সন্তান স্কুলে যাচ্ছে, মাদ্রাসায় পড়ছে, শিক্ষকের কাছে শিখছে কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজের ভবিষ্যৎ গড়ছে। অভিভাবক হিসেবে আমরা চাই প্রতিটি জায়গায় সে নিরাপদ থাকুক। যে মানুষগুলোর কাছে আমরা সন্তানকে নিশ্চিন্তে রেখে আসি, তাঁদের ওপর আমাদের বিশ্বাস থাকে। কিন্তু কোনও শিশু যখন সেই পরিবেশেই অনিরাপদ বোধ করে, কিংবা পরিচিত কারও আচরণে ভয় পেয়ে নিজের অভিজ্ঞতার কথা কাউকে বলতে পারে না, তখন প্রশ্নটি শুধু অপরাধের নয়— প্রশ্নটি আমাদের পারিবারিক, সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্কেরও।
সম্প্রতি শিশু নির্যাতনের অভিযোগে মাদ্রাসাশিক্ষকের জামিন নামঞ্জুর, জামালপুরে এক কিশোরীকে ধর্ষণের মামলায় একজন ইমামের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও ব্ল্যাকমেইলিংয়ের অভিযোগে আইনি পদক্ষেপের মতো কয়েকটি খবর নতুন করে ভাবার সুযোগ তৈরি করেছে।
ঘটনাগুলো ভিন্ন। অভিযোগ ও আদালতে প্রমাণিত অপরাধের মধ্যেও গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে।
তাই কোনও ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের পরিচয় দিয়ে সামগ্রিক সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর চেয়ে বড় প্রশ্নটি সামনে আনা জরুরি—আমরা কি এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে পারছি, যেখানে শিশু ও তরুণেরা নিরাপদ থাকবে, নিজেদের সীমারেখা বুঝবে এবং বিপদে পড়লে সাহায্য চাইতে পারবে?
সংখ্যার বাইরেও যে বাস্তবতা
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সংবাদমাধ্যমভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশে শিশুদের ধর্ষণের ৪৫৬টি ঘটনা এবং ধর্ষণের চেষ্টার ১৬৭টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। একই সময়ে শিশুদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের সহিংসতার মোট ১০২৪টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়। এসব ঘটনায় মামলা দায়েরের তথ্য পাওয়া যায় ৫৯০টির ক্ষেত্রে। অর্থাৎ, নথিভুক্ত প্রতিটি ঘটনার পরিণতি বা বিচারিক অগ্রগতির তথ্যও সমানভাবে জানা যায়নি। এই পরিসংখ্যান প্রকৃত ঘটনার পূর্ণ চিত্র নয়—অনেক ঘটনা সামাজিক লজ্জা, ভয়, পারিবারিক চাপ কিংবা প্রতিশোধের আশঙ্কায় প্রকাশ্যে আসে না।
পরিসংখ্যান আমাদের সমস্যার ব্যাপ্তি বুঝতে সাহায্য করে, কিন্তু প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একজন মানুষ, একটি পরিবার এবং দীর্ঘমেয়াদি মানসিক ক্ষতির আশঙ্কা। নির্যাতনের অভিজ্ঞতা শিশুর আত্মবিশ্বাস, পড়াশোনা, অন্যের প্রতি বিশ্বাস এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্ককে প্রভাবিত করতে পারে। তাই শুধু কতটি ঘটনা ঘটলো, কতটি মামলা হলো কিংবা কতজনের সাজা হলো, তা দিয়ে শিশু সুরক্ষার সাফল্য পরিমাপ করা যথেষ্ট নয়। কতগুলো ঘটনা ঘটার আগেই প্রতিরোধ করা গেলো, কতজন শিশু নিরাপদে অভিযোগ জানাতে পারলো এবং কতজন প্রয়োজনীয় সহায়তা পেল, সেগুলোও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
শিশুর নীরবতাকে আমরা কীভাবে বুঝি?
শিশুরা সব সময় নিজেদের অভিজ্ঞতা স্পষ্ট ভাষায় প্রকাশ করতে পারে না। কেউ হয়তো ভয় পায়, কেউ বুঝতে পারে না যে তার সঙ্গে ঘটে যাওয়া আচরণটি অনুচিত, আবার কেউ মনে করে কথাটি বললে তাকে অবিশ্বাস করা হবে বা উল্টো তাকেই দোষ দেওয়া হবে। পরিচিত ও শ্রদ্ধার মানুষ জড়িত থাকলে এই দ্বিধা আরও বাড়তে পারে। শিশুটিকে হয়তো সেই ব্যক্তিকে সম্মান করতে শেখানো হয়েছে। তাঁর কথা মানতে অভ্যস্ত, কিংবা তাঁর বিরুদ্ধে কিছু বললে পরিবার বা প্রতিষ্ঠানের মানুষ কষ্ট পাবেন—এমন আশঙ্কায় সে চুপ থাকে।
আমরা প্রায়ই শিশুদের ভালো আচরণ, বড়দের সম্মান করা এবং শৃঙ্খলা মেনে চলার শিক্ষা দিই।
কিন্তু একইসঙ্গে তাদের শেখাই কি—নিজের শরীর ও ব্যক্তিগত সীমারেখা সম্পর্কে সচেতন থাকা জরুরি? কোনও স্পর্শ, কথা বা আচরণে অস্বস্তি হলে তা প্রকাশ করা যায়? কেউ ভয় দেখালে, গোপন রাখতে বললে কিংবা ব্যক্তিগত ছবি দিয়ে ব্ল্যাকমেইল করলে বিশ্বস্ত কারও সাহায্য নেওয়া যায়? এসব শিক্ষা বয়সোপযোগী ভাষায় পরিবার, স্কুল, মাদ্রাসা ও অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দেওয়া প্রয়োজন।
এর অর্থ শিশুদের মনে ভয় তৈরি করা নয়। বরং তাদের আত্মবিশ্বাসী করে তোলা, যাতে তারা বিপদ চিনতে পারে এবং জানে যে সাহায্য চাওয়ার অধিকার তাদের রয়েছে। একইভাবে অভিভাবকদেরও বুঝতে হবে, সন্তানের আচরণে হঠাৎ পরিবর্তন, অস্বাভাবিক ভয় কিংবা কোনও নির্দিষ্ট ব্যক্তির কাছে যেতে অনীহা দেখা দিলে—তাকে বকাঝকা না করে মন দিয়ে শোনা দরকার। এসব লক্ষণ একাই নির্যাতনের প্রমাণ নয়, তবে শান্তভাবে খোঁজ নেওয়ার যথেষ্ট কারণ হতে পারে।
বিশ্বাসের সঙ্গে জবাবদিহিও জরুরি
শিক্ষক, ধর্মীয় নেতা, প্রশিক্ষক, চিকিৎসক কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ শিক্ষার্থী—বিভিন্ন ভূমিকায় থাকা মানুষ অন্যদের আস্থা অর্জন করেন। এই আস্থা সমাজের জন্য মূল্যবান। কিন্তু ব্যক্তিগত সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করে শিশু সুরক্ষার দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়া যায় না। ভালো মানুষ থাকবেন, আবার এমন ব্যবস্থাও থাকবে, যা অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণ প্রতিরোধ করবে, অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে নেবে এবং প্রয়োজন হলে নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করবে।
প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কার্যকর শিশু সুরক্ষানীতি, দায়িত্বপ্রাপ্ত সুরক্ষা কর্মকর্তা, গোপনীয়তা বজায় রেখে অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা এবং অভিযোগের পর কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে, তার সুস্পষ্ট নিয়ম থাকা উচিত। শিক্ষক ও কর্মীদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ দিতে হবে। শিশুদের সঙ্গে একান্তে কাজ করার ক্ষেত্রে নিরাপদ আচরণের নির্দেশিকা থাকতে হবে এবং অভিযোগ উঠলে অভিযুক্ত ব্যক্তির পরিচয় বা প্রতিষ্ঠানের সুনামকে শিশুর নিরাপত্তার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া যাবে না। একই সঙ্গে অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, ন্যায্য প্রক্রিয়া এবং ভুক্তভোগীর পরিচয় ও মর্যাদা রক্ষাও নিশ্চিত করতে হবে।
এসব ব্যবস্থা শুধু মাদ্রাসা বা স্কুলের জন্য নয়। বিশ্ববিদ্যালয়, আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কোচিং সেন্টার, খেলাধুলার প্রশিক্ষণকেন্দ্র এবং শিশুদের নিয়ে কাজ করা প্রতিটি প্রতিষ্ঠানেরই নিজস্ব সুরক্ষাব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। অনলাইন যোগাযোগ, ব্যক্তিগত ছবি এবং ডিজিটাল ব্ল্যাকমেইলিংয়ের ঝুঁকিও এর অন্তর্ভুক্ত হওয়া উচিত।
পরিবার থেকেই শুরু হতে পারে পরিবর্তন
প্রাতিষ্ঠানিক নীতিমালা যত ভালোই হোক, শিশু যদি নিজের বাড়িতে কথা বলার নিরাপদ পরিবেশ না পায়, তাহলে সেই নীতির সুফল সীমিত হয়ে যায়। সন্তানের কথা শেষ পর্যন্ত শোনা, তার অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়া এবং ভুল করলে অপমান না করে বোঝানো—এসব ছোট অভ্যাস দীর্ঘমেয়াদে বড় পার্থক্য তৈরি করতে পারে। কোনও শিশু নির্যাতনের কথা জানালে প্রথম প্রতিক্রিয়া হওয়া উচিত তাকে বিশ্বাসের সঙ্গে শোনা, তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজনীয় পেশাগত সহায়তা নেওয়া— তাকে কেন আগে বলেনি, কেন সেখানে গিয়েছিল কিংবা কেন বাধা দেয়নি—এসব প্রশ্ন করে দায় তার ওপর চাপানো নয়।
এখানে ধর্মীয় ও সামাজিক নেতাদেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। পরিবার, নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ ও মানুষের মর্যাদা রক্ষার যে মূল্যবোধ তাঁরা প্রচার করেন, শিশু সুরক্ষার বাস্তব উদ্যোগেও তার প্রতিফলন থাকা দরকার। কোনও সম্প্রদায় বা পেশার সবাইকে সন্দেহের চোখে দেখার প্রয়োজন নেই; বরং প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল মানুষকে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সহযোগী হিসেবে যুক্ত করতে হবে।
অভিযোগের ক্ষেত্রে নীরবতা ভাঙা যেমন জরুরি, তেমনই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুক্তভোগীর পরিচয় ছড়িয়ে দেওয়া, যাচাই না করা তথ্য প্রচার করা কিংবা আইনগত প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগেই কাউকে অপরাধী ঘোষণা করা থেকেও বিরত থাকতে হবে। এতে শিশুর ক্ষতি বাড়তে পারে এবং ন্যায়বিচারের প্রক্রিয়াও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
আমরা এমন একটি সমাজ চাই, যেখানে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতিটি ঘটনার পর নতুন করে ক্ষোভ প্রকাশের অপেক্ষা করতে হবে না। পরিবারে খোলামেলা কথোপকথন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কার্যকর সুরক্ষানীতি, দায়িত্বশীল আচরণের শিক্ষা এবং অভিযোগের নিরপেক্ষ নিষ্পত্তি—এসবকে দৈনন্দিন ব্যবস্থার অংশ করতে পারলেই পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরি হবে।
একটি শিশু যেন জানে, তার সঙ্গে কোনও অনুচিত আচরণ হলে সে বলতে পারবে; বললে তাকে অপমান করা হবে না, তার কথা গুরুত্ব দিয়ে শোনা হবে এবং তার নিরাপত্তার জন্য বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়া হবে। এই নিশ্চয়তা তৈরি করা শুধু অভিভাবক বা শিক্ষকের দায়িত্ব নয়, আমাদের সবার সম্মিলিত দায়িত্ব। কারণ শিশুর জন্য সবচেয়ে নিরাপদ সমাজ সেটিই, যেখানে বিপদ ঘটার পর তাকে রক্ষা করার চেষ্টা করা হয় শুধু তা নয়, বিপদে পড়লে সাহায্য চাইতে পারবে—এই বিশ্বাসটিও তার মধ্যে আগে থেকেই তৈরি করা হয়।
লেখক: কমিউনিকেশন, কালচার ও করপোরেট দায়িত্বশীলতা পেশায় নিয়োজিত