চারদলীয় জোট সরকারের আমলে তারেক রহমানের বন্ধু গিয়াস উদ্দিন আল মামুনের গাজীপুরের বাড়ি ‘খোয়াব’-ছিল আলোচনার কেন্দ্রে। সে সময় প্রায়ই এ বাড়িতে গাড়ির বহর নিয়ে আসতেন রাজনীতিক, ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ। রাতভর বৈঠক হতো, পার্টি চলতো। আর এসবের মধ্যমণি ছিলেন মামুন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, এ বাড়িতে তারেক রহমানকেও তারা মাঝে মাঝে আসতে দেখেছেন।
বহুল আলোচিত ‘খোয়াব’ বাড়িটির সেই জাঁকজমক এখন আর নেই, অনেকটা গুরুত্বহীন আর দশটা সাধারণ বাড়ির মতো। তবে খোয়াব নিয়ে এখনও স্থানীয়দের মাঝে আলোচনা থেমে নেই। এখনও তারা খোয়াব-এর অতীত নিয়ে স্মৃতি চারণ করেন।
গাজীপুর শহরের অভিজাত এলাকা দক্ষিণ ছায়াবীথির একেবারে শেষ সীমানার একটি গলি দিয়ে ডান দিকে ঢুকলেই দ্বিতীয় বাড়িটি খোয়াব। গিয়াস উদ্দিন আল মামুনের বাড়ি। সরেজমিনে জানা যায়, তিন তলা এই ভবনটির তিন তলায় বর্তমানে ভাড়া থাকে দুটি পরিবার। কেয়ারটেকার দেলোয়ার হোসেন তার পরিবার নিয়ে বাড়িতেই থাকেন।
বাড়ির নাম খোয়াব হলেও নির্ধারিত জায়গায় ‘খোয়াব’ ফলকটি আর নেই। তুলে ফেলা হয়েছে অনেক আগেই। বাড়ির বর্তমান বাসিন্দারা কেউই বহিরাগত বা অপরিচিত কারও সাথে কথা বলতে চান না। আশপাশের তিন- চারটি বাড়ির মালিকেরাও গিয়াস উদ্দিন আল মামুনের আত্মীয়-স্বজন বলে জানিয়েছেন পটুয়াখালীর বাসিন্দা কেয়ারটেকার দেলোয়ার হোসেন।
দেলোয়ার হোসেন জানান, বাড়ির তিন তলায় দুটি পরিবার সাত বছর ধরে ভাড়ায় থাকেছে। ভাড়া তুলে মাস শেষে ঢাকায় গিয়াস উদ্দিন আল মামুনের বাসায় তার স্ত্রীর কাছে দিয়ে আসেন। গিয়াস উদ্দিন আল মামুনের স্ত্রী শাহিনা ইয়াসমিন বছরে কয়েকবার বাড়ির খোঁজ খবর নিতে আসেন। বিশেষ করে বাড়ির রং,চুনকামসহ সংস্কার কাজ ঠিকঠাক মতো হলো কিনা তিনি তা দেখতে আসেন।
একই এলাকার সোহরাব হোসেন (৬৫) জানান, খোয়াব ভবনে প্রায় এক যুগ আগে ঢাকা থেকে প্রায়ই গাড়ি আসতো,অনেক মানুষের যাতায়াত ছিল। তখন নিয়মিত সরগরম ছিল বাড়িটি। কিন্তু এখন আর সেরকম নেই। তিনি জানান, বাড়ির জমিটি ছিল গিয়াস উদ্দিন আল মামুনের দাদা শ্বশুরের। পরে তার দাদা শ্বশুর মামুনের স্ত্রী শাহিনাকে লিখে দেন।
নামফলক না থাকলেও এখনও বাড়িটিকে এলাকার সবাই খোয়াব ভবন নামেই চেনে। তবে স্থানীয় বাসিন্দারা খোয়াব নামটি ছাড়া বাড়িটি সম্পর্কে কোনও কথা বলতে নারাজ। জানতে চাইলে তারা বলেন, বাড়ির নাম ছাড়া কোনো কিছুই জানি না।
এ ভবন থেকেই আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য আহসান উল্লাহ মাস্টারকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
উল্লেখ্য, হাওয়া ভবনের প্রভাবশালী ব্যক্তি গিয়াস উদ্দিন আল মামুন ছিলেন তারেক রহমানের বাল্যবন্ধু, ব্যবসায়িক পার্টনার এবং অত্যন্ত বিশ্বস্ত। এ কারণে মামুন সহজেই তারেকের ওপর প্রভাব বিস্তার করতেন। তারেকের নাম ভাঙিয়ে জোট সরকারের আমলে তিনি ঘুষ ও দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ ও সম্পদের মালিক হন। তিনি বিদেশেও অর্থ পাচার করেন। তারেকের বন্ধু হওয়ায় মামুনের বিরুদ্ধে কেউ অভিযোগ করারও সাহস পেতেন না। ওয়ান-ইলেভেনের পর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে যৌথবাহিনীর হাতে গ্রেফতার হন মামুন।
অর্থপাচার মামলায় গিয়াস উদ্দিন আল মামুনের সাত বছরের কারাদণ্ডের সাজা বহাল ও ২০ কোটি টাকা জরিমানা করেছেন উচ্চ আদালত। বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি আমির হোসেনের হাইকোর্ট বেঞ্চ চলতি বছরের ২১ জুলাই এ রায় ঘোষণা করেন। এর আগে এই মামলায় ২০১৩ সালের ১৭ নভেম্বর তারেক রহমানের বন্ধু গিয়াস উদ্দিন আল মামুনকে ৭ বছরের কারাদণ্ড ও ৪০ কোটি টাকা জরিমানা করা হয়। পাচার করা ২০ কোটি ৪১ লাখ ২৫ হাজার ৬১৩ টাকা রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করারও নির্দেশ দেন আদালত ।
একই মামলায় দোষী সাব্যস্ত করে বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানকেও সাত বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে ২০ কোটি টাকা জরিমানা করা হয়েছে তাকে। পলাতক তারেক রহমানের বিরুদ্ধে সাজার পরোয়ানা জারি করতে বিচারিক আদালতকে নির্দেশ দিয়েছেন।
তারেক রহমান লন্ডনে বসবাস করলেও বর্তমানে কারাগারে সাজা ভোগ করছেন মামুন। আর তার সাধের খোয়াব হারিয়েছে আগের সেই গুরুত্ব।
এপিএইচ/
আরও পড়ুন:
সনদের স্বীকৃতির পক্ষে কওমি আলেম-শিক্ষার্থীদের আগ্রহ বাড়ছে