জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি: সংকটের বোঝা কতটা কার?

রাত পোহালেই বদলে যায় জীবনযাত্রার খরচ; এই বাস্তবতা বাংলাদেশের মানুষের কাছে নতুন নয়। গত ২০ সেপ্টেম্বর) রাতে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রল ও অকটেনের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে বাড়ানো হয়েছে, যা সোমবার থেকে কার্যকর হয়েছে। এতে ডিজেলের দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৫৫, পেট্রল ১৬০ এবং অকটেন ১৬৫ টাকা। গত নয় মাসে জ্বালানির দাম বেড়েছে ৩২ থেকে ৩৬ শতাংশ পর্যন্ত। এই সংখ্যাগুলো শুধু পরিসংখ্যান নয়, এর সরাসরি প্রভাব পড়বে মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও প্রতিটি পরিবারের মাসিক বাজেটে।

কেন এই মূল্যবৃদ্ধি, প্রশ্নটি তাই স্বাভাবিক। ইরান-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের জেরে হরমুজ প্রণালি দীর্ঘদিন অবরুদ্ধ থাকায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম অস্থির হয়ে ওঠে। সরকারি সূত্রে জানা যায়, বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি আমদানির ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচও বাড়ছে। এর ফলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপরও চাপ তৈরি হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা এই পরিস্থিতিকে সরকারের সীমিত নীতিগত সুযোগের প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন। জ্বালানি আমদানির কারণে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর যে চাপ তৈরি হচ্ছে, তা অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে তাই সতর্ক ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি প্রয়োজন হবে পর্যাপ্ত বৈদেশিক অর্থায়নের। অর্থাৎ, সরকারও বুঝতে পারছে, এই সিদ্ধান্ত স্বস্তির নয়, সামর্থ্যের সংকট থেকেই নেওয়া।

তবে সরকারের যুক্তির একটি স্তর আরও আছে। দেশে জ্বালানি তেলের দাম দীর্ঘদিন প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় কম থাকায় সীমান্তপথে পাচারের আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল বলে জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছে। প্রশ্ন হলো, পাচার ঠেকাতে দাম বাড়ানো কতটা যৌক্তিক সমাধান? বিপুল সীমান্তরক্ষী বাহিনী আর আইনকানুন থাকতেও যদি পাচার নিয়ন্ত্রণের একমাত্র উপায় হয় মূল্যবৃদ্ধি, তাহলে প্রশাসনিক দুর্বলতার দায় শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়ে সাধারণ ভোক্তার কাঁধেই। এই যুক্তি একেবারে অগ্রহণযোগ্য নয়, কিন্তু এর বোঝা কার ওপর কতটা পড়বে, সেই হিসাবটাই আসল প্রশ্ন।

তবে সরকারি তরফ থেকেও এ বিষয়ে আশ্বস্ত করা হয়েছে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি হলেও এর প্রভাবে পণ্যমূল্যে বড় ধরনের চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা নেই বলে জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি নিয়ে অযথা আতঙ্ক বা গুজব ছড়িয়ে বাজার পরিস্থিতি অস্থির না করার বিষয়েও সতর্ক করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। পরিবহন খরচ বাড়লে সেই খরচ শেষ পর্যন্ত নিত্যপণ্যের দামেই যুক্ত হয়। কাঁচামাল আনা-নেওয়া থেকে শুরু করে উৎপাদিত পণ্য বাজারে পৌঁছানো, প্রতিটি ধাপে জ্বালানি খরচের প্রভাব পড়ে। এক হাতে ভর্তুকির বোঝা কমানোর কথা বলা হচ্ছে, অন্য হাতে সেই বোঝাই ঘুরিয়ে চাপানো হচ্ছে উৎপাদন ব্যয়ের ওপর। এই দ্বিচারিতা অস্বীকার করার উপায় নেই।

শিল্প খাতের উদ্বেগ এখানেই সবচেয়ে গভীর। জ্বালানির দাম বাড়তে থাকলে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে, সেটি স্বাভাবিক। কিন্তু এই ব্যয় যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে অনেক শিল্পকারখানার স্বাভাবিক কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়াই কঠিন হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এ ঝুঁকিতে বেশি থাকবে। তাদের মূলধন তুলনামূলক কম, ঋণের খরচ বেশি এবং বাড়তি ব্যয় সামাল দেওয়ার সক্ষমতাও সীমিত। এর প্রভাব শুধু কারখানার হিসাবের খাতায় আটকে থাকবে না। উৎপাদন ব্যয় বাড়লে মুনাফার ওপর চাপ পড়বে, বিনিয়োগ কমবে এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সংকুচিত হবে। একই সঙ্গে পণ্য ও সেবার দাম বাড়ার চাপও তৈরি হতে পারে। অর্থাৎ, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি একদিকে শিল্পের প্রতিযোগিতার সক্ষমতা কমাবে, অন্যদিকে ভোক্তার ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি করবে। এই শৃঙ্খল ভাঙা না গেলে এর প্রভাব ধীরে ধীরে অর্থনীতির প্রায় প্রতিটি স্তরে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

এখন প্রশ্ন হলো, এই দায় কার ওপর কতটা বর্তায়? সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতন কাঠামোয় সর্বনিম্ন গ্রেডের মূল বেতন বাড়ানো হয়েছে প্রায় ১৪২ শতাংশ, অথচ বেসরকারি ও অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের কোটি কোটি শ্রমিকের বেতন বছরের পর বছর একই জায়গায় আটকে থাকে। যাদের বেতন গত পাঁচ বছরে এক শতাংশও বাড়েনি, জ্বালানির এই মূল্যবৃদ্ধির চাপ তাদের জীবনেই সবচেয়ে বেশি অনুভূত হবে। একই বাজারে যখন আড়াই লাখ টাকা বেতনের কর্মকর্তা আর ছয় থেকে আট হাজার টাকা বেতনের শ্রমিক পাশাপাশি দাঁড়ান, ন্যায্যতার প্রশ্নটি এড়িয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিক্রিয়াও স্পষ্ট। নেতারা বলছেন, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি না করে সরকারের উচিত ছিল অন্য কোনো উপায় খোঁজা। এই সমালোচনা রাজনৈতিক বক্তব্য হলেও এর ভেতরে একটি বাস্তব প্রশ্ন লুকিয়ে থাকে না, খোলাখুলিই দাঁড়িয়ে থাকে—বিকল্প রাজস্ব আহরণের পথ কতটা খতিয়ে দেখা হয়েছে? দেশে কর-জিডিপি অনুপাত এখনো দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে কম পর্যায়ে। প্রকৃত করদাতার সংখ্যা টিআইএনধারীর তুলনায় অনেক কম, যাদের বড় অংশ শূন্য আয়কর রিটার্ন জমা দেন। এই ফাঁক পূরণ না করে বারবার জ্বালানি ও পরোক্ষ করের ওপর নির্ভর করলে বোঝা গিয়ে পড়ে সীমিত আয়ের মানুষের ওপরই, যাদের এড়ানোর কোনো সুযোগ নেই।

আমার মতে, এই সংকট শুধু জ্বালানি মূল্যের সংকট নয়, এটি দেশের রাজস্ব কাঠামোর গভীর দুর্বলতার একটি প্রতিফলন। যতদিন প্রত্যক্ষ কর আহরণের ভিত্তি প্রশস্ত না হবে, ততদিন প্রতিটি বৈদেশিক সংকটের চাপ এসে পড়বে জ্বালানি ও ভোগ্যপণ্যের দামে, আর তার সবচেয়ে বড় শিকার হবেন তারাই, যাদের সামর্থ্য সবচেয়ে কম।

সমাধান একেবারে অসম্ভব নয়। ভর্তুকি পুরোপুরি তুলে না দিয়ে তা লক্ষ্যভিত্তিক করা যেতে পারে, যাতে প্রকৃত অভাবী মানুষ ও ক্ষুদ্র শিল্প প্রয়োজনীয় সহায়তা পায়। একই সঙ্গে শিল্প খাতের জন্য বিশেষ মূল্যহার বা রেয়াতি ব্যবস্থার কথাও ভাবা যেতে পারে। এতে উৎপাদন ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি কিছুটা কমবে এবং কর্মসংস্থানও সুরক্ষিত থাকবে।

তবে দীর্ঘমেয়াদে শুধু ভর্তুকি দিয়ে এই সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়। রাষ্ট্রের রাজস্ব আয় বাড়াতে করের আওতা সম্প্রসারণ করা জরুরি। একই ব্যক্তি বা একই শ্রেণির ওপর বারবার করের বোঝা না বাড়িয়ে নতুন করদাতা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে করজালের আওতায় আনতে হবে। জ্বালানি মূল্য, ভর্তুকি ও রাজস্ব নীতির মধ্যে প্রয়োজনীয় ভারসাম্য তৈরি করাই হতে পারে টেকসই সমাধানের পথ। কারণ রাষ্ট্র মানুষের জন্যই, তাই যেকোনো নীতির কেন্দ্রে মানুষের সক্ষমতা ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তাকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।

জ্বালানি তেলের দাম আন্তর্জাতিক বাজারের বাস্তবতার সঙ্গে সমন্বয় করা প্রয়োজন, এই যুক্তি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবে সেই সমন্বয়ের চাপ কীভাবে ভাগ হবে, কার ওপর কতটা বোঝা পড়বে, তা বিবেচনায় না নিয়ে নেওয়া প্রতিটি সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের ভোগান্তিই বাড়ায়। এই চক্র থেকে বেরিয়ে আসতে হলে সাময়িক সিদ্ধান্তের পাশাপাশি সাহসী ও দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত সংস্কারের পথেই এগোতে হবে।

লেখক: অর্থনৈতিক বিশ্লেষক