্রক্রিয়া অযথা দীর্ঘ হবে না এবং ভুক্তভোগীকে ভয় দেখিয়ে মামলা থেকে সরিয়ে দেওয়া যাবে না- এই আস্থাই অপরাধ প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

গফরগাঁওয়ের অভিযোগে ১৪ বছর বয়সী শিশুটির বিষয়টিও বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। একজন সন্তানকে বেঁধে রেখে তার মায়ের ওপর যৌন সহিংসতা চালানোর অভিযোগ শুধু ওই নারীর ওপর নয়, শিশুটির ওপরও গভীর সহিংসতা। সে নিজে শারীরিকভাবে আক্রান্ত  হয়ে এমন দৃশ্যের প্রত্যক্ষদর্শী হওয়া তার মানসিক বিকাশে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। তাই শিশুটিকে শুধু শারীরিক নির্যাতনের শিকার হিসেবে দেখলে চলবে না—তাকে একজন ট্রমা-ভুক্তভোগী হিসেবেও বিবেচনা করতে হবে।

তার নিরাপত্তা, মানসিক সহায়তা, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, শিক্ষা ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে তার পরিচয় ও ব্যক্তিগত তথ্য গোপন রাখা জরুরি। একটি শিশুর জীবনের ওপর একটি রাতের ভয়াবহতা যেন সারা জীবনের সামাজিক পরিচয় হয়ে না দাঁড়ায়- এ দায়িত্ব পরিবার, রাষ্ট্র এবং গণমাধ্যম সবার।

এই ঘটনায় আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে সামনে এসেছে—ভিডিও ধারণ এবং তা প্রকাশের ভয় দেখিয়ে অর্থ দাবি। প্রযুক্তির বিস্তারের সঙ্গে যৌন সহিংসতার একটি নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে। শারীরিক সহিংসতার পর ডিজিটাল মাধ্যমে ভুক্তভোগীকে আবারও ভয় দেখানো, ব্ল্যাকমেইল করা বা সামাজিকভাবে অপমানের হুমকি দেওয়া এক ধরনের দ্বিতীয় দফার নির্যাতন।

বর্তমান সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬-এর ২৫ ধারায় ব্ল্যাকমেইলিং, যৌন হয়রানি, রিভেঞ্জ পর্ন, ডিজিটাল শিশু যৌন নিপীড়ন সংক্রান্ত উপাদান বা সেক্সটর্শনের উদ্দেশ্যে কোনও ভিডিও, ছবি বা অন্যান্য তথ্য-উপাত্ত প্রকাশ, প্রচার কিংবা প্রকাশের হুমকিকে অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। কোনও নারী বা ১৮ বছরের কম বয়সী শিশুর বিরুদ্ধে এ ধরনের অপরাধ সংঘটিত হলে শাস্তির মাত্রাও বেশি। ফলে অভিযোগ অনুযায়ী ভিডিও ধারণ করে তা ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে অর্থ দাবি করার বিষয়টিও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়া উচিত।

তবে এখানে শুধু আইন প্রয়োগকারী সংস্থার দায়িত্বের কথা বললেই হবে না। আমাদের সামাজিক আচরণও গুরুত্বপূর্ণ। কোনও নারী নির্যাতনের শিকার হলে তাঁর ছবি, ভিডিও, পরিচয় বা ব্যক্তিগত তথ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া একেবারেই বন্ধ করতে হবে। ‘খবর’ ছড়িয়ে দেওয়ার নামে কোনও ভুক্তভোগীর ব্যক্তিগত মর্যাদা ক্ষুণ্ন  করার অধিকার কারও নেই।

গণমাধ্যমের ক্ষেত্রে এই দায়িত্ব আরও বেশি। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ১৪ ধারায় এমনভাবে সংবাদ বা তথ্য প্রকাশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে, যাতে নির্যাতনের শিকার নারী বা শিশুর পরিচয় প্রকাশ পায়। আইনটি সংবাদপত্রের পাশাপাশি অনলাইন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ক্ষেত্রেও এই সুরক্ষা প্রযোজ্য করেছে।

তাই কোনও ঘটনা যতই ভয়াবহ হোক, সংবাদ পরিবেশনের সময় ভুক্তভোগীর পরিচয়, ছবি, ঠিকানা, সন্তানের পরিচয় কিংবা এমন কোনও তথ্য প্রকাশ করা উচিত নয়—যা তাঁদের সহজে শনাক্ত করতে পারে। অপরাধের ভয়াবহতা তুলে ধরা এবং ভুক্তভোগীর গোপনীয়তা রক্ষা-দুটিকে একসঙ্গে করা সম্ভব। বরং দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার অন্যতম বৈশিষ্ট্যই হলো এই ভারসাম্য রক্ষা করা।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—অপরাধ প্রতিরোধে আমরা কতটা কার্যকর?

প্রতিটি অপরাধের পর গ্রেফতার ও বিচার জরুরি। কিন্তু রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু প্রতিক্রিয়াশীল হওয়া নয়; প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাও গড়ে তোলা। স্থানীয় পর্যায়ে অপরাধপ্রবণতা, সংঘবদ্ধ অপরাধীদের গতিবিধি, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা, রাতের নিরাপত্তা, পুলিশের টহল ও গোয়েন্দা তৎপরতা- এসব নিয়মিতভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। কোনও এলাকায় বারবার অপরাধের ঘটনা ঘটলে সেটিকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে না দেখে বৃহত্তর নিরাপত্তা ব্যবস্থার অংশ হিসেবে দেখা দরকার।

নারীর নিরাপত্তা নিয়ে আমাদের আলোচনায় আরেকটি ভুল প্রবণতা রয়েছে— আমরা অনেক সময় ভুক্তভোগীর আচরণ, পোশাক, চলাফেরা, রাতের বেলা বাইরে থাকা কিংবা ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে প্রশ্ন তুলি। অথচ অপরাধের দায় কখনো ভুক্তভোগীর ওপর বর্তায় না। একজন নারী কোথায় ছিলেন, কখন ছিলেন বা কীভাবে জীবনযাপন করেন- এসব কোনোভাবেই তাঁর বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতার কারণ তৈরি করতে পারে না। অপরাধের দায় অপরাধীর এবং সেই দায় নির্ধারণ করবে আইন ও আদালত।

একইসঙ্গে মনে রাখতে হবে, যৌন সহিংসতার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় অবস্থান শুধু শাস্তির মধ্য দিয়ে প্রকাশ পেলে হবে না। ভুক্তভোগী নারীকে চিকিৎসা, আইনি সহায়তা, মানসিক সহায়তা এবং নিরাপদ পরিবেশ দিতে হবে। মামলা করার পর তিনি যেন সামাজিক চাপ, ভয়ভীতি, সমঝোতার চাপ বা প্রতিশোধের আশঙ্কায় ভেঙে না পড়েন, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। ন্যায়বিচার তখনই অর্থবহ হয়, যখন একজন ভুক্তভোগী বিচার চাইতে গিয়ে নতুন কোনও বিপদের মুখে না পড়েন। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে অপরাধের শিকার ব্যক্তির চিকিৎসা পরীক্ষারও বিশেষ বিধান রয়েছে।

গফরগাঁওয়ের ঘটনাটি তাই আমাদের সামনে শুধু একটি ভয়াবহ অভিযোগের ছবি তুলে ধরে না, এটি রাষ্ট্র ও সমাজের কাছে একটি মৌলিক প্রশ্ন রাখে—নারীর নিরাপত্তা আমরা আসলে কোথায় নিশ্চিত করতে পেরেছি?

আইনে অধিকার আছে, শাস্তির বিধান আছে, সাংবিধানিক সুরক্ষা আছে। কিন্তু একজন নারী যদি নিজের ঘরেও নিরাপদ না থাকেন, যদি একটি শিশু তার মায়ের ওপর সহিংসতার সঙ্গে নিজেও নির্যাতনের শিকার  হতে  হয়, যদি অপরাধের ভিডিও দিয়ে আবারও ভুক্তভোগীকে ভয় দেখানো যায়—তাহলে শুধু আইনের অস্তিত্ব দিয়ে আমাদের দায়িত্ব শেষ হয় না।

প্রয়োজন আইনের কার্যকর প্রয়োগ, পেশাদার তদন্ত, দ্রুত বিচার, ভুক্তভোগীর সুরক্ষা এবং অপরাধ প্রতিরোধে আরও শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা। একইসঙ্গে প্রয়োজন এমন একটি সামাজিক মানসিকতা, যেখানে ধর্ষণের শিকার নারীকে প্রশ্ন করা হবে না; প্রশ্ন করা হবে অপরাধীকে। যেখানে একটি শিশুর ট্রমাকে কৌতূহলের বিষয় নয়, আইনগত ও মানবিক সহায়তার বিষয় হিসেবে দেখা হবে। যেখানে প্রযুক্তি অপরাধীর হাতিয়ার না হয়ে মানুষের নিরাপত্তার মাধ্যম হবে।

নারীর নিরাপত্তা কোনও বিশেষ সুবিধা নয়। এটি তাঁর নাগরিক অধিকার, মানবিক মর্যাদা এবং রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্বের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। তাই গফরগাঁওয়ের এই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত ও আইনানুগ বিচার যেমন জরুরি, তেমনি জরুরি সেই ব্যবস্থাগুলো খুঁজে বের করা, যার মাধ্যমে ভবিষ্যতে আর কোনও নারীকে তাঁর নিজের ঘরেও এমন ভয়াবহতার মুখোমুখি হতে না হয়।

শেষ পর্যন্ত একটি সভ্য রাষ্ট্রের সাফল্য শুধু কত কঠোর শাস্তির আইন সে করেছে, তা দিয়ে মাপা যায় না; বরং তার নাগরিক- বিশেষ করে নারী ও শিশু-কতটা নিরাপদে, মর্যাদার সঙ্গে এবং ভয়মুক্তভাবে জীবনযাপন করতে পারছেন, তার মধ্যেই রাষ্ট্রের মানবিকতার প্রকৃত পরিচয় নিহিত।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, আইন বিভাগ, প্রাইম ইউনিভার্সিটি