প্যারিসের বাস্তিল দুর্গের পতন থেকে শুরু করে চব্বিশের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান, ইতিহাসের প্রতিটি মোড়ে মানুষ যে লড়াই করেছে, তার একটাই উদ্দেশ্যে—প্রজা থেকে নাগরিক হয়ে ওঠা। কিন্তু বিপ্লব ঘটে গেলেও অনেক সময় রয়ে যায় ভাষার শৃঙ্খল। আমরা যখন রাষ্ট্রীয় কার্যকারিতা পরিমাপ করতে গিয়ে ‘সুশাসন’ শব্দটি উচ্চারণ করি, তখন কি খেয়াল করি এর ভেতরের ঔপনিবেশিক প্রচ্ছন্ন দাপট?
ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, ভাষা চিন্তা নির্মাণ করে। গত তিন দশকে আমাদের রাজনৈতিক চর্চা, প্রশাসনিক রূপরেখা এবং সুশীল সমাজের টকশোতে যে শব্দটি জপের মতো উচ্চারিত হয়েছে, তা হলো ‘সুশাসন’। আপাতদৃষ্টিতে একে নির্দোষ ও আধুনিক মনে হলেও, ‘শাসন’ শব্দটির ভেতরে লুকিয়ে আছে এক গভীর কর্তৃত্ববাদী পরাক্রম, যেখানে রাষ্ট্র হলো— হুকুমদানকারী শাসক, আর সাধারণ মানুষ হলো— অবাধ্য প্রজা, যাদের সার্বক্ষণিক ‘শাসনে’ বা নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি।
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের আসল লক্ষ্য নাগরিকের ওপর শাসন চালানো নয়; রাষ্ট্রের মূল দায়িত্ব হলো— নাগরিকের অধিকার সুনিশ্চিত করার স্বার্থে প্রশাসনিক ব্যবস্থা, জনসম্পদ এবং আইনি পরিসরকে নিখুঁতভাবে ‘সুপরিচালনা’ করা। সুশাসন এবং সুপরিচালনার মধ্যকার এই পার্থক্যটি নিছক কোনও ভাষাগত কসরত নয়; এটি হলো রাষ্ট্রের সঙ্গে নাগরিকের সম্পর্কের মৌলিক দর্শনের ব্যবধান।
ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু কার হাতে?
শব্দতত্ত্বের গভীরে গেলে দেখা যায়, ‘শাসন’ শব্দের মূল নিহিত রয়েছে অনুশাসন, শৃঙ্খলিত করা এবং শাসনদণ্ড ব্যবহারের ব্যাকরণে। রাজতন্ত্র কিংবা ঔপনিবেশিক আমলে বিলেত থেকে আসা ভাইসরয় ও লাটসাহেবরা প্রজার ওপর শাসন চালাতেন। সেখানে প্রজার দায়িত্ব ছিল আদেশ মান্য করা, আর শাসকের কাজ ছিল হুকুম জারি করা ও রাজস্ব আদায় করা।
অন্যদিকে ‘পরিচালনা’ বা Stewardship বা Public Management শব্দটির মধ্যে রয়েছে ব্যবস্থাপনার সুর, সমন্বয় সাধনের ব্যাকুলতা এবং এক গভীর সেবামূলক অঙ্গীকার। একজন কন্ডাক্টর যেভাবে একটি বড় অর্কেস্ট্রার শত সুরকে এক সুরে বাঁধেন, কিংবা একজন নাবিক যেভাবে ঝড়ের রাতে জাহাজকে নিরাপদ উপকূলে নিয়ে যান, রাষ্ট্র পরিচালনাও ঠিক তেমন। সেখানে শক্তি প্রয়োগের চেয়ে অর্পিত দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করাই মূল কথা।
আন্তর্জাতিক আইনের দিক থেকে দেখলে, জাতিসংঘের Universal Declaration of Human Rights (UDHR)-এর ২১ অনুচ্ছেদ এবং International Covenant on Civil and Political Rights (ICCPR)-এ স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে রাষ্ট্র ও সরকার হলো জনগণের অধিকার বাস্তবায়নের ট্রাস্টি মাত্র। নাগরিককে শাসন করার কোনও নৈতিক বা আইনি সার্বভৌম কর্তৃত্ব সরকারের নেই।
আমেরিকার হার্ভার্ড কেনেডি স্কুলের স্বনামধন্য রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও প্রাতিষ্ঠানিক গবেষক অধ্যাপক ফ্রান্সিস ফুকুইয়ামা তার কালজয়ী গবেষণা গ্রন্থ ‘State-Building: Governance and World Order in the 21st Century’-এ দেখিয়েছেন যে, আধুনিক রাষ্ট্রের সফলতা মাপতে হয় তার প্রশাসনিক সক্ষমতা ও জনসেবা প্রদানে পারদর্শিতা দিয়ে, নাগরিকের ওপর কতটুকু কড়াকড়ি বা নিয়ন্ত্রণ চাপানো হলো তা দিয়ে নয়। যখন আমরা শব্দটিকে ‘সুপরিচালনা’ বলবো, তখন ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু আপনাতেই রাষ্ট্রের হাত থেকে নেমে চলে আসে আসল মালিক অর্থাৎ নাগরিকের হাতে।
সংবিধান এবং প্রশাসনিক সংস্কৃতির মনস্তাত্ত্বিক ফাটল
বাংলাদেশের সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদে খুব স্পষ্ট ভাষায় লেখা আছে—‘প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ।’ একইভাবে সংবিধানের ২১(২) অনুচ্ছেদে প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত প্রতিটি ব্যক্তির মূল কর্তব্য হিসেবে বলা হয়েছে ‘সর্বদা জনগণের সেবা করিবার চেষ্টা করা’।
কিন্তু বাস্তবের প্রশাসনিক চিত্রটি কেমন? বাংলাদেশ তথ্য অধিকার আইন ২০০৯, জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশল বং প্রতিটি সরকারি দফতরে ‘নাগরিক সনদ’ থাকার পরও একজন সাধারণ মানুষকে কেন জন্মনিবন্ধন সনদ, জমির পর্চা কিংবা পাসপোর্ট তুলতে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফাইল আটকে থাকার বা অবমাননার শিকার হতে হয়?
এর মূল কারণ আমাদের আমলাতন্ত্র এখনও নিজেকে ‘শাসক’ বা ‘সুশাসক’ মনে করে, জনগণের ‘পরিচালক’ বা ‘সেবক’ মনে করে না। সুশাসনের নাম দিয়ে তারা যে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও লাইনে দাঁড় করানোর সংস্কৃতি তৈরি করেছে, তা মূলত ঔপনিবেশিক আমলেরই আধুনিক রূপ।
যুগান্তকারী গবেষণা গ্রন্থ ‘Why Nations Fail’-এ হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির অর্থনীতিবিদ ড্যারন অ্যাসেমোগলু এবং এমআইটির অধ্যাপক জেমস রবিনসন প্রমাণ করেছেন যে যেসব দেশ ‘আহরণমূলক’ (Extractive) শাসন বজায় রাখে তারা ধ্বংস হয়, আর যেসব দেশ ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক’ (Inclusive) প্রতিষ্ঠান ও সুপরিচালনা নিশ্চিত করে তারা উন্নত হয়। আমাদের প্রথাগত সুশাসন মূলত আহরণমূলক মানসিকতাকে টিকিয়ে রাখে, যেখানে সুপরিচালনা গড়ে তোলে প্রকৃত অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ।
স্বচ্ছতা, অংশগ্রহণ ও জবাবদিহি: সুপরিচালনার তিন স্তম্ভ
সুশাসনের ব্যাকরণে স্বচ্ছতা, অংশগ্রহণ ও জবাবদিহিতাকে বহুলাংশে যান্ত্রিক ফর্মুলা বা দাতা সংস্থাকে দেখানোর মতো শর্ত হিসেবে দেখা হয়। সুশাসনের ধারণায় স্বচ্ছতা মানে নোটিশ বোর্ডে প্রসেস লিখে রাখা বা এনজিওর জন্য বার্ষিক রিপোর্ট ছাপানো। কিন্তু সুপরিচালনায় স্বচ্ছতা মানে হলো উন্মুক্ত ডেটা প্ল্যাটফর্ম, যেখানে প্রতি টাকার হিসাব নাগরিক তাঁর স্মার্টফোনেই দেখতে পাবেন।
সুশাসনে অংশগ্রহণ মানে হলো সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর লোকদেখানো দু-একটি ‘গণশুনানি’ করা। কিন্তু সুপরিচালনায় অংশগ্রহণ হলো নীতি প্রণয়নের শুরু থেকেই নাগরিকদের সরাসরি টেবিলে বসানো। সুশাসনে জবাবদিহি হলো শাস্তিমূলক—ওপরের কর্তার কাছে নিচের আমলার কৈফিয়ত। সুপরিচালনায় জবাবদিহি হলো অনুভূমিক—যেখানে সরকারি প্রতিষ্ঠান সরাসরি সেবাগ্রহীতা সাধারণ নাগরিকের কাছে জবাব দিতে বাধ্য থাকে।
অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘Development as Freedom’-এ লিখেছেন, উন্নয়ন কোনও যান্ত্রিক বিষয় নয়; মানুষের স্বাধীনতার বিস্তারই হলো উন্নয়নের মূল উদ্দেশ্য। সুশাসন মানুষকে নিয়মের শিকলে বাঁধে, আর সুপরিচালনা মানুষের স্বাধীনতার পরিসর বাড়িয়ে দেয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘নৈবেদ্য’ কাব্যে শাসক ও নাগরিকের আত্মমর্যাদার সম্পর্ক নিয়ে লিখেছিলেন—‘কারা যেন টানিয়াছে গণ্ডি চতুর্দিকে’ নিত্য সচেতন হয়ে থাকিবারে হবে, না হলে মস্তক নত করিবারে হবে—প্রতি পদে পদে। আমরা যদি এই মানসগণ্ডি ভাঙতে না পারি, তবে নাগরিক হিসেবে আমাদের মাথা চিরকাল নত করেই রাখতে হবে।
সুপরিচালনা আনতে পারে গুণগত পরিবর্তন
ধরা যাক, একটি সরকারি হাসপাতালের কথা। সুশাসনের দৃষ্টিভঙ্গিতে হাসপাতালটি সঠিকভাবে চলছে কিনা, তা দেখা হবে ডাক্তারের উপস্থিতি রেজিস্টার, ওষুধের মাস্টাররোল কিংবা সিসিটিভি ক্যামেরার কঠোর নিয়ন্ত্রণ দেখে (যা মূলত নিয়ন্ত্রণ ও শাসন)।
কিন্তু সুপরিচালনার দৃষ্টিভঙ্গিতে মাপকাঠি হবে ভিন্ন: রোগীরা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিনা হেনস্তায় টিকিট ও ওষুধ পাচ্ছেন কিনা, ডাক্তাররা রোগী প্রতি পর্যাপ্ত সময় ও মর্যাদা দিচ্ছেন কিনা এবং কোন ওষুধের সংকট রয়েছে তা রিয়েল-টাইম ডিজিটাল ড্যাশবোর্ডে প্রকাশিত হচ্ছে কিনা।
সুশাসন প্রসেস বা প্রক্রিয়াকে পূজা করে, আর সুপরিচালনা ফলাফল এবং নাগরিকের সন্তুষ্টিকে প্রাধান্য দেয়। সুশাসন খোঁজে কে অপরাধ করলো তাকে সাজা দেওয়া, আর সুপরিচালনা নিশ্চিত করে যেন ব্যবস্থার কাঠামোগত ত্রুটি দূর করে নাগরিক ভোগান্তি স্থায়ীভাবে বন্ধ করা যায়।
জেগে ওঠার সময় এখন
এই রূপান্তর কেবল সরকারের একক নীতিগত সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে না। সচেতন নাগরিক হিসেবে আমাদের নিজেদের চিন্তাভাবনাতেও বিপ্লব আনতে হবে। এতদিন ধরে আমরা কোনও সরকারি দফতরে গিয়ে ‘স্যার’ ডেকে কাজ আদায় করাকেই সুশাসন মনে করেছি। এখন সময় এসেছে নিজেদের অধিকার চিনতে শেখার।
সরকারি কর্মকর্তা বা নির্বাচিত প্রতিনিধি আমাদের ‘শাসক’ নন, তারা আমাদের দ্বারা নিয়োজিত ও আমাদের দেওয়া ট্যাক্সের টাকায় পরিচালিত ‘ব্যবস্থাপক’—এই সত্যটি নিজেদের মনে গভীরভাবে গেঁথে নিতে হবে। প্রতিটি স্থানীয় প্রকল্প, ব্রিজের বাজেট বা পরিষদের বরাদ্দের সঠিক হিসাব পেতে নিয়মিত তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করতে হবে। এবং সেবা পাওয়ার অধিকার কোনও দয়া নয়; এটি সংবিধিবদ্ধ অধিকার। সেবা প্রদানে দেরি বা অবহেলা হলে সম্মিলিতভাবে আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
শব্দের পরিবর্তন কোনও শূন্যগর্ভ ব্যাকরণগত কসরত নয়; শব্দের মধ্য দিয়েই সমাজ নতুন করে ভাবতে শেখে। সুশাসন শব্দটি আমাদের বহু বছর শৃঙ্খলিত করে রেখেছে এক অদৃশ্য প্রজা- মনস্তত্ত্বে। আজ সময় এসেছে সুশাসনের ঔপনিবেশিক ভূত ঝেড়ে ফেলে ‘সুপরিচালনা’র ধারণাকে আলিঙ্গন করার।
রাষ্ট্র যখন জনগণের ওপর খবরদারি করার মানসিকতা বাদ দিয়ে নিজেকে একটি মানবিক ও আধুনিক সেবা প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচালনা করবে, তখনই রচিত হবে প্রকৃত নাগরিক মুক্তির রূপরেখা। এই শব্দটি আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্রের চালিকাশক্তি হলে, আর কোনও নাগরিককে তার অধিকার আদায়ের জন্য রাজপথে রক্ত দিতে হবে না; রাষ্ট্র নিজেই তার কাছে অধিকার পৌঁছে দেওয়ার জন্য দুয়ার খুলে দাঁড়াবে।
লেখক: একজন উন্নয়নকর্মী