শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন: ফিরবেন, কিন্তু কীভাবে?

বাংলাদেশে এখন সবচেয়ে ‘নির্ভরযোগ্য’ জিনিস বোধহয় আবহাওয়া নয়, রাজনৈতিক গুজব। বৃষ্টি হবে কি না, সেটা নিয়ে আবহাওয়া অধিদফতর ভুল করতে পারে। কিন্তু শেখ হাসিনা কবে ফিরবেন, সে বিষয়ে চায়ের দোকানের ‘বিশেষজ্ঞদের’ আত্মবিশ্বাসের কোনো কমতি নেই। কেউ বলেন, ডিসেম্বরেই ফিরছেন। কেউ বলেন, সব ঠিক হয়ে গেছে। কেউ আবার এমন ভঙ্গিতে খবর দেন, যেন দিল্লি থেকে ঢাকার বিমান টিকিটটাও তাঁর হাতে।

এবার অবশ্য ব্যাপারটা একটু আলাদা। কারণ ‘শেখ হাসিনা ফিরছেন’ কথাটি এবার শুধু ফেসবুকের পোস্ট, টকশোর অনুমান কিংবা রাজনৈতিক আড্ডার গরম খবর নয়। শেখ হাসিনা নিজেই বলেছেন, তিনি ফিরবেন। জুলাইয়ে রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি ডিসেম্বরের দিকে দেশে ফিরে আত্মসমর্পণের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিলেন। আগস্টেও সেই অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন। আর সর্বশেষ ভারতের এনডিটিভিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফেরার ব্যাপারে আবারও জোর দিয়েছেন। বরং এবার তাঁর বক্তব্যের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অংশ হলো, প্রশ্নটি তিনি ‘ফিরবেন কি না’ থেকে সরিয়ে ‘কীভাবে ফিরবেন’-এ নিয়ে গেছেন।

রাজনীতিতে এই একটিমাত্র বাক্যই অনেক প্রশ্নের জন্ম দেয়। কারণ ‘ফিরবো’ বলা সহজ। কিন্তু রাষ্ট্রের সীমান্ত, বিমানবন্দর, আদালত, পুলিশ, কূটনীতি এবং নিরাপত্তার সঙ্গে সেই ‘ফিরবো’-এর যখন দেখা হয়, তখন গল্পটা আর এত সরল থাকে না।

শেখ হাসিনা এখন ভারতে। বাংলাদেশ তার প্রত্যর্পণ চেয়েছে। ভারত জানিয়েছে, বাংলাদেশের অনুরোধ তারা পেয়েছে এবং বিষয়টি আইনি ও বিচারিক প্রক্রিয়ার আলোকে পরীক্ষা করছে। বাংলাদেশও বারবার বলেছে, তাকে দেশে ফিরিয়ে আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে। ফলে ডিসেম্বরের ক্যালেন্ডারে শুধু একটি তারিখ নেই, তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে ঢাকা ও দিল্লির কূটনৈতিক হিসাবও।

এখানে একটা মজার ব্যাপার আছে। শেখ হাসিনা বলছেন, তিনি ফিরবেন। বাংলাদেশ বলছে, তাকে ফিরিয়ে আনা দরকার। ভারত বলছে, বিষয়টি পরীক্ষা করা হচ্ছে। তিন পক্ষের বক্তব্য শুনলে মনে হতে পারে, সবাই একই নাটকের চরিত্র, শুধু চিত্রনাট্যটা এখনও কারও হাতে পুরোপুরি পৌঁছায়নি। আর সেই চিত্রনাট্যের সবচেয়ে কঠিন অংশ হলো আইন।

শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মৃত্যুদণ্ডের রায় রয়েছে। তার বিরুদ্ধে আরও মামলা ও আইনি প্রক্রিয়া চলছে। সরকারের বক্তব্য, তিনি দেশে ফিরলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অন্যদিকে শেখ হাসিনা তার বিরুদ্ধে চলমান বিচার ও রায়কে রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন।

সর্বশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, দেশে ফিরে কারাবাসের সম্ভাবনার জন্যও তিনি প্রস্তুত। অর্থাৎ তিনি অন্তত প্রকাশ্য বক্তব্যে জানেন যে দেশে ফেরার পর ফুলের মালা দিয়ে অভ্যর্থনা পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই। আদালত আছে, মামলা আছে, রায় আছে। তারপরও তার বক্তব্য, তিনি ফিরবেন।
এখন প্রশ্ন হলো, সেই ফেরা কীভাবে?

ভারত তাকে প্রত্যর্পণ করবে? তিনি নিজে বাংলাদেশে এসে আত্মসমর্পণ করবেন? বিমানবন্দরে নামবেন? নাকি এমন কোনো আইনি ও কূটনৈতিক পথ তৈরি হবে, যার খুঁটিনাটি এখনো জনসমক্ষে আসেনি? আর দেশে পা রাখার সঙ্গে সঙ্গেই কী হবে? গ্রেফতার, না আদালতে আত্মসমর্পণ, না কারাগার; নাকি প্রথমে অন্য কোনো আইনি প্রক্রিয়া? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনো নেই। অথচ বাংলাদেশে আমরা উত্তর না থাকলেও উত্তর বানিয়ে নিতে বেশ পারদর্শী।

ফেসবুকে এরই মধ্যে নানা ধরনের ‘নিশ্চিত খবর’ পাওয়া যায়। কোনও কোনও পোস্টে মনে হয়, দিল্লি, ঢাকা এবং শেখ হাসিনার মধ্যে সব আলোচনা শেষ। শুধু পোস্টদাতাই জানেন না কেন সরকার এখনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিচ্ছে না। আবার অন্যদিকে এমন কথাও শোনা যায়, তার ফেরার কোনো সম্ভাবনাই নেই। অর্থাৎ এক পক্ষের কাছে সবকিছু নিশ্চিত, অন্য পক্ষের কাছেও সবকিছু নিশ্চিত। শুধু বাস্তবতাটাই এখনো মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে।

রাজনীতির এই জায়গাটিই বিপজ্জনক। কারণ প্রত্যাবর্তনের প্রশ্নকে আমরা খুব সহজেই ‘শেখ হাসিনা ফিরবেন’ বনাম ‘শেখ হাসিনা ফিরবেন না’ এই দুই বাক্যে নামিয়ে ফেলি। অথচ বাস্তব প্রশ্নগুলো অনেক বেশি জটিল।

তিনি ফিরলে তার ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কী হবে? আওয়ামী লীগের কী হবে? দলের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর বর্তমান নিষেধাজ্ঞার কী হবে? তিনি কি দেশে ফিরে সক্রিয় রাজনীতিতে যেতে পারবেন? তাঁর সঙ্গে দলের সম্পর্ক কীভাবে পুনর্গঠিত হবে? তার দেশে ফেরা কি দলের রাজনৈতিক পুনরাগমনের সূচনা করবে, নাকি দুটো বিষয় সম্পূর্ণ আলাদা থাকবে?

সর্বশেষ এনডিটিভি সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগকে আবার দাঁড় করানোর ইচ্ছার কথাও বলেছেন। কিন্তু রাজনৈতিক ইচ্ছা আর রাজনৈতিক বাস্তবতা একই জিনিস নয়। একটি দলকে পুনরায় রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হতে হলে শুধু একজন নেতার দেশে ফেরাই যথেষ্ট নয়। দরকার সাংগঠনিক কাঠামো, রাজনৈতিক পরিবেশ, আইনি অনুমতি এবং মানুষের সমর্থন। ফলে শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন এবং আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনকে একই সমীকরণে ফেলা এখনই ঠিক হবে না।

তবে তার ফিরে আসা যে বাংলাদেশের রাজনীতিতে বড় আলোড়ন তুলবে, তা নিয়ে প্রশ্ন কম। কারণ শেখ হাসিনা বাংলাদেশের রাজনীতির এমন একজন চরিত্র, যাকে বাদ দিয়ে গত কয়েক দশকের রাজনৈতিক ইতিহাস লেখা কঠিন। তার সমর্থকদের কাছে তার পরিচয় একরকম, বিরোধীদের কাছে আরেক রকম। তার শাসনামল নিয়ে যেমন উন্নয়ন ও রাষ্ট্র পরিচালনার নানা দাবি রয়েছে, তেমনি মানবাধিকার, নির্বাচন, বিরোধী রাজনীতি ও রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন নিয়ে রয়েছে গুরুতর অভিযোগ ও বিতর্ক। ২০২৪ সালের আগস্টের পর সেই বিতর্কের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট আরও বদলে গেছে। তাই তার প্রত্যাবর্তন মানে শুধু একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর দেশে ফেরা নয়। এটি হবে এক নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে পুরোনো এক রাজনৈতিক শক্তির সরাসরি মুখোমুখি হওয়া।

এখানে রাষ্ট্রের আচরণই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী, যিনি একই সঙ্গে বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ এবং যার বিরুদ্ধে আদালতের রায় রয়েছে; তার দেশে ফেরার পর রাষ্ট্র কীভাবে আইন প্রয়োগ করবে, সেটিই আসল পরীক্ষা। আইন যদি প্রয়োগ হয়, সেটি হতে হবে আইনের প্রক্রিয়ায়। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া সামলাতে হবে। রাজপথকে সংঘাতের জায়গায় পরিণত হতে দেওয়া যাবে না।

কারণ বাংলাদেশে রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের ইতিহাস খুব সুখকর নয়। এখানে একজন নেতা ফিরলে তার সঙ্গে শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য ফেরে না; ফিরে আসে মিছিল, পাল্টা মিছিল, স্লোগান, সামাজিক বিভাজন এবং কখনো কখনো পুরোনো প্রতিহিংসার ভূতও।

তাই শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়তো শেখ হাসিনা নিজে নন। প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা প্রস্তুত? আদালত কি তার নিজস্ব প্রক্রিয়ায় চলবে? পুলিশ কি রাজনৈতিক নির্দেশের বদলে আইনের ভিত্তিতে কাজ করবে? প্রশাসন কি নিরপেক্ষভাবে পরিস্থিতি সামলাতে পারবে? রাজনৈতিক দলগুলো কি প্রতিপক্ষের প্রত্যাবর্তনকে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা হিসেবে নেবে, নাকি আবারও রাজনীতিকে শত্রুতা ও প্রতিশোধের ভাষায় নিয়ে যাবে?

এসব প্রশ্নের উত্তর শেখ হাসিনার দেশে ফেরার আগেই দরকার। কারণ একজন মানুষ ফিরবেন কি না, সেটি রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু একজন মানুষ ফিরে আসার পর রাষ্ট্র কীভাবে আচরণ করে, সেটি রাষ্ট্রের চরিত্রের প্রশ্ন।

এখানে ভারতের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান এবং তার প্রত্যর্পণের প্রশ্ন বর্তমানে সেই সম্পর্কের অত্যন্ত স্পর্শকাতর একটি অংশ। ফলে ডিসেম্বরের দিকে যত এগোনো যাবে, ঢাকার চেয়ে দিল্লির দিকেও তাকিয়ে থাকবে অনেক চোখ। দিল্লি কী করে, ঢাকা কী করে এবং শেখ হাসিনা কী করেন, এই তিনটি সিদ্ধান্তের সমন্বয়েই হয়তো তৈরি হবে প্রত্যাবর্তনের বাস্তব পথ।

তবে একটা বিষয় পরিষ্কার রাখা দরকার। শেখ হাসিনা বলেছেন, তিনি ফিরবেন। এর অর্থ এই নয় যে তার ফেরার সব ব্যবস্থা হয়ে গেছে। বাংলাদেশ তাকে চায়, এর অর্থ এই নয় যে প্রত্যর্পণ অবধারিত। ভারত বিষয়টি পরীক্ষা করছে, এর অর্থ এই নয় যে সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে। আর ডিসেম্বর সামনে আছে, এর অর্থ এই নয় যে ডিসেম্বরের নির্দিষ্ট কোনো দিন ইতিমধ্যে ঠিক হয়ে গেছে।

রাজনীতির সবচেয়ে বড় বিপদ হলো, মানুষ অনিশ্চয়তা সহ্য করতে পারে না। তাই যেখানে তথ্যের ঘাটতি থাকে, সেখানে অনুমান এসে জায়গা নেয়। অনুমানের জায়গা দখল করে গুজব। আর গুজবের জায়গা দখল করে ‘ভেতরের খবর’। শেষ পর্যন্ত দেখা যায়, খবরের চেয়ে খবরের বাজারটাই বড় হয়ে গেছে।

শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন নিয়েও এখন সেটিই হচ্ছে। কিন্তু ডিসেম্বর যত এগিয়ে আসবে, ‘ভেতরের খবর’ নয়, দরকার হবে প্রকাশ্য সিদ্ধান্তের। ভারত কী সিদ্ধান্ত নিল, বাংলাদেশ কী পদক্ষেপ নিলো, আদালতের অবস্থান কী, শেখ হাসিনা কী করলেন, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অবস্থান কী হলো, এসবই হবে আসল খবর। আর যদি তিনি সত্যিই ডিসেম্বরের মধ্যে ফিরে আসেন, তাহলে সেদিন বাংলাদেশের সামনে শুধু একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যাবর্তন থাকবে না। থাকবে একটি কঠিন রাষ্ট্রীয় পরীক্ষা।

কারণ তাকে ভালোবাসে এমন মানুষ থাকবে, তাকে ঘৃণা করে এমন মানুষও থাকবে। তাকে রাজনৈতিকভাবে ফিরিয়ে আনতে চাওয়া মানুষ থাকবে, তাকে বিচারের মুখোমুখি দেখতে চাওয়া মানুষও থাকবে। এই দুই প্রান্তের মাঝখানে দাঁড়িয়ে রাষ্ট্রকে করতে হবে সবচেয়ে কঠিন কাজটি: আইন প্রয়োগ করতে হবে, কিন্তু প্রতিশোধের ভাষায় নয়; রাজনৈতিক বিরোধ সামলাতে হবে, কিন্তু সংঘাতকে প্রশ্রয় না দিয়ে; নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, কিন্তু নাগরিক অধিকার বিসর্জন না দিয়ে। এটাই আসল পরীক্ষা।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী ও কলামিস্ট