নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার বনপাড়া খ্রিস্টানপল্লীর মুদি
এদিকে, দীর্ঘদিন অতিবাহিত হওয়ার পরও হত্যা রহস্য উদঘাটন না হওয়ার পাশাপাশি দেশব্যাপী সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিভিন্ন ব্যক্তির ওপর হামলার ঘটনায় উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে খ্রিস্টানপল্লীর প্রায় চার হাজার সদস্যদের মাঝে। এ অবস্থায় সুনীল হত্যাকাণ্ডের আসামিদের গ্রেফতার বা তাদের বিচার নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন সুনীল পরিবারের সদস্যরা।
আরও পড়তে পারেন: ইতালিকে হারিয়ে সেমিতে জার্মানি
সরেজমিনে খ্রিস্টানপল্লীতে গিয়ে দেখা যায়, ৫ জুন সুনীল হত্যার পর থেকে তার মুদি দোকান বন্ধ থাকলেও গত ২-৩দিন থেকে দোকানটিতে বসছেন সুনীলের স্ত্রী জাসিন্দা গোমেজ। তাকে মাঝে মাঝে সহায়তা করছেন মেয়ে জামাই অতুল গোমেজ। সুনীল হত্যাকাণ্ডের পর বাড়ির দুই ভাড়াটিয়া সবুজ ও মনোয়ারাকে গ্রেফতার করা হয়। তৃতীয় ভাড়াটিয়া চাঁদনি ঈদ করতে শুক্রবার তার বাবার বাড়ি যশোরে গিয়েছেন। বর্তমানে পুরো বাড়িই জনমানবশূন্য। খ্রিস্টানপল্লীর বাসিন্দারা অতি প্রয়োজন ছাড়া বিশেষ করে সন্ধ্যার পর বাড়ির বাইরে যাচ্ছেন না। স্কুল পড়ুয়া ছেলে-মেয়েরাও খেলতে যাচ্ছে না মাঠে। এলাকায় অচেনা-অজানা কোনও মানুষ দেখলেই নিরাপদ দূরত্বে থেকে শুধু তাকিয়ে থাকছেন। লক্ষ্য করছেন পথচারীদের চলাফেরা। তাদের চোখে-মুখে শঙ্কা,আতঙ্ক। এলাকার ধর্মস্থানেও পাওয়া যাচ্ছে না পর্যাপ্ত মানুষ।
প্রতিবেশী তেরেজা গোমেজ জানান, আগে তিনি সকাল-সন্ধ্যা হাঁটতে বের হতেন। এখন আর বের হন না। তার নাতি স্থানীয় স্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্র। তাকেও তারা সন্ধ্যার পর বাড়ি থেকে একা বের হতে দেন না।
বনপাড়া খ্রিস্টানপল্লীর পাল পুরোহিত ফাদার বিকাশ হিউবার্ট রিবেরু জানান, সুনীল হত্যাকাণ্ডের পর ধর্মীয় কাজেও কম সংখ্যক লোক অংশগ্রহণ করছে। আতঙ্কের কারণেই মূলত লোকজন ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশ নিচ্ছে না।
খ্রিস্টানপল্লী পরিচালনা পরিষদের সহ সভাপতি বেনেডিক্ট গোমেজ জানান, সুনীল হত্যাকাণ্ডের পর এখানকার লোকজন আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে। বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া সাধারণ লোকজন ঘরের বাইরে বিশেষ করে সন্ধ্যার পর বের হচ্ছেন না।
অারও পড়তে পারেন: কিশোরগঞ্জে মন্দিরের সেবায়েতের ওপর হামলা
অন্যদিকে, সুনীল হত্যাকাণ্ডের পর বাড়ির ভাড়াটিয়া সবুজ ও মনোয়ারা বেগম মনিকে গ্রেফতার ও রিমান্ড শেষে জেলে পাঠিয়েছে আদালত। ঘটনার পর তথ্য ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট জুনাইদ আহম্মেদ পলক ও নাটোর সদর আসনের এমপি শফিকুল ইসলাম শিমুল সুনীলের স্ত্রীর হাতে ৫০ হাজার করে মোট এক লাখ টাকা অনুদান দিয়ে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে সমবেদনা জানিয়েছেন। সুনীল হত্যাকাণ্ডে প্রকৃত খুনিদের খুব শীঘ্রই গ্রেফতার করে বিচার নিশ্চিত করা হবে এমনটা জানানো হলেও এখনও হত্যা রহস্য উদঘাটন করতে পারেনি পুলিশ। মামলার তদন্তের কোনও রিপোর্টও জমা দেননি তদন্তকারী কর্মকর্তা। আবার নতুনভাবে কোনও আসামিকে গ্রেফতার, কোনও আলামত উদ্ধার কিংবা হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচন করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষকারী বাহিনী। এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের এবং খ্রিস্টান ধর্মপল্লীর নেতারা।
জেলা হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতি মণ্ডলের সভাপতি ধীরেন সাহা জানান, সুনীল হত্যাকাণ্ডের ঘটনার পর থেকে এলাকাটিতে আতঙ্ক বিরাজ করছে।
তিনি দাবি করেন, সুনীল হত্যাকাণ্ডসহ দেশের সংখ্যালঘু হত্যাকাণ্ডের ঘটনা খোদ পাকিস্তানকেও হার মানিয়েছে। কেননা পাকিস্তানেও সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা হয় না বরং যে হামলাগুলো হয় তা বিশেষ উদ্দেশ্যে বিশেষ জনসাধারণের ওপর। ঈদের পর তারা সুনীল হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবিতে পুনরায় রাজপথে নামবেন বলে জানান।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে নিহতের মেয়ে স্বপ্না গোমেজ জানান, বাবাকে হত্যার ঘটনায় গ্রেফতার মনোয়ারা বেগম মনি তার মেয়ে জান্নাতুন ফেরদৌস নদীকে নিয়ে তাদের বাড়িতে ভাড়া থাকতেন। নদীর সঙ্গে আকাশ নামে এক ছেলের সম্পর্ক ছিল। প্রায়ই আকাশ ও তার বন্ধুরা মনির বাসায় আসত। এছাড়া মনির সঙ্গে প্রায়ই দেখা করতে আসতেন স্থানীয় পাটোয়ারী জেনারেল হাসপাতালের স্টাফ আলম। বাড়িতে অন্য মানুষদের আনাগোনায় অন্য ভাড়াটিয়াদেরও খারাপ লাগত। এলাকাবাসীদের নজরেও বিষয়টি আসে। এ ঘটনায় প্রতিবাদ করলে মাঝে মাঝেই মনির সঙ্গে তার বাবা-মার কথা কাটাকাটি হত। একপর্যায়ে মনি তার ভাই ও বাবাকে ডেকে এনে আমার বাবাকে হুমকি দেন। ভাড়াটিয়া সংশ্লিষ্ট ছাড়া অন্য কারো সঙ্গে তার বাবার কোনও শত্রুতা ছিল বলে তার জানা নেই।
স্বপ্নার স্বামী অতুল গোমেজ জানান, খ্রিস্টানপল্লীর পাশে মধ্যপাড়া গ্রামের এক মহিলা উপজেলার এক মেসে রান্নার কাজ করে। ঘটনার কিছুক্ষণ আগে ওই মহিলা রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় দুইজন লোককে তার শ্বশুরবাড়ির কাছে ডেভিড ভিলার পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছিল বলে তাদের জানিয়েছে। কিছুক্ষণ পরেই সুনীল হত্যার ঘটনা তিনি শুনেছেন বলে দাবি করেছেন।
অতুল গোমেজ আরও দাবি করেন, স্থানীয় মিশনের সিস্টার কণিকা তাকে জানিয়েছেন, ঘটনার দিন কণিকাসহ দুইজন সিস্টার ভবানীপুর মিশনে নামাজ শেষে সিএনজিতে বনপাড়া মিশনে ফিরছিলেন। সুনীলের বাড়ি পার হওয়ার পর মোড়ের কাছে তারা দুইজন লোককে মোটরসাইকেলসহ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছেন। তাদের চোখগুলো যেন জ্বল জ্বল করছিল। মিশনে পৌঁছানোর কিছুক্ষণ পরই তারা সুনীল হত্যার বিষয়টি জানতে পারেন।
মামলার আইও, ডিবি পুলিশের ওসি আব্দুল হাই জানান, বিভিন্ন তথ্য ও বিষয় মাথায় নিয়ে সুনীল হত্যাকাণ্ডের তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। তদন্তে প্রাপ্ত তথ্যগুলো যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। তদন্ত শেষে তিনি এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন দাখিল করবেন।
পুলিশ সুপার শ্যামল কুমার মুখার্জী জানান, পুলিশ হেডকোয়ার্টার থেকে সুনীল হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে নিয়মিত খোঁজ নেওয়া হচ্ছে। গতানুগতিক মামলার চেয়ে এই মামলায় সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে সার্বক্ষণিক তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। খুব শীঘ্রই সুনীল হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
অারও পড়তে পারেন: লাশ দেখে উদ্ধারকারীরা: ‘বর্বর, বীভৎস’
/বিটি/টিএন/- আপ- এমএসএম/