নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার পিয়ার সাত্তার লতিফ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্তকে কানে ধরে উঠবসের ঘটনার রেশ না যেতেই এবার রূপগঞ্জে একটি স্কুলের প্রধান শিক্ষককে জুতাপেটার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় এক নারী ইউপি সদস্যের বিরুদ্ধে।
নির্যাতিত প্রধান শিক্ষকের নাম ফারুক আহমেদ। তিনি উপজেলার কায়েতপাড়া ইউনিয়নের চনপাড়া পুনর্বাসন কেন্দ্রের ‘আল-আমীন মডেল একাডেমির’ প্রধান শিক্ষক।
অভিযুক্ত বিউটি আক্তার কুট্টি রূপগঞ্জ উপজেলার কায়েতপাড়া ইউনিয়নের ৭, ৮ ও ৯ নং ওয়ার্ডে সংরক্ষিত নারী আসনে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ইউনিয়ন পরিষদে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় মেম্বার পদে নির্বাচিত হয়েছেন।
শিক্ষক ফারুক আহমেদকে জুতাপেটার ঘটনার প্রতিবাদে বৃহস্পতিবার দুপুরে নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবের সামনে ওই স্কুলের শিক্ষার্থীরা মানববন্ধন করেছে। তবে অভিযুক্ত নারী মেম্বারের দাবি তিনি জুতাপেটা করেননি। তবে জুতাপেটার হুমকি দিয়েছিলেন।
এদিকে, মানববন্ধন চলাকালে গণমাধ্যম কর্মীরা তথ্য নিতে গেলে ওই নারী মেম্বারের পক্ষে জাতীয় পার্টি নেতারা এসে সংবাদ প্রকাশ না করার অনুরোধ করেন। তবে এ ঘটনায় তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে উপজেলা প্রশাসন।
উপজেলা শিক্ষা অফিসার, নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে দেওয়া ফারুক আহমেদের লিখিত অভিযোগে জানা যায়, গত ২৯ মে সকাল সাড়ে ১০টায় কায়েতপাড়া ইউপি সদস্য ৭, ৮ ও ৯ নং ওয়ার্ডের নারী মেম্বার বিউটি আক্তার কুট্টি তার দুই নাতনিকে সম্পূর্ণ বিনা বেতনে পড়ালেখার জন্য প্রধান শিক্ষককে চাপ দেন। এ দাবির কারণে প্রধান শিক্ষক বিদ্যালয়ের সভাপতির অনুরোধে বিদ্যালয়ের বেতন মওকুফ করে দেন। কিন্তু বিউটি আক্তার তাতেও সন্তুষ্ট হননি। তিনি কোচিং ফিও মওকুফের জন্য চাপ প্রয়োগ করেন। প্রধান শিক্ষক ফারুক আহমেদ তাতে রাজি না হওয়ায় তাকে গালাগালের পর জুতাপেটা করেন বিউটি। এ সময় স্কুলের দুই সহকারী শিক্ষিকা তাকে জোর করে রুমের বাইরে নিয়ে যান। খবর পেয়ে তার (বিউটির) বড় ভাই, মেয়ে জামাই ও তার মাদক বাহিনীসহ ২০/২৫ জন লোক প্রধান শিক্ষকের রুমে এসে আসবাব ও বইপত্র ফেলে দিয়ে তাকে দেখে নেওয়ার হুমকি দিয়ে চলে যান।
ওই ঘটনার প্রতিবাদে বৃহস্পতিবার দুপুরে নারায়ণগঞ্জ শহরের চাষাঢ়া নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবের সামনে ইউপি সদস্য বিউটি আক্তার কুট্টির শাস্তির দাবিতে মানববন্ধন করেছেন ভুক্তভোগী প্রধান শিক্ষক ফারুক আহমেদসহ স্কুলের অন্য শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা। এ সময় তারা বিউটি আক্তার কুট্টির দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন তারা। এতে উপস্থিত ছিলেন আল-আমিন মডেল একাডেমির সহকারী শিক্ষক ফরাদ হোসেন, কাউছার আহমেদ, খাদিজা, জায়েদা, ইয়াসমিন আক্তার, শরিফাসহ স্কুলের প্রায় অর্ধশতাধিক শিক্ষার্থী।
সংবাদ না করার জন্য জাতীয় পার্টির নেতার অনুরোধ
এদিকে, মানববন্ধন চলাকালীন সময়ে নিজেকে রুপগঞ্জ উপজেলা জাতীয় পার্টির সাধারণ সম্পাদক দাবি করে এম এ হাসান সংবাদিকদের সংবাদ প্রকাশ না করার জন্য অনুরোধ করেন। এছাড়াও অভিযুক্ত বিউটি আক্তার কুট্টিকে আত্মীয় হিসেবে দাবি করেন তিনি। শিক্ষক ফারুক আহমেদের সঙ্গে বিউটির বাকবিতন্ডার ঘটনা স্বীকার করলেও লাঞ্ছনার বিষয়টি অস্বীকার করেন জাতীয় পার্টির ওই নেতা।
কায়েতপাড়া ইউয়িনের ৭, ৮ ও ৯ নং ওয়ার্ডে সংরক্ষিত নারী মেম্বার বিউটি আক্তার কুট্টি বলেন, ‘প্রধান শিক্ষক একজন জামায়াতের কর্মী। তিনি অবৈধভাবে নিয়োগ পাওয়ার পর থেকে স্কুলের বেতন ১২০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৬০ টাকা করেছেন এবং পঞ্চম শ্রেণির ২৫০ টাকার বেতন ৫০০ টাকা করেছেন। এ নিয়ে স্থানীয় কয়েকজন অভিভাবক অভিযোগ করলে প্রধান শিক্ষককে বেতন কমাতে অনুরোধ করি। কিন্তু ওই দিন স্কুলের বেতন ও কোচিং ফি এর জন্য স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী বর্ষা নামে আমরা নাতনিকে বের করে দেওয়া হয়। এ নিয়ে স্কুলের প্রধান শিক্ষক ফারুক আহমেদের সঙ্গে বাকবিতণ্ডা হয়। একপর্যায়ে ওই শিক্ষক আমাকে অকথ্য ভাষায় গালাগালি করেন। যে কারণে আমি ওই শিক্ষককে জুতাপেটা করবো বলি। তবে আমি তাকে জুতাপেটা করি নাই।’
রূপগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারহানা ইসলাম বলেন, ‘ঘটনা তদন্তে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) এসএম মাহফুজুর রহমানকে প্রধান করে উপজেলা মাধ্যমিক অফিসার ও উপজেলা শিক্ষা অফিসারসহ তিন সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।’
তদন্ত কমিটির প্রধান রূপগঞ্জ উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) এসএম মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘গত বুধবার পর্যন্ত ট্রেনিংয়ে থাকায় ও আগামী ৪ জুন বন্দর উপজেলায় ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন উপলক্ষে শিক্ষক লাঞ্ছনার ঘটনায় এখনও তদন্ত কার্যক্রম শুরু হয়নি। নির্বাচনের পরে এ নিয়ে তদন্ত করা হবে।’
/বিটি/টিএন/