নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে দুটি দেশের ভোট বিশ্বের নজর কেড়েছে। ইসরায়েলে নেতানিয়াহুর জোট সরকার গড়ার মতো আসন পায়নি। যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্পের রিপাবলিকানরা কংগ্রেসের হাউস আর সিনেট, দুটোই হারিয়েছে। মিশিগানে জিতে আবদুল এল সাইয়েদ হয়েছেন দেশটির প্রথম মুসলিম সিনেটর। তিনটি খবর পাশাপাশি রাখলে মনে হয়, কোনো নেতার দাপট চিরদিন থাকে না। তবে আমার মনে হয়, আসল কথাটা আরেকটু গভীরে। সবসময় নেতা বদলালেই রাষ্ট্রের মনোভাব বদলায় না।
ইসরায়েল থেকে শুরু করি। সেখানকার নেসেটে ১২০ আসন, সরকার গড়তে লাগে ৬১। ২৭ অক্টোবরের ভোটে নেতানিয়াহুর জোট পেয়েছে ৫৩, গাদি আইজেনকোটের জোট ৪৮ আর আরব দলগুলো রেকর্ড ১৯টি আসন। গত কয়েক দিনে হিসাবটা খানিক পরিষ্কার হয়েছে। প্রেসিডেন্ট হারজগের সঙ্গে দুই দিনের বৈঠকে ৬৭ জন সংসদ সদস্য আইজেনকোটের নাম প্রস্তাব করেছেন। নেতানিয়াহুর পক্ষে ছিলেন ৪৬ জন, বিরত ছিলেন সাতজন। দুটি আরব দলই আইজেনকোটকে সমর্থন দিয়েছে। হারজগ ৮ নভেম্বর জানাবেন কার হাতে সরকার গড়ার দায়িত্ব যাবে।
তবে তিনি নিজেই বলেছেন, জোটগুলোর পরস্পরকে আটকে দেওয়ার প্রবণতায় ছবিটা পুরো স্পষ্ট নয়। আইজেনকোটের শিবিরের লিবারম্যান আরব দলের ভরসায় গড়া সরকারে যাবেন না বলে আবারও জানিয়েছেন, যদিও ধর্মপ্রাণ হারেদি দলগুলোর ওপর তার আগের আপত্তি তুলে নিয়েছেন বলে খবর বেরিয়েছে। ১০ নভেম্বর নতুন নেসেটের সদস্যরা শপথ নেবেন। নেতানিয়াহু দুর্বল হয়েছেন ঠিকই, কিন্তু তার অধ্যায় শেষ, এ কথা এখনই বলা যায় না।
নেতানিয়াহু গেলে ফিলিস্তিনিরা কি হাঁপ ছাড়তে পারবেন? আমার মনে হয় না। আইজেনকোট ২০১৫ থেকে ২০১৯ পর্যন্ত সেনাপ্রধান ছিলেন। প্রতিবেদন বলছে, আগস্টের এক সাক্ষাৎকারে তিনি দুই রাষ্ট্র সমাধানকে অবাস্তব বলেছেন এবং পশ্চিম তীরের বসতিকে শর্ত সাপেক্ষে সমর্থন করেছেন। অথচ অধিকৃত ভূমিতে বসতি আন্তর্জাতিক আইনে অবৈধ। উগ্র বসতিকারীদের সহিংসতার নিন্দা করা এক জিনিস, পূর্ণ সার্বভৌম ফিলিস্তিনের পক্ষে দাঁড়ানো আরেক জিনিস। আমার বিচারে ইসরায়েলের নিরাপত্তা-ভাবনা মুখ বদলালেই বদলে যাবে না।
ওয়াশিংটনের চিত্রও জটিল। বুশের সময় ২০০৬ সালের পর এই প্রথম কোনো রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট একসঙ্গে দুই কক্ষ খোয়ালেন। ভোটারদের রাগ ছিল দামের ওপর: জ্বালানি, মুদি, ঘরভাড়া। ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স নিজেই প্রকাশ্যে বলেছেন, ইরান যুদ্ধের কারণেই এই হার। ট্রাম্প অবশ্য সিদ্ধান্তে অনড়। তার কথা, ইরানের হাতে পরমাণু অস্ত্র যেতে দেওয়া যায় না। ভোটাররা যুদ্ধের নীতিকথা নিয়ে যতো না ভেবেছেন, তার বিল নিয়ে ভেবেছেন তার চেয়ে বেশি।
ডেমোক্র্যাটদের হাতে অবশ্য সব ক্ষমতা আসেনি। কমিটির চেয়ারম্যান পদ, তদন্ত আর তলবের ক্ষমতা মিলবে, কিন্তু প্রেসিডেন্টের ভেটো উল্টে দেওয়ার মতো দুই তৃতীয়াংশ নেই। ১১ ডিসেম্বর সরকারি তহবিলের মেয়াদ ফুরোবে। ওটাই তাদের সবচেয়ে বড় দর-কষাকষির জায়গা। তবে সেনারা যখন মাঠে, তখন টাকা আটকে দিলে রাজনৈতিক ঝুঁকি আছে। রিপাবলিকান শিবিরেও ফাটল দেখা দিয়েছে।
টমাস ম্যাসি জানিয়েছেন, কংগ্রেস বসলে তিনি প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের অভিশংসনের প্রস্তাব তুলবেন। ট্রাম্প প্রকাশ্যে হেগসেথের পাশে আছেন। ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে তিনি বলেছেন, আপাতত নতুন হামলার ইচ্ছা নেই। রয়টার্সের দুই সূত্র অবশ্য মনে করে, লড়াই আবার শুরু হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
ট্রাম্প হারলে ইরানের কি স্বস্তি? আমি অতটা আশা দেখি না। এটা আমার নিজের বিশ্লেষণ, কোনো সূত্রের দাবি নয়। ইরানের প্রতি মার্কিন কঠোরতা তিনটি স্তরে বোনা। একটি আইনি ও প্রশাসনিক: নিষেধাজ্ঞার কাঠামো, কংগ্রেসের পুরোনো অবস্থান আর নিরাপত্তা আমলাতন্ত্র। একটি রাজনৈতিক: ইরানের প্রতি নরম দেখালে মার্কিন ভোটের বাজারে লাভ হয় না, তাই ডেমোক্র্যাটরা যুদ্ধের বিরোধিতা করলেও করবে খরচ আর কংগ্রেসের এখতিয়ারের কথা তুলে। আর একটি কৌশলগত: ইরানের পরমাণু কর্মসূচি আর ইসরায়েলের নিরাপত্তা দুই দলেরই স্পর্শকাতর জায়গা। তেহরানও নরম হচ্ছে না। সংসদ স্পিকার কালিবাফ ভ্যান্সকে ‘হেরে যাওয়া জুয়াড়ি; বলে খোঁচা দিয়েছেন। যুদ্ধের তাপ কমতে পারে, কিন্তু ইরানকে স্থায়ী হুমকি ভাবার অভ্যাস সহজে যাবে না। এই শত্রুতা কোনো একজন মানুষের নয়, ব্যবস্থার।
এল সাইয়েদের জয়ের আলাদা গুরুত্ব আছে। প্রচারের সময় ট্রাম্প তাকে ‘জিহাদি’ বলে আক্রমণ করেছিলেন। এ ধরনের ধর্মীয় পরিচয় ধরে আঘাত সাধারণত ভয় আর বিভেদ বাড়ায়। মিশিগানের ভোটাররা তবু তাকেই বেছে নিয়েছেন। এতে বোঝা যায়, বিদ্বেষের রাজনীতির একটা সীমা আছে। তবে আবেগ একটু সরিয়ে হিসাব কষা দরকার। একশ জনের সিনেটে তিনি একজন। একা কেউ পররাষ্ট্রনীতির মোড় ঘোরাতে পারেন না, বিশেষ করে ইসরায়েল-ইরান প্রশ্নে, যেখানে দুই দলের অবস্থান দীর্ঘদিনের। তার প্রচারের মূল কথাও ছিল স্বাস্থ্যসেবা আর জীবনযাত্রার খরচ। ভোটাররা পকেটের কথা ভেবে তাকে বেছে নিয়েছেন, নতুন কোনো পররাষ্ট্রনীতির আশায় নয়। প্রতিনিধিত্বের মূল্য অনেক, কিন্তু প্রতিনিধিত্ব হলেই নীতি বদলায় না।
এবার আমাদের কথা। আশু স্বস্তির সম্ভাবনা আমি কম দেখছি। নির্বাচনের পর ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ১০০ ডলারের নিচে নেমে ৯৩ ডলারের কাছাকাছি এসেছে। বাজার ধরে নিয়েছে, ফল দেখে ট্রাম্প সমঝোতার দিকে ঝুঁকবেন। কিন্তু ৫ নভেম্বরই ইরান জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে আরও তিনটি ট্যাঙ্কার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। রয়টার্স লিখছে, উপসাগরে ট্যাঙ্কারে হামলা প্রায় রেকর্ড গতিতে চলছে। আমাদের জ্বালানির প্রায় সবটাই আমদানি করতে হয়, গ্যাসের চাহিদার প্রায় ৩০ শতাংশ আসে এলএনজি থেকে। ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে ব্র্যাক ইপিএল স্টক ব্রোকারেজের বরাতে বলা হয়েছে, তেলের দাম ব্যারেলে ১০ ডলার বাড়লে মাসিক আমদানি খরচ প্রায় ৮০ মিলিয়ন ডলার বাড়ে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক সমীক্ষা সতর্ক করেছে, যুদ্ধ চললে মূল্যস্ফীতি ১০ শতাংশ ছাড়িয়ে যেতে পারে। সেপ্টেম্বরেই জ্বালানির দাম ১৭ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। এলএনজির দাম যুদ্ধের আগের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। বিশ্ববাজারে সুদের চাপও কমছে না: ব্যাংক অব ইংল্যান্ড তিন বছরে প্রথমবার সুদের হার বাড়িয়েছে। তাই দাম হুট করে নেমে যাবে, এমন আশায় বসে থাকা ঠিক হবে না। জ্বালানি, মূল্যস্ফীতি, রিজার্ভ আর প্রবাসী আয়ের ওপর চাপ আরও কিছুদিন থাকবে বলেই আমার ধারণা।
তাহলে কী করা যায়? আমার সুপারিশ কয়েকটি। জ্বালানির কৌশলগত মজুত গড়া জরুরি, কারণ মজুত না থাকলেই সংকটে আতঙ্কিত কেনাকাটা শুরু হয়। আমদানির উৎসও ছড়াতে হবে। মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে, ধরা যাক দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়, বিকল্প খুঁজতে হবে, আর সুযোগ পেলে স্পট বাজার থেকে কিনতে হবে। ভর্তুকির বোঝা কমাতে সৌর ও বায়ুর মতো দেশি নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানো দরকার। আমদানির ওপর নির্ভরতা যত কমবে, ওয়াশিংটনের প্রতিটি সিদ্ধান্তে আমাদের ঘরে আঁচ লাগার ভয়ও তত কমবে।
কূটনীতিতে সতর্ক ও নিরপেক্ষ থাকতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য আর পোশাক রফতানির সম্পর্ক ঠিক রেখেই ইরান ও উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে প্রবাসী কর্মসংস্থান ও জ্বালানি যোগাযোগ বজায় রাখতে হবে। আর রিজার্ভ ও বিনিময় হার সামলাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে সাবধানে চলতে হবে। খরচ বাড়লে সুদ কমানোর পরিকল্পনা আটকে যেতে পারে।
নেতানিয়াহুর জোট পিছিয়ে পড়েছে বলেই ফিলিস্তিনিদের স্বাধীনতা নিশ্চিত হয়ে যায়নি। ট্রাম্প হেরেছেন বলেই ইরানে শান্তি আসছে না। বাংলাদেশের জন্য শিক্ষাটা সোজা। অন্যের দেশের ক্ষমতার লড়াই আমরা গ্যালারিতে বসে শুধু দেখতে পারি না। কারণ তার ধাক্কা এসে লাগে আমাদের বাজারদরে, বিদ্যুৎ-গ্যাসের বিলে, কারখানার উৎপাদনে আর প্রবাসীর পাঠানো টাকায়। ভোটের অঙ্কে নেতা বদলায়। নীতি বদলাতে সময় লাগে, লাগে রাষ্ট্রের গভীর স্বার্থ আর জনমতের দীর্ঘ চাপ। তাই ভরসা রাখতে হবে নিজেদের প্রস্তুতির ওপর।
লেখক: প্রাবন্ধিক ও বিশ্লেষক