জানা গেছে, বাংলাদেশের সুন্দরবন অংশে বাঘের সংখ্যা মাত্র এখন ১০৬।
সর্বশেষ জরিপের ফলাফল প্রকাশ করে ২০১৫ সালে বনবিভাগ থেকে জানানো হয়, সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা মাত্র ১০৬টি। ২০০৪ সালে বন বিভাগের জরিপে পায়ের ‘ছাপ’ গণনা করে বলা হয়, সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা ৪৪০। তার মধ্যে পুরুষ ১২১টি, বাঘিনী ২৯৮টি ও বাচ্চা ২১টি।
বন বিভাগ ও গবেষকদের সূত্রে জানা গেছে, পরিবেশ বিপর্যয়, আবাসস্থলের অভাব, খাদ্য শৃঙ্খল ও চোরাকারবারীদের দৌরাত্ম্যে বাঘের সংখ্যা দিনকে দিন কমছে। এর মধ্যে চোরাকারবারীদের বাঘ হত্যা মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। তারা বাঘ হত্যা করে এর চামড়া পাচার করছে। এতে করে বাংলাদেশ অঞ্চলের সুন্দরবন অংশে বাঘের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে কমছে।
তারা বলছেন, বাঘ শিকারে দেশিয় চক্রের সঙ্গে বিদেশি সিন্ডিকেট জড়িত। এ ছাড়া চোরা শিকারীদের নেপথ্য রাজনৈতিক সহযোগিতা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুন্দরবনের বাঘ রক্ষায় বর্তমান আইনের দুর্বলতা দূর করাসহ আইনের কঠোর বাস্তবায়ন, বনবিভাগে সৎ ও প্রাণীবান্ধব কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগ দিয়ে বাঘ সংরক্ষণে কর্মসূচি নিতে হবে।
নইলে বছরে বাঘ দিবস একদিনই পালিত হবে। আর পাশাপাশি সারাবছরই বাঘ শিকার চলতে থাকবে।
পর্যবেক্ষক মহল বলছেন, বাঘ সংরক্ষণে সংশ্লিষ্ট সরকারি ও বেসরকারি সবার সক্ষমতা বৃদ্ধি অতি জরুরি। এ জন্য বাঘ পর্যবেক্ষণ, ফলোআপ ইত্যাদি টেকনিক্যাল বিষয় সম্পর্কে কারিগরি জ্ঞান প্রয়োজন। ওয়াইল্ড লাইফ ক্রাইম নিয়ন্ত্রণে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাসহ বিচারিক কর্মে নিয়োজিতদেরও সক্ষমতা বৃদ্ধির কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে। সুন্দরবনকে ঘিরে পরিচালিত সব প্রকল্পের লক্ষ্যগুলিকে সমন্বিত করে বাঘ সংরক্ষণে ঐক্যবদ্ধ উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। তা না হলে বিলুপ্তির হাত থেকে রয়েল বেঙ্গল টাইগারকে আর রক্ষা করা যাবে না।
বন বিভাগের হিসাব মতে, গত ১৭ বছরে চোরা শিকারিদের হামলায় ও নানা প্রতিকূলতায় মারা পড়েছে ১৯টি রয়েল বেঙ্গল টাইগার। আর বেসরকারি হিসাব মতে, উল্লিখিত সময়ে মারা পড়েছে ৫২টি বাঘ। এর মধ্যে পূর্ব সুন্দরবন বিভাগে ১৯টি এবং বাকি ৩৩টি পশ্চিম সুন্দরবনের খুলনা ও সাতক্ষীরা অংশে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ুর পরিবর্তন ছাড়াও চোরাশিকারি আর বনদস্যুরা অনেক বেশি মুনাফার আশায় এখন হত্যার পর বাঘের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, চামড়া, হাড় পাচারে জড়িয়ে পড়েছে। এ কারণে গত এক দশকে সুন্দরবনের বাঘের সংখ্যা দ্রুততার সঙ্গে কমে এসেছে।
এ বিষয়ে খুলনার সেভ দ্য সুন্দরবন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ড. শেখ ফরিদুল আলম বলেন, টাইগার দিবস একদিন পালিত হয়। কিন্তু সারাবছর ধরেই বাঘ শিকার চলে।
তিনি বলেন, বাঘ সুরক্ষায় দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনাসহ সুন্দরবন বনদস্যু মুক্ত করা, অভয়ারণ্য তৈরি করা, বাঘের আবাসন স্থল চিহ্নিত করে পদক্ষেপ নিতে হবে।
বাঘের চোরা শিকার সম্পর্কে র্যাব-৬’র কোম্পানি কমান্ডার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. এনায়েত হোসেন মান্নান বলেন, চোরাশিকারিরা বিক্রির উদ্দেশ্যে ফাঁদ পেতে, গুলি করে ও বিষটোপ ব্যবহার করে সুন্দরবনের বাঘ ও হরিণ শিকার করে। এরপর চামড়া ছাড়িয়ে এ চামড়া ও হাড় বিভিন্ন দালাল চক্রের হাত ঘুরে বিদেশে পাচার করে।
২০১৫ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি সাতক্ষীরার তালা উপজেলার কুমিরা এলাকা থেকে একটি বাঘের চামড়াসহ দ্বীন মোহাম্মদ গাইন নামে এক পাচারকারীকে আটক করে র্যাব। এরপ ২৪ ফেব্রুয়ারি দুপুরে সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার বুধহাটা বাজার এলাকায় অভিযান চালিয়ে একটি বাঘের চামড়া ও চারটি হরিণের চামড়াসহ পাচারকারী চক্রের তিন সদস্যকে আটক করা হয়।
এ বিষয়ে সুন্দরবন পূর্ব বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. সাইদুল ইসলাম বলেন, সুন্দরবনের বাঘ ও সম্পদ রক্ষায় আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের পাশাপাশি বনবিভাগও কঠোর অবস্থানে রয়েছে। সুন্দরবনকে চোরাশিকারিদের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য ইতোমধ্যেই নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।
সুন্দরবন পশ্চিম বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. সাঈদ আলী বলেন, সুন্দরবনের বাঘ রক্ষায় নিয়মতান্ত্রিক কার্যক্রম চালাতে হবে।
তিনি বলেন, বাঘ রক্ষায় ২০১৪ সাল থেকে ক্যামেরা ট্র্যাপিং শুরু হয়েছে, যা আগামী নভেম্বরেও হবে। নভেম্বরে আবারও বাঘ জরিপ করা হবে। এই পদ্ধতির মাধ্যমে এখন থেকে প্রতি বছরই বাঘ গণনা চলবে।
এছাড়াও সরাসরি বাঘ সংরক্ষণ সংক্রান্ত না হলেও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ সংক্রান্ত ‘ক্রেল’ প্রজেক্ট, ‘সিলস’ প্রজেক্ট নামে একাধিক প্রজেক্ট চলছে। অন্যদিকে বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় স্ট্রেদেনিং রিজিওনাল কো-অপারেশন ফর ওয়াইল্ডলাইফ প্রটেকশন প্রকল্পও কাজ করছে।
কিন্তু এ সব উদ্যোগ যখন নেওয়া হয়েছে, তখনও সুন্দরবনের রাজা বাঘের জীবন সংকটে চোরাকারবারীদের দৌরাত্ম্যে।
বিশেষজ্ঞরা অভিযোগ করেছেন, বাঘ সংরক্ষণের প্রধান চ্যালেঞ্জ চোরাশিকারি। এরা সব সময়ই আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের সাথে সক্রিয় থাকে। লোকচক্ষুর অন্তরালে এরা কাজ করে যাচ্ছে। এর সঙ্গে বনবিভাগের কেউ কেউ যুক্ত না থাকলে এভাবে বাঘ শিকার সম্ভব নয়।
তারা আরও বলছেন, এছাড়াও বাঘের খাবারের অভাব রয়েছে সুন্দরবনে। এ কারণে বাঘ লোকালয়ে চলে আসছে এবং মানুষের হামলার শিকার হয়ে মারা পড়ছে।
এদিকে, সুন্দরবন রক্ষা জাতীয় কমিটির খুলনার সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার বলেন, চোরাকারবারী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বাঘ শিকার চলছে। তাদের নেপথ্যে রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়া হচ্ছে।
দেশিয় নেপথ্য শক্তির পাশাপাশি বিদেশি সিন্ডিকেটও বাঘ শিকারে সহযোগিতা করছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
সম্প্রতি প্রশাসনের নেওয়া পদক্ষেপের সমালোচনা করে অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার বলেন, সম্প্রতি সুন্দরবন বনদস্যু মুক্ত করার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তবে শুধুমাত্র এ পদক্ষেপে সুন্দরবনে বাঘ হত্যা প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। এ জন্য বাঘ হত্যায় নেপথ্য শক্তিকেও চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা দরকার।
এ ছাড়া বনবিভাগে সৎ ও প্রাণীবান্ধব কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগও জরুরি। বাঘ সুরক্ষায় এর কোনও বিকল্প নেই।
এবি