পর্যটন: যেখানে যাচ্ছি, সেখানে বিপদে পড়লে কী হবে?

ইন্টারনেট আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আশীর্বাদে বেড়াতে যাওয়ার পরিকল্পনা করতে এখন আমাদের খুব একটা বেগ পেতে হয় না। ফেসবুকে কোনও সুন্দর জায়গার ছবি চোখে পড়লো, কী ইউটিউবে রিসোর্টের ভিডিও দেখে ভালো লাগলো—ব্যস! অনলাইন রিভিউ ঘেঁটে পছন্দের হোটেল আর বাস বা প্লেনের টিকেট বুকিং।

প্রযুক্তি আমাদের জন্য আজ নতুন নতুন গন্তব্যের দরজা খুলে দিয়েছে। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও গড়ে উঠছে হোটেল, রিসোর্ট ও পর্যটনকেন্দ্র। কিন্তু এই আয়োজনের মধ্যে একটি প্রশ্ন আমরা ভুলে যাই— যেখানে যাচ্ছি, সেখানে বিপদে পড়লে কী হবে?

কক্সবাজারের ইনানীতে টুপটুপ রেস্টো অ্যান্ড রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে অন্তত ১০ জনের মৃত্যুর ঘটনা এই প্রশ্নকে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ রাখেনি। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, রিসোর্টটির অগ্নিনিরাপত্তার লাইসেন্স ছিল না। একটি দৈনিক পত্রিকার প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র না থাকায় পরিবেশ অধিদপ্তর গত এপ্রিলে প্রতিষ্ঠানটিকে কার্যক্রম বন্ধের নোটিশ দিয়েছিল এবং নির্দেশনা না মানায় পরে জরিমানাও করা হয়। এরপরও প্রতিষ্ঠানটি চালু ছিল বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। আগুনের কারণ তদন্তে স্পষ্ট হবে। কিন্তু তার আগেই প্রশ্ন তোলা যায়, নিরাপত্তার ঘাটতি ও কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অমান্য করার পরও একটি পর্যটনকেন্দ্র কীভাবে চালু থাকে?

এখানে শুধু একটি রিসোর্টের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে না। প্রশ্ন উঠছে, পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তোলা, অনুমোদন দেওয়া, নিয়মিত পরিদর্শন করা এবং নিয়ম না মানলে ব্যবস্থা নেওয়ার মধ্যে আদৌ কার্যকর যোগসূত্র আছে কিনা। কারণ পর্যটকের কাছে একটি জায়গা যতটা আকর্ষণীয়, সেটি ততটাই নিরাপদ —এমন নিশ্চয়তা শুধু প্রচার বা অনলাইন রিভিউ থেকে পাওয়া যায় না।

আর বিপদ মানেই যে হোটেলে আগুন লাগা, তা-ও নয়। সমুদ্রে গোসল করতে নেমে স্রোতে ভেসে যাওয়া, পাহাড়ি পথে দুর্ঘটনা, অনিরাপদ নৌযানে ভ্রমণ, সড়ক দুর্ঘটনা, ছিনতাই কিংবা হয়রানি— ভ্রমণের বিভিন্ন পর্যায়েই বিপদ ঘটতে পারে। কেউ হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে কাছাকাছি চিকিৎসা পাওয়া যাবে কিনা, দুর্ঘটনায় পড়লে উদ্ধারকারী দল কত দ্রুত পৌঁছাবে, কিংবা জরুরি সাহায্য চাইতে হলে কোথায় যোগাযোগ করতে হবে— এসব প্রশ্নের উত্তরও পর্যটকের নিরাপত্তার অংশ।

কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের তথ্যই বিষয়টি বোঝার জন্য যথেষ্ট। সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ, বাংলাদেশের (সিআইপিআরবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে সৈকতে গোসল করতে নেমে ১২ জনের মৃত্যু হয়েছিল। একই সময়ে লাইফগার্ডরা ৭৯৫ জনকে জীবিত উদ্ধার করেন। এই পরিসংখ্যান একদিকে উদ্ধারকর্মীদের কাজের গুরুত্ব তুলে ধরে, অন্যদিকে মনে করিয়ে দেয়— বিপদ এখানে কোনও কাল্পনিক আশঙ্কা নয়। পর্যটকের ভিড় বাড়লে শুধু সতর্কবার্তা দিলেই হবে না—বিপজ্জনক স্রোত চিহ্নিত করা, পর্যাপ্ত প্রশিক্ষিত লাইফগার্ড রাখা এবং দ্রুত উদ্ধারের ব্যবস্থা নিশ্চিত করাও জরুরি।

এই দায়িত্ব পালনের জন্য পর্যাপ্ত জনবল ও সরঞ্জামও প্রয়োজন। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ট্যুরিস্ট পুলিশের প্রধান জানিয়েছিলেন, দেশের প্রায় ১৬০০টি পর্যটনস্থলের বিপরীতে তাদের সদস্যসংখ্যা ছিল মাত্র ১৪০০; তখন ৩২ জেলার ১৩০টি স্থানে নিয়মিত নিরাপত্তা দেওয়া হচ্ছিল। এটি বর্তমান পরিস্থিতির পূর্ণাঙ্গ চিত্র নয়, তবে পর্যটন নিরাপত্তার পরিসর যে কত বড়, তা বোঝায়। এতগুলো জায়গায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে শুধু পুলিশ নয়, স্থানীয় প্রশাসন, ফায়ার সার্ভিস, স্বাস্থ্যসেবা, পরিবহন কর্তৃপক্ষ এবং পর্যটন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকেও সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

সমস্যা হলো, আমরা প্রায়ই নিরাপত্তাকে আলাদা আলাদা দায়িত্বের তালিকা হিসেবে দেখি। হোটেলের নিরাপত্তা হোটেল কর্তৃপক্ষের, সৈকতে উদ্ধারকাজ অন্য সংস্থার, সড়কে চলাচল আরেক কর্তৃপক্ষের, আর অপরাধ মোকাবিলা পুলিশের দায়িত্ব। কিন্তু পর্যটকের যাত্রা তো এভাবে ভাগ করা নয়। বাড়ি থেকে বের হওয়া, গন্তব্যে পৌঁছানো, থাকা, ঘোরাঘুরি এবং বাড়ি ফেরা— পুরোটা তার কাছে এক অনন্য অভিজ্ঞতা। এই যাত্রার কোনও একটি জায়গায় বড় ধরনের ব্যর্থতা ঘটলে বাকি সব আয়োজন অর্থহীন হয়ে যেতে পারে।

দেশি ও বিদেশি পর্যটকের ক্ষেত্রেও নিরাপত্তার মানদণ্ড একই হওয়া উচিত। পরিবার নিয়ে বেড়াতে যাওয়া একজন বাংলাদেশি যেমন নিরাপদ আবাসন, নির্ভরযোগ্য পরিবহন ও জরুরি চিকিৎসা চান, বিদেশি পর্যটকেরও প্রত্যাশা তা-ই। তবে স্থানীয় ভাষা বা নিয়মকানুন না জানার কারণে বিদেশিরা বিপদে পড়লে বাড়তি সমস্যায় পড়তে পারেন। তাই কোথায় সাহায্য পাওয়া যাবে, কীভাবে অভিযোগ জানাতে হবে এবং কাছাকাছি চিকিৎসাকেন্দ্র কোথায়— এসব তথ্য সহজে খুঁজে পাওয়ার ব্যবস্থা থাকা দরকার। ইংরেজিসহ প্রয়োজনীয় ভাষায় নির্দেশনা এবং কার্যকর জরুরি যোগাযোগব্যবস্থা এ ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে।

এ জন্য নতুন কোনও জটিল ব্যবস্থা গড়ার আগে বিদ্যমান ব্যবস্থাগুলো কতটা কার্যকর, তা যাচাই করা দরকার। প্রধান পর্যটন গন্তব্যগুলোর ঝুঁকি চিহ্নিত করে কোথায় অগ্নিনিরাপত্তার ঘাটতি, কোথায় উদ্ধার সরঞ্জামের অভাব, কোথায় চিকিৎসা পেতে দেরি হয়—এসব তথ্য এক জায়গায় আনতে হবে। হোটেল ও রিসোর্টের নিরাপত্তা নিয়মিত পরিদর্শন করতে হবে, আর গুরুতর ঝুঁকি থাকলে আইন অনুযায়ী কার্যক্রম বন্ধসহ প্রয়োজনীয় কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। শুধু কতটি প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করা হলো, তা নয়—কতটি ঘাটতি দূর হলো এবং জরুরি পরিস্থিতিতে কত দ্রুত সাহায্য পৌঁছালো, সেই হিসাবও প্রকাশ করা প্রয়োজন।

পর্যটকের জন্য জরুরি সহায়তা পাওয়ার পথটিও সহজ হওয়া দরকার। বিপদে পড়লে একটি কার্যকর নম্বরে ফোন করে সাহায্য চাওয়া, নিজের অবস্থান জানানো এবং কাছাকাছি হাসপাতাল বা উদ্ধারকেন্দ্রের তথ্য পাওয়া সম্ভব হওয়া উচিত। প্রযুক্তি যখন আমাদের অচেনা গন্তব্য চিনিয়ে দিতে পারে, তখন সেই প্রযুক্তি ব্যবহার করে জরুরি সহায়তা পাওয়াও সহজ করা যায়। তবে অ্যাপ বা হটলাইন চালু করাই যথেষ্ট নয়— ফোন ধরার লোক, দ্রুত সাড়া দেওয়ার দল এবং প্রয়োজনীয় সরঞ্জামও থাকতে হবে।

বাংলাদেশের পর্যটনশিল্পের সম্ভাবনা নিয়ে সন্দেহ নেই। নতুন গন্তব্য, উন্নত আবাসন, ভালো পরিবহন ও আকর্ষণীয় সেবার মাধ্যমে এই খাত আরও এগিয়ে যেতে পারে। কিন্তু পর্যটকের নিরাপত্তাকে উন্নয়নের পরের ধাপ হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি পর্যটনব্যবস্থার শুরু থেকেই থাকা দরকার। সুন্দর দৃশ্য মানুষকে একটি জায়গায় টানে— নিরাপদ অভিজ্ঞতা তাঁকে সেখানে বারবার ফিরে যেতে উৎসাহিত করে।

আমরা সাধারণত পর্যটনশিল্পের সাফল্য মাপি কত মানুষ বেড়াতে এলেন, কত নতুন রিসোর্ট তৈরি হলো কিংবা কত আয় হলো, তা দিয়ে। এবার হিসাবের সঙ্গে আরও কিছু প্রশ্ন যোগ করা দরকার— পর্যটকেরা কতটা নিরাপদে ঘুরলেন, বিপদে পড়লে কত দ্রুত সাহায্য পেলেন, আর যাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা, তারা নিজেদের দায়িত্ব কতটা পালন করলেন? শুধু পর্যটকদের গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়া নয়, তাঁদের নিরাপদে বাড়ি ফিরতে নিশ্চিত করাও পর্যটন শিল্পের সাফল্য।

লেখক: কমিউনিকেশন, কালচার ও করপোরেট দায়িত্বশীলতা পেশায় নিয়োজিত