পুলিশের পেশাগত দায়িত্ব পালনের অধিকার অবশ্যই আছে। কিন্তু সেই অধিকার কি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের আশঙ্কা তৈরি করে—এমন বক্তব্যকে বৈধতা দেওয়ার যুক্তি হতে পারে? বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের সাম্প্রতিক বিবৃতি এই প্রশ্নটিকেই সামনে নিয়ে এসেছে।
পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকিরের ‘সরকার অনুমোদন দিলে প্রয়োজনে ক্রসফায়ার করতে পিছপা হবে না পুলিশ’—এমন বক্তব্যের পর জনপরিসরে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা কেবল একজন পুলিশ কর্মকর্তার বক্তব্যের যথার্থতা নিয়ে নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ক্ষমতার সীমা, সরকারের দায়বদ্ধতা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং নাগরিকের জীবন ও নিরাপত্তার মৌলিক অধিকার। এমন একটি সংবেদনশীল পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের বিবৃতিটি বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
প্রথমেই একটি বিষয় পরিষ্কার করা দরকার। অ্যাসোসিয়েশনের বিবৃতিতে সরাসরি ক্রসফায়ার বা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে সমর্থন করার ঘোষণা নেই। বরং সেখানে প্রচলিত আইন ও বিধিবিধান অনুসরণ, পেশাগত দায়িত্ব পালন, মানবাধিকার রক্ষা এবং জবাবদিহির কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বিবৃতির সামগ্রিক বক্তব্য, যুক্তির বিন্যাস এবং উপসংহার বিবেচনায় প্রশ্ন ওঠে— এটি কি আইজিপির বক্তব্যের বিপজ্জনক তাৎপর্য নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে, নাকি বক্তব্যটিকে আইনের যথাযথ প্রয়োগের আহ্বান হিসেবে ব্যাখ্যা করে তার পক্ষে যুক্তি দাঁড় করিয়েছে?
অ্যাসোসিয়েশনের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, আইজিপির বক্তব্যকে প্রচলিত আইন ও বিধিবিধানের আলোকে বিবেচনা করা প্রয়োজন। বক্তব্যটির মূল তাৎপর্য নাকি আইনের সীমার মধ্যে থেকে পরিস্থিতি অনুযায়ী যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং পুলিশ সদস্যদের পেশাগত আত্মবিশ্বাস ও দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা নিশ্চিত করা। কিন্তু এখানেই মৌলিক প্রশ্নটি থেকে যায়—আইজিপি যখন সরকারের অনুমোদনের শর্তে ক্রসফায়ারের কথা বলেন, তখন তাঁর বক্তব্যকে শুধু আইন প্রয়োগের সক্ষমতা বৃদ্ধির আহ্বান হিসেবে ব্যাখ্যা করা কতটা যুক্তিসংগত?
ক্রসফায়ার শব্দটি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নিছক কোনও তাত্ত্বিক বা নিরপেক্ষ শব্দ নয়। এর সঙ্গে দীর্ঘদিনের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিতর্ক, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার বলপ্রয়োগ এবং রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির প্রশ্ন জড়িত। ফলে একজন পুলিশপ্রধানের মুখে এ ধরনের বক্তব্য এলে তা স্বাভাবিকভাবেই গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করে। কারণ, আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে দেওয়া বক্তব্য পুলিশ সদস্যদের কাছে কী বার্তা পৌঁছে দেয়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
সরকারের অনুমোদন কোনও কাজকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে আইনসম্মত করে না। সরকার নির্বাহী ক্ষমতার অধিকারী, কিন্তু সেই ক্ষমতা সংবিধান ও আইনের ঊর্ধ্বে নয়। কোনও ব্যক্তি অপরাধে অভিযুক্ত হলেই—তাঁর জীবন কেড়ে নেওয়ার অধিকার রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয় না। অপরাধের অভিযোগ তদন্ত, প্রমাণ মূল্যায়ন, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ এবং নিরপেক্ষ আদালতে বিচার—এগুলোই অপরাধ মোকাবিলার স্বীকৃত আইনি পথ। কোনও রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক নির্দেশ বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে বৈধতা দিতে পারে না।
অ্যাসোসিয়েশনের বিবৃতিতে দায়িত্ব পালনকালে পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলা, হতাহত হওয়ার ঘটনা এবং তাঁদের নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে। পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলা অবশ্যই উদ্বেগজনক। দায়িত্ব পালনকালে তাঁদের জীবন রক্ষা, নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা এবং অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার দায়িত্ব রাষ্ট্রের রয়েছে। এ বিষয়ে কোনও দ্বিমত থাকার কথা নয়।
কিন্তু পুলিশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিরোধিতা পরস্পরবিরোধী নয়। বরং একটি কার্যকর, পেশাদার ও জনআস্থাভিত্তিক পুলিশব্যবস্থার জন্য দুটিই অপরিহার্য। পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটলে তদন্ত, অভিযুক্তদের গ্রেফতার, সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহ, কার্যকর প্রসিকিউশন এবং আদালতের মাধ্যমে শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। একইসঙ্গে দায়িত্ব পালনের সময় আইনসম্মত বলপ্রয়োগের প্রশিক্ষণ, ঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতা এবং প্রয়োজনীয় সুরক্ষা সরঞ্জাম দিতে হবে।
অপরাধ দমনের নামে আইনের সীমা অতিক্রম করার সুযোগ তৈরি হলে—তার পরিণতি শুধু অভিযুক্ত ব্যক্তির জীবনহানির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এতে আইন প্রয়োগের নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়, বিচারব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং পুলিশ ও জনগণের সম্পর্কের মধ্যে ভীতি ও অবিশ্বাস তৈরি হতে পারে।
তাই পুলিশের কার্যকারিতা পরিমাপের মানদণ্ড হওয়া উচিত অপরাধ দমনে আইনসম্মত সাফল্য, বিচার নিশ্চিত করার সক্ষমতা এবং নাগরিকের অধিকার রক্ষার রেকর্ড—কতটা কঠোরভাবে বলপ্রয়োগ করা যায়, তা নয়।
অ্যাসোসিয়েশনের বিবৃতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—এটি আইজিপির বক্তব্যকে ঘিরে সৃষ্ট উদ্বেগের সরাসরি জবাব না দিয়ে বক্তব্যটির একটি ব্যাখ্যা হাজির করেছে। বিবৃতিতে আইন, বিধিবিধান, পেশাগত দায়িত্ব, পুলিশ সদস্যদের নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার কথা বলা হয়েছে। এসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হলেও এগুলো দিয়ে ক্রসফায়ারের মতো একটি বিতর্কিত বিষয়কে ঘিরে তৈরি হওয়া মৌলিক উদ্বেগের নিষ্পত্তি হয় না।
বিবৃতিতে সরাসরি বলা হয়নি যে সরকারের অনুমোদন থাকলেও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড গ্রহণযোগ্য নয়। বলা হয়নি যেকোনও পরিস্থিতিতেই শাস্তি কার্যকর করার বিকল্প হিসেবে ক্রসফায়ার ব্যবহার করা যাবে না। বরং শেষাংশে আইজিপির বক্তব্যকে প্রচলিত আইন ও বিধিবিধানের যথাযথ, দৃঢ় ও আইনসম্মত প্রয়োগ এবং অপরাধ দমনে পুলিশের কার্যকর ভূমিকা নিশ্চিত করার আহ্বান হিসেবে বিবেচনার কথা বলা হয়েছে।
এই উপস্থাপন বক্তব্যটির বিতর্কিত তাৎপর্যকে আড়াল করে সেটিকে তুলনামূলকভাবে গ্রহণযোগ্য প্রশাসনিক বক্তব্য হিসেবে প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি করে। ফলে অ্যাসোসিয়েশন সরাসরি ক্রসফায়ার সমর্থন না করলেও তার বিবৃতি আইজিপির বক্তব্যের প্রতি প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান হিসেবে পাঠ করা যেতে পারে। এমন একটি বিবৃতি থেকে প্রত্যাশিত ছিল স্পষ্ট ঘোষণা—পুলিশ সদস্যদের নিরাপত্তা ও অপরাধ দমনের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য, কিন্তু বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের কোনও অনুমোদন গ্রহণযোগ্য নয়।
একটি পেশাজীবী সংগঠনের দায়িত্ব কেবল তার সদস্যদের অবস্থান ব্যাখ্যা করা নয়; পেশাগত নৈতিকতা ও আইনের শাসনের প্রশ্নে প্রয়োজনীয় সীমারেখাটিও স্পষ্ট করা। বিশেষত যখন বক্তব্যদাতা পুলিশের সর্বোচ্চ পদে অধিষ্ঠিত, তখন তাঁর বক্তব্যের সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কে সতর্কতা আরও বেশি জরুরি।
অ্যাসোসিয়েশনের বিবৃতিতে সংবিধান, ফৌজদারি কার্যবিধি, পুলিশ আইন ও অন্যান্য বিধিবিধান অনুসরণের অঙ্গীকারের কথা বলা হয়েছে। এই অঙ্গীকারের প্রকৃত তাৎপর্য তখনই প্রতিষ্ঠিত হবে—যখন আইন প্রয়োগের সীমা ও বলপ্রয়োগের নীতিগুলোও দ্ব্যর্থহীনভাবে স্বীকার করা হবে।
কোনও ব্যক্তি তাৎক্ষণিকভাবে জীবননাশের হুমকি সৃষ্টি করলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনসম্মত ও প্রয়োজনীয় বলপ্রয়োগের প্রশ্ন উঠতে পারে। কিন্তু জীবন রক্ষার জন্য অপরিহার্য বলপ্রয়োগ এবং কাউকে বিচার ছাড়াই হত্যা করা এক বিষয় নয়। আত্মরক্ষা বা অন্যের জীবন রক্ষার যুক্তি দেখিয়ে আটক ব্যক্তিকে হত্যা করা কিংবা আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ার বাইরে শাস্তি কার্যকর করা বৈধ হয়ে যায় না। বলপ্রয়োগের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয়তা, আনুপাতিকতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদে আইন অনুযায়ী ব্যতীত জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতা থেকে কাউকে বঞ্চিত না করার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সনদের ৬ অনুচ্ছেদেও জীবনের অন্তর্নিহিত অধিকার স্বীকৃত। এসব নীতির আলোকে অপরাধ দমনের লক্ষ্য যত গুরুত্বপূর্ণই হোক, তা অর্জনের পদ্ধতি আইনসম্মত হতে হবে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ক্ষমতা যত বেশি, সেই ক্ষমতার অপব্যবহার ঠেকাতে জবাবদিহির প্রয়োজনও তত বেশি।
পুলিশের প্রতি মানুষের আস্থা প্রতিষ্ঠিত হয় শুধু অপরাধ দমনের দৃশ্যমান সাফল্যের মাধ্যমে নয়; বরং পুলিশ কতটা নিরপেক্ষভাবে আইন প্রয়োগ করে, অভিযোগের যথাযথ তদন্ত করে, হেফাজতে থাকা ব্যক্তির নিরাপত্তা নিশ্চিত করে এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে জবাবদিহি করে, তার ওপরও। পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে স্বাধীন ও কার্যকর তদন্তের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। বেআইনি বলপ্রয়োগ বা হেফাজতে মৃত্যুর অভিযোগের ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রযোজ্য।
আইজিপির বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে অ্যাসোসিয়েশনের সামনে সুযোগ ছিল—পুলিশের পেশাগত দায়িত্ব ও নাগরিকের মৌলিক অধিকারের মধ্যে কোনও কৃত্রিম বিরোধ না তৈরি করে একটি সুস্পষ্ট অবস্থান জানানোর।
বলা যেতো, পুলিশ সদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রকে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে, অপরাধীদের আইনানুগ বিচারের আওতায় আনতে হবে এবং একই সঙ্গে ক্রসফায়ার বা অন্য কোনও নামে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের কোনও সুযোগ রাখা যাবে না। এই অবস্থান পুলিশের পেশাগত মর্যাদাকে দুর্বল করতো না; বরং আইন ও মানবাধিকারের প্রতি তার অঙ্গীকারকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করতো।
বাংলাদেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য পুলিশকে শক্তিশালী করা প্রয়োজন। কিন্তু শক্তিশালী পুলিশ বলতে এমন কোনও বাহিনীকে বোঝায় না, যার হাতে আইনের সীমা অতিক্রম করার সুযোগ থাকবে। শক্তিশালী পুলিশ হলো সেই বাহিনী, যে রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক চাপের ঊর্ধ্বে থেকে আইন অনুসরণ করে, নাগরিকের জীবন রক্ষা করে, অপরাধের কার্যকর তদন্ত করে এবং নিজের কাজের জন্য জবাবদিহি করতে প্রস্তুত থাকে।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি পুলিশকে অপরাধ দমনের ক্ষমতা দেওয়া হবে কিনা, তা নয়। প্রশ্ন হলো— সেই ক্ষমতা কীভাবে প্রয়োগ করা হবে এবং তার সীমা কে নির্ধারণ করবে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এর উত্তর স্পষ্ট; সংবিধান, আইন, বিচারিক প্রক্রিয়া ও মানবাধিকারের মানদণ্ডই ক্ষমতার সীমা নির্ধারণ করবে। সরকারের অনুমোদন, অপরাধের ভয়াবহতা কিংবা পুলিশের ওপর হামলার বাস্তবতা— কোনোটিই এই সীমারেখা মুছে দিতে পারে না।
বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের বিবৃতিকে তাই এই মৌলিক প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে। আইজিপির বক্তব্যের ব্যাখ্যা দেওয়া যথেষ্ট নয়—বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে অবস্থানও স্পষ্ট করতে হবে। কারণ, আইনের শাসনের প্রতি আনুগত্যের প্রকৃত পরীক্ষা হয় তখনই, যখন আইন অতিক্রম করার পক্ষে যুক্তি হাজির হয়। পুলিশের মর্যাদা রক্ষা করতে হলে পুলিশকেই প্রথমে প্রমাণ করতে হবে—আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়, রাষ্ট্রও নয়।
লেখক: মানবাধিকার কর্মী