এই ৯জনসহ অন্য অপরাধীদের আলোর পথে নিয়ে আসতে সরকারি ও বেসরকারিভাবে তাদের কর্মসংস্থানের পাশাপাশি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিও বদলানোর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট মহল।
সরেজমিনে দেখা যায়, দিনাজপুর কোতোয়ালি থানায় রাতে কাজ করছেন পুলিশ কর্মকর্তারা। আর বসে রয়েছেন ৯ জন দাগি আসামি। এদের মধ্যে রয়েছেন ডাকাত সর্দার, ডাকাত সদস্য, চোর, ছিনতাইকারী ও মাদক ব্যবসায়ী। তারা সবাই এসেছেন রাতে থানায় ঘুমানোর জন্য। এটিই এখন কোতোয়ালি থানার প্রতিদিনকার চিত্র। ভালো হওয়ার মন মানসিকতা নিয়ে এক সময়ের এই অপরাধীরা রাতে থানায় থাকেন। পরের দিন সকালে আবারও ফিরে যান বাড়িতে, তারপর সেখান থেকে কেউ যান রিকশা চালাতে, কেউ অটো চালাতে, কেউবা আসক্রিম বিক্রি করতে, আবার কেউ ফলের খুচরা দোকান করতে।
এদের মধ্যেই একজন দেলোয়ার হোসেন (৪৬)। তিনি জেলা সদরের উত্তর বালুবাড়ী এলাকার ডাকাত চৈত মোহাম্মদের ছেলে। মামলায় সাজা খেটেছেন ১২ বছর। কিন্তু এখন তিনি অন্ধকার জগত ছেড়ে আলোর পথে আসতে চান।
দেলোয়ার হোসেন জানান, থানায় এসে তিনি ভালো হওয়ার জন্য আত্মসমর্পণ করেছেন। থানায় রাত কাটান। তার ইচ্ছা নিজে ভালো হবেন এবং অন্যরাও যাতে কোনও খারাপ কাজ না করেন সেদিকে দৃষ্টি রাখবেন।
আরেকজন হেলাল উদ্দিন। ছিলেন ডাকাত সর্দার। কিন্তু অন্ধকার জগত ছেড়ে থানায় আত্মসমর্পণ করে ৮ মাস ধরে ভালো আছেন। জানান, জীবনে অন্যের পাল্লায় পড়ে ডাকাতি, ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপকর্ম করেছেন তিনি। ছিলেন ডাকাতদের নেতা। কিন্তু এখন ভালো পথে আসতে চান। এখন তার পেশা অটোচালক। অটো চালিয়ে যা পান তা দিয়েই খেয়ে পড়ে ভালো আছেন বলে জানান তিনি। তিনি দিনাজপুর জেলা সদরের ঘাসিপাড়া এলাকার আউয়াল আলীর ছেলে।
আলোর পথে ফিরে আসার ইচ্ছায় থানায় রাত কাটাচ্ছেন আরও ৭ জন। তারা হলেন- দিনাজপুর জেলা সদরের পশ্চিম বালুয়াডাঙ্গা এলাকার আব্দুল হকের ছেলে বাংরী বাবু (৫৫), বিরল উপজেলার দাড়াইল গ্রামের আশরাফ আলীর ছেলে আমিন (৪৫), জেলা সদরের গোলাপবাগ লেবুর মোড় এলাকার মৃত আব্দুল হালিমের ছেলে জাহাঙ্গীর আলম (৪৫), বিরল উপজেলার নলদিঘি গ্রামের মৃত আকিমুদ্দিনের ছেলে শাহিনুর ইসলাম (৩৫), জেলা সদরের নয়নপুর গ্রামের মৃত মকসুদ আলমের ছেলে মকবুল হোসাইন (৪৬), জেলা সদরের বাঙ্গীবেচাঘাট এলাকার মৃত নছির উদ্দিনের ছেলে রফিকুল ইসলাম (৩২) ও জেলা সদরের রামনগর এলাকার ফেরদৌস (৪৪)।
তারা রাতে থানায় আসেন ও সকালে বাড়িতে চলে যান। অপরাধ জগৎ ছেড়ে এখন নিজেরাই প্রশাসনকে সহযোগিতা করছেন অপরাধীদের ধরে দেওয়ার ক্ষেত্রে। তাদের ইচ্ছা, যদি সরকার তাদের কোনও কাজের ব্যবস্থা করত তাহলে তারা সৎভাবে জীবন যাপন করতে পারতেন।
জাহাঙ্গীর আলম বলেন, তিনি ডাকাতি ও চুরির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। মোটে ৭ বছর ধরে জেল খেটেছেন। মামলা ছিল ৬টি। কিন্তু এখন আছে মাত্র ৩টি। জানান, আর কখনও অন্ধকার পথে যেতে চান না তিনি। তিনি বলেন, আগের জগৎ খুবই খারাপ ছিল। সবাই তাকে ঘৃণা করতেন। কিন্তু এখন সবাই তাকে ভালোবাসেন। স্ত্রী-সন্তানসহ সবাইকে নিয়ে আগামীর পথগুলো ভালোভাবে চলার ইচ্ছা পোষণ করেন তিনি। তিনি বলেন, সরকার যদি তাদের কোনও কর্মসংস্থানের পথ করে দিত তাহলে তাদের জন্য আরও ভালো হতো।
তার মত মকবুল হোসাইন ও রফিকুল ইসলাম বলেন, সরকারি সহযোগিতা পেয়ে কোনও কাজে যুক্ত হতে পারলে তাদের জীবনে কোনও চিন্তা থাকতো না। এখন তারা কেউ রিকশা চালিয়ে, কেউবা অটো চালিয়ে আবার কেউ আইসক্রিম বিক্রি করে জীবন যাপন করেন। কিন্তু এগুলো স্থায়ী কর্মসংস্থান নয়, পাশাপাশি সামাজিক স্বীকৃতির বিষয়টিও আছে বলে জানান তারা।
দিনাজপুর কোতোয়ালি থানার ওসি একেএম খালেকুজ্জামান জানান, এক সময়ের অপরাধীদেরকে ভালো পথে নিয়ে আসতে পারলে তাদের দেখাদেখি অন্যরাও সুপথে আসবে-এই ধরনের চিন্তাভাবনা থেকেই পুলিশের এই প্রচেষ্টা। এসব অপরাধীকে থানার ভেতরে রেখে ভালো করা ছিল একটি বড় চ্যালেঞ্জ। কিন্তু একে একে এখন ৯ জন আছেন যারা ভালো হয়ে গেছেন, তাদের দেখাদেখি অনেকেই তাদের অপরাধ জগতের পেশা ছেড়ে দিয়েছেন। যাতে করে জেলা সদরে অনেক অপরাধ কমে গেছে। তিনি জানান, শুধু অপরাধ কম নয়, কোথাও কোনও অপরাধ সংঘটিত হলে আমরা খুব সহজেই এসব অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের ধরতে পারি। এরাই এখন পুলিশের এক ধরনের সোর্স হিসেবে কাজ করেন। এতে করে এসব অপরাধী ভালো হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন, পুলিশ উপকৃত হচ্ছে, পাশাপাশি জনগণও উপকৃত হচ্ছেন। সঙ্গে কমেছে বিভিন্ন অপকর্ম।
দিনাজপুরের পুলিশ সুপার রুহুল আমিন জানান, এসব অপরাধীর ভালো পথে ফিরে আসার ইচ্ছায় এখন অনেকাংশে অপরাধ কমেছে। তবে এদেরকে সামাজিকভাবে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা গেলে স্থায়ীভাবে অপরাধ দমন করা সম্ভব। কারণ, তাদের দেখাদেখি অন্যরাও খারাপ পথ ছেড়ে আসতো।
তিনি জানান, এসব অপরাধীর কর্মসংস্থানের জন্য ইতোমধ্যেই পদক্ষেপ নিয়েছেন তারা। বিষয়টি নিজে জেলা প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলে ভালো একটি উপায় খোঁজা হচ্ছে। সম্মানজনক পেশায় তাদেরকে নিযুক্ত করা গেলে অপরাধীদের আলোর পথে নিয়ে আসা সম্ভব বলে জানান তিনি।
আরও পড়তে পারেন: শিবিরের কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তেই ঝিনাইদহে চিকিৎসক ও সেবায়েত হত্যা: পুলিশ সুপার
আরও পড়তে পারেন: এক যুবকের ধীরে ধীরে জঙ্গি হয়ে ওঠার সত্য কাহিনী
/এফএস/এমএসএম/