সাতক্ষীরার দেবহাটায় ওয়াহিদুজ্জামান শামীমকে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা আমাদের সামনে এক ভয়াবহ প্রশ্ন দাঁড় করিয়েছে— এ দেশে মানুষকে পিটিয়ে হত্যা করার সাহস পায় কারা? কোন শক্তিতে বলীয়ান হয়ে একদল মানুষ আইন নিজের হাতে তুলে নেয়, একজন মানুষকে নির্যাতন করে হত্যা করে এবং রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিচারব্যবস্থাকে কার্যত চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়?
সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, শামীমকে প্রথম দফায় মারধরের পর চিকিৎসাধীন অবস্থায়ও তাঁর ওপর দ্বিতীয় দফায় হামলা চালানো হয়। শেষ পর্যন্ত তার মৃত্যু হয়। পরিবারের অভিযোগ, ধর্ম অবমাননার অভিযোগকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার ও লোকজনকে জড়ো করার মধ্য দিয়ে সহিংসতার পরিবেশ তৈরি করা হয়েছিল। হত্যার ঘটনার পর দায়ের করা মামলায় ১০ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা আরও ২০০ থেকে ২৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে। ১৬ অক্টোবর ২০২৬ পর্যন্ত দুজনকে গ্রেফতারের খবর পাওয়া গেছে।
এটি কেবল একটি হত্যাকাণ্ড নয়— রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব, আইনের শাসন এবং মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগের ঘটনা। প্রথম দফায় হামলার পর একজন মানুষ চিকিৎসাধীন ছিলেন, তারপরও তাঁকে রক্ষা করা গেলো না। এই পরিস্থিতি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যকারিতা এবং বিপন্ন মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সক্ষমতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলে। একজন আহত মানুষ যদি হাসপাতালে নিরাপদ না থাকেন, তাহলে সাধারণ মানুষ নিরাপত্তার নিশ্চয়তা খুঁজবে কোথায়?
বাংলাদেশের সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদ প্রত্যেক ব্যক্তির আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার নিশ্চিত করেছে। ৩২ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, আইনানুযায়ী ব্যতীত কোনও ব্যক্তিকে জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করা যাবে না। অর্থাৎ কারও বিরুদ্ধে যত গুরুতর অভিযোগই উঠুক, তাঁর জীবন কেড়ে নেওয়ার অধিকার কোনও ব্যক্তি, দল, ধর্মীয় গোষ্ঠী কিংবা উত্তেজিত জনতার নেই।
কিন্তু বাস্তবে আমরা কী দেখছি? কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই একদল মানুষ বিচারক, তদন্তকারী ও শাস্তিদাতার ভূমিকা নিয়ে নিচ্ছে। অভিযোগের সত্যতা যাচাই, অভিযুক্তের বক্তব্য শোনা কিংবা আদালতে প্রমাণ উপস্থাপনের প্রয়োজন যেন ফুরিয়ে যাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পোস্ট, একটি অডিও কিংবা একটি অভিযোগই যেন কাউকে শাস্তি দেওয়ার, এমনকি জীবন কেড়ে নেওয়ার অজুহাত হয়ে উঠছে। অথচ অভিযোগ অপরাধের প্রমাণ নয়, জনতার ক্ষোভ আদালতের রায় নয়, আর সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের উপস্থিতি কোনও অপরাধকে বৈধতা দেয় না।
প্রশ্নটি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই— যারা সংঘবদ্ধ হয়ে মানুষকে পিটিয়ে হত্যা করছে, তারা এমন সাহস পাচ্ছে কোথা থেকে? তারা কি মনে করছে, দলবদ্ধ হলে তাদের শনাক্ত করা যাবে না? ধর্মীয় আবেগকে সামনে আনতে পারলে অপরাধের দায় এড়ানো যাবে? নাকি অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে তারা ধরে নিয়েছে, কিছুদিন উত্তেজনা চলবে, মামলা হবে, কয়েকজন গ্রেফতার হবে, তারপর সবকিছু আগের মতো হয়ে যাবে?
এসব প্রশ্নের উত্তর অনুমান দিয়ে নয়, তদন্ত ও প্রমাণের ভিত্তিতে দিতে হবে। কাউকে আগাম অপরাধী ঘোষণা করা আমাদের উদ্দেশ্য নয়। কিন্তু যারা সহিংসতার উসকানি দেয়, মানুষকে জড়ো করে, হামলায় নেতৃত্ব দেয়, কিংবা সরাসরি হত্যায় অংশ নেয়— তাদের প্রত্যেকের ভূমিকা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে আইনের আওতায় আনা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
এ ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভূমিকাও গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। অনলাইনে উসকানি দিয়ে জনতাকে সংগঠিত করা, কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ ছড়িয়ে দেওয়া এবং তার পরিণতিতে সহিংসতার আশঙ্কা তৈরি হলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কত দ্রুত পদক্ষেপ নেয়? সহিংসতা ঘটে যাওয়ার পর মামলা ও গ্রেপ্তারের পাশাপাশি তা প্রতিরোধে আগাম ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে কি? সাতক্ষীরার ঘটনা এসব প্রশ্নের জবাব দাবি করে। রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু হত্যাকাণ্ডের পর অপরাধীদের খুঁজে বের করা নয়— সম্ভাব্য হামলা প্রতিরোধ এবং বিপন্ন মানুষের জীবন রক্ষাও তার দায়িত্ব। বিশেষ করে, প্রথম দফার হামলার পর শামীমের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল, তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা জরুরি।
শামীমের বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ আনা হয়েছিল বলে সংবাদমাধ্যমে এসেছে। কিন্তু অভিযোগ সত্য কিনা, তা নির্ধারণের দায়িত্ব আদালত ও আইনসম্মত প্রক্রিয়ার, কোনও উত্তেজিত জনতার নয়। অভিযোগের সত্যতা যা-ই হোক, কাউকে পিটিয়ে হত্যা করার কোনও বৈধতা তৈরি হয় না। ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা এবং আইনের প্রতি শ্রদ্ধা পরস্পরের বিরোধী নয়। ধর্মীয় অনুভূতিকে ব্যবহার করে কোনও ব্যক্তির জীবন কেড়ে নেওয়া ন্যায়বিচার, মানবিকতা ও আইনের শাসন— সবকিছুকেই অস্বীকার করে। ধর্মীয় পরিচয় কিংবা বিশ্বাসের দাবি কাউকে আইনের ঊর্ধ্বে স্থান দিতে পারে না।
সংবাদমাধ্যমে নিহত শামীমের পরিবারের নিরাপত্তাহীনতার কথাও উঠে এসেছে। একজন মানুষকে হারানোর শোকের পাশাপাশি পরিবারটিকে যদি ভয়ভীতি ও অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকতে হয়, তবে ন্যায়বিচারের পথ আরও কঠিন হয়ে পড়ে। তাই পরিবারের সদস্য ও সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, তাঁদের ভয়ভীতি প্রদর্শন প্রতিরোধ করতে হবে এবং স্বাধীনভাবে অভিযোগ জানানোর সপরিবেশ তৈরি করতে হবে।
মামলায় বিপুলসংখ্যক অজ্ঞাত ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। কিন্তু মামলায় আসামির সংখ্যা বাড়লেই ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয় না। প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য, ভিডিও ফুটেজ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট এবং অন্যান্য আইনসম্মতভাবে সংগৃহীত প্রমাণ বিশ্লেষণ করে প্রত্যেকের ভূমিকা শনাক্ত করতে হবে। যারা সরাসরি হামলা ও হত্যায় অংশ নিয়েছে, যারা সহযোগিতা করেছে কিংবা পরিকল্পিতভাবে উসকানি দিয়েছে, প্রমাণের ভিত্তিতে তাদের দায় নির্ধারণ করতে হবে।
একইসঙ্গে নিরপরাধ কাউকে হয়রানি বা নির্বিচারে অভিযুক্ত করা যাবে না। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার অর্থ প্রতিশোধ নেওয়া নয়— বরং নিরপেক্ষ তদন্ত, ন্যায়সংগত বিচার এবং অপরাধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ শাস্তি নিশ্চিত করা।
প্রধান অভিযুক্তের ভূমিকা এবং ঘটনার আগে ও পরে তাঁর কর্মকাণ্ড সম্পর্কে প্রকাশিত তথ্যও তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কী পদক্ষেপ নিয়েছে, তদন্তে কী অগ্রগতি হয়েছে এবং অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারে কোনও প্রতিবন্ধকতা রয়েছে কিনা, সে বিষয়ে জনগণকে দায়িত্বশীলভাবে অবহিত করতে হবে। একইসঙ্গে প্রথম দফার হামলার পরও কীভাবে দ্বিতীয় দফার হামলা সম্ভব হলো, সম্ভাব্য সহিংসতা ঠেকাতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যথাযথ পদক্ষেপ নিয়েছিল কিনা এবং কোনও দায়িত্বহীনতা বা অবহেলা ছিল কিনা, তা খতিয়ে দেখা জরুরি। অবহেলা বা দায়িত্বে ব্যর্থতার প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদেরও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
একটি রাষ্ট্রের শক্তি শুধু কতজনকে গ্রেফতার করা হলো, তা দিয়ে বিচার করা যায় না। রাষ্ট্র কতটা কার্যকরভাবে মানুষের জীবন রক্ষা করতে পারে, আইনের প্রতি মানুষের আস্থা বজায় রাখতে পারে এবং সংঘবদ্ধ অপরাধীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে পারে, তার ওপরই আইনের শাসনের বাস্তবতা নির্ভর করে। সরকারকে স্পষ্ট করে দিতে হবে, ধর্ম, রাজনীতি, সামাজিক পরিচয় কিংবা জনসমর্থনের আড়ালে কাউকে হত্যা করার অধিকার কারও নেই। অপরাধে যার যতটুকু ভূমিকা, প্রমাণের ভিত্তিতে তার দায়ও সেই অনুযায়ী নির্ধারিত হতে হবে।
আজ শামীমের জীবন কেড়ে নেওয়া হয়েছে। আগামীকাল অন্য কোনও অভিযোগে অন্য কেউ একই পরিণতির শিকার হবেন না—তার নিশ্চয়তা কোথায়? রাষ্ট্র যদি এই প্রশ্নের জবাব দিতে না পারে, তবে মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে সংবিধানের প্রতিশ্রুতি ক্রমেই অর্থহীন হয়ে পড়বে।
আমরা কি এমন বাংলাদেশ চাই, যেখানে জনতার দল নামে অভিযোগ তুলবে, বিচার করবে এবং শাস্তি হিসেবে মানুষকে পিটিয়ে হত্যা করবে? নাকি এমন বাংলাদেশ চাই, যেখানে অভিযোগের বিচার হবে আইনে, মানুষের জীবন থাকবে সুরক্ষিত এবং অপরাধী যে-ই হোক, তাকে জবাবদিহি করতে হবে?
মানুষকে পিটিয়ে হত্যার পর রাষ্ট্র যদি শুধু মামলা নেয়, কিন্তু এমন অপরাধের সাহস জোগানো পরিস্থিতি ও শক্তিকে মোকাবিলা করতে না পারে, তবে প্রশ্ন উঠবেই— রাষ্ট্র কি নাগরিকের জীবন রক্ষায় ব্যর্থ, নাকি অপরাধীদের কাছে নিজের কর্তৃত্ব ছেড়ে দিচ্ছে?
লেখক: মানবাধিকার কর্মী